Barta24

রোববার, ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

মুজিব লোকান্তরে, মুজিব সবার অন্তরে

মুজিব লোকান্তরে, মুজিব সবার অন্তরে
মোতাহের হোসেন প্রিন্স/ছবি: বার্তা২৪
মোতাহের হোসেন প্রিন্স


  • Font increase
  • Font Decrease

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘‘বাঙালী জাতি কখনো পরাধীন ছিল না, কিন্তু নিজের স্বভাবের কারণে কখনো স্বাধীন হতে পারেনি৷’’ অর্থাৎ পরাধীনতার জন্য অনেকাংশে আমাদের মানসিকতাই দায়ী৷

ইবনে বতুতা তাঁর ‘কিতাবুল রেহলা’ গ্রন্থে বাংলাদেশকে ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ দোযখ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রাচুর্য মানুষের সুখ এনে দেয়, অথচ সেটিও এদেশের মানুষকে সুখি করতে পারেনি৷ এক সময় কথিত ছিল, এই বাংলার পলি মাটি এতটাই উর্বর ছিল যে, মুর্শিদাবাদের একজন ব্যবসায়ীর টাকা দিয়ে সমস্ত বিলাত শহর কেনা যেত৷

আমাদের মানসিকতার জন্য শত বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল আমাদের বইতে হয়েছে৷ বৃটিশ বেনিয়াদের শাসন আর পাকিস্তানিদের শোষণের ইতিহাস বাংলার মানুষের প্রতি নির্মম নির্যাতন আর নিপীড়নের ইতিহাস।

শত বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে আবার এই বাংলার মুক্তিকামী জনতাই অসংখ্য বিপ্লব সংঘটিত করেছে৷ হাজী শরীয়তুল্লাহ বিপ্লব করেছেন, মীর নিছার আলী তিতুমীর বিপ্লব করেছেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও ক্ষুদিরাম বিপ্লব করেছেন; কিন্তু সকল বিপ্লবের ইতিহাসকে বিজয়ের ইতিহাসে পরিণত করেছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান৷ যার নেতৃত্বে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলার ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার লাল টগবগে সূর্য ছিনিয়ে এনেছে৷

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ-মা-মাটি আর মানুষের প্রতি ভালবাসা এতটাই বেশি ছিল যে, কোনো লেখনী বা বক্তব্যের মাধ্যমে তা শেষ করা যায় না৷ দেশ, মা, মাটি আর মানুষের প্রয়োজনেই তিনি তাঁর সকল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন৷ এতটাই বৈচিত্র্যপূর্ণ তাঁর জীবন৷

তিনি মহাদার্শনিক ছিলেন না, মহাপণ্ডিতও ছিলেন না; কিন্তু মহাদার্শনিক বা পণ্ডিতরা যা পারেননি, তিনি তা পেরেছিলেন৷

ক্ষণজন্মা এই পুরুষ শৈশবে স্কুলের সহপাঠীর গায়ে পরিধানের বস্ত্র না থাকায় নিজের বস্ত্র দিয়ে, নিজে শুধু চাদর গায়ে জড়িয়ে বাড়িতে ফিরেছিলেন৷ তেমনি কৈশোরে এতিম শিশুদের শিক্ষার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টির চাল সংগ্রহ করেছেন৷ শৈশব থেকেই উপমহাদেশের প্রধান দুই ধর্মাবলম্বী হিন্দু-মুসলমানদের পারস্পরিক দূরত্বের সম্পর্ক তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল৷

কৈশোরেই তিনি তাঁর স্কুলের দুরাবস্থার কথা তুলে ধরেছিলেন তাঁর স্কুল পরিদর্শনে আসা পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে৷ স্কুল শিক্ষকের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় দুরবস্থার সৃষ্টি হলে তিনি স্কুলের সকল শিক্ষার্থীদের নিয়ে ক্লাস বর্জন করেন, স্কুলে শিক্ষা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন৷ এরপর তিনি কলকাতা যান ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য৷

১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়, বাংলায় লাখ লাখ লোক মারা যাচ্ছিল৷ বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লেখেন, “যুদ্ধ করে ইংরেজ আর না খেয়ে মরে বাঙালি, যে বাঙালির কোনো কিছুরই অভাব ছিল না৷ মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মায়ের দুধ চাটছে৷ কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবারের জন্য কাড়াকাড়ি করছে৷ ছেলে মেয়েদের ফেলে দিয়ে মা কোথায় পালিয়ে গেছে৷ পেটের দায়ে নিজের ছেলে মেয়েকে বিক্রি করতে চেষ্টা করছে৷ কেউ কিনতেও রাজি হয় নাই৷ বাড়ির দুয়ারে এসে চিৎকার করছে, মা বাঁচাও কিছু খেতে দাও, মরে তো গেলাম, আর পারি না, একটু ফেন দাও৷ এ কথা বলতে বলতে ঐ বাড়ির দুয়ারের কাছেই পড়ে মরে গেছে৷ এ সময় আমি লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম৷ অনেকগুলো লঙ্গর খানা খুললাম৷ দিনে একবার করে খাবার দিতাম৷ মুসলিম লীগ অফিসে, কলকাতা মাদ্রাসায় এবং আরও অনেক জায়গায় লঙ্গর খানা খুললাম৷ দিনভর কাজ করতাম আর রাতে কোনোদিন বেকার হোস্টেলে ফিরে আসতাম, কোনোদিন লীগ অফিসের টেবিলে শুয়ে পড়তাম৷”

ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধু ছাত্রদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতেন৷ কোন ছাত্রের কী অসুবিধা হচ্ছে, কোন ছাত্র হোস্টেলে জায়গা পায় না, কার ফ্রি মিল দরকার; তাকে বললেই প্রিন্সিপাল ড. জুবেরী সাহেবের কাছে হাজির হতেন৷ তিনি কোনো অন্যায় আবদার করতেন না, তাই শিক্ষকরা তাঁর কথা শুনতেন৷ জাতির পিতা ছাত্র অবস্থায় ভারতীয় উপমহাদেশে বিষবাষ্পের মত ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবেলা করা, দুই সম্প্রদায়ের ভেতর সম্প্রীতির বন্ধন স্থাপনের জন্য যৌবনে অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন৷ তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, ভারতবর্ষে মুসলমানরা থাকবে এবং পাকিস্তানে হিন্দুরাও থাকবে৷ সকলেই সমান অধিকার পাবে৷ পাকিস্তানে হিন্দুরাও স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বাস করবে, ভারতবর্ষের মুসলমানরাও সমান অধিকার পাবে৷ পাকিস্তানের মুসলমানরা যেমন হিন্দুদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে, তেমনি ভারতবর্ষের হিন্দুরাও মুসলমানদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে৷

অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে জানতে পারি, কয়েকটা জেলায় খাদ্য সমস্যা দেখা দিয়েছিল৷ বিশেষ করে ফরিদপুর, কুমিল্লা ও ঢাকা জেলার জনসাধারণ এক মহাবিপদের সম্মুখীন হয়েছিল৷ সরকার কর্ডন প্রথা চালু করেছিল৷ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় খাদ্য যেতে দেওয়া হত না৷ ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার লোক, খুলনা ও বরিশালে ধান কাটার মৌসুমে দল বেঁধে দিনমজুর হিসেবে যেত৷ এরা ধান কেটে ঘরে উঠিয়ে দিত, পরিবর্তে একটা অংশ পেত৷ এদেরকে দাওয়াল বলা হত৷ এবার তারা যখন ধান কাটতে যায়, তখন সরকার কোন বাঁধা দিল না৷ যখন তারা দুই মাস পর্যন্ত ধান কেটে তাদের ভাগ নৌকায় তুলে রওনা করলো, বাড়ির দিকে তাদের ক্ষুধার্ত মা-বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের খাওয়ানোর জন্য, তখন তাদের পথ রোধ করা হলো৷ 'ধান নিতে পারবে না, সরকারের হুকুম', ধান জমা দিয়ে যেতে হবে, নতুবা নৌকাসমেত আটক ও বাজেয়াপ্ত করা হবে৷ শেষ পর্যন্ত ধান নামিয়ে রেখে ওই দিনমজুর লোকগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হলো৷ এ খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু আর চুপ থাকতে পারেননি, তীব্র প্রতিবাদ শুরু করলেন৷ সভা করলেন, সরকারি কর্মচারীদের সাথে সাক্ষাতও করলেন৷ দুখি মানুষের কষ্ট বঙ্গবন্ধু সহ্য করতে পারতেন না৷ কোনো অন্যায় দেখলেই সেখানে প্রতিবাদ করতেন৷

বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আরও লিখেছেন, আমার মনে আছে খুবই গরিব এক বৃদ্ধ মহিলা কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, শুনেছে এই পথে আমি যাব, আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বলল- বাবা আমার এই কুঁড়েঘরে তোমার একটু বসতে হবে৷ আমি তার হাত ধরেই তার বাড়িতে যাই৷ অনেক লোক আমার সাথে, আমাকে মাটিতে একটা পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা এনে আমার সামনে ধরে বলল- খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছু নাই৷ আমার চোখে পানি এলো৷ আমি দুধ একটু মুখে নিয়ে, সেই পয়সার সাথে আরও কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম- তোমার দোয়া আমার জন্য যথেষ্ট, তোমার দোয়ার মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না৷ টাকা সে নিলো না, আমার মাথায় মুখে হাত দিয়ে বলল- গরীবের দোয়া তোমার জন্য আছে বাবা৷ নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল। যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি, সেইদিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, 'মানুষেরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না৷'

ছাপ্পান্ন বছরের ছোট্ট জীবনে যিনি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দীর্ঘ চৌদ্দটি বছর কাটিয়েছেন৷ দেশ, মা ও মাটির স্বার্থে তিনি সকল কষ্ট ও বেদনাকে হাসিমুখে সহ্য করেছেন৷ দেশ আর মানবতার কল্যাণে জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে পিতা মুজিবের এই ত্যাগ, হাজার বছর ধরে কোটি বাঙালির হৃদয়ে রুধির ধারার মত প্রবাহমান থাকবে৷

পিতা মুজিবের আপসহীন এবং সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনাদর্শ নিয়েই তাঁর সুযোগ্য তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনা পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে৷ পিতা মুজিবের স্বপ্ন যত বেশি বাস্তবায়ন হচ্ছে, তত বেশি এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ৷ আর তেমনি করেই সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্রের নিকষ কালো ষড়যন্ত্রের জাল আরো বেশি ঘনিভূত হচ্ছে৷

কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে বিশ্ব মানবতাবাদের অন্যতম মানবতাবাদী নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের অসম্ভব ত্যাগ ও মানবকল্যাণে নিবেদিত জীবনাদর্শ দিয়ে গড়ে ওঠা তাঁর প্রতিষ্ঠান এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত লাখো কোটি বাঙালির চেতনা শক্তির কাছে পরাজিত হবে সকল অপশক্তি৷ এগিয়ে যাবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ, এই হোক জাতির পিতার শততম জন্মদিনে আমাদের অবিচল প্রত্যাশা৷

মোতাহের হোসেন প্রিন্স: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়৷

আপনার মতামত লিখুন :

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

সবার জামিন হয়ে যায়। এই সবাই কারা? শুনে মনে হয় অনেক মানুষ। একটি মহল্লায়, একটি গ্রামে, একটি শহরে কতো মানুষই তো থাকে। তাহলে সবাই বলতে কি মহল্লার সব মানুষের কথা বলা হচ্ছে? গ্রাম-শহরের মানুষও নিশ্চয়ই এই গোনার মধ্যে আছে। সবাই মানে তো অসংখ্য। তাহলে জামিন হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের।

আচ্ছা জামিন মানে কী? অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া, নাকি অপরাধ প্রমাণের আগ পর্যন্ত মুক্ত বাতাসে চলাচল করার স্বাধীনতা? এমনও তো হতে পারে জামিন মানে কাউকে পরোয়া না করার দাম্ভিকতা। মহল্লা, গ্রাম, শহরের সবাই কি অপরাধী? কারণ শুরুতেই যে বলা হয়েছে, সবাই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। কে দিল এই খবর? টিনে বারি দিয়ে মহল্লা, গ্রাম, শহরে খবর ছড়াচ্ছে কে, সবার যে জামিন হচ্ছে? মানুষ। হুম, মানুষ তার দুঃখের কথা জানাচ্ছে। মানুষ তার অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছে। তাহলে এই যে বলা হলো সবাই, সেখানে কি মানুষ নেই?

সবাই বলতে তো অগণিত, অসংখ্য বোঝায়, সেখানে মানুষ থাকবে না কেন? মানুষেরা নির্বাসনে গেছে? এমন সংবাদই পাওয়া যাচ্ছে। যাবে না কেন? মহল্লার দু’পায়ের যে প্রাণী পাশের বাড়ির শিশুকে জমির লোভে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল, সে এখন শীষ বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দু’পায়ের দল গ্রামের কিশোরীকে ধর্ষণ করার পরেও হুঙ্কার থামায়নি। নতুন কিশোরী তাদের নজরে। চাকায় মানুষ পিষে ফেলে ছিল যে, তাকে এখনও দেখা যায় রঙিন কাঁচের আড়ালে শীতাতাপ মোটর যানে। আগুনে পুড়ে গেল কতো প্রিয় মুখ। পুড়িয়ে মারলো যে সংঘ, তারা আষাঢ়ে ক্ষমতার রোদ পোহায়।

মানুষ নামে আছে যে বিলুপ্ত প্রায় সম্প্রদায়, তারা ক্রমশ গুহাবাসী হয়ে পড়ছে। কোনোভাবে মুখ বের করে দেখছে- কোথাও কোনো অপরাধ নেই। যেহেতু অপরাধ নেই, তাই সবাই শরতের রোদ্দুর দেখছে। আগাম হৈমন্তী হাওয়া শরীরে মাখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মহল্লায় তাদের সালিশে ডাকবে কে, গ্রামে সালিশ বসানোর মুরোদ কার, আর শহর? রঙিলা শহরের নকশাকার তো ওই ওরাই। যাদের জামিন হয়ে যায়। সংখ্যায় ওরা লঘিষ্ঠই ছিল। ক্রমশ ওরা নদর্মার কালো জলের মতো বুদঁ বুঁদ ছড়াতে থাকে। সেই ছোট একটি বুঁদ বুঁদের উৎস থেকে তৈরি হয়েছে কালো জলের জলাশয়। সেই জলও নাকি কালো নয়। সেই জলের দুর্গন্ধেরও নাকি সুবাস আছে। মহল্লা, গ্রাম, শহরে সেই গল্পের বয়ান চলছে। কাগজের জাদুর পরশে কালো সাদা হয়ে যাচ্ছে। অপরাধী সুবোধ হয়ে যাচ্ছে। সুবোধকে দেওয়া হচ্ছে অপরাধীর বেশ।

ওদের জামিন হয়ে যাচ্ছে বলে রাতের বাঁদুরও ভয়ে আছে। নেকড়েরা মহল্লা, গ্রাম, শহর ছেড়েছে। কিন্তু গুটিকয় সেই মানুষেরা? ওরা নির্বসানে যাবে কোথায়, গোলকে এমন কোনো ভূখণ্ড আছে, ব-দ্বীপে এমন আছে কোনো শুদ্ধ জমিন? যেখানে মানুষ মিশে যেতে পারবে দোঁ-আশের সঙ্গে? মানুষ এক আশ্চর্য প্রাণ। কি মহাকাশ, মহাকাল সমান ধৈর্য্য তার। আবার তার গরিষ্ঠ হবার সাধ।

জামিন যাদের হচ্ছে হোক না। কতোদূর যাবে ওরা, পোড়াবে, নষ্ট করবে কতোটা? মানুষ জানে সেই দু’পায়ের প্রাণীদের মুরোদ। ওদের আত্মমৃত্যুর উৎসব সন্নিকটে। মহাকার লাখ প্রাণীর মতোই, মহাদানব এই দু’পায়ের অপরাধীরা বিলুপ্ত হবেই। সবাই, অসংখ্য বলতে আসলে মানুষই সত্য। ক্ষুদ্র শুধু জামিন পেয়ে যাওয়ার দল। ওদের আসলে জামিনের সুযোগ নেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র