ডাকসু: আলো আসবেই

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রতিদিনের মত আজ ভোরেও সূর্য উঠেছে। কিন্তু আজকের সূর্যটি আর সব দিনের মত নয়। আজকের সূর্যটি যেন একটু বেশিই আলো ছড়াচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের রাজনীতিতে।

২৮ বছর ধরে জমে থাকা হতাশা, অন্ধকার দূর হয়ে যাচ্ছে। এই লেখা যখন আপনারা পড়ছেন, ততক্ষণে ডাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। আশা করি আগের রাতে কেউ ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবাই নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারছেন। আপনাদের সবাইকে একটু দ্রুতই ক্যাম্পাসে যেতে হবে। ভোট দিতে পারবেন বেলা ২টা পর্যন্ত। তবে ২টার মধ্যে হলে পৌঁছাতে পারলে যতক্ষণই লাগুক, ভোট আপনি দিতে পারবেন। ডাকসুতে ২৫টি এবং হল সংসদে ১৩টি মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩৮টি ভোট দিতে পারবেন আপনি। তাই হাতে একটু সময় নিয়ে যাবেন। আর সম্ভব হলে, আগেই আপনার পছন্দের প্রার্থী তালিকা ঠিক করে যাবেন।

দেশজুড়ে এখন চলছে উপজেলা নির্বাচন। কিন্তু এক ডাকসু নির্বাচনের কাছেই ম্লান তা। শুধু উপজেলা নির্বাচন নয়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ঘটনা ডাকসু নির্বাচন। ডাকসু নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সবাই বলে ডাকসু নেতা তৈরির কারখানা। খুব একটা ভুল বলে না। বিভিন্ন সময়ে ডাকসুর নেতারাই এখন জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আব্দুর রব, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতারুজ্জামান, জিয়াউদ্দিন বাবুল, সুলতান মনসুর, মুশতাক হোসেন, আমানউল্লাহ আমান, খায়রুল কবির খোকন- সবাই নিজ নিজ দলে সক্রিয়। এই যে এতগুলো ডাকসু নেতার নাম আপনার ঠোঁটের আগায়, এবার গত ২৯ বছরে ছাত্র নেতাদের নাম বলুন তো? আমি জানি আমরা সবাই আমতা আমতা করব। ব্যক্তিগতভাবে কিছু নাম হয়তো আমরা বলতে পারব, তবে জাতীয়ভাবে পরিচিত কোনো ছাত্রনেতা আমরা পাইনি। ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয় যে এই সময়ে ভালো ছাত্রনেতা ছিল না। ছিল, কিন্তু আমরা তাদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেইনি। নেতৃত্ব দেয়ার মত করে গড়ে তুলিনি। তাই নেতৃত্বের প্রতিভা নিয়েও তারা হারিয়ে গেছে।

তবে ডাকসু শুধু নেতা তৈরির কারখানা নয়। ডাকসু হলো দেশের সবচেয়ে অগ্রসর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার, মতপ্রকাশের, নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধানের ক্ষেত্র। তারা জোর গলায় নিজেদের কথা বলবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ২০১৩এর গণজাগরণ- সব আন্দোলনেই নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই একসময় ছাত্রশিবির মানেই ছিল আতঙ্ক। কিন্তু ছাত্রশিবির তো নয়ই, প্রতিক্রিয়াশীল কোনো সংগঠন, কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনি। স্বৈরাচার এরশাদ জাতীয় রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হলেও, তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রসমাজ কখনোই ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি।

ডাকসু আমাদের গণতন্ত্রের এক গোলক ধাঁধা। স্বাধীনতার পরের ১৯ বছরে ৭টি ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। যদিও ৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগ বিপুল ভোটে জিতে যাচ্ছিল বলে ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে তিনটি ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমলে হয়েছে দুটি। কিন্তু স্বৈরাচার পতনের পর গত ২৯ বছরে আর নির্বাচিত নেতৃত্ব পায়নি ডাকসু। ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গণতান্ত্রিক আমলেই বারবার গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে ভোটাধিকারকে। বছরের পর বছর ধরে ক্যাম্পাসে একাধিপত্য। হলে হলে গেস্ট রুমের নির্যাতন, সাধারণ ছাত্রদের সাথে চাকর বাকরের মতো আচরণের খবর শুনে লজ্জিত হয়েছি। কোথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই প্রতিবাদী চেতনা।

স্বৈরাচার এরশাদের আমলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটা ভারসাম্য ছিল। উত্তর পাড়া মানে ক্যাম্পাসের উত্তর দিকের হলগুলো ছিল ছাত্রদলের দখলে। আর দক্ষিণ পাড়া ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু গণতান্ত্রিক আমলে এই ভারসাম্য ভেঙ্গে পড়ে। যখন যে দল ক্ষমতায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার একক সাম্রাজ্য। কিন্তু এই সাম্রাজ্য যে আসলে ফাঁকা বেলুন, তা টের পাওয়া যায়, কারণ জাতীয় রাজনীতিতে পট-পরিবর্তনের রাতেই বদলে যায় ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ। ছাত্রদের মধ্যে যদি সমর্থনই না থাকে, তবে আর সাম্রাজ্য গড়ে লাভ কি?

২৯ বছর কেন ডাকসু নির্বাচন হয়নি। আমি ধরে নিচ্ছি, পরাজয়ের ভয়ে ক্ষমতাসীনরা ডাকসু নির্বাচন দেয়নি। কারণ ডাকসুর ইতিহাসে কখনোই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা জেতেনি।

প্রায় ২৯ বছর পর এবার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ছাত্রলীগ ছাড়া সবাই হলের বাইরে কেন্দ্র স্থাপনের দাবি করেছিল, ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর দাবি করেছিল। কিন্তু মানা হয়নি। তারপরও নির্বাচনের পরিবেশ ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল। তারচেয়ে বড় কথা হলো এবারের নির্বাচন হচ্ছে অংশগ্রহণমূলক। সক্রিয় সবগুলো সংগঠন তো অংশ নিচ্ছেই, স্বতন্ত্র অনেকেও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ভিপি পদে প্রার্থী ২১ জন, জিএস পদে ১৪ জন। আর প্রচার-প্রচারণায় উৎসবমুখর ছিল ক্যাম্পাস।

ফলাফল কী হবে, সেটা রাতে জানা যাবে। ক্ষমতাসীনদের পরাজয়ের ঐতিহ্য বজায় থাকবে, নাকি প্রতিপক্ষের সুযোগ নেবে ছাত্রলীগ? সেটা ঠিক করুক ভোটাররা। ডাকসুর জট খুলেছে, প্রায় ২৯ বছর পর নির্বাচন হচ্ছে, এটাই আমাকে আশাবাদী করেছে। আমি জানি এই পথ ধরে আলো আসবেই।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।