ডাকসু নির্বাচন: শুদ্ধতম ছাত্ররাজনীতির বিকাশ হোক

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তা২৪

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ (ডাকসু) বাংলাদেশের দ্বিতীয় আলোচিত রাজনৈতিক মঞ্চ। অনেকে ডাকসুকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ বলেও অভিহিত করেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ‘রাজনীতির বিকাশ ও উন্নয়নে’ ডাকসুর অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ প্রতিষ্ঠিত করা গেলেও বর্তমান নির্বাচন সংঘটিত করতে ২৮ বছর পেরিয়ে গেছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মোট ৩৬ বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একবারও নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। অন্তত ৬০ জন ‘স্বশিক্ষিত ও অকুতোভয় রাজনৈতিক নেতা’ প্রাপ্তি থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধিকার আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে ডাকসুর। ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ঐতিহাসিক শিক্ষা আন্দোলন (১৯৬২), বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা (১৯৬৬), গৌরবময় গণ-অভ্যুত্থান (১৯৬৯), সংগ্রামময় মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) একনায়কতন্ত্রের অবসান ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার (১৯৯০), স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন (২ মার্চ, ১৯৭১) প্রভৃতি ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষ্য বহনকারী ১৯৫৩ সাল থেকে গৌরবের নামধারী ‘ডাকসু’।

দুই
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন না হওয়ায় কিংবা ছাত্র সংসদ না থাকায় যখন যে দল ক্ষমতায় থেকেছে সেই দলের মতাদর্শে বিশ্বাসী শিক্ষার্থীরা ছাত্র রাজনীতির চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। সেখানে সুযোগ সন্ধানী ও সুবিধাবাদী শিক্ষার্থীদের অনুপ্রবেশ এবং অংশগ্রহণও ছিল। অতীতে ছাত্র রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে যে ছাত্র সংগঠনগুলো আতঙ্ক ও ভীতি সৃষ্টি করেছিল, কালের বিবর্তনে তারা ক্যাম্পাসগুলো থেকে বিতাড়িত হয়েছে অসম্মাজনকভাবে।

রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রতিপত্তি সারা জীবনের জন্য নয়; কিন্তু শ্রদ্ধা, সম্মান, মানুষকে নি:শর্ত ভালোবাসা এবং সহায়তা করার অনুভূতি ও তার প্রাপ্তির সুখ সারা জীবনের। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অর্থবহ উদ্যোগে অনীহা, ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা, বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর বিজয়ের আশঙ্কা, বয়স ও সুযোগ না থাকায় ছাত্র সংগঠনগুলোর বয়োজৈষ্ঠ্য নের্তৃবৃন্দের তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগের অভাবসহ প্রভৃতি নানামুখী কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে গত ২৮ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘তারকা রাজনীতিবিদের’ বিকাশ ঘটেনি।

তিন
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অধিকার মঞ্চ’-এর শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর একক অনশন; শিক্ষার্থীদের রিট আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ কর্তৃক পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের আদেশ; বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের উদ্যোগ এবং সরকারের ঐকান্তিক সহযোগিতা ডাকসু নির্বাচন সংঘটিত হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরিতে নি:সন্দেহে প্রেরণা যুগিয়েছে ও ভিত্তিভূমি রচনা করেছে।

দীর্ঘ ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠনগুলোর ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, সকল ছাত্র সংগঠনের প্যানেল দেওয়া, প্রচার চালানো এবং নের্তৃবৃন্দের পদচারণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নি:সন্দেহে প্রাণ পেয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ডাকসু নির্বাচন’ বর্তমানে একটি ভিন্ন মাত্রা, উৎসাহ–উদ্দীপনা ও আমেজ যুক্ত করেছে। ডাকসু নির্বাচনের জন্য একটি অবাধ, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ, ও প্রভাবমুক্ত সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অব্যাহত থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। কেননা, মানুষ গড়ার কারিগর যখন নির্বাচনের সকল পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত, তখন সেখানে কোন রকম সংশয়-সন্দেহ না থাকায় কাম্য। যেহেতু ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ডাকসু নির্বাচনের উপর, সেহেতু স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে সকলের নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকতে হবে। গৌরবের ইতিহাস গৌরব দিয়েই সাজাতে হয়, তাতে যেন কোন দাগ না লাগে।

চার
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ছাত্রদলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিয়ে, বুকে টেনে নিয়ে, একসাথে ‘মিটিং’ করে, বুকের মধ্যে নিয়ে নিরাপদে ক্যাম্পাস পার করে দিয়ে, মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদলকে চায়ের আমন্ত্রণ ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সাথে বসে চা-নাস্তা করে, কিংবা ক্যাম্পাসে ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়ে যে মানবিক রাজনৈতিক আচরণ করেছে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে তা শ্রদ্ধার সাথে শেখা ও চর্চা করা উচিত। কেননা এই সকল কর্মকাণ্ড ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে। অথচ বিগত দিনগুলোর ইতিহাসে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এমন আচরণ কখনো কারো কাছ থেকে পায়নি। যা পেয়েছিল তা ছিল এক ধরণের অমানবিক আচরণ, ভয়ঙ্কর অপমান ও অশ্রদ্ধা-অসম্মানের সাথে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন। সেই সব নির্যাতন যারা সহ্য করেছে, তারাই জানে কি বেদনার ইতিহাস জড়িয়ে আছে তার মধ্যে।

যেহেতু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে, সেহেতু সরকারের সম্মান বৃদ্ধি ও মর্যাদা রক্ষায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মানবিক ও প্রশংসনীয় ভূমিকা এক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এমনকি কেউ যেন কোনভাবে ডাকসু নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে সেজন্য অতি উৎসাহীদের ব্যাপারেও তাদেরকে সজাগ থাকতে হবে।

পাঁচ
যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় প্রচলিত ছাত্র রাজনীতির চর্চার বাইরে থাকেন। তবে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দের কাছে তাদের মানবিক ও যৌক্তিক অনেক প্রত্যাশা থাকে যেগুলো পূরণ করা ছাত্র সংগঠনগুলোর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ভয়ঙ্কর ও আতঙ্কের কোন পরিবেশ; কোন নেতার প্রকাশ্যে ধুমপানের কুণ্ডলি পাকানো ধোঁয়া; মোটরবাইক নিয়ে বেপরোয়া চলাচল; ‘ইভটিজিং’, ‘মাদক’, ‘র‍্যাগি’, ‘হল ও সিট দখল’, ‘চাঁদাবাজি’, ‘টেন্ডারবাজি’, ‘নিয়োগ বাণিজ্য’, ‘ভর্তি জালিয়াতি’; প্রতিপক্ষ দলের অনুসারিদের উপর ভয়ঙ্করভাবে আক্রমন; যখন তখন মিছিল; ধর্ষণ ও জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার হুমকিসহ যত খারাপ বিষয় আছে, সেগুলো প্রত্যাশা করেন না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবাধ জ্ঞান বিকাশের সুযোগ; আন্তর্জাতিক মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি; মানসম্মত খাবার ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন পরিবেশসহ প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি শতভাগ সম্মান ও সমর্থন থাকতে হবে নির্বাচিত ডাকসু নের্তৃবৃন্দের। কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ভবন, উপাচার্যের অফিস এবং বাসভবন ঘেরাও ও হামলা যেন কেউ করতে না পারে; একটি দিনও যেন ক্যাম্পাস বন্ধ না থাকে এবং অতি উৎসাহী কোন শিক্ষার্থী দ্বারা শিক্ষকবৃন্দের যেন কোন ধরণের সম্মানহানী না হয়, সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে ডাকসুকে। ঐতিহ্যবাহী ‘ডাকসু’ সেই সকল বিষয়ের নের্তৃত্ব দেবে যা সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থী থাকেন, যারা কায়ক্লেশে খেয়ে না খেয়ে জীবন যাপন করেন, তাদের ব্যাপারে নের্তৃবৃন্দকে ভাবতে হবে। গৌরবময় ডাকসুর অতীতের কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিতে হবে যে কীভাবে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থার প্রতীক ছিলেন। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীবান্ধব এমন একটি ডাকসু দেখতে চাই যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের খুশিতে হাসবে এবং কান্না ও কষ্টে পাশে থেকে কাঁদবে। ডাকসুকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধু নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছিলেন বলে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁকে আজীবন বহিস্কার করেছিল।

পরিশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডাকসু নেতৃবৃন্দকে দুইটি অনুরোধ করতে চাই। (এক) বাংলায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ নাম থেকে ‘ছাত্র’ নামটি সরিয়ে দিয়ে ‘শিক্ষার্থী’ শব্দের সম্মানজনক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। তাতে ইংরেজি শব্দ থেকে আর্বিভূত ‘ডাকসু’ নামটিও ঠিক থাকবে এবং ‘শিক্ষার্থী’ শব্দটির অর্ন্তভুক্তির মাধ্যমে হাজার হাজার ছাত্রীদেরকে শ্রদ্ধা করা হবে। (দুই) অতীতের কালজয়ী ‘ডাকসু’ নেতৃবৃন্দের সম্মানজনক উপস্থিতির মাধ্যমে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্যদিয়ে নতুন ডাকসু নেতৃবৃন্দ যেন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাতে ভবিষ্যতের জন্যেও বিনম্র শ্রদ্ধা ও সম্মানের ভিত্তিভূমি রচিত হবে।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, জেঝিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :