৭ মার্চের ভাষণ আজো অনুপ্রেরণার উৎস

রেজা-উদ্-দৌলাহ প্রধান, ঢাকা, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা গৌরবের এক অনন্য দিন। দীর্ঘদিনের আপসহীন আন্দোলন সংগ্রামের এক পর্যায়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক উত্তাল জনসমুদ্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন।

সেদিন স্বাধীনতাকামী লাখ লাখ জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘.....তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ কিছু বলবে না। গুলি চালালে আর ভালো হবে না। সাত কোটি মানুষকে আর দাবায়ে রাখতে পারবা না। বাঙালি মরতে শিখেছে, তাদের কেউ দাবাতে পারবে না। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেদিনের মাত্র ১৮ মিনিটের সেই ভাষণটি ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক সঞ্জীবনী মন্ত্র। বজ্রকণ্ঠের ওই ঘোষণা ছিল প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি। বাঙালির আদর্শ ও চেতনার কেন্দ্রবিন্দু এই ভাষণই একমাত্র ভাষণ যা একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজ 'বিশ্বঐতিহ্য দলিল'। জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কো মানবজাতির মূল্যবান সম্পদ হিসেবে ‘International Memory of World Register’-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে।

বঙ্গবন্ধুকে বলা হয় ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ তথা ‘রাজনীতির কবি’। ৭ই মার্চের ভাষণ যেন তার রচিত একটি অমর কবিতা। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনে বাংলার মানুষের ভোটে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অন্যায়ভাবে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে আলোচনার আড়ালে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে থাকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে ও সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে ৬ মার্চ পর্যন্ত ঘোষিত হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলন চলে। এরপর সাতই মার্চের ভাষণে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

ওই দিন রেসকোর্স ময়দানের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী কামান তাক করে রেখেছিল। আকাশে উড়ছিল গানবাহী সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার। একদিকে স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রবল আকাঙ্ক্ষা ও অন্যদিকে শাসকশ্রেণির অপ্রত্যাশিত চাপ। এই দুই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের যে রূপ ও প্রকৃতি দাঁড়াল তা অত্যন্ত কৌশলী, বহুমাত্রিক ও স্বভাবসুলভ। এই ভাষণের অনন্য শব্দচয়ন, অনুপম বাকশৈলী, ঋজু উপস্থাপনা ও আবহমান বাংলার লোকজ শব্দসম্ভার মুক্তিপাগল মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকর্ষণ করে।

বাঙালির হাজার বছরের পরাধীনতার শেকল ভেঙে স্বাধীনতার সোনালি সোপানে উত্তরণের পথে ৭ মার্চের ভাষণটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। সংগঠন ও নেতৃত্বের ক্যারিশমা তথা জাদুকরী ক্ষমতার সফল মিথস্ক্রিয়ার একটি অভূতপূর্ব প্রদর্শনী এই ৭ মার্চ। আমরা যখন একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন এই মন্ত্রই আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনুপ্রেরণা জোগাবে। এই পথ ধরে আসবে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি।

তাই ৭ মার্চ ভাষণের গুরুত্ব শুধু সেদিনই শেষ নয়। কেবল বাঙালি জাতি নয়, পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী, নিপীড়িত, বঞ্চিত ও শোষিত জনগণের জন্য অমূল্য দিক-নির্দেশকও। আজ যখন বাংলাদেশ উন্নত বাংলাদেশ হবার স্বপ্নে বিভোর তখনো এই ভাষণ অনুপ্রেরণা দায়ক। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। গত ১০ বছরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতেৃত্বে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটসহ জল, স্থল ও অন্তরীক্ষের সবখানেই আজ উন্নয়নের ছোঁয়া। আর এই উন্নয়নের জন্য পিছুটান হিসেবে ছিল হাজারো বাঁধা, ষড়যন্ত্র। তবে সেসব বাঁধা অতিক্রম করেই দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি প্রায়ই বলেন, একাত্তরে আমাদেরকে কেউ দাবায় রাখতে পারেনি, এখনো কেউ দাবায় রাখতে পারবে না। বিশ্বে বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে চলবে।

আপনার মতামত লিখুন :