আর্থিক অন্তুর্ভুক্তিতে বাংলাদেশের বিষ্ময়কর অগ্রগতি

এম. এ. মাসুম
এম. এ. মাসুম, ছবি: বার্তা২৪.কম

এম. এ. মাসুম, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে টেকসই ও অন্তর্ভূক্তিমূলক ব্যাংকিং খাতের বাস্তবায়ন একটি সময়োচিত পদেক্ষেপ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে আর্থিক অন্তর্ভূক্তি ধারণাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

সারাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে আর্থিক সেবা সহজে ও দ্রুততার সঙ্গে পৌছে দেয়াই আর্থিক অন্তুর্ভূক্তির লক্ষ্য। আর্থিক অন্তুর্ভূক্তি কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রামের মানুষের ক্ষুদ্র হিসাবের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তাদের রাখা আমানতের পরিমাণও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত কৃষকসহ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ১ কোটি ৭৯ লাখ ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।

বিশ্বের ১৭০ কোটি পূর্ণ বয়স্ক মানুষ এখনও ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে আছে। ব্যাংক হিসাবের বাইরে থাকা এসব মানুষের অর্ধেকের বাস উন্নয়নশীল সাত দেশে। এ তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নামও। বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষ এখনও ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে আছেন। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।

বিশ্বব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভূক্তির হার বাড়ছে। ব্যাংকিং খাতে হিসাব খোলার হারে নারীরা পুরুষের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে আছে। এতে আরও বলা হয়, সারা বিশ্বে ৬৯ শতাংশ পূর্ণ বয়স্ক মানুষের ব্যাংক হিসাব রয়েছে। ২০১৪ সালে এ হার ছিল ৬২ শতাংশ। আর ২০১১ সালে ব্যাংকে হিসাব ছিল পূর্ণ বয়স্ক ৫১ শতাংশ মানুষের। ব্যাংকে হিসাবধারীর সংখ্যা বর্তমানে ৩৮০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট(বিআইবিএম) এর এক গবেষণা থেকে জানা যায়, সাতটি দেশের মধ্যে একমাত্র পাকিস্তান বাদে অন্যসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা সর্বনিম্ন। এ দেশগুলো হচ্ছে-ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটার ও মালয়েশিয়া।

পাকিস্তানে ১৩ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে। বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা ৩১ শতাংশ মানুষের। তাছাড়া, নেপাল ও ভুটানের ব্যাংক হিসাব আছে যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ৮ এবং ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের। সর্ব্বোচ্চ ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে শ্রীলংকায়। মালয়েশিয়ায় এ সংখ্যা ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ। ভারতে অর্ধেকের বেশি মানুষের ব্যাংক হিসাব রয়েছে।

অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের ব্যাংক হিসাবের মালিকানায় লিঙ্গ ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও তুরস্কে ব্যাংক হিসাবে পুরুষ ও নারীর ব্যবধান প্রায় ৩০ শতাংশের মতো। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেবার বাইরে যত মানুষ রয়েছে তার ৬৫ শতাংশই নারী। ২০১৪ থেকে ২০১৭ থেকে বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের হার প্রায় ২১ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের মূলধারায় সামাজিক দায়বোধ জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার বাংলাদেশে নিম্ন  আয়ের মানুষ ও গ্রামীন জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং খাতের সেবার আওতায় আনতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আর্থিক অন্তুর্ভূক্তির অংশ হিসেবে গরিব কৃষকদের ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণ, অসহায় মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র জীবন বীমাগ্রহীতা, বেকার তরুণ, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গার্মেন্টস শ্রমিক, অতি দরিদ্র উপাকরবোগী, অতি দরিদ্র মহিলা উপকারভোগী, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচীর সুবিধাভোগী, পথশিশুশু, ছিন্নমূল এমনকি ভিক্ষুকও ব্যাংক হিসাব খুলতে পারছে। এ ধরনের হিসাবের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ন্যুনতম স্থিতি রাখার বাধ্যবাধকতা নেই, নেই কোন চার্জ বা ফি। দেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ২ কোটি মানুষ এখন ব্যাংক হিসাবধারী। ১০ বছর আগে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত এ মানুষেরা ছিলেন আর্থিক সেবার বাইরে।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাংকিংয়ের বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। মোবাইর ব্যাংকিং এরই মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে গ্রামীন জনজীবনে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। দেশে ব্যাংক ব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে পৌঁছাতে না পারলেও মোবাইল ব্যাংকিং পৌঁছে গেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং সব শ্রেণির মানুষের কাছে। কারণ বিশ্বে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর ৮ শতাংশই হচ্ছে বাংলাদেশী। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৮ সালের অক্টোবর শেষে মোবাইল ব্যাংক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৫০ লাখ। প্রতিদিন গড়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদে হয় প্রায় ১ হাজার ২৪ কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবধারীর সংখ্যা ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবধারীর সংখ্যা যেখানে ছিল মাত্র ৩ শতাংশ, তিন বছরের ব্যবধানে ২০১৭ সালে তা দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশ। জানা যায়, বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি এবার বড় পরিসরে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। ‘নগদ’নামে নতুন ডিজিটাল আর্থিক এ সেবা বিদ্যমান সেবার কয়েকগুণ বেশি লেনদেনের সুযোগ নিয়ে আসছে।

শৈশকবাল থেকে শিশুকে মিতব্যয়ী হওয়ার শিক্ষা দিয়ে তাদের সঞ্চয়ী হওয়ার মনোভাব গড়ে তুলতে কয়েক বছর ধরে জনপ্রিয় হযে উঠছে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম। বর্তমানে ১৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬১ জন শিক্ষার্থী স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা জমা রয়েছে ব্যাংকে। উল্লেখ্য, ২০১০ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ। ফলে ব্যাংকগুলোতে এ কার্যক্রমের আওতায় খোলা হিসাবের পাশাপাশি আমানতের পরিমাণও অব্যাবহতভাবে বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী ৩০ জুন, ২০১৮ পর্যন্ত ৫৬ টি তফসিলী ব্যাংকের আমানতের পরিমান ১৪  দশমিক ১৯ বিলিয়ন টাকা। স্কুল ব্যাংকিং এর মোট হিসাবের ১৬ শতাংশ অর্থাৎ লাখ ৪৫ হাজারটি হিসাব খোলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ সর্ব্বোচ্চ অবস্থানে আছে।

আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের আর্থিক সেবা খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। মূলতঃ ২০১৬ সাল থেকে দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে একদিকে প্রান্তিক মানুষ আর্থিক সেবার মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন, অন্যদিকে আর্থিক অন্তর্ভূক্তির বিকাশের কারণে সামিষ্টিক অর্থনীতিও শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়াচ্ছে। ডিসেম্বর ১৮ পর্যন্ত ১৯টি ব্যাংকের ৬,৯৩৩ এর বেশি এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে ২৪ লাখ ৫৭ হাজার একাউন্ট পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি সাাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর ভাতা প্রদান, স্কুল ব্যাংকিং, বিল পরিশোধে এজেন্ট ব্যাংকিং বিশেষ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে রেমিট্যন্সের টাকা সহজে, নিরাপদে এবং বৈধভাবে পৌঁছানো, এসএমই ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা এলাকায় কৃষি খাতে বিকাশে এজেন্ট ব্যাংকিং মূখ্য ভূমিকা পালন করছে।  এজেন্ট ব্যাংকিং দিন দিন জনপ্রিয় হওয়ার ফলে লেনদেন ও গ্রাহক সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, শহরের চেয়ে গ্রামে এজেন্ট ব্যাংকিং বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে।

দেশে বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা ৬২টি হলেও ব্যাংক খাতের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততায় এখনও কাঙ্ক্ষি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ। ডেবিট কার্ড ব্যবহার, সঞ্চয়, আর্থিক অন্যান্য কার্যক্রমেও মানুষের ব্যাংকের সম্পৃক্ততা কম। ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন দেয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর এক গবেষণায় জানা যায়, বাংলাদেশে মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন-ভাতাদি পাচ্ছেন। এ হার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম। মালয়েশিয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে বেতন পরিশোধের হার ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ, ভুটানে ৬ দশমিক ৪, ভারতে ৩ ও নেপালে ২ দশমিক ৪ শতাংশ জনবল ব্যাংকিং চ্যানেলে বেতন গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশের এসডিজি অর্জনে ব্যাংক খাতের সঙ্গে আরও অধিক জনসংখ্যার সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছেন বিশেজ্ঞরা। মোবাইল, ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং প্রভৃতির পর এবার আসছে বুথ ভিত্তিক ব্যাংকিং। বর্তমানে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের কার্যক্রম শহারাঞ্চল কেন্দ্রেক হওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এর আওতার বাইরে থেকে যান।

তাছাড়া, ব্যাংকগুলোর ঋণের ৮৫ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রামে দেয়া হয়। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনও ব্যাংকিং সেবার বাইরে আছে। এসব মানুষকে ব্যাংকের আওতায় আনতে হলে ব্যাপক জনসচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। অর্থ প্রবাহের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে। গ্রাম পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবা বিস্তারে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম আরো বাড়াতে হবে।

এম. এ. মাসুম: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক