Alexa

কোনো আদর্শ শিক্ষক নির্দয় হতে পারেন না

কোনো আদর্শ শিক্ষক নির্দয় হতে পারেন না

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪

মুফতি এনায়েতুল্লাহ

সম্প্রতি ভালুকায় শিক্ষকের বেতের আঘাতে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে মারা গেছে মাদরাসা ছাত্র তাওহিদ (১৩)। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত শিক্ষক পলাতক রয়েছেন।

তাওহিদ ময়মনসিংহের ভালুকার জামিরদিয়া এলাকার ওমর ফারুক (রা.) হাফিজিয়া কিন্ডারগার্টেন মাদরাসায় হেফজ বিভাগে পড়ত। ২৭ ফেব্রুয়ারি তাকে শিক্ষক আমিনুল ইসলাম দেড় পাড়া কোরআন শরিফ মুখস্থ করতে দেয়। সে সাত পৃষ্ঠা মুখস্থ শোনানোর পর বাকিটুকু শোনাতে না পারায় শিক্ষক তাকে বেধড়ক পেটায়। আঘাতে তার বুকের পাঁজর ভেঙে যায়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয় এবং সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

শুধু তাওহিদ নয় প্রায়ই গণমাধ্যমে খবর আসে- শিক্ষকের মারধরে ছাত্র অজ্ঞান, শিক্ষকের প্রহারে শিশু শিক্ষার্থী হাসপাতালে, শিক্ষকের মারধরে ছাত্রীর আত্মহত্যা, শিক্ষকের বেতের আঘাতে চোখ নষ্ট, ও এমনকি মারধরের ফলে মৃত্যুর অভিযোগ। অনেক সময় মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতারও করা হয়। এভাবে গণমাধ্যমে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রকে বেদম মারপিটের যে বর্ণনা পাই তা রীতিমত ভয়ংকর।

শিক্ষকতা একটি মহৎ পেশা। এখানে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক অতি পবিত্র। সেখানে মারামারি সীমা কেন ছাড়িয়ে যাবে? ছাত্রদের মারপিট করে কঠোর শিক্ষক হওয়া যায়, কিন্তু আদর্শ শিক্ষক হওয়া যায় না।

আমরা মনে করি, অমানবিক ও নির্যাতনকারী শিক্ষক তথা নির্যাতন ও শাস্তির ব্যাপারে কঠোর আইন প্রণয়ন করা দরকার। তবে এমন কোনো আইন যেন না হয়, যাতে শিক্ষককে ‘নিধিরাম সর্দার’-এর পর্যায়ে নিয়ে যায়। অর্থাৎ সব দিক রক্ষা পায়।

অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, শহর থেকে শুরু করে গ্রামে-গঞ্জে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকরাও মারাত্মকভাবে অসচেতন। অভিভাবকদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। শ্রেণিকক্ষ একটি সম্বনিত জায়গা। এখানে শান্ত ও দুষ্টু প্রকৃতির শিক্ষার্থী থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সবাই এক নয়। এটা মেনেই শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীদের সামলাতে হয়। যে শিক্ষক ভালোভাবে সামাল দিতে পারেন, তিনি সফল। বাকিরা আশ্রয় নেন প্রহারের। এটি তাদের অযোগ্যতা, অদক্ষতা। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই অযোগ্যতা ও অদক্ষতা ঢাকতেই তারা প্রহারের আশ্রয় নেন।

শিক্ষক তার ছাত্রকে সামান্য প্রহার কিংবা মানসিকভাবে কিছুটা লজ্জিত করতে পারেন, এর উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট ছাত্রকে সংশোধন করা এবং সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া। তবে শিক্ষকদের এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে যাতে এটি কোনোভাবে নির্যাতন কিংবা অমানবিক নিষ্ঠুর আচরণের পর্যায়ে না যায়। আমিও শিক্ষক। শৃংখলা ও সংশোধনের স্বার্থে নিম্নশ্রেণির (নিচের ক্লাসের) শিক্ষার্থীদের একটু-আধটু বেত লাগানো আর বেধড়ক পেটানো এক কথা নয়। বিদ্যমান সমাজ বাস্তবতায় মৃদু প্রহার হয়তো কখনো কখনো কাজে লাগতে পারে, কিন্ত বেধড়ক মারধর কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়।

নিষ্পাপ বাচ্চাদের শুধু পড়া না পাড়ার জন্য কিংবা শৃঙ্খলা ভাঙার জন্য নির্দয়ভাবে পেটানোর পক্ষপাতী আমি নই। আমি তীব্রভাবে এটি ঘৃণা করি। ক্লাসে বাচ্চাদের কোলাহল থামানো, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা, দুষ্টুমির জন্য শাসন করা কিংবা পড়া আদায়ের জন্য বেতের কঠিন প্রয়োগ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। যদি কোনো ছাত্র বেশি শৃঙ্খলা নষ্ট করে, কিংবা নিয়মিত পাঠ আদায় করতে অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক ডেকে এ বিষয়ে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কোনো শিক্ষককে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি যে, ছাত্রকে পিটিয়ে জজ-ব্যারিস্টার বানিয়ে দেবে, কিংবা কোরআনের হাফেজ বা বড় আলেম বানিয়ে দেবে। যা ছাত্র তার মেধার কারণে শিক্ষা অর্জন করতে পারবে না, তাকে জোর-জবরদস্তি করে পড়ানোর কোনো অর্থ নেই। কোনো ছাত্রকে মারপিট করে, রুমে তালা মেরে আটকে রেখে জোর করে মানুষ বানাতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

কোনো আদর্শ শিক্ষক ছাত্রদের প্রতি নির্দয় হতে পারেন না। কোমলমতি শিশুদের গায়ে বেত মারলে কোনো শিক্ষকের মনে প্রতিক্রিয়া নাও হতে পারে, কিন্তু আমার কলিজায় টান পড়ে। এটা আমি সহ্য করতে পারি না। তাই কঠোর প্রকৃতির শিক্ষকদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়নি। এসব অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

কিছু মানুষকে বলতে শোনা যায়, পড়াতে গিয়ে শিক্ষক যদি ছাত্রকে প্রহার করেন তাহলে শরীরের যে স্থানে প্রহার করা হয়েছে ওই স্থান বেহেশতে যাবে কিংবা ওই স্থান জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। এ কথার কোনো ভিত্তি নেই। কাউকে শিক্ষক প্রহার করলে হয়ত সান্তনা দেওয়ার জন্য তার হিতাকাঙ্খী কেউ এমন কথা বলতে পারেন। যাতে সে মন খারাপ না করে। এর বেশি কিছু না।

ছাত্রকে শাসনের ক্ষেত্রে শিক্ষক বা পিতামাতা কতটুকু প্রহার করতে পারেন কিংবা কখন পারেন কখন পারেন না এ সম্পর্কে ইসলামি শরিয়তের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। শিক্ষকদের উচিৎ সেটা অনুসরণ করা।

এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত মেরদাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন (তিনি বাচ্চাদের পড়াতেন ), বাচ্চাদের তিনটার বেশি মারবে না, যদি তুমি তিনটার বেশি মারো, তাহলে আল্লাহতায়ালা কিয়ামত দিবসে তোমার থেকে বদলা নেবেন।

ইসলামি স্কলাররা এই হাদিসের আলোকে বলেন, শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষক হাতের মাধ্যমে হালকাভাবে বাচ্চাদের মারতে পারবে কিন্তু একসঙ্গে তিনবারের বেশি নয়। ইসলামি শরিয়তে বেত, লাঠি, চামড়ার বেল্ট ইত্যাদি দ্বারা ছাত্রদের মারা কখনও জায়েজ নয়। চাই সেটা এমন বিষয় হোক যা শিক্ষা দেওয়া ফরজে আইন অথবা ফরজে কেফায়া।

এভাবে পিতা-মাতা শাসন করার জন্য বাচ্চাদের সাধারণভাবে মারতে পারবেন। তাদের ক্ষেত্রেও বেত-লাঠি ইত্যাদি দিয়ে মারা জায়েজ নয়। সুতরাং কোনো শিক্ষকের জন্য বাচ্চাদের বেঁধে বেত-লাঠি, চামড়ার বেল্ট ইত্যাদি দিয়ে মারা জায়েজ নেই। শিক্ষকদের এমন কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত এবং আদর-স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে পড়ানো উচিত। এর অন্যথা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়গুলো সমাজের শিক্ষকরা দ্রুত বুঝলেই মঙ্গল।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: বিভাগীয় সম্পাদক, ইসলাম, বার্তা২৪.কম

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর