Alexa

মুজিব লোকান্তরে, মুজিব সবার অন্তরে

মুজিব লোকান্তরে, মুজিব সবার অন্তরে

মোতাহের হোসেন প্রিন্স/ছবি: বার্তা২৪

মোতাহের হোসেন প্রিন্স

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘‘বাঙালী জাতি কখনো পরাধীন ছিল না, কিন্তু নিজের স্বভাবের কারণে কখনো স্বাধীন হতে পারেনি৷’’ অর্থাৎ পরাধীনতার জন্য অনেকাংশে আমাদের মানসিকতাই দায়ী৷

ইবনে বতুতা তাঁর ‘কিতাবুল রেহলা’ গ্রন্থে বাংলাদেশকে ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ দোযখ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রাচুর্য মানুষের সুখ এনে দেয়, অথচ সেটিও এদেশের মানুষকে সুখি করতে পারেনি৷ এক সময় কথিত ছিল, এই বাংলার পলি মাটি এতটাই উর্বর ছিল যে, মুর্শিদাবাদের একজন ব্যবসায়ীর টাকা দিয়ে সমস্ত বিলাত শহর কেনা যেত৷

আমাদের মানসিকতার জন্য শত বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল আমাদের বইতে হয়েছে৷ বৃটিশ বেনিয়াদের শাসন আর পাকিস্তানিদের শোষণের ইতিহাস বাংলার মানুষের প্রতি নির্মম নির্যাতন আর নিপীড়নের ইতিহাস।

শত বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে আবার এই বাংলার মুক্তিকামী জনতাই অসংখ্য বিপ্লব সংঘটিত করেছে৷ হাজী শরীয়তুল্লাহ বিপ্লব করেছেন, মীর নিছার আলী তিতুমীর বিপ্লব করেছেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও ক্ষুদিরাম বিপ্লব করেছেন; কিন্তু সকল বিপ্লবের ইতিহাসকে বিজয়ের ইতিহাসে পরিণত করেছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান৷ যার নেতৃত্বে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলার ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার লাল টগবগে সূর্য ছিনিয়ে এনেছে৷

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ-মা-মাটি আর মানুষের প্রতি ভালবাসা এতটাই বেশি ছিল যে, কোনো লেখনী বা বক্তব্যের মাধ্যমে তা শেষ করা যায় না৷ দেশ, মা, মাটি আর মানুষের প্রয়োজনেই তিনি তাঁর সকল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন৷ এতটাই বৈচিত্র্যপূর্ণ তাঁর জীবন৷

তিনি মহাদার্শনিক ছিলেন না, মহাপণ্ডিতও ছিলেন না; কিন্তু মহাদার্শনিক বা পণ্ডিতরা যা পারেননি, তিনি তা পেরেছিলেন৷

ক্ষণজন্মা এই পুরুষ শৈশবে স্কুলের সহপাঠীর গায়ে পরিধানের বস্ত্র না থাকায় নিজের বস্ত্র দিয়ে, নিজে শুধু চাদর গায়ে জড়িয়ে বাড়িতে ফিরেছিলেন৷ তেমনি কৈশোরে এতিম শিশুদের শিক্ষার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টির চাল সংগ্রহ করেছেন৷ শৈশব থেকেই উপমহাদেশের প্রধান দুই ধর্মাবলম্বী হিন্দু-মুসলমানদের পারস্পরিক দূরত্বের সম্পর্ক তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল৷

কৈশোরেই তিনি তাঁর স্কুলের দুরাবস্থার কথা তুলে ধরেছিলেন তাঁর স্কুল পরিদর্শনে আসা পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে৷ স্কুল শিক্ষকের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় দুরবস্থার সৃষ্টি হলে তিনি স্কুলের সকল শিক্ষার্থীদের নিয়ে ক্লাস বর্জন করেন, স্কুলে শিক্ষা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন৷ এরপর তিনি কলকাতা যান ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য৷

১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়, বাংলায় লাখ লাখ লোক মারা যাচ্ছিল৷ বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লেখেন, “যুদ্ধ করে ইংরেজ আর না খেয়ে মরে বাঙালি, যে বাঙালির কোনো কিছুরই অভাব ছিল না৷ মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মায়ের দুধ চাটছে৷ কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবারের জন্য কাড়াকাড়ি করছে৷ ছেলে মেয়েদের ফেলে দিয়ে মা কোথায় পালিয়ে গেছে৷ পেটের দায়ে নিজের ছেলে মেয়েকে বিক্রি করতে চেষ্টা করছে৷ কেউ কিনতেও রাজি হয় নাই৷ বাড়ির দুয়ারে এসে চিৎকার করছে, মা বাঁচাও কিছু খেতে দাও, মরে তো গেলাম, আর পারি না, একটু ফেন দাও৷ এ কথা বলতে বলতে ঐ বাড়ির দুয়ারের কাছেই পড়ে মরে গেছে৷ এ সময় আমি লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম৷ অনেকগুলো লঙ্গর খানা খুললাম৷ দিনে একবার করে খাবার দিতাম৷ মুসলিম লীগ অফিসে, কলকাতা মাদ্রাসায় এবং আরও অনেক জায়গায় লঙ্গর খানা খুললাম৷ দিনভর কাজ করতাম আর রাতে কোনোদিন বেকার হোস্টেলে ফিরে আসতাম, কোনোদিন লীগ অফিসের টেবিলে শুয়ে পড়তাম৷”

ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধু ছাত্রদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতেন৷ কোন ছাত্রের কী অসুবিধা হচ্ছে, কোন ছাত্র হোস্টেলে জায়গা পায় না, কার ফ্রি মিল দরকার; তাকে বললেই প্রিন্সিপাল ড. জুবেরী সাহেবের কাছে হাজির হতেন৷ তিনি কোনো অন্যায় আবদার করতেন না, তাই শিক্ষকরা তাঁর কথা শুনতেন৷ জাতির পিতা ছাত্র অবস্থায় ভারতীয় উপমহাদেশে বিষবাষ্পের মত ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবেলা করা, দুই সম্প্রদায়ের ভেতর সম্প্রীতির বন্ধন স্থাপনের জন্য যৌবনে অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন৷ তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, ভারতবর্ষে মুসলমানরা থাকবে এবং পাকিস্তানে হিন্দুরাও থাকবে৷ সকলেই সমান অধিকার পাবে৷ পাকিস্তানে হিন্দুরাও স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বাস করবে, ভারতবর্ষের মুসলমানরাও সমান অধিকার পাবে৷ পাকিস্তানের মুসলমানরা যেমন হিন্দুদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে, তেমনি ভারতবর্ষের হিন্দুরাও মুসলমানদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে৷

অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে জানতে পারি, কয়েকটা জেলায় খাদ্য সমস্যা দেখা দিয়েছিল৷ বিশেষ করে ফরিদপুর, কুমিল্লা ও ঢাকা জেলার জনসাধারণ এক মহাবিপদের সম্মুখীন হয়েছিল৷ সরকার কর্ডন প্রথা চালু করেছিল৷ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় খাদ্য যেতে দেওয়া হত না৷ ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার লোক, খুলনা ও বরিশালে ধান কাটার মৌসুমে দল বেঁধে দিনমজুর হিসেবে যেত৷ এরা ধান কেটে ঘরে উঠিয়ে দিত, পরিবর্তে একটা অংশ পেত৷ এদেরকে দাওয়াল বলা হত৷ এবার তারা যখন ধান কাটতে যায়, তখন সরকার কোন বাঁধা দিল না৷ যখন তারা দুই মাস পর্যন্ত ধান কেটে তাদের ভাগ নৌকায় তুলে রওনা করলো, বাড়ির দিকে তাদের ক্ষুধার্ত মা-বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের খাওয়ানোর জন্য, তখন তাদের পথ রোধ করা হলো৷ 'ধান নিতে পারবে না, সরকারের হুকুম', ধান জমা দিয়ে যেতে হবে, নতুবা নৌকাসমেত আটক ও বাজেয়াপ্ত করা হবে৷ শেষ পর্যন্ত ধান নামিয়ে রেখে ওই দিনমজুর লোকগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হলো৷ এ খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু আর চুপ থাকতে পারেননি, তীব্র প্রতিবাদ শুরু করলেন৷ সভা করলেন, সরকারি কর্মচারীদের সাথে সাক্ষাতও করলেন৷ দুখি মানুষের কষ্ট বঙ্গবন্ধু সহ্য করতে পারতেন না৷ কোনো অন্যায় দেখলেই সেখানে প্রতিবাদ করতেন৷

বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আরও লিখেছেন, আমার মনে আছে খুবই গরিব এক বৃদ্ধ মহিলা কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, শুনেছে এই পথে আমি যাব, আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বলল- বাবা আমার এই কুঁড়েঘরে তোমার একটু বসতে হবে৷ আমি তার হাত ধরেই তার বাড়িতে যাই৷ অনেক লোক আমার সাথে, আমাকে মাটিতে একটা পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা এনে আমার সামনে ধরে বলল- খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছু নাই৷ আমার চোখে পানি এলো৷ আমি দুধ একটু মুখে নিয়ে, সেই পয়সার সাথে আরও কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম- তোমার দোয়া আমার জন্য যথেষ্ট, তোমার দোয়ার মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না৷ টাকা সে নিলো না, আমার মাথায় মুখে হাত দিয়ে বলল- গরীবের দোয়া তোমার জন্য আছে বাবা৷ নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল। যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি, সেইদিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, 'মানুষেরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না৷'

ছাপ্পান্ন বছরের ছোট্ট জীবনে যিনি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দীর্ঘ চৌদ্দটি বছর কাটিয়েছেন৷ দেশ, মা ও মাটির স্বার্থে তিনি সকল কষ্ট ও বেদনাকে হাসিমুখে সহ্য করেছেন৷ দেশ আর মানবতার কল্যাণে জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে পিতা মুজিবের এই ত্যাগ, হাজার বছর ধরে কোটি বাঙালির হৃদয়ে রুধির ধারার মত প্রবাহমান থাকবে৷

পিতা মুজিবের আপসহীন এবং সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনাদর্শ নিয়েই তাঁর সুযোগ্য তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনা পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে৷ পিতা মুজিবের স্বপ্ন যত বেশি বাস্তবায়ন হচ্ছে, তত বেশি এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ৷ আর তেমনি করেই সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্রের নিকষ কালো ষড়যন্ত্রের জাল আরো বেশি ঘনিভূত হচ্ছে৷

কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে বিশ্ব মানবতাবাদের অন্যতম মানবতাবাদী নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের অসম্ভব ত্যাগ ও মানবকল্যাণে নিবেদিত জীবনাদর্শ দিয়ে গড়ে ওঠা তাঁর প্রতিষ্ঠান এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত লাখো কোটি বাঙালির চেতনা শক্তির কাছে পরাজিত হবে সকল অপশক্তি৷ এগিয়ে যাবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ, এই হোক জাতির পিতার শততম জন্মদিনে আমাদের অবিচল প্রত্যাশা৷

মোতাহের হোসেন প্রিন্স: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়৷

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

বৈশাখী অর্থনীতি

বৈশাখী অর্থনীতি

বাঙালির সবচেয়ে আলোড়িত জাতীয় উৎসব- বাংলা নববর্ষ। শুরুর দিকে নববর্ষকে ঘিরে কয়েকটি উৎসব পালিত হলেও বর্তমানে অনেকগু...

বৈশাখ ও কিছু কথা

বৈশাখ ও কিছু কথা

মাদরাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা নিয়ে মধ্যবিত্ত নাগরিকদের একাংশ ভীষণ ক্ষুব্ধ! সা...