Barta24

রোববার, ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

তাহলে গ্রামগুলো ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হবে কি?

তাহলে গ্রামগুলো ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হবে কি?
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম/ছবি: বার্তা২৪
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম


  • Font increase
  • Font Decrease

গ্রামে জন্ম নেয়ায় এর ওপর আমার বেশ মায়া। ছাত্রজীবনে দু’দিনের ছুটি থাকলেই ঢাকা থেকে ট্রেনে চেপে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতাম। এখন আর হয়ে ওঠে না। এবার অনেকদিন পর গ্রামে বেড়াতে গেলাম। কিন্তু রাতেই আমাকে কর্মস্থলে ফিরে যেতে হবে। একজন মুরুব্বী কিছুটা ক্ষোভের স্বরে বললেন- বেশ কিছুদিন যাবৎ শুনতে পাচ্ছি- আমাদের গ্রামগুলো শহর হয়ে যাবে। খুশির সংবাদ। তাহলে তোমাকে আর অজপাড়াগাঁয়ে ক্ষণিকের জন্য বেড়াতে আসার প্রয়োজন হবে না। তাঁর কথাগুলোতে বেশ মায়ার আব্দার লক্ষ্য করলাম। অগত্যা তাঁর কাছে দু:খ প্রকাশ করে এ যাত্রায় ক্ষমা চাইলাম। ভাবলাম, গ্রামগুলো যদি সত্যিই শহর হয়ে যেত তাহলে তো ভালই হতো। কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভব?

শিশুকালে আদর্শগ্রামের কথা শুনেছি। বিদেশে পড়াশুনার সময় ‘স্মার্ট ভিলেজের’ কথা শুনেছি। কিন্তু এখন জানলাম আমাদের দেশের গ্রামগুলো শহর হয়ে যাবে। আদতে কি তাই? মনে হয় সেটা নয়। গ্রাম থাকতেই হবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে পার্থক্যকে বুঝতে হেবে। আসলে গ্রামে সব ধরণের আধুনিক নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা করে দায়িত্বরত কর্মীবাহিনীকে গ্রামমুখী করা ও গ্রামের মানুষকে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করে দেয়াটাই আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

আমাদের দেশে গ্রামের মানুষ উচ্চশিক্ষিত হলেই জীবিকার তাগিদে শহরে চলে যায়। আর গ্রামে ফিরে আসে না। এমনকি জেলা বা বিভাগীয় শহরও নয় -সবার লক্ষ্য ঢাকায় বসতি গড়া। কারণ, ঢাকায় দেশের সব নাগরিক সুবিধাদি হিজিবিজি করে হলেও ঘণীভুত হয়েছে! একবার কেউ সেখানে ঢুকলে আর বের হতে চান না। এভাবেই ঢাকাকে জন-গণভারে, ইট-সুরকিভারে, অলি-গলিতে যানজট ভারে নূব্জ্য করে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে। আজ তাই ঢাকাকে পৃথিবীর সবচে’ বড় বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঠেলে দেয়া হয়েছে।

এজন্য শহরের মানুষকে গ্রামে ফিরে যাবার ও যারা এখনও গ্রামেই আছেন তাদেরকে সেখানেই থেকে যাবার কৌশল হাতে নেয়া বিশেষ প্রয়োজন। এই কৌশলতো বহুবছর ধরেই চলছে। কার্যকরী হয়নি কেন? এর প্রধান কারণ, দুর্নীতি।

আমরা জানি, সেবা খাতে কর্মরত কাউকে ঢাকা থেকে বদলি করলেই শুরু হয় উচ্চ পর্যায়ের তদবির। তাদের হাত অনেক লম্বা। অনেক অর্থ খরচ করে বদলি ঠেকিয়ে গর্ব করে বলেন -–আমার বস খুব ভালো মানুষ। বস্ ভালো মানুষ হলে ঘুষ নাই বা বললাম, তদবিরের কাড়ি কাড়ি অবৈধ অর্থ কার পকেটে গেল? এভাবে গ্রামের স্কুলে ভালো শিক্ষক নেই, হাসপাতালে ভালো ডাক্তার নেই, গ্রামের রাস্তায় ভালো গাড়ি নেই, আলো নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই। এমনকি ভালো জনপ্রতিনিধিরাও রাতে গ্রামের নিজ বাড়িতে না ঘুমিয়ে শহরে রাত কাটান। কারণ, গ্রামের বড়িতে রয়েছে চোর-ডাকাত ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা। এভাবে গ্রাম থেকে যাচ্ছে চরম অবহেলিত।

তাইতো দরকার হচ্ছে একটি ‘স্মার্ট ভিলেজের’। যেটা - গ্রামের স্থিত শক্তি, সম্পদ ও ঐতিহ্যকে সামাজিক ও প্রযুক্তিগতভাবে চিহ্নিত ও পুনরুজ্জীবিত (Revitalizing rural wealth, energy and heritage through social and digital innovation ) করা, নতুন সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেয়।

এজন্য গ্রামের শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানবসম্পদকে আধুনিক জ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করে দেশের কেন্দ্র তথা বহি:বিশ্বের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করা। এসব কাজের জন্য দায়িত্বশীল সব সেক্টরের কর্মকর্তা- কর্মচারী, মেন্টর, সমাজবিদ, রাজনীতিবিদগণকে গ্রামে থেকে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা আশু প্রয়োজন। এটা কেন? সেজন্য একটি গ্রামের অভিজ্ঞতার কথা বলি।

আমাদের গ্রামের নাম হিরামানিক। কোন ভণিতা নয়- সত্যিই এটাই এর নাম। গ্রামটি খুব সুন্দর। এই গ্রামে আমার পিতা ১৯৬৬ সালে তাঁর পৈত্রিক ভিটা থেকে একটু দূরে নিজের উদ্যোগে চারটি কুঁড়েঘর দিয়ে একটি নতুন বাড়ি নির্মান করেছিলেন। সেই বাড়িতে আমাদের পরিবারের প্রথম নতুন মানব শিশু হিসেবে আমার জন্মলাভ হয়েছে ১৯৬৭ সালে। সেখানেই আমার শৈশব- কৈশোরের স্মৃতি। আমার অনেক খেলার সাথী ছিল। একসংগে গোল্লাছুট খেলতাম, সাঁতার কাটতাম ও ডারকি দিয়ে মাছ ধরতাম। তাদের দু’একজন সেখানেই আছে। বাকীরা জীবিকার তাগিদে কেউ শহরে কেউবা আমাদেরকে কাঁদিয়ে বেহেশ্তে চলে গেছেন। এতদিনে সেই জন্মঘর বিলীন হয়ে সেখানে নতুন পাকাঘর হয়েছে, পিচঢালা রাস্তা, পাকা স্কুলঘর, বিজলি বাতি, ডিশ টিভি সবকিছু হয়েছে। আধুনিক পরিবর্তনের ছোয়াঁয় শিক্ষা, নিত্যনতুন যানবাহন, ব্যবসায়িক ভাবনা জেঁকে বসেছে গ্রামের মানুষের মধ্যে।

কিন্তু বিরাট দূরত্ব দেখলাম সবার মধ্যে। দিনের বেলা সবাই খুব ব্যস্ত। কেউ কেউ রাতেও। আগেকার দিনে রাতে কেউ কাজ করতো না। এখন বাধ্য হয়ে করতে হয়। আর কাজ বলতে গ্রামের হাট দোকানদারী করা, রিক্সা, আটোরিক্সা চালানো ইত্যাদি। সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এসব দিয়ে অতিরিক্ত আয় করে চাহিদা মেটাতে হয়।

এই গ্রামের জমি খুবই উর্বর। বছরে তিনটি ফসল জন্মে। এখানে অনেক ধনী কৃষক আছেন। অনেকের অনেক জমি, কারো সামান্য কৃষিজমি আছে আবার অনেকের কৃষি জমি নেই। কেউ অন্যের জমিতে চাষাবাদকরে ও কেউবা দিনমজুর। কারো কৃষিজমি, চাকুরী ও কারো বিভিন্নধরণের ছোট ব্যবসা আছে।গ্রামের সবাই সবাইকে নাম বললেই চিনতে পারেন। স্মরণাতীত কাল থেকে এ গ্রামের মানুষজন সহজ-সরল ও একে অপরের সুখ-দু:খের সাথী।

এই গ্রামে অনেক অসুস্থ মানুষ আছে, নির্ভরশীল বয়স্ক বেশি। উঠতি বয়সের যুবকরা এখন কেরাম খেলে, মোবাইল টিপে। কেউ গান-বাজনা করে, পয়সা দিয়ে ডাব্বু খেলে।

এখানে চারটি মসজিদ ও একটি মন্দির আছে। সম্প্রতি আরো দু’টি নতুন মসজিদ হয়েছে। এখানে কোন কুটির শিল্প নেই, তামাকের ব্যাপক আবাদ হলেও ওখানে কোনো বিড়ির কারখানাও নেই। এখানে সিজেনাল বেকার অনেক। মহিলারা এনজিও থেকে লোন নেয়, তবুও আয় তেমন নাই। বেশি রোজগারের আশায় বড় শহরের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে অনেক পরিবার।

তাই অনেক বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা। কোনো কোনো বাড়িতে বয়স্ক পুরুষ মানুষ নেই। কয়েকজন ভিক্ষুক আছেন। কর্মজীবি শ্রমজীবি স্বল্প শিক্ষিত ও স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষগুলো অনেকেই গার্মেন্টস কারখানায় অথবা রিক্সা, অটোরিক্সা চালানোর জন্য ঢাকায় চলে গেছে। বর্তমানে মানুষের ব্যস্ততার কারণে পরস্পরের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে।

আমাদের গ্রাম শহর হোক তা চাই না। কারণ, গ্রামটি শহর হলে কার লাভ হবে? ধনীদের লাভ হবে। গ্রামের প্রকৃতির বিনাশ হবে। ধনীদের বাড়িতে আরো পাকা ঘর হবে। ধনীদের গাড়ি হবে, রাস্তায় যানজট হবে। শব্দ দূষণ, বায়ুদূষণ, পরিবেশদূষণ হবে।শহরের মানুষগুলো ঘরের মধ্যে বসে টিভি, ভিডিও দেখে সময় কাটাবে। কেউ কারো বাড়িতে যাবে না। বাচ্চারা ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলে কাটাবে। বাইরের মাঠে হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট খেলতে যাবে না।

আমাদের গ্রামের মত অনেক সুন্দর সুন্দর গ্রাম ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও অন্যান্য বড় শহরের আশেপাশেই আছে। যেসকল গ্রাম থেকে মাত্র এক ঘন্টায় একশ’/ দু’শ কি.মি. পাড়ি দিয়ে বড় শহরগুলোতে যাতায়ত করা যায়। তাহলে বড় শহরে অযথা রাত যাপনের দরকার কি? শহরে থেকে যদি এ্যাম্বুলেন্সে বসে জ্যামে পড়ে দু'ঘন্টায় হাসপাতালে পৌঁছুতে না পারি তবে সেই শহরে থাকার দরকার আছে কি? আমার স্মার্ট গ্রামে বা সেই গ্রাম থেকে আধা বা একঘন্টার দূরত্বেই যদি একটি ভালমানের হাসপাতাল তৈরি হয়ে যায় তাহলে কেন বড় শহরে ফ্লাটবাড়ি কেনার চিন্তা করছি?

তাই আমার গ্রাম শহর নয় আপাতত: গ্রামই থাকুক। শহর নয়। দরকার একেকটি স্মার্ট ভিলেজের। গ্রামের মানুষগুলো সবাই শিক্ষিত হোক। তবে সবাই শিক্ষিত হয়ে তারা যেন শহরে পালিয়ে না যায়। জীবিকার তাগিদে দিনে শহরে যাক বা চাকুরী করতে যাক, রাতে যেন নিজ গাঁয়ে ফিরে এস ঘুমানোর সুযোগ পায়। এটাই আধুনিক স্মার্ট গ্রামের কনসেপ্ট।

টোকিও বা নিউইয়র্ক শহরে প্রতিদিন বহু মানুষ গ্রাম থেকে আসে। সারাদিন কাজ করে সন্ধায় নিজ নজি গ্রামের শান্তিময় আবাসে ফিরে গিয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে। একে বলা হয় 'ডেইলী প্যাসেঞ্জারী সিস্টেম।’ এই সিস্টেমে বাস নয়- সস্তায় নন-স্টপেজ সরকারি ট্রেন চলে শহর থেকে গ্রামে। বিশ্বের প্রায় সকল উন্নত দেশে কর্মজীবি মানুষেরা দু’শ/ তিনশ’ কি.মি. পাড়ি দিয়ে গ্রাম থেকে বড় বড় শহরে আসতে পারে। এভাবে তারা বড় বড় শহরের ট্রাফিকজ্যাম সমস্যাকে কাটাতে পেরেছে।

আর আমরা? পুরনো ঢাকার বাসিন্দাদের কথা তো জানেন। তারা বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষের ব্যবসা আঁকড়ে ধরে ঘিঞ্জির মধ্যেই বাস করতে পছন্দ করেন। এমনকি ভয়ংকর কেমিক্যালের গুদামের ওপর মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়তে তাঁদের বাধে না !

ঢাকা ও বড় বড় শহরে যদি দু’শ/ তিনশ’ কি.মি. পাড়ি দিয়ে গ্রাম থেকে আসা যায় তবে সেখানে রাতে থেকে যাওয়ার বিড়ম্বনা কেন? টোকিও বিশ্বের সবচে’ জনবহুল শহর। সেখানে রাতে ক’জন নিজের বাসায় ঘুমায়?
মাটির নিচে ও উপরে সরকারি বেসরকারি মিলে কমপক্ষে ষোলটি কোম্পানীর ট্রেন চলে। প্রতি মিনিটে প্লাটফর্মে ট্রেন ঢুকে পড়ে। টোকিওর পাশের সব জেলাগুলো থেকে মাত্র ত্রিশ মিনিট বা সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে টোকিওর প্রাণকেন্দ্রে পৌছানো যায়। কোনো কোনো স্কাই ট্রেন বড় বড় অফিস ভবনের বারান্দায় এসে স্টপেজ দেয় অর্থাৎ সেটাই রেল স্টেশন! কারো সময়ের কোন অপচয় হয় না। আবার কোন স্মার্টগ্র্রামের রেল স্টেশনের কাছেই তার বাড়ি। অথবা প্রিপেইড বা ফ্রি গ্যারেজ। যেখান থেকে নিজ গাড়িতে ৫-১০ মিনিটে সুন্দর ছিমছাম নিজ বাড়িতে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। পরিবারসহ হাতে রান্না করে খেয়ে শান্তিতে ঘুমানো যায়।

আর আমরা? ঢাকাতেই স্কাইক্রেপার বিল্ডিং তৈরি করে বসবাস করছি। সবাই গাড়ি কিনছি! অফিসের সময় হলে সবাই তাড়াহুরো করে রাস্তায় নেমে জ্যামের মধ্যে বসে গাড়ির তেল পুড়ে অফিসের সময় পার করে দিচ্ছি। এত ভয়ংকর যানজট থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন নতুন গাড়ি কেনার জন্য লাইসেন্স ইস্যু করছি!

তাই শহরের ট্রাফিকজ্যাম কমাতে আমাদের গ্রামটি স্মার্ট ভিলেজ হোক। এজন্য যত ধরণের ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োজন সেগুলোর ব্যবহার হোক। গ্রামকে শহর বানানো নয়- গ্রামে সব ধরণের নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা করা হোক। বড় বড় শহরের সাথে সহজে এবং দ্রুততম সময়ে রেল যোগাযোগ, স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ, ফ্রি ইন্টারনেট, ভাল ডাক্তারসহ উন্নত চিকিৎসা সেবা, বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষালয় ও মেধাবী শিক্ষক, দারিদ্র, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল এবং কুটির শিল্প ও কৃষিতে উৎপাদিত পণ্য‌্য নির্ধারিত মূল্যে বিক্রয়ের নিশ্চয়তা দিলে প্রতিটি গ্রামের ঐতিহ্য ফিরে আসবে। গ্রামের গরীব মানুষ আর পেটের দায়ে শহরে স্থানান্তরিত হবে না। এটার বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়োজন। তাই আমাদের গ্রামটি আশু একটি ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হোক।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

সবার জামিন হয়ে যায়। এই সবাই কারা? শুনে মনে হয় অনেক মানুষ। একটি মহল্লায়, একটি গ্রামে, একটি শহরে কতো মানুষই তো থাকে। তাহলে সবাই বলতে কি মহল্লার সব মানুষের কথা বলা হচ্ছে? গ্রাম-শহরের মানুষও নিশ্চয়ই এই গোনার মধ্যে আছে। সবাই মানে তো অসংখ্য। তাহলে জামিন হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের।

আচ্ছা জামিন মানে কী? অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া, নাকি অপরাধ প্রমাণের আগ পর্যন্ত মুক্ত বাতাসে চলাচল করার স্বাধীনতা? এমনও তো হতে পারে জামিন মানে কাউকে পরোয়া না করার দাম্ভিকতা। মহল্লা, গ্রাম, শহরের সবাই কি অপরাধী? কারণ শুরুতেই যে বলা হয়েছে, সবাই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। কে দিল এই খবর? টিনে বারি দিয়ে মহল্লা, গ্রাম, শহরে খবর ছড়াচ্ছে কে, সবার যে জামিন হচ্ছে? মানুষ। হুম, মানুষ তার দুঃখের কথা জানাচ্ছে। মানুষ তার অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছে। তাহলে এই যে বলা হলো সবাই, সেখানে কি মানুষ নেই?

সবাই বলতে তো অগণিত, অসংখ্য বোঝায়, সেখানে মানুষ থাকবে না কেন? মানুষেরা নির্বাসনে গেছে? এমন সংবাদই পাওয়া যাচ্ছে। যাবে না কেন? মহল্লার দু’পায়ের যে প্রাণী পাশের বাড়ির শিশুকে জমির লোভে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল, সে এখন শীষ বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দু’পায়ের দল গ্রামের কিশোরীকে ধর্ষণ করার পরেও হুঙ্কার থামায়নি। নতুন কিশোরী তাদের নজরে। চাকায় মানুষ পিষে ফেলে ছিল যে, তাকে এখনও দেখা যায় রঙিন কাঁচের আড়ালে শীতাতাপ মোটর যানে। আগুনে পুড়ে গেল কতো প্রিয় মুখ। পুড়িয়ে মারলো যে সংঘ, তারা আষাঢ়ে ক্ষমতার রোদ পোহায়।

মানুষ নামে আছে যে বিলুপ্ত প্রায় সম্প্রদায়, তারা ক্রমশ গুহাবাসী হয়ে পড়ছে। কোনোভাবে মুখ বের করে দেখছে- কোথাও কোনো অপরাধ নেই। যেহেতু অপরাধ নেই, তাই সবাই শরতের রোদ্দুর দেখছে। আগাম হৈমন্তী হাওয়া শরীরে মাখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মহল্লায় তাদের সালিশে ডাকবে কে, গ্রামে সালিশ বসানোর মুরোদ কার, আর শহর? রঙিলা শহরের নকশাকার তো ওই ওরাই। যাদের জামিন হয়ে যায়। সংখ্যায় ওরা লঘিষ্ঠই ছিল। ক্রমশ ওরা নদর্মার কালো জলের মতো বুদঁ বুঁদ ছড়াতে থাকে। সেই ছোট একটি বুঁদ বুঁদের উৎস থেকে তৈরি হয়েছে কালো জলের জলাশয়। সেই জলও নাকি কালো নয়। সেই জলের দুর্গন্ধেরও নাকি সুবাস আছে। মহল্লা, গ্রাম, শহরে সেই গল্পের বয়ান চলছে। কাগজের জাদুর পরশে কালো সাদা হয়ে যাচ্ছে। অপরাধী সুবোধ হয়ে যাচ্ছে। সুবোধকে দেওয়া হচ্ছে অপরাধীর বেশ।

ওদের জামিন হয়ে যাচ্ছে বলে রাতের বাঁদুরও ভয়ে আছে। নেকড়েরা মহল্লা, গ্রাম, শহর ছেড়েছে। কিন্তু গুটিকয় সেই মানুষেরা? ওরা নির্বসানে যাবে কোথায়, গোলকে এমন কোনো ভূখণ্ড আছে, ব-দ্বীপে এমন আছে কোনো শুদ্ধ জমিন? যেখানে মানুষ মিশে যেতে পারবে দোঁ-আশের সঙ্গে? মানুষ এক আশ্চর্য প্রাণ। কি মহাকাশ, মহাকাল সমান ধৈর্য্য তার। আবার তার গরিষ্ঠ হবার সাধ।

জামিন যাদের হচ্ছে হোক না। কতোদূর যাবে ওরা, পোড়াবে, নষ্ট করবে কতোটা? মানুষ জানে সেই দু’পায়ের প্রাণীদের মুরোদ। ওদের আত্মমৃত্যুর উৎসব সন্নিকটে। মহাকার লাখ প্রাণীর মতোই, মহাদানব এই দু’পায়ের অপরাধীরা বিলুপ্ত হবেই। সবাই, অসংখ্য বলতে আসলে মানুষই সত্য। ক্ষুদ্র শুধু জামিন পেয়ে যাওয়ার দল। ওদের আসলে জামিনের সুযোগ নেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র