‘আপনারা সবকিছুই জানেন এবং বোঝেন’

চিররঞ্জন সরকার
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এসেছিল এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত সেদিনের প্রায় ১৯ মিনিটের ভাষণে শেখ মুজিব শুরু করেছিলেন, জনতাকে ‘আপনি’ সম্বোধনের মাধ্যমে। বলেছিলেন, ‘আপনারা সবকিছুই জানেন এবং বোঝেন।’ তিনি জনতাকে তাঁর সহযাত্রী মনে করেছিলেন। যে সহযাত্রীরা সব কিছু সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল। উভয়ের দুঃখ-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা এক। কেউ কারও চেয়ে কম জানে বা বোঝে না।

প্রকৃত নেতা কখনও তাঁর কর্মী-সমর্থকদের ‘কম বুদ্ধিমান’ মনে করেন না। যেমন করেননি বঙ্গবন্ধু। তিনি শুধু বাস্তবতার দিকগুলো তুলে ধরেছেন। সাধারণ মানুষের অনুভূতিগুলোকে নিজের অনুভূতির সঙ্গে ঝালিয়ে নিয়েছেন। একপর্যায়ে উপস্থিত জনতার সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে পড়েছেন যে কখন যে জনতা ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে পরিণত হয়ে গেছে তা না বক্তা, না শ্রোতা, তা কেউই খেয়াল করেননি।

ভাষণের একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তা-ই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’

এই বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান একটা গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। ভাষণ শেষে আবার স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাস্তাগুলো।

শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ওই ভাষণ দিয়েছিলেন। একদিকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, অন্যদিকে তাকে যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিহিত করা না হয়, সেদিকেও তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তিনি পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নেননি। তাঁর এই সতর্ক কৌশলের কারণেই ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই জনসভার ওপর হামলা করার প্রস্তুতি নিলেও তা করতে পারেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও শেখ মুজিবকে ‘চতুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে চলে গেলো, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না। (ডয়েচে ভেলে, ৩১ অক্টোবর, ২০১৭)

আগের দিন ৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান টেলিফোনে কথা বলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সরকারের তৎকালীন তথ্য কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে এসব তথ্য রয়েছে। জেনারেল ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে বলার চেষ্টা করেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) যেন এমন কোনও কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করেন, যেখান থেকে ফিরে আসার উপায় আর না থাকে।’ ৬ মার্চ এও ঘোষণা করা হলো যে, ২৫ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

পরিস্থিতির চাপে ভীতসন্ত্রস্ত পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সদর দফতর থেকে বিভিন্নভাবে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে এই বার্তা দেওয়া হয় যে, ৭ মার্চ যেন কোনোভাবেই স্বাধীনতা ঘোষণা না করা হয়। ৭ মার্চ জনসভাকে কেন্দ্র করে কামান বসানো হয়। এমনকি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়।

মেজর সিদ্দিক সালিক তার গ্রন্থে লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ৭ মার্চের জনসভার প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ নেতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোনও কথা বলা হলে তা শক্তভাবে মোকাবেলা করা হবে। বিশ্বাসঘাতকদের (বাঙালি) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে। শাসন করার জন্য কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না।’

এমন এক কঠিন সংকটময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ মার্চ রেসকোর্সে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষকে চারটি শর্ত দিয়ে ভাষণের শেষাংশে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কিছু অংশ ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, তিনি সেদিন যুদ্ধের ঘোষণা যেমন পরোক্ষভাবে প্রদান করেন, আবার যুদ্ধে কীভাবে জয়ী হতে হবে সে ব্যাপারেও বক্তব্য রাখেন। স্বাধীন রাষ্ট্রের বৈধ সরকার প্রধানের মতো একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।..... যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না!’

অনেকেরই আশঙ্কা ছিল বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হতে পারে। যে জন্য তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা রাস্তাঘাট সবকিছু বন্ধ করে দেবে।’ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলেও শত্রু পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধ অব্যাহত থাকে- ৭ মার্চের ভাষণে তা-ই তিনি বলেছেন।

তবে ৭ মার্চ যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারেন- এটা বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোও জেনে গিয়েছিল। ৬ মার্চ ’৭১ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হয় ‘শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল (৭ মার্চ) পূর্ব পাকিস্তানের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ’৭১-এর ৭ মার্চ সরাসরি কেন স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, তার ব্যাখ্যা পরবর্তীকালে তিনি নিজেই দিয়েছেন। ১৯৭২-এর ১৮ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে এনডব্লিউ টিভির জন্য দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ৭ মার্চের ওই ঘটনা বর্ণনা করেন।

ফ্রস্ট শেখ মুজিবের কাছে জানতে চান, ‘আপনার কি ইচ্ছা ছিল যে তখন ৭ মার্চ রেসকোর্সে আপনি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা দেবেন?’ জবাবে শেখ মুজিব বলেন, ‘আমি জানতাম এর পরিণতি কী হবে এবং সভায় আমি ঘোষণা করি যে এবারের সংগ্রাম মুক্তির, শৃঙ্খল মোচন এবং স্বাধীনতার।’

ফ্রস্ট প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যদি বলতেন আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা করছি, তো কী ঘটত?’ শেখ মুজিব উত্তর দেন, ‘বিশেষ করে ওই দিনটিতে আমি এটা করতে চাইনি। কেননা, বিশ্বকে তাদের আমি এটা বলার সুযোগ দিতে চাইনি যে মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং আঘাত হানা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। আমি চাইছিলাম তারাই আগে আঘাত হানুক এবং জনগণ তা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।’

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল একটি অগ্নিমশাল, যা বিস্ফোরিত করেছিল মুক্তিযুদ্ধের দাবানল, যার সামনে টিকতে পারেনি হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এই ভাষণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। সামরিক আইন প্রত্যাহার, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফেরত নেয়া, নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা এবং যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা। এ চারটি শর্ত দিয়ে একদিকে অলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখলেন, অপরদিকে বক্তৃতা শেষ করলেন এই কথা বলে যে এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি প্রকারান্তরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেন।

মূলত স্বাধীনতা সংগ্রাম স্বাধীনতা যুদ্ধের রূপ নেয় যখন ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক চলাকালীন ২৫ মার্চের কালরাতে জেনারেল টিক্কা খান অপারেশন সার্চ লাইট নামে নারকীয় গণহত্যা শুরু করে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সশস্ত্রভাবে দমনের চেষ্টা হলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম সশস্ত্র রূপ ধারণ করলেও আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন এবং নৈতিক বৈধতা বাংলাদেশের পক্ষে চলে আসে। ১৯৭১ -এর ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ এই ১৮ দিনে এই ভাষণ বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষকে প্রস্তুত করেছে মুক্তির সংগ্রামে, স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পুরো মুক্তিযদ্ধের সময়ে মানুষকে উজ্জীবিত রেখেছে। প্রিয় নেতা সুদূর পাকিস্তান কারাগারে। বেঁচে আছেন কি-না তাও জানা নেই। কিন্তু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ওই অমর ভাষণ জীবন-মরণের কঠিন দুঃসময়ে এক সঞ্জিবনী সুধার মতো বিপন্ন মানুষকে সজীব রেখেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একাধিকবার এই ঐতিহাসিক ভাষণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে মূল্যায়নধর্মী বক্তব্য দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। যেমন ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় রাষ্ট্রীয় সফরে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘গত ৭ই মার্চ (১৯৭১) তারিখে আমি জানতাম পৈশাচিক বাহিনী আমার মানুষের ওপর আক্রমণ করবে। আমি বলেছিলাম আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। আমি বলেছিলাম তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। আমি বলেছিলাম এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমার লোকেরা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বৃদ্ধ থেকে বালক পর্যন্ত সকলেই সংগ্রাম করেছে।’

সুতরাং, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছে আসলে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ, আর ২৬শে মার্চ ১৯৭১ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর কর্তৃক ঘোষিত সশস্ত্র প্রতিরোধ অথবা যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ ৭ই মার্চের ঘোষণার ধারাবাহিকতা মাত্র।

এই ভাষণটি আজও আমাদের জাতীয় জীবনের অনুপ্রেরণা। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর দিকনির্দেশনা আজও রয়ে গেছে। আমাদের জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে এই ভাষণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পথ হারানোর ক্ষণে কিংবা দেশবিরোধী শত্রুদের ষড়যন্ত্র আর আস্ফালনে দিশেহারা মুহূর্তে যেন বেজে ওঠে সেই বজ্রকণ্ঠ: ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি...!’ অথবা ‘আপনারা সব কিছুই জানেন এবং বোঝেন!’

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট।