Barta24

রোববার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

English

ততদিন রবে কীর্তি তোমার...

ততদিন রবে কীর্তি তোমার...
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪.কম
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ৯৯ বছর, পা রাখতেন ১০০ বছরে। কেমন হতেন ৯৯ বছর বয়সী মানুষটি? গোটা জাতি আজ যখন তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালনে উদ্বেলিত, তখন তিনি দূর আকাশের তারা। তিনি দূর থেকে দেখছেন তার প্রিয় স্বদেশভূমিকে? দেখছেন কিভাবে প্রিয় কন্যা একে একে পূরণ করছেন তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। তিনি নিশ্চয়ই ওপাড় থেকে দেখে হাসছেন পরিতৃপ্তির হাসি।

এই বাংলাদেশে তার অনেক নাম। কেউ বলে জাতির পিতা, কেউ ডাকে বঙ্গবন্ধু, কারো কাছে তিনি মজিবর, কারো কাছে মুজিব ভাই, কেউ বলে শেখ সাব, বাবা-মায়ের আদরের ডাক খোকা। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় তাঁর জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। টুঙ্গীপাড়া বললে কিন্তু আপনারা আজকের আধুনিক টুঙ্গীপাড়া ভাববেন না। তখন টুঙ্গীপাড়া সত্যি দুর্গম। সেখান থেকে একটি ছেলে কলকাতা হয়ে ঢাকা, তারপর একটা সময় গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে গেলেন।

বঙ্গবন্ধু একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য চরিত্র। এই যে আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ বললাম, আপনারা কেউ এখনকার রাজনীতিবিদদের সাথে মিলিয়ে ফেলবেন না। এখন যেমন রাজনীতিবিদ মানেই ধান্দাবাজ, চান্দাবাজ, মাস্তান। কিন্তু সত্যিকারের রাজনীতিবিদ তিনিই; যিনি একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শের জন্য লড়াই করবেন, সংগ্রাম করবেন, মানুষকে ভালোবাসবেন, মানুষের পাশে থাকবেন। যিনি একটি জনগোষ্ঠির মানুষের আশা-আকাঙ্খাকে ধারণ করবেন।

বলছিলাম বঙ্গবন্ধু ছেলেবেলা থেকেই রাজনীতিবিদ। স্কুলে থাকতেই গরীব মানুষকে নানাভাবে সাহায্য করতেন, এমনকি নিজের পরনের কাপড়ও দান করেছেন। স্কুল পরিদর্শনে আশা সোহরাওয়ার্দীর পথ আটকে হোস্টেলের সমস্যা বলার গল্প তো এখন ইতিহাস। কলকাতায় বেকার হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছেন, আবার রাজনীতিও করেছেন। পাকিস্তান গড়তে সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান যে আমাদের দেশ না, সেটা বুঝতে তাঁর সময় লেগেছে মাত্র একবছর। ৪৮ সালেই ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরণ করেছেন। যদিও স্কুলজীবনেই ৭ দিনের কারাবাস পোহাতে হয়েছিল তাকে।  তবে পাকিস্তানের শুরু থেকেই কারাগার হয়ে ওঠে তার দ্বিতীয় বাড়ি।

২৩ বছরের মুক্তি সংগ্রামের ১৪ বছরই তাঁর কারাগারে কেটেছে। মোট ২৩ বারে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন তিনি। চাইলে আপস করে আয়েসী জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু সেই যে বলেছি আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ, এক সেকেন্ডের জন্যও আপস করেননি। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেই উন্মেষ ঘটে স্বাধীনতার চেতনা। আর কেউ পারুক আর না পারুক, বঙ্গবন্ধু সেটা তখনই বুঝেছিলেন। তাই তার রাজনীতির পুরোটাই ছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লড়াই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেটাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হতে দেননি। ধাপে ধাপে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে জনগণকে সাথে নিয়ে এগিয়ে গেছেন লক্ষ্য নিয়ে। ৬৬ সালে দলের ভেতরের বাইরের অনেকের আপত্তির মুখেও তিনি ৬ দফা পেশ করেন। এই ৬ দফায় স্বাধীনতার কথা বলা হয়নি, কিন্তু বিরোধিতাকারীরা বুঝে গিয়েছিলেন, ৬ দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান অখণ্ড থাকা না থাকা অর্থহীন হয়ে যাবে। বুঝেছিল বাংলার জনগণও। তাই তো তারা অন্য সবাইকে ফেলে বঙ্গবন্ধুর পেছনে সমবেত হন। পাকিস্তান সরকারও যে বুঝতে পারেনি, তা নয়। তাই তো তারা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেয়। পাকিস্তান সরকার এই মামলা দিয়ে শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চেয়েছিল। কিন্তু উল্টো তারা এই মামলা দিয়ে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বানিয়ে দিলেন।

গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে আইয়ুব খানের, উত্থান ঘটে বঙ্গবন্ধুর। ৭০এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টি আসনই পায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ন্যায্য ক্ষমতা না দিয়ে টালবাহানা শুরু করে পশ্চিমারা। মার্চের শুরু থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত চলে কৌশলের খেলা। কিন্তু সবচেয়ে বড় কৌশলটা ছিল বঙ্গবন্ধুরই। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু পাঠ করলেন, তাঁর অমর কবিতাখানি। যা এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সেদিন বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন।

ভাষণ শেষ করলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। সবকিছুই তিনি বলে দিলেন। কিন্তু পাকিস্তানীরা তাকে আটকানোর উপায় পায়নি। পাকিস্তানীরা বহু উসকানি দিয়েছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেই ফাঁদে পা দেননি। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বানাতে দেননি। ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নামে গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানী হানাদারেরা। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তারের আগ মুহুর্তে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে কিন্তু তাঁর নামেই চলে মুক্তিযুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তানে কারাগারে সেলের পাশে কবর খোড়া হয়েছিল, কিন্তু টলানো যায়নি তাকে। মৃত্যুকে পরোয়া করেননি তিনি।

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে দেশ গড়ার সংগ্রাম বেশি কষ্টকর হয়ে যায়। আগে শত্রু ছিল পশ্চিমারা। আর পরের শত্রুরা ঘরের। যে শত্রুদের তিনি ভালোবাসেন। বাংলার মানুষকে ভালোবাসাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আবার বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল মানুষের প্রতি তার এই অগাধ ভালোবাসা আর অন্ধ বিশ্বাস। বাংলাদেশের কেউ তাকে মারতে পারে, এটা তিনি বিশ্বাসই করেননি। স্বাধীনতা বিরোধী, অতি বাম আর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ক্রীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পটভূমি তৈরি করে। আর দেশী-বিদেশী চক্রান্তে কয়েকজন বিপথগামী সেনা সদস্য সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। তার ২১ বছর এই ভূখন্ডে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তাঁকে মানুষের হৃদয়ে নিষিদ্থ রাভা যায়নি। এখন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুময়। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর মরদেহ টুঙ্গীপাড়ায় নিয়ে গিয়েছিল মানুষের মন থেকে মুছিয়ে দেবে বলে। কিন্তু তিনি ছড়িয়ে গেছেন সারা বাংলাদেশে।

আমি সবসময় বলি দলমত নির্বিশেষে সবার বঙ্গবন্ধুকে পাঠ করা উচিত। তার জীবন থেকে, আদর্শ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও 'কারাগারের রোজনামচা' সবার অবশ্যপাঠ্য।

আগেই বলেছি বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুময়। এটাই হওয়া উচিত, এটাই হওয়ার কথা। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাণিজ্যও কম হয় না। প্রতিবছর অনেকগুলো অপ্রয়োজনীয় বই প্রকাশিত হয় বঙ্গবন্ধুর নামে। অনেকগুলো সংগঠন আছে নামের আগে পরে ‘বঙ্গবন্ধু' ব্যবহার করে। নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। কিন্তু অতি ব্যবহারে যেন বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করা না হয়। বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তবু তিনি দোষে-গুণে মানুষ। তাঁর অনেক কাজ সবার পছন্দ নাও হতে পারে। যেমন আমার কাছে বাকশাল ভালো লাগলেও অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। এই ভালো না লাগার কথাটা বলার স্বাধীনতা থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু সাথে সাথে নিশ্চিত করতে হবে, ভোটাধিকার, মানবাধিকার, আইনের শাসন আর সুশাসন।

বঙ্গবন্ধু একজন অতি সাধারণ মানুষ থেকে হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ একজনে। কিন্তু জাতির পিতা হওয়ার পরও ছিলেন অতি সাধারণই। তিনি গণভবনে থাকেননি, বঙ্গভবনে থাকেননি, থেকেছেন ধানমন্ডির অতি সাধারণ বাড়িতে। শেষ পর্যন্ত সে বাড়ি ছিল সবার জন্য খোলা। এখনও সেই বাড়ি সবার জন্য খোলা। তবে এখন সেটা বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। তবে সেখানে গেলে যে কেউ চমকে যাবেন দেশের রাষ্ট্রপতি কি সাধারণ জীবন-যাপন করতেন। প্লিজ সাধারণের বঙ্গবন্ধুকে সাধারণেরই থাকতে দিন। তাকে বিচ্ছিন্ন করবেন না। ঘাতকরা অনেক চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস মুছতে পারেনি। পারবে যে না, সেটা অনেক আগেই জানতেন অন্নদাশঙ্কর রায়- যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মজিবুর রহমান...

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :

আবদুল মোনেম: এক মহান কর্মবীরের প্রতিকৃতি

আবদুল মোনেম: এক মহান কর্মবীরের প্রতিকৃতি
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

#ও বন্ধু আমার 🌷 জনাব আবদুল মোনেম। দেশের প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব। সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট অবকাঠামো, যা আজকের বাংলাদেশে আমরা দেখি, এসবের সিংহভাগেরই নির্মাতা আবদুল মোনেম লিমিটেড তথা জনাব মোনেম। যৌবনের স্বর্ণালী সময়সহ তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটাই তিনি অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন প্রিয় মাতৃভূমির বৃহৎ সব নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে। দেশি বিদেশি সব কন্ট্রাক্টররা যে প্রকল্প তাদের পক্ষে করা অসম্ভব বলেছে, আবদুল মোনেম সাহেব সে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন হাসি মুখে। প্রাণান্ত চেষ্টা আর অধ্যাবসায় দিয়ে অসম্ভব সেসব প্রকল্পকে দেখিয়েছেন সাফল্যের মুখ। সমাজ সংসার আত্মীয় পরিজন সব ছেড়ে ছুঁড়ে প্রকল্প এলাকায় কাটিয়েছেন মাসের পর মাস। গলা পর্যন্ত কাদা পানিতে নেমে শ্রমিকদের দেখিয়েছেন কাজের দিশা! তাঁর কোম্পানির প্রকৌশলীরা অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন কিভাবে একজন কর্মবীর আবদুল মোনেম বাস্তবায়ন করে চলেছেন উন্নয়নের পথরেখা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566051707738.gif
গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে আবদুল মোনেমের (ডানে) সঙ্গে লেখক/ সংগৃহীত


ব্যবসায়ের লাভ লোকসানকে কখনোই গুরুত্ব দেননি জনাব মোনেম। দেশমাতৃকার উন্নতি সবসময় তাঁর কাছে মুখ্য হয়ে থেকেছে। যে কারণে মুনাফাখোর ব্যবসাদাররা যেখানে মানুষের অশ্রদ্ধার পাত্র হন, জনাব মোনেম সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের আসনে। দিন গেছে, ব্যবসা ডাইভার্সিফাই হয়েছে। বিশ্বখ্যাত কোমল পানীয় কোকাকোলা বা ইগলু’র মতো দুনিয়া জোড়া সুনামের আইসক্রিম ব্র্যান্ড সমৃদ্ধ আবদুল মোনেম লি. এখন পরিণত হয়েছে আবদুল মোনেম গ্রুপে। কয়েক কোটি টাকার টার্নওভারের সেদিনের কোম্পানি এখন হাজার কোটি টাকার কনগ্লোমারেট! কোক ইগলু ছাড়াও বিশ্বের বেশকিছু নামকরা ব্র্যান্ড এখন মোনেম গ্রুপের সঙ্গে পার্টনার। তাই বলে মোনেম ভাই পরিবর্তিত হননি এতটুকু। সেই শুরুতে যেমন নিরহংকারী, দানশীল ও ডাউন টু আর্থ ছিলেন, আজও তেমনই আছেন!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566051780819.gif

দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে জনাব মোনেমের সঙ্গে আমার ও আমার পরিবারের সম্পর্ক। দেশ বিদেশের অনেক স্টেশন আমরা একসঙ্গে সফর করেছি, একত্রে থেকেছি। সুযোগ হয়েছে পরস্পরকে জানার ও কাছে আসার। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছেছেন জনাব আবদুল মোনেম। আমাদের স্বার্থহীন মানবিক সম্পর্ক আজও দ্যুতিময় প্রথম দিনের ঔজ্জ্বল্যেই! এতটা পথ আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি, কিন্তু স্বার্থের কোনো সংঘাত না থাকায় আমাদের পারিবারিক সম্পর্কে মালিন্য সামান্য মরিচা ধরাতে পারেনি, আলহামদুলিল্লাহ!
পবিত্র ঈদ আল-আদহা’র সালাত আদায়ে গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে আমাদের এই হিরণ্ময় সাক্ষাৎ। আল্লাহ সুবহানআহু ওয়াতা’আলা উন্নয়ন ব্যক্তিত্ব আমার প্রিয়-শ্রদ্ধেয় মোনেম ভাইকে সুস্থ ও নেক আমলময় হায়াতে তাইয়েবা দান করুন, আমীন...

লেখক: জাতীয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?
শেখ আদনান ফাহাদ/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

১৯৪৭ সালেই বর্তমান বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙালিদের নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহান প্রয়াস চালিয়েছিলেন তৎকালীন কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের কয়েকজন প্রগতিশীল নেতা। কিন্তু দুই দলের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে পেরে উঠেননি তাঁরা। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, সরদার বল্লভভাই প্যাটেল ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রমুখের ধূর্ত রাজনীতির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন বাঙালির রাষ্ট্রকামী রাজনীতিবিদগণ। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ৭৩ এবং ৭৪ নং পৃষ্ঠায় সে সময়ের ঘটনাবলীর বর্ণনা দেওয়া আছে। পূর্ববাংলার সম্পদ লুটে গড়া উঠা কলকাতা হারিয়ে বাঙালি দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে ১৯৭১ এর গণহত্যা সংঘটিত করার সুযোগই পেত না পাকিস্তানি হায়েনারা।

বাঙালি আজ দুইভাগে বিভক্ত- ভারতীয় বাঙালি আর বাংলাদেশি বাঙালি! বাঙালির একান্ত রাষ্ট্র একমাত্র বাংলাদেশ। হিন্দি আর ইংরেজির আগ্রাসনে ভারতে বাংলা আজ ধুঁকে ধুঁকে মরলেও বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা হিসেবে বাংলা এখানে টিকে আছে স্বমহিমায়। ইতিহাসের নানা খেলায় বাঙালি বিভক্ত হয়ে তার অতীত গৌরবের অনেকখানি হারিয়েছে। ভারতের পুরো ক্রিকেট টিমে আজ একজন বাঙালি খেলোয়াড় নেই; অদূর ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট টিমে কোনো বাঙালি সন্তান খেলতে পারবে- এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমে ১১ জন বাঙালি বিশ্ব ক্রিকেট আলোকিত করছে। বাঙালি অনেক হারিয়েও বুঝতে পারে না, কী তার ছিল আর কী তার আছে?

৪৭ এ বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও পরবর্তী ২৪ বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার মানুষকে প্রস্তুত করেছেন স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আর এ যাত্রায় সাথে নিয়েছেন তৎকালীন সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন আর প্রতিবেশী ভারতকে। ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ভারত সরাসরি যুদ্ধে জড়ালেও সীমান্ত খোলা রেখেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক চালানো গণহত্যার শুরু থেকেই। বাঙালি অধ্যুষিত আগরতলা আর কলকাতার মানুষ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। বাংলাদেশের পাশে ছিল পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও প্রতিবেশী ভারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল স্বাধীনতা আর ভারত পেয়েছিল এই অঞ্চলে তার একমাত্র নিরাপদ এবং বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে তৎকালীন সামরিক বাহিনীর কিছু বখাটে কর্মকর্তার হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতি বঙ্গবন্ধুকে না হারালে, বাংলাদেশই হত বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলে। জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন মাঝিবিহীন নৌকায় পরিণত হয়। রাষ্ট্র চলে যায় সামরিক আর বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দখলে। বাংলাদেশ মূলত উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমল থেকে।

তবে পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ফলে বাংলাদেশ মূলত ভারত আর চীনের নানা পণ্যের বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। সিপিডির এক রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। বাংলাদেশে চাকুরি ও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ হয় হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকের। এক তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধলক্ষ ভারতীয় চাকুরি করে। অথচ ভারতে বাংলাদেশের নাগরিকদের কাজের অনুমতি দেয়া হয় না। হাজার হাজার বাংলাদেশি ভারতের বিভিন্ন স্থানে পর্যটক হিসেবে ঘুরতে যায়; তাছাড়া মেডিক্যাল সেবা পেতে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি লাভজনক রাষ্ট্র। এমন একটি লাভজনক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ভারতের নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে বাঙালিদের সম্পর্ক দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে!

ফেসবুক ও ইউটিউবের দুনিয়ায় দুই পারের বাঙালিদের মধ্যে ভয়ানক কথাযুদ্ধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন সব বাজে শব্দ বলা হচ্ছে যা মুখে আনা যায় না। বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে কিছু বলা হলেই ওপার থেকে শুরু হয় পুরো বাংলাদেশকে অপমান করে নানাবিধ অশ্রাব্য বাক্যবান। অনেক ফেইক আইডি থেকেও বিতর্ক উসকে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাস না জেনেই, অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে না বুঝেই পুরো দেশকে নিয়ে অনেককে আপত্তিকর কথা বলতে দেখা যায়। ফেসবুকে আনন্দবাজার কিংবা প্রথম আলোর পেইজে ঢুকলেই দুই বাংলার মানুষের মধ্যকার কথাযুদ্ধের নমুনা পাওয়া যায়। কাশ্মীর সমস্যা হোক, কিংবা ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলা হোক কিংবা হোক সাকিব আল হাসানের উপর হওয়া কোনো নিউজ, ফেসবুকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু হয় বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে।

ইন্টারনেট পুরো বিশ্বকে এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার আওতায় এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কোনো বিষয়ে নিজের মত, অমত, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ মিথস্ক্রিয়ার দুনিয়াকে করেছে ব্যস্ত। মানুষ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে যোগাযোগপ্রবণ এবং একইসাথে প্রতিক্রিয়া-প্রবণও। অনলাইন নিউজপেপার এবং প্রিন্ট নিউজপেপারগুলোর অনলাইন ভার্সন এবং ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশ এবং ভারতের বাঙালিদের আনাগোনা অহরহ। ইন্টারনেট এবং ভাষার শক্তিকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগাতে পারত ভারত ও বাংলাদেশের বাঙালিরা। কিন্তু কাজের চেয়ে যে অকাজই বেশী হচ্ছে।

ভারত-বিদ্বেষী বাংলাদেশি আর বাংলাদেশ-বিদ্বেষী ভারতীয়রা দুই রাষ্ট্রের নাম বিকৃত করেছেন। যে গালি মুখে আনা যায় না, সেসব কথা লেখা থাকে কমেন্ট আকারে। বাংলাদেশের কেউ ভারতের কারও কথার প্রতিবাদ করলেই শুরু হয় ১৯৭১ সালের রেফারেন্স দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। ৭১ কে ভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি, মুক্তিবাহিনীর বীরত্ব ইত্যাদি বিষয়কে খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা ভারতীয় বাঙালিদের মধ্যে দেখা যায়। কোনো বাংলাদেশি ভারতের দিক থেকে করা কোনো কাজের সমালোচনা করলেই ৭১ এর কথা বলে খোটা দেয়ার চেষ্টা হয়। ভারতীয়রা একাত্তরকে দেখে থাকে তাঁদের নিজস্ব প্রেক্ষিত থেকে। বাংলাদেশ যে ভারতের কত উপকারে আসে কিংবা আসছে, সেটি ফেসবুকের জগতে খুব কম ভারতীয়ই স্বীকার করেন।

বাংলাদেশিদের একটা ছোট অংশ ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আনন্দবাজারসহ নানা পত্রিকার ফেসবুক পেইজের নিউজে কমেন্ট করে। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয়রা ক্ষিপ্ত হয়। ক্ষিপ্ত হওয়ার অধিকার তাঁদের আছে, কিন্তু গুটি কয়েক বাংলাদেশির ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এই ভারতীয়রা পুরো বাংলাদেশ নিয়ে অত্যন্ত অপমানজনক মন্তব্য করে। এই মন্তব্য কোনো সচেতন বাংলাদেশির পক্ষে হজম করা মুশকিল। ভারতীয়দের বড় একটা অংশ বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেই না। তারা শুধু জানে, ১৯৭১ এ ভারত পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে?

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বিশালত্ব, জাতি সংগঠনে আওয়ামী লীগ এর অবদান, স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি, বিশ্ব রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব, বাঙালি আর্মি, নেভি ও বিমান সেনা, মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী কিংবা ক্র্যাক প্লাটুন এর বীরত্ব ইত্যাদি কিছুই না জেনে ৭১ কে শুধু ভারতীয় প্রেক্ষিত থেকে দেখতে অভ্যস্ত এসব ভারতীয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের সহযোগিতা আদায় করেছেন। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের যে কোনো বিশ্লেষণে প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শাহাদাত বরণ করা বীর বাঙালিরা। ৭১ প্রশ্নে ভারতীয়দের উচিত হবে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। মূলত বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর বীরত্বেই ৭১ সালে পাকিস্তানকে পরাজিত করার গৌরবের ভাগীদার হতে পেরেছিল ভারত।

বাংলাদেশকে ‘কাঙ্গালের’ দেশ বলে মন্তব্য করে কিছু ভারতীয়। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে কোথায় চলে গেছে এবং যাচ্ছে সেটি এসব ভারতীয় বন্ধুরা জানেন না। সামাজিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলেছে বহু আগেই। মাথাপিছু আয়ের হিসেবেও আর কয়েক বছর পরে পেছনে পড়বে ভারত। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে বহু বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। গুগলে সার্চ করলেই সব লিংক পাওয়া যাবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ নানা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ঢুকলেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির দলিল মিলবে। ভারতীয়দের উচিত হবে সিনেমার জগতে শুধু না থেকে বাস্তবতাকে জানার চেষ্টা করা।

সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, ভারতের চলচ্চিত্র জগতে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি, সংবাদ মাধ্যমগুলোতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ইত্যাদি কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারত-প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় একই সভ্যতা ও সংস্কৃতির দুটো প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এমন বাস্তবতা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র