সংকটোত্তর ভারত-পাকিস্তান এবং মোদির অগ্নিপরীক্ষা

ফরিদুল আলম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি প্রশমনের পর এবার চলছে পারষ্পরিক অর্জনের হিসেব নিকেশ। আপাতদৃষ্টিতে সংকটের কার্যকর কোনো সমাধান না হলেও যুদ্ধংদেহী মনোভাব থেকে সরে এসেছে দুই দেশই। দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যকার সংঘাতের বিস্তৃতি মূলত কোনও দেশকেই নিরঙ্কুশ বিজয় এনে দেবে না –এই উপলব্ধিবোধ থেকে সরে আসলেও সাম্প্রতিক সংকট পরবর্তী সময়টি অনেকটা রিট্রিট (যুদ্ধকালীন সময়ে ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের স্বার্থে পিছু হটা) হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যেখানে সংকটের কোনো সমাধান হয়নি এবং অতীতেও এধরনের সংকটের ধারাবাহিকতায় নিত্যনতুন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, সেক্ষেত্রে বর্তমান সময়টিকে ভবিষ্যতে দুই দেশই একে অপরের ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে চাইবে সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাম্প্রতিক উত্তেজনা থেকে আমরা আরেকটি বিষয় বুঝতে পারলাম, সেটি হলো এখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিখ্যাত ক্রীড়াতত্ত্ব অনুযায়ী একটি ‘জিরো সাম গেম’ হয়ে গেল, অর্থাৎ দুই পক্ষই কমবেশি অগ্রসর হলেও ফলাফল কারও অনুকূলে রইলনা। তবে দিন যতই যাচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে ততই বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। ঘটনার সারসংক্ষেপ এরকমঃ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের ভারত নিয়ন্ত্রিত পুলওয়ামা সীমান্তে আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হবার পর পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মুহাম্মদ এর দায় স্বীকার করলে ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের ভাওয়ালপুর এবং বালাকোটে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক (প্রতিপক্ষয়ের সীমানায় ঢুকে শত্রু আস্তানায় হামলা) করা হয় এবং দাবি করা হয় এর মধ্য দিয়ে ৩শ জঙ্গি নিহত হয়েছে এবং জঙ্গি আস্তানাগুলো গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

ভারতের বিমান বাহিনীর এই হামলার সময় পাকিস্তানের সেনারা দুটি যুদ্ধবিমানকে ভূপাতিত করে এবং উইং কমান্ডার অভিনন্দন নামক একজন বৈমানিককে আটক করে। আটকের ৬০ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভারতের উদ্দেশ্যে শান্তির বার্তা সরূপ আটক বৈমানিককে সসম্মানে ফেরত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে টেলিফোনে কথা বলার আগ্রহ ব্যক্ত করেন।

এই সময়ের মধ্যে ভারত সীমান্তে ব্যাপক সৈন্য মোতায়েন করে যুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে থাকে। তবে তাদের বৈমানিককে ফেরত দেয়ার পর পুরো পরিস্থিতি রাতারাতি পাল্টে যেতে থাকে। আন্তর্জাতিক মহল থেকে উত্তেজনা প্রশমনে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রশংসিত হতে থাকেন। এমতাবস্থায় ভারতের পক্ষ থেকে আবারও পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে হামলার অর্থ দাঁড়ায় অনেকটা উস্কানিস্বরূপ।

এ পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি ‘জিরো সাম গেম’ হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। তবে ইদানীংকালে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামি মাসে অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচন, দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাকার বিষয় নিয়ে সেখানকার গণমাধ্যম মোদি সরকারের সামগ্রিক অর্জনের সাথে সাথে সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংকটের ইতিবৃত্ত নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে।

ভারতের দাবি করা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের মাধ্যমে ৩শ জঙ্গিকে হত্যা এবং পাকিস্তানের ভাওয়ালপুর এবং বালাকোটে বিমান হামলা চালিয়ে জঙ্গি আস্তানা গুড়িয়ে দেয়া নিয়ে পরস্পরবিরোধী সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। দেশটির বিরোধী দলগুলো এর সচিত্র তথ্য প্রমাণ চাইলেও ভারত সরকার সেটা তাদের কাছে আছে এবং কৌশলগত কারণে প্রকাশ করবে না বলে জানানোর পর গত ৬ মার্চ রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে একটি বেসরকারি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার স্যাটেলাইট চিত্রের উদ্বৃতি দিয়া জানানো হয় যে ভারতের দাবি করা হামলার স্থানগুলো অক্ষত রয়েছে। সেখানে জইশ-ই-মুহাম্মদের পরিচালিত ঘাটিগুলো আগের মতই রয়েছে এবং কোনো স্থাপনাতে হামলার কোনো চিহ্ন নেই।

প্রতিবেদনটিতে ২০১৮ সালের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ধারণকৃত ছবিগুলোর সাথে বর্তমান সময়ের ধারণ করা ছবি মিলিয়ে কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি বলে জানানো হয়। এই ব্যাপারে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি এখনও। তবে আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদি সরকারের জন্য বিষয়টি নিঃসন্দেহে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে মোদি সরকার যদি তাদের অনুকূলে নতুন কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে না পারেন তবে সাম্প্রতিক সংকটের অবসানকে ‘জিরো সাম গেম’ না বলে ‘নন-জিরো সাম গেম’ বলা যেতে পারে, আর সেক্ষেত্রে পুরো সাফল্য পাকিস্তানের অনুকূলে চলে আসে।

এমনিতেও উপমহাদেশের দুই দেশের মধ্যে সংকটের সরূপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে কাশ্মীর নিয়ে যে দীর্ঘকালীন সংকট বিরাজমান রয়েছে সেখানে দুই দেশের ভৌগলিক সীমানা ছাড়িয়ে কোন না কোনভাবে এখানে তৃতীয় পক্ষ্যের পরোক্ষ ইন্ধন রয়ে যায়। এখানে শক্তিই যদি সমস্যা সমাধানের একমাত্র বিবেচিত মানদণ্ড হত, তাহলে সঙ্গত কারণেই ভারতের শক্তির সাথে পাকিস্তানের শক্তির কোন তুলনা চলেনা। দুই দেশের শক্তির বাইরেও এখানে পাকিস্তান তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে এই সমস্যায় দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্ব রাজনীতিতে বর্তমানে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রচ্ছন্নভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান করলেও পাকিস্তানের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের পথ ধরে পাকিস্তান এই দুটি দেশের কাছ থেকে কাশ্মীর নিয়ে যে পরোক্ষ সহযোগিতা পেয়ে যাচ্ছে, সেটা ভারতের মত একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে তাদের জন্য এক বিরাট রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।

দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধ এবং তাদের আফগানিস্তান নীতির স্বার্থে সন্ত্রাসের লালনভূমি হিসেবে খ্যাত পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ককে অস্বীকার করতে পারছে না একমাত্র আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাবের কারণে। ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে কয়েক দফায় পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অবনতি ঘটলেও আফগানিস্তানের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয়েছে। অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তান- এই দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনায় চীন প্রকাশ্যে সরব না থাকলেও পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের লালনের জন্য দেশটি পরোক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

চীনের ৬ হাজার ৬শ কোটি ডলারের চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (সিপিইসি) তাদের প্রস্তাবিত বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) এর সাথে সংযুক্ত হয়েছে, যা বেলুচিস্তানের গোয়েদার উপকূল থেকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের সাথে সংযুক্ত হবে। দেশের বাইরে এটাই চীনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ, যার মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে পণ্য আদান প্রদান সহজতর হবে। চীন তার দুরভিসন্ধিমূলক এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে পাকিস্তানের যে কোনো প্রয়োজনে পাশে থাকবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর তাই পাকিস্তান একদিকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করে আসলেও ভারতকে মোকাবিলার স্বার্থে এই সংগঠনগুলো পাকিস্তানের জন্য অনেক বড় শক্তি।

পাকিস্তানে বর্তমানে সক্রিয় অনেক জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে লস্কর-ই-তাই-তাইয়েবা এবং জইশ-ই-মুহাম্মদ নামক সংগঠন দুটির প্রধান হাফিজ সাইদ এবং মাসুদ আজহার। এদের মধ্যে ১৯৯৯ সালে আফগানিস্তানের কান্দাহার থেকে পাকিস্তানের কিছু সন্ত্রাসী কর্তৃক ভারতের একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাইয়ের কবলে পড়লে সন্ত্রাসীদের দাবি মোতাবেক মাসুদ আজহারকে ভারতের কারাগার থেকে মুক্তি দেবার বিনিময়ে ভারতকে যাত্রীদের মুক্ত করতে হয়।

আর ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ের হোটেলে সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে ১৬৬ জন মানুষকে হত্যার মূল দায় বর্তায় লস্কর প্রধান হাফিজ সাইদের উপর। অথচ এই দুজন নেতাই পাকিস্তানে মুক্ত জীবন যাপন করছেন। তারা প্রকাশ্যে তাদের ঘাটিগুলো পরিচালনা করছেন। সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনায় জইশ নেতা মাসুদ আজহার নেপথ্যের নায়ক হিসেবে চিহ্নিত থাকলেও এবং বিভিন্ন দাবি অনুযায়ী তিনি এখনও জীবিত এবং সুস্থ থাকলেও পাকিস্তান সরকার গত ৬ মার্চ কেবল লোকদেখানোভাবে তার ভাই এবং ছেলেকে আটক করেছে। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সংকট প্রশমনে দৃশ্যপটে তাদের অবস্থান তুলে ধরলেও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাদের কৌশলগত স্বার্থের প্রয়োজনে শক্ত অবস্থান নেবার পক্ষপাতী নয়।

অবস্থাদৃষ্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন নতুন চাপের মধ্যে রয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মাত্র কিছুদিন আগে সরকার গঠনের পর যে কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছেন, তা থেকে মোদির তুলনায় তিনি অধিক শান্তিকামী বলে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন। এখানে ভারতের জন্য হয়েছে উভয় সংকট, তুলনামূলক শক্তিতে পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে থাকার কারণে তার জন্য আঘাতের পাল্টা জবাব দেয়া যেমন অপরিহার্য হয়ে পড়ে, আবার এখান থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাবার হতাশা রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নানান বিতর্কের জন্ম দেয়। এহেন পরিস্থিতিতে আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচন নরেন্দ্র মোদির জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে আভির্ভূত হতে যাচ্ছে।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :