Barta24

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

ততদিন রবে কীর্তি তোমার...

ততদিন রবে কীর্তি তোমার...
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪.কম
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ৯৯ বছর, পা রাখতেন ১০০ বছরে। কেমন হতেন ৯৯ বছর বয়সী মানুষটি? গোটা জাতি আজ যখন তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালনে উদ্বেলিত, তখন তিনি দূর আকাশের তারা। তিনি দূর থেকে দেখছেন তার প্রিয় স্বদেশভূমিকে? দেখছেন কিভাবে প্রিয় কন্যা একে একে পূরণ করছেন তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। তিনি নিশ্চয়ই ওপাড় থেকে দেখে হাসছেন পরিতৃপ্তির হাসি।

এই বাংলাদেশে তার অনেক নাম। কেউ বলে জাতির পিতা, কেউ ডাকে বঙ্গবন্ধু, কারো কাছে তিনি মজিবর, কারো কাছে মুজিব ভাই, কেউ বলে শেখ সাব, বাবা-মায়ের আদরের ডাক খোকা। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় তাঁর জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। টুঙ্গীপাড়া বললে কিন্তু আপনারা আজকের আধুনিক টুঙ্গীপাড়া ভাববেন না। তখন টুঙ্গীপাড়া সত্যি দুর্গম। সেখান থেকে একটি ছেলে কলকাতা হয়ে ঢাকা, তারপর একটা সময় গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে গেলেন।

বঙ্গবন্ধু একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য চরিত্র। এই যে আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ বললাম, আপনারা কেউ এখনকার রাজনীতিবিদদের সাথে মিলিয়ে ফেলবেন না। এখন যেমন রাজনীতিবিদ মানেই ধান্দাবাজ, চান্দাবাজ, মাস্তান। কিন্তু সত্যিকারের রাজনীতিবিদ তিনিই; যিনি একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শের জন্য লড়াই করবেন, সংগ্রাম করবেন, মানুষকে ভালোবাসবেন, মানুষের পাশে থাকবেন। যিনি একটি জনগোষ্ঠির মানুষের আশা-আকাঙ্খাকে ধারণ করবেন।

বলছিলাম বঙ্গবন্ধু ছেলেবেলা থেকেই রাজনীতিবিদ। স্কুলে থাকতেই গরীব মানুষকে নানাভাবে সাহায্য করতেন, এমনকি নিজের পরনের কাপড়ও দান করেছেন। স্কুল পরিদর্শনে আশা সোহরাওয়ার্দীর পথ আটকে হোস্টেলের সমস্যা বলার গল্প তো এখন ইতিহাস। কলকাতায় বেকার হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছেন, আবার রাজনীতিও করেছেন। পাকিস্তান গড়তে সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান যে আমাদের দেশ না, সেটা বুঝতে তাঁর সময় লেগেছে মাত্র একবছর। ৪৮ সালেই ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরণ করেছেন। যদিও স্কুলজীবনেই ৭ দিনের কারাবাস পোহাতে হয়েছিল তাকে।  তবে পাকিস্তানের শুরু থেকেই কারাগার হয়ে ওঠে তার দ্বিতীয় বাড়ি।

২৩ বছরের মুক্তি সংগ্রামের ১৪ বছরই তাঁর কারাগারে কেটেছে। মোট ২৩ বারে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন তিনি। চাইলে আপস করে আয়েসী জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু সেই যে বলেছি আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ, এক সেকেন্ডের জন্যও আপস করেননি। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেই উন্মেষ ঘটে স্বাধীনতার চেতনা। আর কেউ পারুক আর না পারুক, বঙ্গবন্ধু সেটা তখনই বুঝেছিলেন। তাই তার রাজনীতির পুরোটাই ছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লড়াই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেটাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হতে দেননি। ধাপে ধাপে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে জনগণকে সাথে নিয়ে এগিয়ে গেছেন লক্ষ্য নিয়ে। ৬৬ সালে দলের ভেতরের বাইরের অনেকের আপত্তির মুখেও তিনি ৬ দফা পেশ করেন। এই ৬ দফায় স্বাধীনতার কথা বলা হয়নি, কিন্তু বিরোধিতাকারীরা বুঝে গিয়েছিলেন, ৬ দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান অখণ্ড থাকা না থাকা অর্থহীন হয়ে যাবে। বুঝেছিল বাংলার জনগণও। তাই তো তারা অন্য সবাইকে ফেলে বঙ্গবন্ধুর পেছনে সমবেত হন। পাকিস্তান সরকারও যে বুঝতে পারেনি, তা নয়। তাই তো তারা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেয়। পাকিস্তান সরকার এই মামলা দিয়ে শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চেয়েছিল। কিন্তু উল্টো তারা এই মামলা দিয়ে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বানিয়ে দিলেন।

গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে আইয়ুব খানের, উত্থান ঘটে বঙ্গবন্ধুর। ৭০এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টি আসনই পায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ন্যায্য ক্ষমতা না দিয়ে টালবাহানা শুরু করে পশ্চিমারা। মার্চের শুরু থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত চলে কৌশলের খেলা। কিন্তু সবচেয়ে বড় কৌশলটা ছিল বঙ্গবন্ধুরই। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু পাঠ করলেন, তাঁর অমর কবিতাখানি। যা এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সেদিন বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন।

ভাষণ শেষ করলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। সবকিছুই তিনি বলে দিলেন। কিন্তু পাকিস্তানীরা তাকে আটকানোর উপায় পায়নি। পাকিস্তানীরা বহু উসকানি দিয়েছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেই ফাঁদে পা দেননি। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বানাতে দেননি। ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নামে গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানী হানাদারেরা। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তারের আগ মুহুর্তে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে কিন্তু তাঁর নামেই চলে মুক্তিযুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তানে কারাগারে সেলের পাশে কবর খোড়া হয়েছিল, কিন্তু টলানো যায়নি তাকে। মৃত্যুকে পরোয়া করেননি তিনি।

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে দেশ গড়ার সংগ্রাম বেশি কষ্টকর হয়ে যায়। আগে শত্রু ছিল পশ্চিমারা। আর পরের শত্রুরা ঘরের। যে শত্রুদের তিনি ভালোবাসেন। বাংলার মানুষকে ভালোবাসাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আবার বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল মানুষের প্রতি তার এই অগাধ ভালোবাসা আর অন্ধ বিশ্বাস। বাংলাদেশের কেউ তাকে মারতে পারে, এটা তিনি বিশ্বাসই করেননি। স্বাধীনতা বিরোধী, অতি বাম আর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ক্রীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পটভূমি তৈরি করে। আর দেশী-বিদেশী চক্রান্তে কয়েকজন বিপথগামী সেনা সদস্য সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। তার ২১ বছর এই ভূখন্ডে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তাঁকে মানুষের হৃদয়ে নিষিদ্থ রাভা যায়নি। এখন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুময়। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর মরদেহ টুঙ্গীপাড়ায় নিয়ে গিয়েছিল মানুষের মন থেকে মুছিয়ে দেবে বলে। কিন্তু তিনি ছড়িয়ে গেছেন সারা বাংলাদেশে।

আমি সবসময় বলি দলমত নির্বিশেষে সবার বঙ্গবন্ধুকে পাঠ করা উচিত। তার জীবন থেকে, আদর্শ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও 'কারাগারের রোজনামচা' সবার অবশ্যপাঠ্য।

আগেই বলেছি বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুময়। এটাই হওয়া উচিত, এটাই হওয়ার কথা। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাণিজ্যও কম হয় না। প্রতিবছর অনেকগুলো অপ্রয়োজনীয় বই প্রকাশিত হয় বঙ্গবন্ধুর নামে। অনেকগুলো সংগঠন আছে নামের আগে পরে ‘বঙ্গবন্ধু' ব্যবহার করে। নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। কিন্তু অতি ব্যবহারে যেন বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করা না হয়। বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তবু তিনি দোষে-গুণে মানুষ। তাঁর অনেক কাজ সবার পছন্দ নাও হতে পারে। যেমন আমার কাছে বাকশাল ভালো লাগলেও অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। এই ভালো না লাগার কথাটা বলার স্বাধীনতা থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু সাথে সাথে নিশ্চিত করতে হবে, ভোটাধিকার, মানবাধিকার, আইনের শাসন আর সুশাসন।

বঙ্গবন্ধু একজন অতি সাধারণ মানুষ থেকে হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ একজনে। কিন্তু জাতির পিতা হওয়ার পরও ছিলেন অতি সাধারণই। তিনি গণভবনে থাকেননি, বঙ্গভবনে থাকেননি, থেকেছেন ধানমন্ডির অতি সাধারণ বাড়িতে। শেষ পর্যন্ত সে বাড়ি ছিল সবার জন্য খোলা। এখনও সেই বাড়ি সবার জন্য খোলা। তবে এখন সেটা বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। তবে সেখানে গেলে যে কেউ চমকে যাবেন দেশের রাষ্ট্রপতি কি সাধারণ জীবন-যাপন করতেন। প্লিজ সাধারণের বঙ্গবন্ধুকে সাধারণেরই থাকতে দিন। তাকে বিচ্ছিন্ন করবেন না। ঘাতকরা অনেক চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস মুছতে পারেনি। পারবে যে না, সেটা অনেক আগেই জানতেন অন্নদাশঙ্কর রায়- যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মজিবুর রহমান...

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :

‘সেই এরশাদ’, ‘এই এরশাদ’

‘সেই এরশাদ’, ‘এই এরশাদ’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পুরনো ও সাম্প্রতিক ছবি

সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, যিনি এক সময়ের সেনাপ্রধান আর বর্তমানে 'প্রধান বিরোধী দলের নেতা', তার জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন করা একই সঙ্গে সহজ এবং কঠিন।

সহজ এ কারণে যে, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থান স্পষ্ট। এরশাদের ক্ষমতা দখল ও দশ বছরের স্বৈরশাসনের 'সেই' সময় সবার কাছেই প্রতিভাত। এ ব্যাপারে বিতর্ক বা তাকে বৈধতা বা ন্যায্যতা দেওয়া অসম্ভব।

কিন্তু 'এই' সময়ের এরশাদ বিশ্লেষকদের কাছে সহজে ব্যাখ্যা করার ব্যক্তি নন। তার কারাভোগ, রাজনীতিতে লেগে থাকার আগ্রহ এবং ক্রমশ প্রকাশিত বিভিন্ন মানবিক গুণাবলীর কারণে এক অন্য মাত্রার এরশাদকে দেখতে পাওয়া যায়।

এরশাদের মৃত্যুতে সবচেয়ে বিপদে যারা

অবশ্য এ কথাও পরিষ্কারভাবে বলা দরকার যে, এরশাদের ভালো কিছু কাজ থাকলেও তার খারাপ কাজগুলো জায়েজ হয়ে যায় না। ব্যক্তিগতভাবে আমি তা মনে করি না এবং লিখিতভাবেই তা উল্লেখ করেছি।

তারপরও বিস্ময় জাগে। নানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। বিশেষত আমরা যারা রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যয়ন ও চর্চায় ব্যাপৃত আছি, তাদেরকে রাজনৈতিক প্রপঞ্চ ও ব্যক্তিত্বের গতিশীলতার ওপর লক্ষ্য রাখতে হয়। তরুণ মার্কস আর পরিণত মার্কসের মধ্যে পার্থক্য রেখা টানতে হয়। একদার কট্টর সাম্প্রদায়িক নেতার জাতীয়তাবাদী-মানবতাবাদীতে রূপান্তরের কার্যকারণ নিরূপণ করতে হয়। আবার বাম, প্রগতিশীল, কমিউনিস্ট নেতার মৌলবাদী স্খলনের ব্যাখ্যাও দাঁড় করাতে হয়।

এরশাদকে এমন তুলনায় আনা হলে আমরা কেমন চিত্র পাব? স্বৈরাচার হয়েও তার কঠোরতার পাশাপাশি মানবিক উন্নয়নমূলক কিছু পদক্ষেপও আড়ালে থাকে না। সমালোচনার পরেও ওষুধ নীতি, ভূমি সংস্কার, বিকেন্দ্রীকরণ, ধর্মীয় বিষয়ের গুরুত্ব তাকে অনেক মানুষের প্রিয়ভাজন করেছে।

যদিও এরশাদের রাজনীতির ৪০ বছরের পুরো সময়ই ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ আর বিএনপির অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে তিনি দশ বছর ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন এবং এখনও বিএনপির রাজনৈতিক ভুলের সুযোগ নিয়ে সামনে চলে আসতে পেরেছেন। দ্বিদলীয় রাজনীতির প্রকৃত বিকাশ হলে তার রাজনৈতিক জীবন এতদূর প্রলম্বিত হয়ে আসতে পারতো কি-না, সন্দেহ।

একজন এরশাদ

যেভাবেই হোক তিনি ক্ষমতার দশ বছর পর আরও তিরিশ বছর রাজনীতিতে থেকেছেন। এ সময়কালে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সাথেই ছিলেন। ধর্মীয় অধিকারের পক্ষে ছিলেন। এবং সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যেই থেকেছেন, যদিও সেই সংসদ ও নির্বাচন নিয়ে বিএনপির আপত্তি রয়েছে।

আপত্তি বা সমালোচনা যাই থাকুক, 'স্বৈরাচারী' এরশাদ গণতান্ত্রিক নির্বাচন, সংসদীয় ব্যবস্থা ইত্যাদিকে পাশ কাটিয়ে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করছেন, এমন দৃষ্টান্ত কেউ দেখাতে পারবে না। নিজের এবং দলের স্বার্থে তিনি রাজনীতি করেছেন, এমনটি সবাই করে। ফলে এ বিষয়ে সমালোচনার কিছু থাকতে পারে না। তিনি তার ও তার দলের স্বার্থে রাজনীতি করে মহাভারত অশুদ্ধ করেননি।

আর যে কাজটি তিনি সন্তর্পণে করেছেন, তা হলো মানব কল্যাণ ও মানবসেবা। বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম এবং অন্যান্য গণমাধ্যমেও খবরগুলো প্রকাশ পেয়েছে, যাতে দান, সাহায্য ছাড়াও সম্পত্তি বিলি-বণ্টনের কথা প্রকাশ পেয়েছে। এরশাদ ব্যক্তিস্বার্থ সামনে রেখে রাজনীতি করলেও ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড়ের স্তূপ করেননি। ক্ষমতালোভী স্বৈরাচারের মধ্যে তাকে দেখা যাচ্ছে বিরল ব্যতিক্রম স্বরূপ।

এরশাদ আমলে আমরা যখন কিছুটা লেখালেখি ও সাংবাদিকতা করেছি, তখন তার কাছের লোকদের বরাতে জেনেছি, তিনি পারতপক্ষে কাউকে না করতে বা ফিরিয়ে দিতে পারেন না। তার কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেলে কার্যোদ্ধার সম্ভব, এমন একটি ভাষ্যও তখন ঢাকায় প্রচলিত ছিল। এ সুযোগে বহুজন চাকরি-বাকরি, প্লট, প্রমোশন নিয়েছেন। অনেক নারীও এরশাদের এই নমনীয়তার সুযোগ নিয়েছেন।

এরশাদ: জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে

শাসক হিসেবে এসব পক্ষপাত অবশ্যই মানবীয় দুর্বলতা ও নৈব্যক্তিকতার অভাব হিসেবে বিবেচনার যোগ্য। রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক বিষয় ব্যক্তিগত তোষামোদির মাধ্যমে বিলি-বণ্টন করা ঘোরতর অন্যায় এবং সুশাসনের বিপরীত ও স্বৈরমানসিকতার পরিচায়ক।

কিন্তু এরশাদ যখন ক্ষমতায় নেই, তখন নিজের সম্পত্তি বিলিয়ে দিলে তাকে কেউ সমালোচনা করতে পারে না। তিনি যে দিতে জানেন, দিতে চান, তা আগে ও বর্তমানে তিনি প্রমাণ করেছেন। এই এরশাদকে মানুষ অস্বীকার করবে কেমন করে?

ব্যক্তিগতভাবে এরশাদের সঙ্গে ক্ষমতাকালে ও ক্ষমতার পরে একাধিকবার আমার সাক্ষাত হয়েছে। সেটা রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, বঙ্গভবন, ধানমণ্ডির কবিতা কেন্দ্র, কারও বাসা, অফিস বা কোনও বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে হলেও আমি তার নিপাট ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ ও সম্মানজনক আচরণের চাক্ষুষ সাক্ষী। পরে যখন তিনি জানলেন, ‘সাপ্তাহিক রোববার’ -এ তাকে স্বৈরাচার বলে আমি স্বনামে নিয়মিত লিখেছি, তখনও তার আচরণের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি।

বিশ্ব বেহায়া
এরশাদকে নিয়ে কামরুল হাসানের ব্যাঙ্গচিত্র/ সংগৃহীত

 

এরশাদকে স্বৈরাচার বলে আমরা আন্দোলন করেছি, তার বিরুদ্ধে লিখেছি, পটুয়া কামরুল হাসানের বিখ্যাত ব্যাঙ্গচিত্র 'বিশ্ব বেহায়া'র পোস্টার সেঁটেছি ক্যাম্পাসের দেওয়ালে দেওয়ালে। তার মৃত্যুর পর চট করে তার সম্পর্কে বিদ্যমান ধারণা ভেঙে যায় না।

শুধু মনের মধ্যে অলক্ষ্যে একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়, 'সেই এরশাদ’ আর 'এই এরশাদ’ কি একজনই? ক্ষমতা দখলকারী এরশাদ আর রাজনীতি শেষে চিরবিদায় নিয়ে চিরদিনের মতো চলে যাওয়া এরশাদ কি একজনই? সহজেই এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না।

ব্যক্তি ও রাজনীতিক এরশাদের প্রকৃত তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে পারবে ইতিহাস। ইতিহাসের সেই রায় জানার জন্য আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে মহাকালের দিকে।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম।

এরশাদ বললেন, তিনিতো অসুস্থ, সিএমএইচের বেডে শুয়ে আছেন

এরশাদ বললেন, তিনিতো অসুস্থ, সিএমএইচের বেডে শুয়ে আছেন
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ছবি: সংগৃহীত

১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। স্বাধীনতার পরবর্তী এক দশক বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে আমাদের রাজনীতিতে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। কিন্তু এ হত্যা, ক্যু আর ষড়যন্ত্র সেখানেই থেমে থাকেনি। রাষ্ট্রপতি জিয়াকেও একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। বিরাজনীতিকরণ অথবা রাজনীতিতে অরাজনৈতিক শক্তির অনুপ্রবেশের সেই ধারাবাহিকতাতেই আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে এরশাদের উত্থান।

এরশাদ প্রায়ই বলতেন যে তিনি রক্তাক্ত পথে ক্ষমতায় আসেননি। এ নিয়ে তার এক ধরনের অহংবোধ ছিল। ইতিহাস পাঠে তার এ দাবিকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু পুরোপুরি স্বীকার করে নেওয়াও কঠিন। কারণ, জিয়া ও মঞ্জুর হত্যা কাণ্ডের পেছনের মূল কুশীলব অন্য কেউ ছিল কিনা, সেটি নির্ণয় না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

তবে, আপাত দৃষ্টিতে মনে হয়, তিনি রক্তপাতহীন পথেই ক্ষমতায় এসেছেন। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, সব সামরিক শাসকরাই দাবি করেন যে তারা বাধ্য হয়েই রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন। এরশাদও সে দাবি করেছেন। যদি ধরেও নিই যে তিনি রক্তাক্ত পথে ক্ষমতায় আসেননি, তারপরও তিনি যে জোর জবরদস্তির পথে ক্ষমতায় এসেছেন এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। যদি তিনি তার লেখা ‘আমার কর্ম আমার জীবন’ বইয়ের ভূমিকাংশে তার ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়টি সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়েছেন।

এরশাদ বললেন, তিনিতো অসুস্থ, সিএমএইচের বেডে শুয়ে আছেন
রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম (মাঝখানে), তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ(বামে), ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু বিভিন্ন লেখকদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরে তিনি নিছক বাধ্য হয়েই ক্ষমতায় আসেননি। বরং এ সুযোগটি তিনি কাজে লাগিয়েছেন এবং সে জন্য যা যা করার তা তিনি করেছেন। এ বর্ণনায় পাওয়া যায়, 'জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরে তিনি তৎকালীন চিফ অফ জেনারেল স্টাফ জেনারেল নূরুদ্দিনকে বললেন, এখন করণীয় কী? সিজিএস একটু ভেবে উত্তর দিলেন সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট (আবদুস সাত্তার) এ সময় দেশের শাসনভার গ্রহণ করবেন। কিন্তু এমন জবাবের জন্য এরশাদ প্রস্তুত ছিলেন না। এরশাদ বললেন, কিন্তু তিনিতো অসুস্থ, সিএমএইচ বেডে শুয়ে আছেন। পরে তিনি তৎকালীন সংস্থাপন সচিব কেরামত আলীকে ডেকে পাঠালেন। তিনিও একই মতামত দিলেন। পরে এরশাদ কেরামত আলীকে নিয়ে সিএমএইচ-এ যান। সেদিন এম্বুলেন্সে করেই অসুস্থ সাত্তারকে বঙ্গভবনে নিয়ে আসেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট সাত্তারের দেশবাসীর উদ্দেশে একটি ভাষণ রেকর্ড করে পাঠিয়ে দেয়া হলো রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারের জন্য'। এর পরের ঘটনাপ্রবাহ এরশাদই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি 'অপারেশন নিয়ন্ত্রণ কক্ষ'র মাধ্যমেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন।

১৯৮২ সালের ২৪ এপ্রিল এরশাদ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। এর তিনদিন পরে তিনি বিচারপতি এএফএম আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করেন এবং যথারীতি সংবিধান স্থগিত করেন। পরে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তাকেও সরিয়ে দিয়ে তিনি নিজেই রাষ্ট্রপতি হন। এর আগে সেনাপ্রধান থাকাকালেই তিনি নিজের ক্ষমতাকে নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা। রাজনীতিতে অধিষ্ঠিত হতে থাকেন এরশাদ। হয়ে ওঠেন শাসক।

সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার/ছবি: সংগৃহীত
সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার, ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু ক্ষমতা চিরদিনের নয়। আজ আছে, কাল নেই। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ২৬টিরও বেশি মামলা হয়েছে। কিন্তু আফসোস, খুব কম মামলারই তদন্ত ও বিচার হয়েছে। এটি আমাদের রাজনৈতিক দেওলিয়াত্ব। ২৬ মামলার মধ্যে দুটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন ও বাকি মামলায় খালাস পান এরশাদ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই সরকারের আমলেই এ মামলাগুলো থেকে তিনি রেহাই পান। কিন্তু জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলা ও একটি দুর্নীতির মামলা আজও চলমান। এরশাদ চলে গেছেন, জানি এ মামলাগুলোও হারিয়েছে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপির প্রথম মেয়াদে এরশাদ পুরো সময়টিই কারাগারে কাটিয়েছেন। যে মামলার জন্য তিনি কারাগারে ছিলেন সে মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালেও মামলার তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। এভাবেই সবকিছু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। হয়তো একদিন এরশাদও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবেন। ইতিহাস কাউকে মনে রাখে না। যে ইতিহাস নির্মাণ করে ইতিহাস শুধু তাকেই মনে রাখে। এরশাদ ইতিহাস নির্মাণ করেছেন কিনা সে প্রশ্নও ইতিহাসের কাছেই থাক।

আমরা আম মানুষ শুধু জানি, সবাইকেই যেতে হয় আজ অথবা কাল। সেদিন এই সিএমএইচ বেডে শুয়ে ছিলেন অসুস্থ আবদুস সাত্তার। তার কাছে ক্ষমতা ছিল না, ক্ষমতা ছিল এরশাদের। ক্ষমতার পালাবদলে সেই সিএমএইচ-এই এরশাদকে যেতে হয়েছে কতবার- কারণে অকারণে। শেষবারের মতো সেখান থেকেই তার মহাযাত্রা। সে যাত্রায় তিনি শুধুই একা। যেমন গিয়েছে সবাই। পেছনে পড়ে থাকে শুধু ইতিহাস।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র