Alexa

বাতাইস্যা প্রকল্প

বাতাইস্যা প্রকল্প

মোকাম্মেল হোসেন, ছবি: বার্তা২৪

কিসলু মিয়া পা ছড়িয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর একটা বাস এসে থামতেই নড়েচড়ে বসল সে। বাস থেকে দুজন মহিলাকে নামতে দেখা গেল। কিসলু বেজার মুখে অন্যদিকে তাকাল; নারী জাতির ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই। পরের বাস এলো আধঘণ্টা বাদে। একজন পুরুষ যাত্রী মাটিতে পা রাখতেই জল থেকে জাল টেনে তোলার দৃশ্যকল্প তৈরি করে কিসলু মিয়া মনে মনে বলতে লাগল-

: আয়-আয়-আয়...

লোকটা চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিসলু মিয়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। লোকটা চায়ের অর্ডার দিয়ে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করতেই কিসলু মিয়া মাছের মতো হা করে ফুসফুসে আটকে থাকা সব বাতাস বের করে দিল। এখন শুধু অপেক্ষা।

পৃথিবীতে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব অপেক্ষার অবসান ঘটে না। কিছু অপেক্ষা আনন্দের পরাগ মেখে শেষ হয়; কিছু বেদনায় পর্যবসিত হয়। কিসলু মিয়ার ক্ষেত্রে পরেরটা ঘটল। সে শিকার কব্জা করার প্রস্তুতি নিতেই লোকটা সিগারেটের অবশিষ্টাংশ চায়ের কাপের মধ্যে ফেলে দিল। ঘটনার আকস্মিকতায় কিসলু মিয়া হতবাক-শালার পুতে করল কী! চায়ের দাম মিটিয়ে লোকটা হাঁটতে শুরু করতেই একদলা থু থু নিক্ষেপ করে অনুচ্চস্বরে কিসলু মিয়া বলল-

: শালা খবিসের বাচ্চা খবিস...

পরের বাস থেকে যিনি নামলেন, তার নাম শফিউদ্দিন। শফিউদ্দিনের চেহারায় ভরসা করার মতো কোনো কিছু দেখা যাচ্ছে না। বসন্তের প্রতীক্ষায় কাতর বৃক্ষরাজি শীত দীর্ঘতর হবে বুঝতে পেরে যেরকম উদাসীনভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে; কিসলু মিয়ার মধ্যেও একইরকম উদাসীনতা দেখা গেল। হঠাৎ করেই দৃশ্যপট বদলে গেল। বাসটা তখনও দাঁড়িয়েছিল। এক ভদ্রলোক বাস ধরার জন্য সুখটান শেষে হাতের সিগারেট ছুড়ে ফেলে দৌড় দিল। লোকটার ও কিসলু মিয়ার দৌড় দেয়ার ঘটনাটা প্রায় একসঙ্গেই ঘটল। বসে থাকা একজন মানুষকে হঠাৎ এভাবে দৌড়াতে দেখে শফিউদ্দিন অবাক হলেন। তিনি দেখলেন- দৌড়ে যাওয়া লোকটা মাটি থেকে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ কুড়িয়ে জোরে টান দিয়ে ধোয়া গিলছে; একইসঙ্গে গিরগিটির মতো জিহ্বা বের করে সিগারেটের ছাইটুকুও খেয়ে নিচ্ছে। শফিউদ্দিন ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করলেন। লোকটার ছাই ভক্ষণের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করা দরকার।

পৃথিবীর অনেক জীবজন্তুই উচ্ছিষ্টভোগী। এ দলে মানুষও আছে। এদেশে উচ্ছিষ্টভোগীর সংখ্যা একেবারে কম নয়। তারা ডাস্টবিনে কুকুর-বেড়াল ও কাকের খাবারে ভাগ বসায়। হোটেল-রেস্তোরাঁর পচা-বাসি খাবারগুলোর সদগতি করে। শফিউদ্দিন ভাবলেন, উচ্ছিষ্টভোগীরা রাষ্ট্রের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। এদের কল্যাণে বিশ্বের সবচেয়ে গৌরবময় ও দামি পুরস্কার ‘নোবেল’ এদেশে আসে; মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সাহায্য পাওয়া যায়। বৈদেশিক সাহায্যের টাকায় বাহারি নামের নানা কিসিমের প্রকল্প রচিত হয়। সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবাদে কিছু মানুষ ফুলে-ফেঁপে উঠে। তবে উচ্ছিষ্টভোগীদের অবস্থা কিন্তু অপরিবর্তিতই থেকে যায়। এসব কথা ভাবতে ভাবতে শফিউদ্দিন চায়ের কাপে ঠোট ছোঁয়ালেন। কিছুক্ষণ বাদে কিসলু মিয়া ফিরে এলে শফিউদ্দিন তাকে জিজ্ঞেস করলেন-

: নাম কী?

: কিসলু মিয়া।

: কী করেন?

: কিছু করি না।

: চলে কেমনে?

: আল্লায় চালায়।

: সবকিছুই আল্লাহ চালায়। পাশাপাশি নিজের চেষ্টাও তো থাকতে হবে?

এ কথার উত্তর না দিয়ে কিসলু মিয়া নোংরা দাঁত বের করে হাসল। শফিউদ্দিন কিসলু মিয়ার জন্য চায়ের অর্ডার দিলেন; সঙ্গে লাঠি বিস্কুট। চা-বিস্কুট খাওয়ার ফাঁকে কিসলু মিয়ার কাছে শফিউদ্দিন জানতে চাইলেন-

: আপনে মোজাকান্দার হাজিবাড়ি চিনেন?

: চিনি।

শফিউদ্দিন পাঁচটা সিগারেট কিনে কিসলু মিয়ার হাতে দিয়ে বললেন-

: আপনে আমার সঙ্গে চলেন; হাজিবাড়ি দেখাইয়া দিবেন।

সত্তরোর্ধ্ব হাজি সাহেব বাড়িতেই ছিলেন। তিনি শফিউদ্দিনকে খাতির করে বসালেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন-

: বিষয় কী!

শফিউদ্দিনের কথা শুনে হাজি সাহেবের চোখ কপালে উঠে গেল। বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বললেন-

: হাজিবাড়িতে দুর্গা মন্দির! এইটা কীভাবে সম্ভব?

: জি; জেলা পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়নকৃত একটি প্রকল্পের নাম এইটাই।

জেলা পরিষদের প্রকল্পের কথা শুনে হাজি সাহেব কিছুক্ষণ হো-হো করে হাসলেন। হাসি থামার পর তিনি বললেন-

: আমাদের এখানে জেলা পরিষদ যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তার কিছু নমুনা দেখাই; চলেন।

হাজি সাহেব শফিউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে একটা প্রাচীন বটগাছের নিচে এসে দাঁড়ালেন। শফিউদ্দিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন-

: হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এই বটগাছের নিচে বছরে একবার কালীপূজা করে। আমাদের জেলা পরিষদ এইখানে একটা মন্দির নির্মাণ কইরা এর নাম দিছে ‘বটতলা কালী মন্দির’।

শফিউদ্দিন দু’হাতে চোখ কঁচলে বললেন-

: কোথায় মন্দির! এইখানে তো কোনো মন্দির দেখতেছি না!

: আমরা না দেখলেও এইখানে একটা কালী মন্দির আছে। বুঝলেন- এই মন্দিরের মতো আমাদের এখানে অনেক যুবসংঘ, ক্রীড়া সংঘ, সমবায় সমিতি, মসজিদ, রাস্তা, ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান আছে- যেগুলা চোখে দেখা যায় না।

: সব প্রকল্পই জেলা পরিষদ বাস্তবায়ন করেছে?

: জি। এলাকার মানুষ এইগুলার নাম দিছে বাতাইস্যা প্রকল্প।

বাতাইস্যা প্রকল্প মানে হাওয়া প্রকল্প। শফিউদ্দিনের বুকচিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হল। তিনি একজন এমফিল গবেষক। তার গবেষণার বিষয় বাংলাদেশে দুর্নীতির চালচিত্র। এখানে এসে জেলা পরিষদের দুর্নীতির নমুনা দেখতে দেখতে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। শফিউদ্দিনের বিমর্ষ ভাব লক্ষ করে হাজি সাহেব বললেন-

: বুঝলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। নিজের দলের লোকজনের চুরি ও লুটপাট দেখে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়।

শফিউদ্দিন কোনো কথা বললেন না। তিনি চোখের সামনে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশের মানচিত্র দেখতে পাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু মানচিত্রের এসব ক্ষত সারানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে পা রেখে বঙ্গবন্ধু তার প্রথম ভাষণে রবীন্দ্রনাথকে উদ্বৃত করে বলেছিলেন-

: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন- সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি; আমি বলতে চাই- কবিগুরুর কবিতার এ কথাগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।

সোনার মানুষ নিয়ে সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তার জীবদ্দশায় তা পূর্ণতা পায়নি। সোনার মানুষের রূপ ধরে তার চারপাশে ভিড় করেছিল এক দল চোর। চোরদের চেনার পর তাকে আক্ষেপ করতেও শোনা গেছে। কিন্তু তখন আর সময় ছিল না।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও সুখী-সমৃদ্ধশালী, সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছেন। সোনার বাংলা গড়ার কঠিন কর্মযজ্ঞে তিনি যাদের সহযোগী হিসেবে পেয়েছেন; তাদের মধ্যে কতজন সৎ, নীতিবান ও দেশপ্রেমিক- এ হিসাব করা জরুরি হয়ে পড়েছে। চোরাদের চিনতে ভুল করলে পিতার মতো একই যন্ত্রণা, একই কষ্ট তাকেও দগ্ধ করবে।

মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

আপনার মতামত লিখুন :