ক্রাইস্টচার্চ হামলা বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দেবে

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪

ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

১৫ মার্চ দিনটি নিউজিল্যান্ড তো বটেই বিশ্বব্যাপী এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। এদিন মসজিদে জুম্মার নামাজরত মুসুল্লিদের উপর যে বর্বরোচিত হামলা সংগঠিত হয়ে গেল এটিকে ১৯৬৯ সালে আল আকসা মসজিদে হামলার সাথে তুলনা করা চলে। তফাৎ শুধু একটা আল আকসা হামলা সংগঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আর নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদের হামলাটি সংগঠিত হয়েছে একজন ব্যক্তি কর্তৃক। তবে হামলার উদেশ্য অভিন্ন, মুসলিম বিদ্বেষ। যে ৪৯ জন মারা গেছেন তারা সবাই মুসলিম। আমাদের জন্য শোকের বিষয় হচ্ছে এদের মধ্যে ৩ জন বাংলাদেশি রয়েছেন এবং এই ৩ জনের দুজন আবার স্বামী-স্ত্রী।

এই হামলা যে কতটা নৃশংস তা হামলার ভিডিও ফুটেজ দেখলেই বোঝা যায়। হামলাকারী ১৬ মিনিটব্যাপী এই নারকীয় ঘটনার পুরোটাই তার কপালে লাগানো ক্যামেরায় ভিডিও করে প্রথমে ফেসবুক লাইভ এবং পরে অনলাইনে ছেড়ে দেয়। প্রথমদফা হামলার পর আবার বন্দুকে গুলি লোড করে দ্বিতীয় দফায় বেছে বেছে তাদের হত্যা করা হয় যারা প্রথম দফায় গুলিতে আহত হয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তার প্রতিক্রিয়া থেকে এটা অনুমান করা যায় যে সে তার লক্ষ্য পূরণে সফল হয়েছে।

হামলাকারীর ব্যক্তিগত টুইটার থেকে জানা গেছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই হামলার জন্য ব্রেন্টন ট্যারেন্ট নামক ২৮ বছর বয়সী ব্যক্তি প্রায় ২ বছর ধরে পরিকল্পনা করছিল এবং ৩ মাস আগে তার হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে আল নূর মসজিদকে নির্ধারণ করে।

এই হামলার ঘটনা একজন ব্যক্তি কর্তৃক সংগঠিত হলেও এবং হামলার মূলে অভিভাসন বিরোধী বার্তা থাকলেও ঘটনাক্রমে হামলার খুব নিকটবর্তী স্থানে সেসময় সফররত বাংলাদেশ ক্রিকেট টীমের সদস্যরা অনুশীলন শেষে ওই একই মসজিদে জুম্মার নামাজে অংশ নেয়ার জন্য ঢুকতে যাচ্ছিল। পরম সৌভাগ্য বলা চলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সংবাদ সম্মেলন শেষে সেখানে পৌঁছতে কয়েকমিনিট দেরি করে, আর এই সময়ের মধ্যে হামলাকারী মসজিদের অভ্যন্তরে নারকীয় কার্য সম্পাদন করছিল।

বাংলাদেশ দলের সদস্যরা পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন বটে, তবে এর মধ্য দিয়ে নিউজিল্যান্ড আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে হারাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বলা হয়ে থাকে ছবির মত ছোট সুন্দর শহর ক্রাইস্টচার্চ। শান্তিতে বসবাস করার জন্য শহরটির নাম রয়েছে সর্বত্রই। হঠাৎ এমন হামলায় সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে সবকিছু এটা এখনও কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না। তবে হামলাকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ঘেঁটে যা পাওয়া গেছে তা হচ্ছে তার এই হামলার জন্য ক্রাইস্টচার্চ হচ্ছে একটা বার্তা, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী শ্বেতাঙ্গ ভূমিতে কেবল তাদেরই অধিকার রয়েছে, অন্য কোন অশ্বেতাঙ্গ কিংবা মুসলিম কর্তৃক তাদের ভূমিতে এসে যেন তাদের জীবন এবং জীবিকায় ভাগ না বসায় সেটার প্রতি বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করা।

৭৩ পৃষ্ঠাব্যাপী এক ম্যানিফেস্টতে সে এই হামলার পেছনে তার যুক্তিগুলো তুলে ধরেছে। এখানে রয়েছে ২০১৬ সালে বাস্তিল দিবসকে ঘিরে প্যারিসের নিস শহরে সন্ত্রাসী হামলার কথা, সেই সাথে সে ২০১৮ সালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ১১ বছর বয়সী এক অস্ট্রেলীয় বালকের হত্যার প্রতিশোধের কথাও জানায়।

এখানে প্রসঙ্গক্রমে ২০১১ সালে নরওয়েতে এমন সন্ত্রাসী হামলার বিষয়টি এসে পড়ে। সেসময় এন্ডার্স ব্রেইভিক নামক ৩২ বছর বয়সী যুবক প্রায় একই কায়দায় দুই দফা হামলা চালিয়ে ৭৭ জনকে হত্যা করে। প্রথমে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের খুব কাছে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, যেখানে ৮ জন প্রাণ হারায়। পরে পুলিশের পোশাক পড়ে নিরাপদে ফেরি পার হয়ে শহরতলীর এক যুব সমাবেশে এলোপাথাড়ি গুলি চালায়, যেখানে আরও ৬৯ জন মারা যায়। ব্রেইভিক কর্তৃক হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা জানা যায় সেটাও অনেকটা একইরকম। সে ছিল প্রচণ্ডরকম মুসলিম এবং অভিবাআসন বিদ্বেষী। ব্রেইভিকও এই হামলা চালানোর আগে প্রায় ১০ বছর ধরে এধরণের হামলা সংগঠনের জন্য পরিকল্পনা করে আসছিল।

অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে এতবড় হামলা চালিয়ে এতগুলো নীরিহ মানুষকে হত্যার জন্য নরওয়ের আদালতে দোষী সাব্যস্ত ব্রেইভিকের সাজা হয়েছে ২১ বছর। দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকার ফলে এটাই ছিল সর্বোচ্চ সাজা। এখানে আমরা নিউজিল্যান্ডের আইনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব যে সেখানেও কিন্তু ১৯৮৯ সালে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করা হয়। সেখানে সর্বপ্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ১৮৪২ সালে এবং সর্বশেষটি ১৯৫৭ সালে। দেশটিতে এই সময়ের মধ্যে মোট ৮৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে এই নিয়ে দেশটির দুই প্রধান রাজনৈতিক দল লেবার পার্টি এবং ন্যাশনাল পার্টির মধ্যে রয়েছে পরষ্পরবিরোধী দুই মত। ১৮৩৫ সালে একবার লেবার পার্টি ক্ষমতাসীন থাকাকালে সকল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রুপান্তরিত করে। পরবর্তিতে ন্যাশনাল পার্টি ১৯৫০ সালে ক্ষমতায় এসে আবারও মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালু করে। পরবর্তিতে তাদের নিজেদের মধ্যেই এ নিয়ে মতবিরোধের জেরে এই দণ্ড বাতিল করা হয়।

নিউজিল্যান্ডে বর্তমানে লেবার পার্টির জেসিন্ডা আর্ডার্ন ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই ঘটনার অবতারণা করা হল এই কারণে যে এখানে নরওয়ের মত একই রকম বিচারের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই লেবার দল মৃত্যুদন্ডের বিরোধী থাকায় ব্রেন্টন ট্যারেন্টের পরিণতি যে ব্রেইভিকের চেয়ে খারাপ হবেনা সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতো বটেই, বিশ্বের ১০৫টি দেশে মৃত্যুদণ্ড সম্পুর্ণভাবে বিলুপ্ত রয়েছে, ওয়ের বিপরীতে ২০ থেকে ২৫ বছরের সর্বোচ্চ সাজার মেয়াদ কার্যকর রয়েছে। বলা চলে এর সুবাদে ব্রেইভিক এবং ট্যারেন্টের মত ব্যক্তিরা যে ধরণের অপরাধ সংগঠন করেছে, সে পথ ধরে ভবিষ্যতে হাটতে পারে আরও কেউ কেউ। কারণ যে বার্তা তারা দিয়েছে সেসব যে সর্বোতভাবে বর্জনীয় এমনটাও কোনভাবে বিশ্বনেতৃবৃন্দের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছেনা।

ক্রাইস্টচার্চ হামলার পর বিশ্বব্যাপী এই হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এটা সত্য, তবে এই সন্ত্রাসী হামলাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। মসজিদে নামাজরত মুসুল্লীদের উপর সংগঠিত এই হামলা যে কোন ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনতে বাধ্য। আজকের বিশ্বব্যাপী যত সন্ত্রাসী হামলা সংগঠিত হয়েছে তার অনেকাংশের দায় গিয়ে পড়েছে ইসলামপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর উপর। এখানে মনে রাখা দরকার যে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের স্বার্থে যাদের পথভ্রষ্ট করে আজ জঙ্গী বানিয়েছে, এই হামলা তাদের আরও প্রতিহিংসাপরায়ন করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষত অমুসলিম দেশগুলোর পক্ষ থেকে যেভাবে শোকবার্তা জানানো হচ্ছে তা অনেকটা দায়সারা গোছের। প্রতিটি বার্তায় নিউজিল্যান্ডের সরকারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর আবেগ অনুভূতি কোথাও সেভাবে ফুটে উঠেনি।

আরও অবাক করার বিষয় হচ্ছে সারা বিশ্বের সন্ত্রাসবাদ দমনের দায় অনেকটা একা নিজের কাধে নিয়ে বেড়ানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে ১১ ঘন্টা সময় নিয়েছেন এবং অবশেষে তার টুইট ছিল এরকম, “মসজিদে ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের পর নিউজিল্যান্ডের জনগণের প্রতি আমার উষ্ণ সমবেদনা এবং শুভকামনা। মসজিদে ৪৯ জন নিরীহ মানুষ এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন ঘটনায় মারা গেলেন, আরও অনেকে গুরুতর আহত হলেন। নিউজিল্যান্ডের পাশে থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার সাধ্যমতো সব কিছু করবে। স্রষ্টা সবার সহায় হোন।”

সবশেষে, ড্যানিস মাইকেল রোহান, যে ছিল একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক, ১৯৬৯ সালে আল আকসা মসজিদে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে নীরিহ মুসলমানদের হত্যা করে এবং পরবর্তীতে মানসিক ভারসাম্যহীন উল্লেখ করে ইসরাইল সরকার ১৯৭৪ সালে তাকে অস্ট্রেলীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। সেই থেকে ১৯৯৫ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিরাপদে পরিবারের সাথে নিজ দেশে অবস্থান করে। একইভাবে মানসিক ভারসাম্যহীন উল্লেখ করে ৭৭ জনকে হত্যার পরও ব্রেইভিক এখন ২১ বছরের সাজা খাটছে। এবার ট্যারেন্টকেও একই কায়দায় মানসিক ভারসাম্যহীন উল্লেখ করা কেবল সময়ের ব্যাপার। বিষয়গুলো কাকতালীয় হতে পারে। তবে প্রতিটি বিষয়ের মূলে কিন্তু মুসলিম বিদ্বেষ প্রবলভাবে গ্রথিত।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।