ঐ মহামানব আসে

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান/ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান/ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

শ্যামলিম বাংলার নদী ও ভূমি সংলগ্ন পবিত্র ভূগোলে জন্ম হয়েছিল তাঁর। তাঁর জন্মের আবির্ভাবে বদলে গেলো বাংলাদেশের তাবৎ দৃশ্যপট। হাজার বছরের শোষণ, বঞ্চনা, অবহেলার হলো অবসান। পুরো বাংলাদেশ স্বাধীনতার স্পৃহায় আস্ত একটি মানব-সমুদ্রে পরিণত হলো।

উজ্জীবনের পর্বতমালার শীর্ষ থেকে ডাক দিলেন তিনি সমগ্র জাতিকে। মহামানবের মোহনীয় স্পর্শে জাতি পেলো পুনরুজ্জীবনের মহামন্ত্র। জাতিসত্ত্বার জাগরণের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন আজ। স্বাধীনতার স্থপতির জন্মদিন আজ।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের স্মরণে মনে পড়ে বিশ্বকবির অমোঘ কথামালা: ‘ঐ মহামানব আসে/দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে/মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে/সুরলোকে বেজে উঠে শঙ্খ/নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক।’

বঙ্গবন্ধুর জন্মই হয়েছিল বিজয়ের জয়ডঙ্কা বাজানোর জন্য। বাঙালিকে বিজয়ী করবার জন্য। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার নাশপাশ থেকে বিজয়ী করার মহানায়ক হিসাবে তিনি এসেছিলেন এই বাংলায়। এসেছিলেন স্বাধীনতার স্বর্ণদুয়ার উন্মোচনের জন্য। বাংলাদেশকে স্বাধীন করবার জন্য।

হাজার বছরের কঠোর সাধনায় বাঙালি জাতি পেয়েছিল মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর মোহন সুরে জেগে উঠেছিল অবদমিত-ঘুমন্ত-শোষিত জাতি। তাঁর ঐতিহাসিক নেতৃত্বে স্বাধীনতার স্পৃহায় ছিন্ন করেছিল শত-সহস্র বর্ষের পরাধীনতার শৃঙ্খল। পৃথিবীর ইতিহাসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল বাঙালি। বাংলাদেশ পেয়েছিল মহান স্বাধীনতা।

একটি আস্ত জীবন তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বাংলাদেশের জন্য। বাঙালি জাতির অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য চারণের মতো ঘুরেছিলেন গ্রাম-শহর-জনপদে। রাজপথে সংগ্রাম করে এবং কারাগারে কাটিয়ে ছিলেন জীবনের সিংহভাগ সময়। অবশেষে ঐক্যবদ্ধ জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন তিনি। ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার লাল সূর্য।

১৯৭১ সালে মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গৌরবময় স্বাধীনতার সংগ্রামের রক্তাক্ত রণাঙ্গণ পেরিয়ে অর্জিত হয় লাল-সবুজের বাংলাদেশ। জাতির মহান নেতা, ইতিহাসের মহানায়ক, বঙ্গবন্ধু পরিণত হন জাতির জনকে। বিশ্বের মানচিত্রে সূচিত হয় বাংলাদেশের দীপ্ত পদযাত্রা।

বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য যে, মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও পরিকল্পনার বাংলাদেশকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার অল্পদিনের মধ্যেই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ উদীয়মান বাংলাদেশের সম্ভাবনার আকাশকে আচ্ছন্ন করে। এমন কি, বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও অগ্রগতির কিরণপ্রভা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে রাতের অন্ধকারে কাপুরুষের মতো হত্যা করে কুচক্রীদল। বিশ্বের নির্মম ও নৃশংসতম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে শারীরিক ও আদর্শিকভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার অপচেষ্টাও চালানো হয়।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিহারে হত্যা করে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় ইতিহাসের চাকা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ঋদ্ধ, গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক-সহিষ্ণু বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে থাকে অপশক্তির দল। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতিতে ঘাতকের নগ্ন উল্লাসের ভীতিকর পরিস্থিতিতে কাঁপতে থাকে বাংলা জননী, বাংলার মানুষ। জনকের অবর্তমানে দমবন্ধ-অবরুদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয় বাংলাদেশে। প্রগতি ও উন্নয়নের গতি হয় রুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের অপরিসীম তেজ ও বীরত্বে অর্জিত বাংলাদেশকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়। বীরদের নির্বাসিত করে কাপুরুষ-হন্তারকরা দখল করে সব কিছু।

কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে শত চেষ্টা করেও মুছে ফেলা যায় নি। কারণ বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন সত্ত্বা। সকল ষড়যন্ত্রের কবর রচনা করে ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থান ঘটে মহানায়কের। মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও রাজনীতির উত্তরাধিকার জননেত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে বাংলাদেশ ফিরে পায় মুক্তিযুদ্ধের হারানো চৈতন্য। ফিরে আসে ইতিহাস। ফিরে আসেন জাতীয় বীর সেনানির দল, মুক্তিযোদ্ধারা। বাংলার রাজনৈতিক আকাশ হয় মুক্ত। উন্নয়নের গতি ফিরে আসে। জাতির জনকের হত্যার কলঙ্ক কালিমা বাঙালির ললাট থেকে মুছে যায়।

বঙ্গবন্ধু হলেন পৌরাণিক উপাখ্যানের এমনই এক বাস্তব চরিত্র, বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে যার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। বাংলার ইতিহাসে, পথে-প্রান্তরে, প্রকৃতি ও নিসর্গে তিনি বার বার ফিরে ফিরে আসেন। আসেন জাতীয় জাগরণের মহান রূপকার হয়ে। জন্মে-কর্মে-মৃত্যুতেও তিনি জাতীয় পুনরুজ্জীবনের মহানায়ক।

মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে জেগে উঠে বাংলাদেশ। টুঙ্গিপাড়া থেকে ধানমন্ডি ছাপিয়ে পুরো সবুজ স্বদেশের কেন্দ্র ও প্রান্তে প্রান্তে জাগে প্রাণ; জাগে শক্তি ও প্রতীতি। অনিঃশেষ বঙ্গবন্ধুর যাদুকরী স্পর্শে জাতি উদ্বেলিত হয় পুনরুজ্জীবনের মহামন্ত্রে। জাতির প্রতিটি সদস্য অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের পথচলায় মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে বার বার ফিরে ফিরে পায় অস্তিত্বের আঙিনায়।

বাঙালির কাছে শোক ও শক্তির এক সম্মিলিত প্রেরণায় প্রোজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু মানেই সবুজ স্বদেশের মুখ, প্রিয় বাংলাদেশ; বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশের মহত্তম অর্জনকে বুকে নিয়ে আরও সামনের দিকে উন্নয়নের সোপানে এগিয়ে যাওয়ার এক অনিঃশেষ চেতনাপ্রবাহ।

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন হলো সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ শপথে জাগ্রত হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ। শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, আবেগে, আনন্দে বাঙালি জাতির পুনঃজাগরণের দিন হলো রাজনৈতিক মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। ‘ঐ মহানায়ক আসে’ ধ্বনিতে সমগ্র বাংলাদেশের উদ্বেলিত ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন হলো বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। সমগ্র জাতির হৃদয়ের গভীরতম শ্রদ্ধায় মহানায়ককে স্মরণের দিন হলো বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন।

আপনার মতামত লিখুন :