Barta24

বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬

English

তাহলে গ্রামগুলো ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হবে কি?

তাহলে গ্রামগুলো ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হবে কি?
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম/ছবি: বার্তা২৪
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম


  • Font increase
  • Font Decrease

গ্রামে জন্ম নেয়ায় এর ওপর আমার বেশ মায়া। ছাত্রজীবনে দু’দিনের ছুটি থাকলেই ঢাকা থেকে ট্রেনে চেপে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতাম। এখন আর হয়ে ওঠে না। এবার অনেকদিন পর গ্রামে বেড়াতে গেলাম। কিন্তু রাতেই আমাকে কর্মস্থলে ফিরে যেতে হবে। একজন মুরুব্বী কিছুটা ক্ষোভের স্বরে বললেন- বেশ কিছুদিন যাবৎ শুনতে পাচ্ছি- আমাদের গ্রামগুলো শহর হয়ে যাবে। খুশির সংবাদ। তাহলে তোমাকে আর অজপাড়াগাঁয়ে ক্ষণিকের জন্য বেড়াতে আসার প্রয়োজন হবে না। তাঁর কথাগুলোতে বেশ মায়ার আব্দার লক্ষ্য করলাম। অগত্যা তাঁর কাছে দু:খ প্রকাশ করে এ যাত্রায় ক্ষমা চাইলাম। ভাবলাম, গ্রামগুলো যদি সত্যিই শহর হয়ে যেত তাহলে তো ভালই হতো। কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভব?

শিশুকালে আদর্শগ্রামের কথা শুনেছি। বিদেশে পড়াশুনার সময় ‘স্মার্ট ভিলেজের’ কথা শুনেছি। কিন্তু এখন জানলাম আমাদের দেশের গ্রামগুলো শহর হয়ে যাবে। আদতে কি তাই? মনে হয় সেটা নয়। গ্রাম থাকতেই হবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে পার্থক্যকে বুঝতে হেবে। আসলে গ্রামে সব ধরণের আধুনিক নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা করে দায়িত্বরত কর্মীবাহিনীকে গ্রামমুখী করা ও গ্রামের মানুষকে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করে দেয়াটাই আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

আমাদের দেশে গ্রামের মানুষ উচ্চশিক্ষিত হলেই জীবিকার তাগিদে শহরে চলে যায়। আর গ্রামে ফিরে আসে না। এমনকি জেলা বা বিভাগীয় শহরও নয় -সবার লক্ষ্য ঢাকায় বসতি গড়া। কারণ, ঢাকায় দেশের সব নাগরিক সুবিধাদি হিজিবিজি করে হলেও ঘণীভুত হয়েছে! একবার কেউ সেখানে ঢুকলে আর বের হতে চান না। এভাবেই ঢাকাকে জন-গণভারে, ইট-সুরকিভারে, অলি-গলিতে যানজট ভারে নূব্জ্য করে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে। আজ তাই ঢাকাকে পৃথিবীর সবচে’ বড় বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঠেলে দেয়া হয়েছে।

এজন্য শহরের মানুষকে গ্রামে ফিরে যাবার ও যারা এখনও গ্রামেই আছেন তাদেরকে সেখানেই থেকে যাবার কৌশল হাতে নেয়া বিশেষ প্রয়োজন। এই কৌশলতো বহুবছর ধরেই চলছে। কার্যকরী হয়নি কেন? এর প্রধান কারণ, দুর্নীতি।

আমরা জানি, সেবা খাতে কর্মরত কাউকে ঢাকা থেকে বদলি করলেই শুরু হয় উচ্চ পর্যায়ের তদবির। তাদের হাত অনেক লম্বা। অনেক অর্থ খরচ করে বদলি ঠেকিয়ে গর্ব করে বলেন -–আমার বস খুব ভালো মানুষ। বস্ ভালো মানুষ হলে ঘুষ নাই বা বললাম, তদবিরের কাড়ি কাড়ি অবৈধ অর্থ কার পকেটে গেল? এভাবে গ্রামের স্কুলে ভালো শিক্ষক নেই, হাসপাতালে ভালো ডাক্তার নেই, গ্রামের রাস্তায় ভালো গাড়ি নেই, আলো নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই। এমনকি ভালো জনপ্রতিনিধিরাও রাতে গ্রামের নিজ বাড়িতে না ঘুমিয়ে শহরে রাত কাটান। কারণ, গ্রামের বড়িতে রয়েছে চোর-ডাকাত ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা। এভাবে গ্রাম থেকে যাচ্ছে চরম অবহেলিত।

তাইতো দরকার হচ্ছে একটি ‘স্মার্ট ভিলেজের’। যেটা - গ্রামের স্থিত শক্তি, সম্পদ ও ঐতিহ্যকে সামাজিক ও প্রযুক্তিগতভাবে চিহ্নিত ও পুনরুজ্জীবিত (Revitalizing rural wealth, energy and heritage through social and digital innovation ) করা, নতুন সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেয়।

এজন্য গ্রামের শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানবসম্পদকে আধুনিক জ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করে দেশের কেন্দ্র তথা বহি:বিশ্বের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করা। এসব কাজের জন্য দায়িত্বশীল সব সেক্টরের কর্মকর্তা- কর্মচারী, মেন্টর, সমাজবিদ, রাজনীতিবিদগণকে গ্রামে থেকে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা আশু প্রয়োজন। এটা কেন? সেজন্য একটি গ্রামের অভিজ্ঞতার কথা বলি।

আমাদের গ্রামের নাম হিরামানিক। কোন ভণিতা নয়- সত্যিই এটাই এর নাম। গ্রামটি খুব সুন্দর। এই গ্রামে আমার পিতা ১৯৬৬ সালে তাঁর পৈত্রিক ভিটা থেকে একটু দূরে নিজের উদ্যোগে চারটি কুঁড়েঘর দিয়ে একটি নতুন বাড়ি নির্মান করেছিলেন। সেই বাড়িতে আমাদের পরিবারের প্রথম নতুন মানব শিশু হিসেবে আমার জন্মলাভ হয়েছে ১৯৬৭ সালে। সেখানেই আমার শৈশব- কৈশোরের স্মৃতি। আমার অনেক খেলার সাথী ছিল। একসংগে গোল্লাছুট খেলতাম, সাঁতার কাটতাম ও ডারকি দিয়ে মাছ ধরতাম। তাদের দু’একজন সেখানেই আছে। বাকীরা জীবিকার তাগিদে কেউ শহরে কেউবা আমাদেরকে কাঁদিয়ে বেহেশ্তে চলে গেছেন। এতদিনে সেই জন্মঘর বিলীন হয়ে সেখানে নতুন পাকাঘর হয়েছে, পিচঢালা রাস্তা, পাকা স্কুলঘর, বিজলি বাতি, ডিশ টিভি সবকিছু হয়েছে। আধুনিক পরিবর্তনের ছোয়াঁয় শিক্ষা, নিত্যনতুন যানবাহন, ব্যবসায়িক ভাবনা জেঁকে বসেছে গ্রামের মানুষের মধ্যে।

কিন্তু বিরাট দূরত্ব দেখলাম সবার মধ্যে। দিনের বেলা সবাই খুব ব্যস্ত। কেউ কেউ রাতেও। আগেকার দিনে রাতে কেউ কাজ করতো না। এখন বাধ্য হয়ে করতে হয়। আর কাজ বলতে গ্রামের হাট দোকানদারী করা, রিক্সা, আটোরিক্সা চালানো ইত্যাদি। সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এসব দিয়ে অতিরিক্ত আয় করে চাহিদা মেটাতে হয়।

এই গ্রামের জমি খুবই উর্বর। বছরে তিনটি ফসল জন্মে। এখানে অনেক ধনী কৃষক আছেন। অনেকের অনেক জমি, কারো সামান্য কৃষিজমি আছে আবার অনেকের কৃষি জমি নেই। কেউ অন্যের জমিতে চাষাবাদকরে ও কেউবা দিনমজুর। কারো কৃষিজমি, চাকুরী ও কারো বিভিন্নধরণের ছোট ব্যবসা আছে।গ্রামের সবাই সবাইকে নাম বললেই চিনতে পারেন। স্মরণাতীত কাল থেকে এ গ্রামের মানুষজন সহজ-সরল ও একে অপরের সুখ-দু:খের সাথী।

এই গ্রামে অনেক অসুস্থ মানুষ আছে, নির্ভরশীল বয়স্ক বেশি। উঠতি বয়সের যুবকরা এখন কেরাম খেলে, মোবাইল টিপে। কেউ গান-বাজনা করে, পয়সা দিয়ে ডাব্বু খেলে।

এখানে চারটি মসজিদ ও একটি মন্দির আছে। সম্প্রতি আরো দু’টি নতুন মসজিদ হয়েছে। এখানে কোন কুটির শিল্প নেই, তামাকের ব্যাপক আবাদ হলেও ওখানে কোনো বিড়ির কারখানাও নেই। এখানে সিজেনাল বেকার অনেক। মহিলারা এনজিও থেকে লোন নেয়, তবুও আয় তেমন নাই। বেশি রোজগারের আশায় বড় শহরের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে অনেক পরিবার।

তাই অনেক বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা। কোনো কোনো বাড়িতে বয়স্ক পুরুষ মানুষ নেই। কয়েকজন ভিক্ষুক আছেন। কর্মজীবি শ্রমজীবি স্বল্প শিক্ষিত ও স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষগুলো অনেকেই গার্মেন্টস কারখানায় অথবা রিক্সা, অটোরিক্সা চালানোর জন্য ঢাকায় চলে গেছে। বর্তমানে মানুষের ব্যস্ততার কারণে পরস্পরের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে।

আমাদের গ্রাম শহর হোক তা চাই না। কারণ, গ্রামটি শহর হলে কার লাভ হবে? ধনীদের লাভ হবে। গ্রামের প্রকৃতির বিনাশ হবে। ধনীদের বাড়িতে আরো পাকা ঘর হবে। ধনীদের গাড়ি হবে, রাস্তায় যানজট হবে। শব্দ দূষণ, বায়ুদূষণ, পরিবেশদূষণ হবে।শহরের মানুষগুলো ঘরের মধ্যে বসে টিভি, ভিডিও দেখে সময় কাটাবে। কেউ কারো বাড়িতে যাবে না। বাচ্চারা ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলে কাটাবে। বাইরের মাঠে হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট খেলতে যাবে না।

আমাদের গ্রামের মত অনেক সুন্দর সুন্দর গ্রাম ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও অন্যান্য বড় শহরের আশেপাশেই আছে। যেসকল গ্রাম থেকে মাত্র এক ঘন্টায় একশ’/ দু’শ কি.মি. পাড়ি দিয়ে বড় শহরগুলোতে যাতায়ত করা যায়। তাহলে বড় শহরে অযথা রাত যাপনের দরকার কি? শহরে থেকে যদি এ্যাম্বুলেন্সে বসে জ্যামে পড়ে দু'ঘন্টায় হাসপাতালে পৌঁছুতে না পারি তবে সেই শহরে থাকার দরকার আছে কি? আমার স্মার্ট গ্রামে বা সেই গ্রাম থেকে আধা বা একঘন্টার দূরত্বেই যদি একটি ভালমানের হাসপাতাল তৈরি হয়ে যায় তাহলে কেন বড় শহরে ফ্লাটবাড়ি কেনার চিন্তা করছি?

তাই আমার গ্রাম শহর নয় আপাতত: গ্রামই থাকুক। শহর নয়। দরকার একেকটি স্মার্ট ভিলেজের। গ্রামের মানুষগুলো সবাই শিক্ষিত হোক। তবে সবাই শিক্ষিত হয়ে তারা যেন শহরে পালিয়ে না যায়। জীবিকার তাগিদে দিনে শহরে যাক বা চাকুরী করতে যাক, রাতে যেন নিজ গাঁয়ে ফিরে এস ঘুমানোর সুযোগ পায়। এটাই আধুনিক স্মার্ট গ্রামের কনসেপ্ট।

টোকিও বা নিউইয়র্ক শহরে প্রতিদিন বহু মানুষ গ্রাম থেকে আসে। সারাদিন কাজ করে সন্ধায় নিজ নজি গ্রামের শান্তিময় আবাসে ফিরে গিয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে। একে বলা হয় 'ডেইলী প্যাসেঞ্জারী সিস্টেম।’ এই সিস্টেমে বাস নয়- সস্তায় নন-স্টপেজ সরকারি ট্রেন চলে শহর থেকে গ্রামে। বিশ্বের প্রায় সকল উন্নত দেশে কর্মজীবি মানুষেরা দু’শ/ তিনশ’ কি.মি. পাড়ি দিয়ে গ্রাম থেকে বড় বড় শহরে আসতে পারে। এভাবে তারা বড় বড় শহরের ট্রাফিকজ্যাম সমস্যাকে কাটাতে পেরেছে।

আর আমরা? পুরনো ঢাকার বাসিন্দাদের কথা তো জানেন। তারা বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষের ব্যবসা আঁকড়ে ধরে ঘিঞ্জির মধ্যেই বাস করতে পছন্দ করেন। এমনকি ভয়ংকর কেমিক্যালের গুদামের ওপর মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়তে তাঁদের বাধে না !

ঢাকা ও বড় বড় শহরে যদি দু’শ/ তিনশ’ কি.মি. পাড়ি দিয়ে গ্রাম থেকে আসা যায় তবে সেখানে রাতে থেকে যাওয়ার বিড়ম্বনা কেন? টোকিও বিশ্বের সবচে’ জনবহুল শহর। সেখানে রাতে ক’জন নিজের বাসায় ঘুমায়?
মাটির নিচে ও উপরে সরকারি বেসরকারি মিলে কমপক্ষে ষোলটি কোম্পানীর ট্রেন চলে। প্রতি মিনিটে প্লাটফর্মে ট্রেন ঢুকে পড়ে। টোকিওর পাশের সব জেলাগুলো থেকে মাত্র ত্রিশ মিনিট বা সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে টোকিওর প্রাণকেন্দ্রে পৌছানো যায়। কোনো কোনো স্কাই ট্রেন বড় বড় অফিস ভবনের বারান্দায় এসে স্টপেজ দেয় অর্থাৎ সেটাই রেল স্টেশন! কারো সময়ের কোন অপচয় হয় না। আবার কোন স্মার্টগ্র্রামের রেল স্টেশনের কাছেই তার বাড়ি। অথবা প্রিপেইড বা ফ্রি গ্যারেজ। যেখান থেকে নিজ গাড়িতে ৫-১০ মিনিটে সুন্দর ছিমছাম নিজ বাড়িতে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। পরিবারসহ হাতে রান্না করে খেয়ে শান্তিতে ঘুমানো যায়।

আর আমরা? ঢাকাতেই স্কাইক্রেপার বিল্ডিং তৈরি করে বসবাস করছি। সবাই গাড়ি কিনছি! অফিসের সময় হলে সবাই তাড়াহুরো করে রাস্তায় নেমে জ্যামের মধ্যে বসে গাড়ির তেল পুড়ে অফিসের সময় পার করে দিচ্ছি। এত ভয়ংকর যানজট থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন নতুন গাড়ি কেনার জন্য লাইসেন্স ইস্যু করছি!

তাই শহরের ট্রাফিকজ্যাম কমাতে আমাদের গ্রামটি স্মার্ট ভিলেজ হোক। এজন্য যত ধরণের ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োজন সেগুলোর ব্যবহার হোক। গ্রামকে শহর বানানো নয়- গ্রামে সব ধরণের নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা করা হোক। বড় বড় শহরের সাথে সহজে এবং দ্রুততম সময়ে রেল যোগাযোগ, স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ, ফ্রি ইন্টারনেট, ভাল ডাক্তারসহ উন্নত চিকিৎসা সেবা, বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষালয় ও মেধাবী শিক্ষক, দারিদ্র, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল এবং কুটির শিল্প ও কৃষিতে উৎপাদিত পণ্য‌্য নির্ধারিত মূল্যে বিক্রয়ের নিশ্চয়তা দিলে প্রতিটি গ্রামের ঐতিহ্য ফিরে আসবে। গ্রামের গরীব মানুষ আর পেটের দায়ে শহরে স্থানান্তরিত হবে না। এটার বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়োজন। তাই আমাদের গ্রামটি আশু একটি ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হোক।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :

ঐতিহাসিক ভুলের খণ্ডন নাকি অন্য কিছু?

ঐতিহাসিক ভুলের খণ্ডন নাকি অন্য কিছু?
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

কাশ্মীর নিয়ে ভারতের পদক্ষেপের পর পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে না বললেও ভারতের সঙ্গে সকল প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে। ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক সভায় তারা ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনারকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি নয়াদিল্লীতে নিযুক্ত তাদের সকল কূটনীতিককে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এর বাইরে তারা ভারতের সঙ্গে সকল প্রকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোকে স্থগিত করেছে।

আগামী মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় তারা বিষয়টিকে আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এখানে সঙ্গত কারণেই বলে রাখা ভাল যে, পাকিস্তানের তরফ থেকে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আসবে জেনেই কিন্তু ভারত অনেক ভেবেচিন্তে কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি এখন একদিকে যেমন ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়, অন্যদিকে মুক্তিকামী মানুষের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে বড় বাধা বিবেচনায় একটি আন্তর্জাতিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। তবে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতার বিবেচনায় এমনটা আশা করার সুযোগ নেই যে ভারতের ওপর কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান হতে পারে।

আইনগতভাবে কাশ্মীর এখন আর রাজ্য নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি বিশেষ অঞ্চল। ১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র- এই তিনটি বিষয় বাদে বাদবাকি সকল বিষয়ে কাশ্মীরের সরকারকে দেওয়া সকল ক্ষমতা বাতিল হয়ে গেল গত ৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের এক স্বাক্ষরে। প্রশ্ন হচ্ছে সংবিধানের একটি বিশেষ ধারা কীভাবে কেবল রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে বাতিল হয়ে গেল। এর উত্তর হচ্ছে যখন এই বিশেষ ধারাটি সংযোজন করা হয় তখনই এর সঙ্গে এটিকে একটি অস্থায়ী প্রভিশন হিসেবে বর্ণনা করে রাষ্ট্রপতি যখনই চাইবেন তখনই তা বিলুপ্ত করতে পারবেন বলে শর্ত দেয়া হয়েছিল। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ৬৯ বছর পর রাষ্ট্রপতি তা বাতিল করলেন মাত্র। তবে বিষয়টিকে যেভাবে সরল অংকের মতো করে বর্ণনা করা হল, বাস্তবে এটি এমন সরল ছিল না কখনো। বিগত প্রায় ৭০ বছর এমনকি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে ভারতের কোনো সরকার কখনো কাশ্মীরকে একীভূত করাতো দূরে থাক সেখানকার স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল জনদাবি সামাল দিতেই সবসময় ব্যস্ত সময় অতিক্রম করেছে।

বিজেপি তথা ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং এর পরবর্তী দেশের রাজনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া থেকে বিষয়টি অনুমান করা কঠিন নয় যে তাদের বহু প্রতীক্ষিত একটি চাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে। সেই সঙ্গে বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আগের চাইতেও ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভের বিষয়টি এখন অনেকটা স্পষ্ট। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে তারা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিল যে জয়লাভ করে আবার সরকার গঠন করতে পারলে তারা বিতর্কিত ৩৭০ ধারা অবলুপ্তি করবে। এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই ৩৭০ ধারাটি এখানে ভারতে রাজনীতিবিদদের অনেকের কাছেই ‘বিতর্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত। এর সঙ্গে ৩৫ উপধারার সন্নিবেশের মধ্য দিয়ে অপরাপর রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে যা নেই কাশ্মীরের ক্ষেত্রে এসবের সন্নিবেশন, যেমন আলাদা পতাকা, নিজস্ব আইন, অপরাপর অঞ্চলের অধিবাসীদের সেখানে স্থায়ী বাসিন্দা হবার ক্ষেত্রে বাধা, চাকরির ক্ষেত্রে অন্যান্যদের প্রবেশাধিকারে প্রতিবন্ধকতা ইত্যাকার সকল বিষয় আসলে কাশ্মীরকে সকলের কাছেই চক্ষুশূল করে রেখেছিল। তবে দিন দিন ধরে বিষয়টি এভাবে চলতে থাকা এবং কাশ্মীর নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সিদ্ধান্তহীনতা বিষয়টিকে এমন এক জটিলতার আবর্তে বন্দি করে রেখেছে যে এটা নিয়ে সহজে কোন যুক্তিগ্রাহ্য সমাধান পাওয়া দুরূহ।

এ কথা ঠিক যে ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কাশ্মীরের মুক্তিকামী মানুষের জন্য বুমেরাং হবে এবং তাদের মুক্তির সংগ্রামকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে, একই সঙ্গে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে অর্থাৎ এই বিশেষ মর্যাদার সঠিক ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে কাশ্মীর, সেটাকেও কি একেবারে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেয়া যায়। আবার এই প্রশ্নও এসে যায়, এই ব্যর্থতার আসল কারণগুলো কি? এসব কিছুর মূলে ভারত সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ, মহারাজা হরি সিং এর সাথে সম্পাদিত চুক্তির প্রতিশ্রুতির যথাযথ বাস্তবায়ন না করা ইত্যাকার বিষয় এবং পরবর্তীতে এসবের মধ্যে পাকিস্তানের ঢুকে পড়া, কাশ্মীর নিয়ে ভরত এবং পাকিস্তানের মধ্যে দুবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, এর বাইরেও বিভিন্ন সময় ছোটখাট সংঘাত- এই সব কিছু মিলে জল এতটা ঘোলা হয়েছে যে দিন যতই গেছে, পরিস্থিতি ততই জটিল আকার ধারণ করেছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কি হতে পারত সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান? এক্ষেত্রে এতসব ঘটনার ব্যাপকতায় এমন কোন গ্রহণযোগ্য সমাধান কেউ দিতে পারেননি।

ইতিহাসবিদ ড: কিংশুক চ্যাটার্জি বলছেন, 'ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশনের মাধ্যমে কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ঠিকই,কিন্তু যে শর্তে হয়েছিল কালক্রমে ভারত তা থেকে অনেকটা সরে এসেছে। পাকিস্তানও কতকটা জোর করেই এই অ্যারেঞ্জমেন্টের মধ্যে প্রবেশ করেছে। ফলে সাতচল্লিশে এই সমস্যার শুরু হলেও এখন সেই সমস্যা অনেক বেশি জটিল আকার নিয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'এখন কাশ্মীর সমস্যার এমন কোনো পর্ব নেই যেখানে ফিরে গিয়ে আমরা বলতে পারি এখান থেকে সমস্যাটা আবার 'রিসেট' করা যাক! আজ যদি কাশ্মীরে গণভোট হয় কিংবা পাকিস্তান তাদের দিকের কাশ্মীর থেকে সরে যায় - তাতে কোনও সমস্যার আদৌ সমাধান হবে বলে মনে হয় না।'

দীর্ঘদিনের এই সমস্যার জন্য কাশ্মীরের শেষ যুবরাজ করণ সিং অনেকটাই দোষ চাপিয়েছেন ভারত সরকারের ওপর। তার মতে, 'যেদিন আমার বাবা সেই চুক্তিতে সই করেন সেদিন থেকেই জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ২৭ অক্টোবর তারিখে সেদিন আমি নিজেও ওই ঘরে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মহারাজা হরি সিং কিন্তু প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও বৈদেশিক সম্পর্ক - শুধু এই তিনটি ক্ষেত্রে ভারতভুক্তি স্বীকার করেছিলেন,নিজের রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে পুরোপুরি মিশিয়ে দেননি। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীরকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।'

সঙ্গত কারণেই ভারতের এই হঠাৎ আচরণ শান্তিপ্রিয় মানুষকে হতাশ করলেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং কাশ্মীরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের দিকে লক্ষ্য করলে ভারতের এই সিদ্ধান্তকে কি খুব একটা অপ্রাসঙ্গিক বলার সুযোগ রয়েছে? বিশেষ মর্যাদার নামে কাশ্মীরে যে ধরণের অচলাবস্থা বিরাজ করছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে যেভাবে প্রতিনিয়ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এবং এর থেকে প্রতিবেশী পাকিস্তান এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ছে এই সবকিছুই কিন্তু দিনে দিনে ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। কাশ্মীরের এই অচলাবস্থার পথ ধরে ভারতের অপরাপর অঞ্চলগুলোতেও অস্থিরতার বিস্তার যেন রোধ করা যায় সেসব বিবেচনায় নরেন্দ্র মোদির এই পদক্ষেপ। এখানে এটাও সত্য হিসেবে মানতে হবে যে এই পদক্ষেপ নিয়ে নরেন্দ্র মোদি নিজেকে সত্যিকার অর্থে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি যদি জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখকে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে যথার্থভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হন তবে যেমন ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করবেন, আবার অন্যদিকে কাশ্মীরের জনরোষ এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকি যদি নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হয় তবে তা একপর্যায়ে বড় ধরণের সংঘাত এমনকি পাক ভারত উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। শুরু হয়ে যেতে পারে আরেকটি বড় যুদ্ধ, যার ভয়াবহতা অতীতের যে কোন সময়কে অতিক্রম করে যেতে পারে। আর এমনটা হলে এর সকল দায়ভারও কিন্তু মোদির ঘাড়েই পড়বে।

লেখক: ফরিদুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চামড়া কারসাজিতে খর্বিত কোরবানিদাতা ও দুঃস্থ-এতিমের অধিকার

চামড়া কারসাজিতে খর্বিত কোরবানিদাতা ও দুঃস্থ-এতিমের অধিকার
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

গত আট দিন যাবৎ পত্রিকার পাতা উল্টাতেই কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কারসাজি ও দুরবস্থার সংবাদগুলো খুব ব্যথিত করছে। কারণ আমাদের অর্থনীতিতে এর প্রভাব যেমন শঙ্কাজনক ও সমাজনীতিতে তেমনই মর্মস্পর্শী। এই দ্বিবিধ শঙ্কার মধ্যে বাংলাদেশ হাইড এন্ড স্কিন মার্চেন্টস এসোসিয়েশন (বিএইচএসএমএ)-এর সভাপতি জানালেন এই সংকট সৃষ্টির জন্য সিংহভাগ দায়ী দেশের ট্যানারিমালিকগণ। এ বিষয়টিকে শুধু দুঃখজনক বললে ভুল হবে। এর পেছনের গভীর বিষয়গুলোকে দেশের স্বার্থে খুবই মনোযোগের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার আমলে নেয়া উচিত।

ঈদের শেষে সুনামগঞ্জের সৈয়দপুর গ্রামে এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সংগৃহীত চামড়াগুলো দু’দিন পেরিয়ে যাবার পরও বিক্রি না হলে সংরক্ষণের অভাবে ও পরিবেশ দূষণের ভয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। মাদরাসায় গরীব, এতিম শিক্ষার্থীরা প্রতিবছরের মতো এবারও নিজেরা ভ্যান-রিকশা ভাড়া করে ৮০০টি ছাগল ও ১০০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিল। দাম পাবার আশায় নিজেরা কিছু লবণ কিনে সংরক্ষণের চেষ্টা করেছিল। এজন্য তাদের ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু চামড়ার দাম না থাকায় কোথাও বিক্রি করতে না পেরে প্রতিবাদ জানিয়ে সেগুলো কবরস্থ করেছে। এ সংবাদ শুনে সেখানকার এক টি.এন.ও-র মন্তব্য হলো- ‘মাদরাসার লোকেরা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য’ চামড়াগুলোর কবর দিয়েছে! এমন একটি অর্থনৈতিক ক্রান্তির বিষয়কে নিয়ে সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন দায়সারা কথা বলতে পারেন তা জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয়। বিসিএস পাশ করা একজন কর্মকর্তা যখন এমন অর্বাচীন কথা বলে পার পেতে চান তখন বলার কিছুই থাকে না। চামড়াগুলো যদি এখন পর্যন্ত খোলা জায়গায় থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতো তাহলে তিনি নিজে কী করতেন?

আজকাল সবকিছুকে তাচ্ছিল্য করে দেখা, মন্তব্য করা আমাদের মজ্জাগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক মন্ত্রী সেদিন ডেঙ্গু নিয়ে বললেন- দেশের উন্নতি হচ্ছে তাই ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। কোনো দেশের উন্নতি হলে ডেঙ্গু ছড়ায় এটাও অবিবেচকের মত বচন বৈ কি? সুষম উন্নতি হলে জনদুর্ভোগ কমে। আর অপরিকল্পিত, অসম উন্নয়ন হলে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়। যেমন, ঈদুল আযহার পূর্বে হঠাৎ করে ভঙ্গুর রেল লাইনের মধ্যে কয়েকটি নতুন ঈদ স্পেশাল ট্রেন চালানোর ঘোষণা দেয়া হলো। অর্থাৎ একটি চালু নির্ধারিত ট্রেনের সময়সূচিকে বাধাগ্রস্ত করে আরেকটি উপযাজক ট্রেন উড়ে এসে জুড়ে বসলো। ফলে সব ট্রেনের সময়সূচিতে হট্টগোল বেধে গিয়ে এক মহা বিপর্যয়ের ও বিড়ম্বনার ঈদ যাত্রা দেশবাসী উৎকণ্ঠার সাথে প্রত্যক্ষ করলো। এখানেও সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার অভাব। এভাবে হঠাৎ ব্যতিক্রমী উন্নয়ন ভাবনা আমাদের স্বাভাবিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে জনদুর্ভোগ তৈরি করছে, যা নি:সন্দেহে তাদের জনপ্রিয়তাকে কমিয়ে দিচ্ছে।

কিছুদিন আগে কিছু আনাড়ি কর্মকর্তাদের দেখা গেছে ধান ক্ষেতের পাশে পাজেরো থামিয়ে দলবল নিয়ে উপযাচক হয়ে কৃষকদের ধান কেটে দিতে। কেউ কেউ হাটে গিয়ে দু’একদিন ধান কিনে পত্রিকার শিরোনামও হয়েছেন। তাতে কি ধানের দাম এক পয়সা বেড়েছে? প্রান্তিক কৃষকরা কি কোন প্রকারে লাভবান হয়েছে? ধান ক্ষেতে আগুন দেয়াকে কেউ কেউ গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। শেয়ার বাজারের ধ্বসকে অদৃশ্য হাতের কারসাজি বলেছেন। ডেঙ্গুর মৃত্যু সংখ্যা নিয়ে এখনও সরকারি ও বেসরকারি সংখ্যার মধ্যে বিরাট অমিল। আগামী সেপ্টেম্বর মাস নাকি ডেঙ্গু জ্বরের পিক সিজন! ২০১৮ সালে আগস্ট মাসে ১৭৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। অথচ এবারের আগস্ট মাসের ১৪ দিন না পেরুতেই ২৬ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কীটপতঙ্গের জীবাণু নিয়ে গবেষণা করেন এমন একজন সহযোগী অধ্যাপক জানালেন- ডেঙ্গু জীবাণুর ক্যাটাগরি ও চরিত্র বদল হয়েছে। সি এবং ডি ক্যাটাগরিতে সাধারণ ওষুধের বিপরীতে ওদের ক্ষমতা বেড়ে গিয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তাই ডেঙ্গুরোগ প্রতিকারে আমাদের নিত্যনতুন গবেষণা চালানো প্রয়োজন। এ বিষয়ে শুধু বাক্যবাগিশ না হয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নতুন করে ব্যবহারিক গবেষণায় মনোযোগী হতে বলেছেন তিনি। এজন্য বিশেষ তহবিল গঠনও জরুরী। এই মানবিক বিপর্যয়কে এড়াতে হলে সবাইকে জরুরী ভিত্তিতে কাজে নেমে পড়তে হবে।

ডেঙ্গুরোগ যেমন আমাদের চেতনাকে মানবিক পর্যায়ে নাড়া দিয়েছে ঠিক তেমনি কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কারসাজি ও দুরবস্থার সাম্প্রতিক চিত্রগুলো আমাদের অর্থনীতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিকে নাড়া দিয়েছে। একটি পত্রিকা উল্লেখ করেছে- ‘এতিম গরীবদের হক মেরে দিল চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট’। ঢাকার মহাখালীর এক মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা আওলাদ হোসেন জানিয়েছেন, সে এলাকার মানুষ কোরবানির চামড়া মাদরাসার ফান্ডে দেন। চামড়া বিক্রির এই টাকা এতিম ও দরিদ্র শিশুদের পড়াশুনা ও খাবারের খাতে খরচ করা হয়। দেশে সুনামগঞ্জ ও মহাখালীতেই শুধু নয়-এ ধরণের হাজার হাজার বেসরকারি সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এতিম, অসহায়, অবহেলিত শিশু শিক্ষার্থীরা কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে পড়াশুনা ও খাবারের খরচ মিটিয়ে থাকে।

অপরদিকে চট্টগ্রামে একলক্ষ চামড়া রাস্তা থেকে বর্জ্য হিসেবে তুলে নিয়ে গেছে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা। আমার এক সহকর্মী বলেছেন তিনি তাঁর কোরবানির চামড়াটিকে বরাবরের মত বাসার দারোয়ানকে দান করেছিলেন। কিন্তু দারোয়ান কোথাও সেটার সুব্যবস্থা করতে না পেরে কোন এক পুকুরে নিক্ষেপ করে এসেছে। পত্রিকায় জানা গেল ট্যানারিগুলোতে গতবছরের কোরবানির চামড়া এখনও অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এর কারণ কী? জুতা, ব্যাগ, পোল্ট্রি ফিড ইত্যাদি বানানো ছাড়া চামড়ার কি আর কোন বিকল্প ব্যবহার নেই? এতদিন বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলেও এখন কীজন্য সেটা অর্জিত হচ্ছেনা? সেটা ভেবে দেখার বিষয়। বিদেশে পশু শিং ও চামড়ার বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। আমাদের দেশেও সেটার ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। জাপানের কুমামোতো জেলার ঐতিহ্যবাহী দামী স্যুপ জাতীয় খাবার তৈরি হয় গরুর ‘নাইজো’ অর্থাৎ ভুঁড়ির কালো খসখসে অংশটা দিয়ে ও ঢাক-ঢোল বানানো হয় চামড়া দিয়ে। আমাদের দেশেও চামড়া দিয়ে নানা বাদ্যযন্ত্র বানানো হয়। দেশের পটুয়াখালীতে বিভিন্ন এলাকায় গরুর মাথার চামড়া দিয়ে এক ধরনের রান্নার প্রচলন রয়েছে যা বিভিন্ন পদের ও স্বাদের। এছাড়া গরুর চামড়া দিয়ে এক ধরনের সুস্বাদু শুকনো আচার তৈরি করা যায় এবং সংরক্ষণ করে বছরব্যাপী খাওয়া যায়। কাঁচা চামড়া রফতানি করলে দেশের নব সম্প্রসারিত ট্যানারি প্রকল্পসহ এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প ধ্বংস হবে এবং ট্যানারি শ্রমিকেরা কর্মহীন হয়ে পড়বে।

এ বছর কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা শুরুর আগে আড়তদারদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করেননি ট্যানারি মালিকগণ। বিএইচএসএমএ-সভাপতি জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকগণ এ বছর ব্যাংকের নিকট থেকে ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েও আড়তদারদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করেননি। এজন্য একটি ট্যানারির বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও হয়েছে। ঐ ট্যানারি মালিক আদালতে টাকা প্রদানের অঙ্গীকারনামায় সই প্রদান করলেও এখন পর্যন্ত টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে। ট্যানারি মালিকদের কারণে গত দু'বছর লোকসানে পড়ে মৌসুমি সৌখিন চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার ভয়ে চামড়া কিনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে মাঠে নামেননি। ফলে ক্রেতা সংকটে চামড়ার দাম শূন্য হয়ে বিড়ম্বনা ও চরম সংকটে রূপ নিয়েছে।

গত বছর ট্যানারি মালিকেরা ঈদের সময় আড়তদারদের বকেয়া ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিলেন। এবার তারা মাত্র ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা দিয়েছেন। ফলে বাজারে নগদ অর্থ সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া আড়তদাররা ব্যাংকের নিকট থেকে কোনো অর্থ সহায়তা পাননি। এটাও আমাদের অর্থনীতির ওপর কালো থাবা। দেশের জনস্বাস্থ্যের বর্তমানে ক্রান্তিকাল চলছে। তার ওপর পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান। এমতাবস্থায় দেশের এককালের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি আয়ের উৎস চামড়া শিল্পকে সিন্ডিকেটের কালো থাবা থেকে বাঁচানো জরুরি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অসহায়, এতিম শিশু শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা এবং গরীব, দুঃস্থ, দুখী মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা জরুরি। পাহাড় সমান লাভ করার লোভ, প্রতারণার সিন্ডিকেট বানিয়ে কারসাজি করে যারা মানুষকে কষ্ট দেন, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করার কাজে লিপ্ত থাকেন তাদের ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে ও এতিম, অসহায়, অবহেলিত শিশু শিক্ষার্থীদের দুরবস্থা সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে এসে সহায়তা করতে হবে।


*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র