ডাকসু নির্বাচন বিশাল ও কঠিন যাত্রার প্রথম ধাপ

মাছুম বিল্লাহ
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪

মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

দীর্ঘ আটাশ বছর পর আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতিক্ষীত ও আলোচিত ডাকসু নির্বাচন। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎপর সব ছাত্র সংগঠন কেন্দ্রীয় এবং হল সংসদে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। দলীয়ভাবে নির্বাচন না হলেও ছাত্র সংগঠনগুলো প্যানেল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। নির্বাচন হবে ডাকসুর ১৮টি হলের ছাত্র সংসদে। ডাকসুর ২৫টি পদে ২২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ডাকসু নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? আমরা জানি, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীকার আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেই ডাকসু অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। ডাকসুর মাধ্যমে দেশের নেতৃত্ব তৈরি হয়। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য সোচ্চার থাকে ডাকসু। শিক্ষা সংক্রান্ত যে কোনো গণবিরোধী আন্দোলনেও ডাকসু ভূমিকা পালন করে এসেছে।

বিগত বছরগুলোতে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেখেছি। যেমন-মেট্রোরেলের রুট বদলাও আন্দোলন, ৭ কলেজের অধিভুক্তির আন্দোলন, এর প্রেক্ষিতে জোরদার নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ।

প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্রঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত বামজোট প্যানেলের ভিপি প্রাথী ডাকসু নির্বাচন সম্পর্কে বলছেন, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক চেহারা এখন আর নেই, যে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের গর্ব করার কথা ছিল, যে বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় এ দেশের আঁতুড়ঘর, সে বিশ্ববিদ্যালয় এখন হয়ে গেছে দাস তৈরির কারখানা।শিক্ষার্থীদের গণরুম আর গেষ্টরুমে এমন এক অত্যাচারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, যা বহির্বিশ্ব কেন, এ দেশের সাধারণ একটি পরিবারও কল্পনা করতে পারবে না। আমাদের এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এককালে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। পরিহাসের বিষয়, এখন এটাই যে, যেখানে অক্সফোর্ড ইউনিয়নে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়েদের জেতা নিয়ে আমাদের গণমাধ্যম গালভরা সংবাদ উপস্থাপন করে, সেখানে ডাকসু নির্বাচনের পরের দিন আমরা তাদের মুখে শুধুই হয়তো কারচুপি আর ভোট ডাকাতির খবর শুনতে পাব।’এগুলো সবই নিষ্ঠুর বাস্তবতা। শুধুমাত্র ছাত্র সংসদ, শুধুমাত্র শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এজন্য দায়ী যে নয় তা আমরা জানি। এজন্য দায়ী পুরো সমাজের অবক্ষয়, রাজনৈতিক র্দুবৃত্তায়ন, পেশীশক্তির পালন তোষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা।

দেশের মেধাবী সন্তানরা এখানে ভর্তি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপদে থেকে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারা তাদের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার হরণ করার অধিকার কারোরই নেই।অথচ আমরা গণরুম ও গেস্টরুম কালচারের মাধ্যমে এইসব মেধাবী সন্তানদের ওপর নিপীড়নের যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে দেখতে পাই তা বিশ্ববিদ্যালয় কেন কোন বর্বর সমাজেও হওয়ার কথা নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে তার কোনো সমাধান হবে কী? সমাজ ও দেশের এই প্রেক্ষাপটে এবং বাস্তবতায় আমরা কেমন ধরনের ডাকসু চাইব? এমন ধরনের নেতা নির্বাচন করতে হবে, যারা তবে ছাত্রছাত্রীদেরই অংশ। যাদের সঙ্গে দেখা করতে কোনো প্রটোকল পার হতে হবে না, বন্ধুর মতো যাদের কাছে যাওয়া যাবে। যারা পেশিশক্তিকে প্রাধ্যান্য দিবেন না, ক্যাম্পাসে সত্যিকার জ্ঞান বিতরণের আলোয় হিসেবে গড়ার জন্য কাজ করবে,সকল ধরনের শিক্ষার্থীদের একই চোখে দেখবেন। শিক্ষার্থী বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবেন হলে, বিভাগে, লাইব্রেরিতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। কিন্তু সেই ধরনের নেতৃত্বে কোত্থেকে আসবে? আকাশ চিঁড়ে তো আর মহাত্মা গান্ধী আর নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতা আসবেন না। যেখানে টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আর এক ছাত্রকে হত্যা করে, যেখানে হলের দখল নিতে গিয়ে খুনাখুনি হয়, যেখানে পার্টিতে নতুন শিক্ষার্থীদের ভেড়ানোর জন্য ভীতি প্রদর্শন, অস্ত্র প্রদর্শন নিত্যনৈমিত্তিক ও মামুলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে কোথা থেকে আসবে এই ধরনের নেতা? তারপরেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা আশায় বুক বেঁধে আছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সকল ধরনের পশুত্বের অবসান হবে।

বিভিন্ন প্রার্থীরা মিডিয়ার কাছে জানাচ্ছেন যে, আবাসিক হলগুলো ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের ঘাঁটি, ভোটকেন্দ্র, নির্বাচনী কর্মকর্তারা বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দলেরই প্রত্যক্ষ সমর্থক। নির্বাচনের সময় মাত্র ছয় ঘন্টা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী দেবে ৩৮টি ভোট, পর্যবেক্ষক ও মিডিয়াকর্মীদের প্রবেশ নিয়ে রয়েছে নাানরকম নিয়মের মারপ্যাঁচ-এভাবেই একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তারপরেও সচেতন ছাত্রসমাজকে বেছে নিতে হবে যোগ্য নেতৃত্বকে। নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ীরা আবাসন সমস্যার সমাধানের জন্য কাজ করবে, গেষ্টরুম-গণরুম নিষিদ্ধ করবে, অছাত্রদের হল থেকে উচ্ছেদ করবে, ক্যাম্পাসজুড়ে খাবারের মানোন্নয়ন, একাডেমিক জটিলতা নিরসনে-যেমন অযৌক্ত্রিক ফি, শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতা, রেজিষ্ট্রার ভবনের দাপট ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করবেন।

ডাকসু নির্বাচনের আচরণবিধির ৩ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, 'নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো ধরনের যানবহান যেমন মোটরকার, মোটরসাইকেল, রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি, হাতি, ব্যান্ড পার্টি ইত্যাদি নিয়ে কোনরূপ শোভাযাত্রা বা মিছিল করা যাবেনা।’ আচরণবিধির ৪(গ) ধারায় বলা হয়েছে, 'ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার বা প্রার্থী ছাড়া অন্য কেউ কোনভাবেই কোন প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচারণা চালাতে পারবেন না।’

আমরা বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখেছি প্রতিদিনই আচরণবিধি লঙ্গনের খবর ও চিত্র। এসব ঘটনা আমাদের জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল।আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে ডাকসু নির্বাচনের আচরণবিধির ১৫(খ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কেউ নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ দশ হাজার টাকা জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিল অথবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার অথবা রাষ্ট্র বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী অন্য যে কোনো দণ্ড দণ্ডিত হবেন।

ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে দুই সদস্যের দলীয় আংশিক প্যানেল ঘোষণা করেছে এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রসমাজ। ভিপি ও জিএস পদে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য জাতীয় ছাত্রসমাজকে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদ। সম্প্রতি ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর জাতীয় ছাত্রসমাজের নির্বাচনে অংশগ্রহণের খবরে ক্ষোভ জানায় ছাত্রলীগ ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো। এরশাদ আমলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। দেখেছি তাদের দাপট। এ নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিবে। ছাত্রসমাজ বলে কথা নেই। যখনই যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের ছাত্র সংগঠনের কীর্তিকলাপ জাতি সর্বদাই উদ্বেগ সহকারে প্রত্যক্ষ করেছে।

কোনোভাবেই এই নির্বাচন পেছানো এবং বন্ধ করে রাখা ঠিক নয়। ডাকসুর একটি গঠনতন্ত্র আছে এবং ডাকসুর অস্তিত্ব রয়েছে ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্সে। ডাকসু গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ডাকসু ইলেকশন হবে। কীভাবে হবে, কাদেরকে নিয়ে হবে সেগুলো বিস্তারিত বলা আছে সেই গঠনতন্ত্রে। কিন্তু সবকিছু লিখিত থাকার পরেও বিগত ২৭ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন হয়নি। এ নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে, আলোচনা সমালোচনা হয়েছে।

২৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ সৃষ্টি হয়। মোট ৩৬বার এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডাকুসর প্রথম ভিপি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। ১৯২৮-২৯ সেশনে ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন এ এম আজহারুল ইসলাম ও এস চক্রবর্তী, ১৯২৯-৩২ সময়কালে রমণী কান্ত ভট্টাচার্য ও কাজী রহমাত আলী ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যতগুলো ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার একটিতেও সরকারপন্থী সংগঠন জয়লাভ করেনি। ২০১২ সালে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে উচ্চ আদালতে একটি রিটও হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি একটি সমাবেশে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তারপরেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যেখানে প্রতি বছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা সেখানে বাংলাদেশের ৪৬ বছরের ইতিহাসে মাত্র সাতবার নির্বাচন হয়েছে। সর্বশেষ ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে।

ডাকসুতে নির্বাচিত নেতারাই জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গত ১৭ জানুয়ারি মাননীয় হাইর্কোটের একটি দ্বৈত বেঞ্চ আাগামী ছয়মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশটি দেয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। আমাদের প্রশ্ন ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য হাইকোর্টকে কেন বলতে হবে, কেন অনুসরণ করা হয় না ডাকসু গঠনতন্ত্র? বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভেবে দেখতে হবে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক; বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিকে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।

আপনার মতামত লিখুন :