Barta24

বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬

English

সড়কে মৃত্যুর মিছিল ও পরিবহন সিন্ডিকেটের শৃঙ্খল

সড়কে মৃত্যুর মিছিল ও পরিবহন সিন্ডিকেটের শৃঙ্খল
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তা২৪
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান


  • Font increase
  • Font Decrease

গত ১৯ মার্চ ২০১৯ সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর ছাত্র আবরার রাজধানী ঢাকার নর্দ্দায় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে বাস চাপায় নিহত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ওঠার জন্য জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের অদক্ষ চালক তাকে চাপা দেয়। পুলিশের তথ্য মতে, শাহজাদপুরের বাঁশতলা এলাকায় এক পথচারী নারীকে ধাক্কা দিয়ে পালানোর সময় বাসটি এই দুর্ঘটনা ঘটায়।

এছাড়া গত ২৯ জুলাই ২০১৮ শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া ও আর আগে গত ২১ জুলাই, ২০১৮ নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির আহত ছাত্র পায়েলকেও পানিতে নির্মমভাবে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে পরিবহন শ্রমিক।

দুই

প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সবিহীন মানুষের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়া আর মানুষ খুন করার জন্য অস্ত্র তুলে দেওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অথচ সেই কাজটিই অবলীলায় করে থাকে বেশ কিছু সিন্ডিকেটের সহায়তায় বিআরটিএ এবং পরিবহন মালিকেরা। দালাল, অসাধু কর্মকর্তা, সুবিধাভোগী সিন্ডিকেট মালিক-শ্রমিকের প্রভাব জেঁকে বসেছে বিআরটিএ’র ঘাড়ে।

৩০ জুন, ২০১৮ পর্যন্ত নিবন্ধিত ৩৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬২০টি যানবাহনের বিপরীতে লাইসেন্সধারী চালক আছেন ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৮১৬ জন। যার অর্থ দাঁড়ায় দেশের ১৬ লাখেরও বেশি চালকের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্সই নেই (৯ আগস্ট ২০১৮, ভোরের কাগজ)। এ দায়ভার কার?

একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। সে কান্না একদিকে যেমন স্বজন হারানো পরিবারের তেমনি অন্যদিকে পরিবহন মালিকের। স্বাভাবিকভাবেই দুর্ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা যানবাহনটিকে ভেঙে ফেলে, পুড়িয়ে দেয়। কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় পরিবহন মালিকের, রাষ্ট্রের। পরিবহন মালিক মানেই উচ্চবিত্ত কোটিপতি নন। বেশি সুদে ঋণ করে। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি-সম্পদ বিক্রি করে, স্ত্রী, পরিবারের স্বজনদের গহনা বিক্রি করে, বন্ধক রেখে কোটি টাকার পরিবহন রাস্তায় নামায় সংসার পরিচালনার জন্য।

অথচ প্রত্যেক দুর্ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যানবাহনটি বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মালিক সর্বস্বান্ত হন। সেই মালিকদের যেখানে অধিকমাত্রায় সচেতন থাকার কথা ছিল, তারাও যাচাই-বাছাই ছাড়াই অদক্ষ একজনের হাতে গাড়ি তুলে দিয়ে নিজের জন্য দুর্ভাগ্য ডেকে আনেন। সড়ক নিরাপদ হলে সবার আগে তো মালিক-শ্রমিকেরই লাভ। সেটা নতুন করে তাদেরকে ভাবতে হবে। অবাক করা বিষয় হলো, সারাদেশ জুড়ে পরিবহন সেক্টরের বহুমুখী ক্ষমতাশালী সিন্ডিকেটের কাছে রাষ্ট্রযন্ত্র যেন শৃঙ্খলিত বলে মনে হয়।

তিন

গত বছর নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের সময় ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দুইটি সংবাদ সম্মেলন থেকে বেশ কিছু অসাধারণ বিষয় উঠে এসেছে। যেমন:

(১) ঢাকা শহরের পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে ৩০-৩৫ শতাংশ মাদকাসক্ত (যদিও বাস্তবে আরেও বেশি)।

(২) বাস ভাঙচুর করা ও সম্পূর্ণভাবে জ্বালিয়ে দেওয়ার ভয়ে নিরাপত্তাহীনতার কারণে মালিকরা গাড়ি নামাতে নিষেধ করেন।

(৩) বাস মালিকেরা পরিবহন শ্রমিকদের কাছে একরকম জিম্মি।

(৪) বেশ কিছু মালিক পরিবহন শ্রমিকদের চুক্তিতে বাস চালাতে দেওয়ায় বেশি মুনাফার জন্য বাসগুলো সড়কে রেষারেষির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় (০৪ আগস্ট ২০১৮, প্রথম আলো)।

(৫) সড়ক পরিবহন আইনকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক কর্তৃক বাধ্যতামূলকভাবে মান্য করা ।

(৬) যে কোম্পানি চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো বন্ধ করবে না কিংবা আইন মানবে না সমিতির আওতায় হলে তার লাইসেন্স বাতিল করার জন্য সমিতি সুপারিশসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।

(৭) প্রতিটি বাস টার্মিনালে গাড়ি ফিটনেস সনদ, চালকের লাইসেন্স সমিতি অব্যাহত অভিযানের মাধ্যমে চেক করবে এবং কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে তাকে চলতে দেওয়া হবে না।

(৮) চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো বন্ধ করতে সড়কের পাশে টিকিট কাউন্টারের ব্যবস্থা রাখার জন্য সিটি করপোরেশনকে আহ্বান জানাবে (৮ আগস্ট ২০১৮, ভোরের কাগজ।)।

এগুলোর কোনোটিরই তারা নিজেরা বাস্তবায়ন করেছে বলে মনে হয় না।

চার

এখানে বেশ কিছু বিষয় ভেবে দেখা দরকার। যেমন:

(ক) অনেক দুর্নাম নিয়ে পরিচালিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কে সময়ের প্রয়োজনে গঠনমূলকভাবে আমূল পরিবর্তন করা এবং নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী সকল সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া জরুরি।

(খ) যানবাহনগুলোতে অতিরিক্ত যে ভাড়া আদায় করা হয় তা বন্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা ও তার সঠিক বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি।

(গ) গাড়ির চালক নির্বাচনে পরিবহন মালিককে অধিকমাত্রায় সচেতন হতে হবে।

(ঘ) বয়স্ক নাগরিক ও প্রতিবন্ধী জনগণকে সম্পূর্ণ ফ্রি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সারা বাংলাদেশে অর্ধেক ভাড়া নির্ধারণ করা জরুরি ।

(ঙ) পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকের সমন্বয়ে ‘বিশেষ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ টিম’ ঢাকাসহ সকল বিভাগীয় শহর এবং হাইওয়েগুলোতে কাজ করলে অনেক উপকার হবে।

(চ) সড়কের পাশে পথচারীদের জন্য দখলমুক্ত, পার্কিংমুক্ত উন্মুক্ত ফুটপাত দরকার।

(ছ) সড়কের ব্রিজগুলোতে টোল আদায়ের বিকল্প সম্মানজনক পথ বের করা জরুরি।

(জ) পথে পথে পরিবহনে চাঁদাবাজি, যাত্রী হয়রানি বন্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

(ঝ) চালকসহ অন্যান্য শ্রমিকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করাসহ পর্যাপ্ত বিশ্রামের মানবিক ব্যবস্থা করা এবং দূরপাল্লার যাত্রায় অবশ্যই দুইজন চালক রাখা দরকার।

চোখ বন্ধ করলে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন, মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সদ্য প্রয়াত ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক ছাড়া যানজট ও সড়ক পথের দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে আর তেমন কাউকে সরব হতে দেখা যায়নি কখনো। পারস্পরিক দোষারোপ না করে পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং যাত্রী হিসাবে জনগণকে নিজেদের ভুল-ক্রটি সম্পর্কে অবগত ও সচেতন হতে হবে।

অনেক সময় পরিবহন শ্রমিকও ‘ট্রাফিক সিগনাল’ এবং সড়ক আইন মান্য করে না । মান্য করলে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হওয়ার সময় আবরারকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হত না। ভুক্তভোগী পরিবারকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া; নিরাপদ সড়ক, পরিবহন ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা; সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা এবং সকলকে তা বাধ্যতামূলকভাবে মান্য করা সময়ের দাবি।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :

ঐতিহাসিক ভুলের খণ্ডন নাকি অন্য কিছু?

ঐতিহাসিক ভুলের খণ্ডন নাকি অন্য কিছু?
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

কাশ্মীর নিয়ে ভারতের পদক্ষেপের পর পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে না বললেও ভারতের সঙ্গে সকল প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে। ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক সভায় তারা ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনারকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি নয়াদিল্লীতে নিযুক্ত তাদের সকল কূটনীতিককে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এর বাইরে তারা ভারতের সঙ্গে সকল প্রকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোকে স্থগিত করেছে।

আগামী মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় তারা বিষয়টিকে আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এখানে সঙ্গত কারণেই বলে রাখা ভাল যে, পাকিস্তানের তরফ থেকে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আসবে জেনেই কিন্তু ভারত অনেক ভেবেচিন্তে কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি এখন একদিকে যেমন ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়, অন্যদিকে মুক্তিকামী মানুষের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে বড় বাধা বিবেচনায় একটি আন্তর্জাতিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। তবে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতার বিবেচনায় এমনটা আশা করার সুযোগ নেই যে ভারতের ওপর কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান হতে পারে।

আইনগতভাবে কাশ্মীর এখন আর রাজ্য নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি বিশেষ অঞ্চল। ১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র- এই তিনটি বিষয় বাদে বাদবাকি সকল বিষয়ে কাশ্মীরের সরকারকে দেওয়া সকল ক্ষমতা বাতিল হয়ে গেল গত ৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের এক স্বাক্ষরে। প্রশ্ন হচ্ছে সংবিধানের একটি বিশেষ ধারা কীভাবে কেবল রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে বাতিল হয়ে গেল। এর উত্তর হচ্ছে যখন এই বিশেষ ধারাটি সংযোজন করা হয় তখনই এর সঙ্গে এটিকে একটি অস্থায়ী প্রভিশন হিসেবে বর্ণনা করে রাষ্ট্রপতি যখনই চাইবেন তখনই তা বিলুপ্ত করতে পারবেন বলে শর্ত দেয়া হয়েছিল। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ৬৯ বছর পর রাষ্ট্রপতি তা বাতিল করলেন মাত্র। তবে বিষয়টিকে যেভাবে সরল অংকের মতো করে বর্ণনা করা হল, বাস্তবে এটি এমন সরল ছিল না কখনো। বিগত প্রায় ৭০ বছর এমনকি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে ভারতের কোনো সরকার কখনো কাশ্মীরকে একীভূত করাতো দূরে থাক সেখানকার স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল জনদাবি সামাল দিতেই সবসময় ব্যস্ত সময় অতিক্রম করেছে।

বিজেপি তথা ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং এর পরবর্তী দেশের রাজনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া থেকে বিষয়টি অনুমান করা কঠিন নয় যে তাদের বহু প্রতীক্ষিত একটি চাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে। সেই সঙ্গে বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আগের চাইতেও ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভের বিষয়টি এখন অনেকটা স্পষ্ট। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে তারা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিল যে জয়লাভ করে আবার সরকার গঠন করতে পারলে তারা বিতর্কিত ৩৭০ ধারা অবলুপ্তি করবে। এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই ৩৭০ ধারাটি এখানে ভারতে রাজনীতিবিদদের অনেকের কাছেই ‘বিতর্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত। এর সঙ্গে ৩৫ উপধারার সন্নিবেশের মধ্য দিয়ে অপরাপর রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে যা নেই কাশ্মীরের ক্ষেত্রে এসবের সন্নিবেশন, যেমন আলাদা পতাকা, নিজস্ব আইন, অপরাপর অঞ্চলের অধিবাসীদের সেখানে স্থায়ী বাসিন্দা হবার ক্ষেত্রে বাধা, চাকরির ক্ষেত্রে অন্যান্যদের প্রবেশাধিকারে প্রতিবন্ধকতা ইত্যাকার সকল বিষয় আসলে কাশ্মীরকে সকলের কাছেই চক্ষুশূল করে রেখেছিল। তবে দিন দিন ধরে বিষয়টি এভাবে চলতে থাকা এবং কাশ্মীর নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সিদ্ধান্তহীনতা বিষয়টিকে এমন এক জটিলতার আবর্তে বন্দি করে রেখেছে যে এটা নিয়ে সহজে কোন যুক্তিগ্রাহ্য সমাধান পাওয়া দুরূহ।

এ কথা ঠিক যে ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কাশ্মীরের মুক্তিকামী মানুষের জন্য বুমেরাং হবে এবং তাদের মুক্তির সংগ্রামকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে, একই সঙ্গে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে অর্থাৎ এই বিশেষ মর্যাদার সঠিক ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে কাশ্মীর, সেটাকেও কি একেবারে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেয়া যায়। আবার এই প্রশ্নও এসে যায়, এই ব্যর্থতার আসল কারণগুলো কি? এসব কিছুর মূলে ভারত সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ, মহারাজা হরি সিং এর সাথে সম্পাদিত চুক্তির প্রতিশ্রুতির যথাযথ বাস্তবায়ন না করা ইত্যাকার বিষয় এবং পরবর্তীতে এসবের মধ্যে পাকিস্তানের ঢুকে পড়া, কাশ্মীর নিয়ে ভরত এবং পাকিস্তানের মধ্যে দুবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, এর বাইরেও বিভিন্ন সময় ছোটখাট সংঘাত- এই সব কিছু মিলে জল এতটা ঘোলা হয়েছে যে দিন যতই গেছে, পরিস্থিতি ততই জটিল আকার ধারণ করেছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কি হতে পারত সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান? এক্ষেত্রে এতসব ঘটনার ব্যাপকতায় এমন কোন গ্রহণযোগ্য সমাধান কেউ দিতে পারেননি।

ইতিহাসবিদ ড: কিংশুক চ্যাটার্জি বলছেন, 'ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশনের মাধ্যমে কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ঠিকই,কিন্তু যে শর্তে হয়েছিল কালক্রমে ভারত তা থেকে অনেকটা সরে এসেছে। পাকিস্তানও কতকটা জোর করেই এই অ্যারেঞ্জমেন্টের মধ্যে প্রবেশ করেছে। ফলে সাতচল্লিশে এই সমস্যার শুরু হলেও এখন সেই সমস্যা অনেক বেশি জটিল আকার নিয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'এখন কাশ্মীর সমস্যার এমন কোনো পর্ব নেই যেখানে ফিরে গিয়ে আমরা বলতে পারি এখান থেকে সমস্যাটা আবার 'রিসেট' করা যাক! আজ যদি কাশ্মীরে গণভোট হয় কিংবা পাকিস্তান তাদের দিকের কাশ্মীর থেকে সরে যায় - তাতে কোনও সমস্যার আদৌ সমাধান হবে বলে মনে হয় না।'

দীর্ঘদিনের এই সমস্যার জন্য কাশ্মীরের শেষ যুবরাজ করণ সিং অনেকটাই দোষ চাপিয়েছেন ভারত সরকারের ওপর। তার মতে, 'যেদিন আমার বাবা সেই চুক্তিতে সই করেন সেদিন থেকেই জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ২৭ অক্টোবর তারিখে সেদিন আমি নিজেও ওই ঘরে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মহারাজা হরি সিং কিন্তু প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও বৈদেশিক সম্পর্ক - শুধু এই তিনটি ক্ষেত্রে ভারতভুক্তি স্বীকার করেছিলেন,নিজের রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে পুরোপুরি মিশিয়ে দেননি। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীরকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।'

সঙ্গত কারণেই ভারতের এই হঠাৎ আচরণ শান্তিপ্রিয় মানুষকে হতাশ করলেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং কাশ্মীরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের দিকে লক্ষ্য করলে ভারতের এই সিদ্ধান্তকে কি খুব একটা অপ্রাসঙ্গিক বলার সুযোগ রয়েছে? বিশেষ মর্যাদার নামে কাশ্মীরে যে ধরণের অচলাবস্থা বিরাজ করছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে যেভাবে প্রতিনিয়ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এবং এর থেকে প্রতিবেশী পাকিস্তান এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ছে এই সবকিছুই কিন্তু দিনে দিনে ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। কাশ্মীরের এই অচলাবস্থার পথ ধরে ভারতের অপরাপর অঞ্চলগুলোতেও অস্থিরতার বিস্তার যেন রোধ করা যায় সেসব বিবেচনায় নরেন্দ্র মোদির এই পদক্ষেপ। এখানে এটাও সত্য হিসেবে মানতে হবে যে এই পদক্ষেপ নিয়ে নরেন্দ্র মোদি নিজেকে সত্যিকার অর্থে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি যদি জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখকে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে যথার্থভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হন তবে যেমন ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করবেন, আবার অন্যদিকে কাশ্মীরের জনরোষ এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকি যদি নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হয় তবে তা একপর্যায়ে বড় ধরণের সংঘাত এমনকি পাক ভারত উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। শুরু হয়ে যেতে পারে আরেকটি বড় যুদ্ধ, যার ভয়াবহতা অতীতের যে কোন সময়কে অতিক্রম করে যেতে পারে। আর এমনটা হলে এর সকল দায়ভারও কিন্তু মোদির ঘাড়েই পড়বে।

লেখক: ফরিদুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চামড়া কারসাজিতে খর্বিত কোরবানিদাতা ও দুঃস্থ-এতিমের অধিকার

চামড়া কারসাজিতে খর্বিত কোরবানিদাতা ও দুঃস্থ-এতিমের অধিকার
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

গত আট দিন যাবৎ পত্রিকার পাতা উল্টাতেই কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কারসাজি ও দুরবস্থার সংবাদগুলো খুব ব্যথিত করছে। কারণ আমাদের অর্থনীতিতে এর প্রভাব যেমন শঙ্কাজনক ও সমাজনীতিতে তেমনই মর্মস্পর্শী। এই দ্বিবিধ শঙ্কার মধ্যে বাংলাদেশ হাইড এন্ড স্কিন মার্চেন্টস এসোসিয়েশন (বিএইচএসএমএ)-এর সভাপতি জানালেন এই সংকট সৃষ্টির জন্য সিংহভাগ দায়ী দেশের ট্যানারিমালিকগণ। এ বিষয়টিকে শুধু দুঃখজনক বললে ভুল হবে। এর পেছনের গভীর বিষয়গুলোকে দেশের স্বার্থে খুবই মনোযোগের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার আমলে নেয়া উচিত।

ঈদের শেষে সুনামগঞ্জের সৈয়দপুর গ্রামে এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সংগৃহীত চামড়াগুলো দু’দিন পেরিয়ে যাবার পরও বিক্রি না হলে সংরক্ষণের অভাবে ও পরিবেশ দূষণের ভয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। মাদরাসায় গরীব, এতিম শিক্ষার্থীরা প্রতিবছরের মতো এবারও নিজেরা ভ্যান-রিকশা ভাড়া করে ৮০০টি ছাগল ও ১০০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিল। দাম পাবার আশায় নিজেরা কিছু লবণ কিনে সংরক্ষণের চেষ্টা করেছিল। এজন্য তাদের ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু চামড়ার দাম না থাকায় কোথাও বিক্রি করতে না পেরে প্রতিবাদ জানিয়ে সেগুলো কবরস্থ করেছে। এ সংবাদ শুনে সেখানকার এক টি.এন.ও-র মন্তব্য হলো- ‘মাদরাসার লোকেরা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য’ চামড়াগুলোর কবর দিয়েছে! এমন একটি অর্থনৈতিক ক্রান্তির বিষয়কে নিয়ে সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন দায়সারা কথা বলতে পারেন তা জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয়। বিসিএস পাশ করা একজন কর্মকর্তা যখন এমন অর্বাচীন কথা বলে পার পেতে চান তখন বলার কিছুই থাকে না। চামড়াগুলো যদি এখন পর্যন্ত খোলা জায়গায় থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতো তাহলে তিনি নিজে কী করতেন?

আজকাল সবকিছুকে তাচ্ছিল্য করে দেখা, মন্তব্য করা আমাদের মজ্জাগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক মন্ত্রী সেদিন ডেঙ্গু নিয়ে বললেন- দেশের উন্নতি হচ্ছে তাই ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। কোনো দেশের উন্নতি হলে ডেঙ্গু ছড়ায় এটাও অবিবেচকের মত বচন বৈ কি? সুষম উন্নতি হলে জনদুর্ভোগ কমে। আর অপরিকল্পিত, অসম উন্নয়ন হলে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়। যেমন, ঈদুল আযহার পূর্বে হঠাৎ করে ভঙ্গুর রেল লাইনের মধ্যে কয়েকটি নতুন ঈদ স্পেশাল ট্রেন চালানোর ঘোষণা দেয়া হলো। অর্থাৎ একটি চালু নির্ধারিত ট্রেনের সময়সূচিকে বাধাগ্রস্ত করে আরেকটি উপযাজক ট্রেন উড়ে এসে জুড়ে বসলো। ফলে সব ট্রেনের সময়সূচিতে হট্টগোল বেধে গিয়ে এক মহা বিপর্যয়ের ও বিড়ম্বনার ঈদ যাত্রা দেশবাসী উৎকণ্ঠার সাথে প্রত্যক্ষ করলো। এখানেও সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার অভাব। এভাবে হঠাৎ ব্যতিক্রমী উন্নয়ন ভাবনা আমাদের স্বাভাবিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে জনদুর্ভোগ তৈরি করছে, যা নি:সন্দেহে তাদের জনপ্রিয়তাকে কমিয়ে দিচ্ছে।

কিছুদিন আগে কিছু আনাড়ি কর্মকর্তাদের দেখা গেছে ধান ক্ষেতের পাশে পাজেরো থামিয়ে দলবল নিয়ে উপযাচক হয়ে কৃষকদের ধান কেটে দিতে। কেউ কেউ হাটে গিয়ে দু’একদিন ধান কিনে পত্রিকার শিরোনামও হয়েছেন। তাতে কি ধানের দাম এক পয়সা বেড়েছে? প্রান্তিক কৃষকরা কি কোন প্রকারে লাভবান হয়েছে? ধান ক্ষেতে আগুন দেয়াকে কেউ কেউ গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। শেয়ার বাজারের ধ্বসকে অদৃশ্য হাতের কারসাজি বলেছেন। ডেঙ্গুর মৃত্যু সংখ্যা নিয়ে এখনও সরকারি ও বেসরকারি সংখ্যার মধ্যে বিরাট অমিল। আগামী সেপ্টেম্বর মাস নাকি ডেঙ্গু জ্বরের পিক সিজন! ২০১৮ সালে আগস্ট মাসে ১৭৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। অথচ এবারের আগস্ট মাসের ১৪ দিন না পেরুতেই ২৬ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কীটপতঙ্গের জীবাণু নিয়ে গবেষণা করেন এমন একজন সহযোগী অধ্যাপক জানালেন- ডেঙ্গু জীবাণুর ক্যাটাগরি ও চরিত্র বদল হয়েছে। সি এবং ডি ক্যাটাগরিতে সাধারণ ওষুধের বিপরীতে ওদের ক্ষমতা বেড়ে গিয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তাই ডেঙ্গুরোগ প্রতিকারে আমাদের নিত্যনতুন গবেষণা চালানো প্রয়োজন। এ বিষয়ে শুধু বাক্যবাগিশ না হয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নতুন করে ব্যবহারিক গবেষণায় মনোযোগী হতে বলেছেন তিনি। এজন্য বিশেষ তহবিল গঠনও জরুরী। এই মানবিক বিপর্যয়কে এড়াতে হলে সবাইকে জরুরী ভিত্তিতে কাজে নেমে পড়তে হবে।

ডেঙ্গুরোগ যেমন আমাদের চেতনাকে মানবিক পর্যায়ে নাড়া দিয়েছে ঠিক তেমনি কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কারসাজি ও দুরবস্থার সাম্প্রতিক চিত্রগুলো আমাদের অর্থনীতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিকে নাড়া দিয়েছে। একটি পত্রিকা উল্লেখ করেছে- ‘এতিম গরীবদের হক মেরে দিল চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট’। ঢাকার মহাখালীর এক মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা আওলাদ হোসেন জানিয়েছেন, সে এলাকার মানুষ কোরবানির চামড়া মাদরাসার ফান্ডে দেন। চামড়া বিক্রির এই টাকা এতিম ও দরিদ্র শিশুদের পড়াশুনা ও খাবারের খাতে খরচ করা হয়। দেশে সুনামগঞ্জ ও মহাখালীতেই শুধু নয়-এ ধরণের হাজার হাজার বেসরকারি সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এতিম, অসহায়, অবহেলিত শিশু শিক্ষার্থীরা কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে পড়াশুনা ও খাবারের খরচ মিটিয়ে থাকে।

অপরদিকে চট্টগ্রামে একলক্ষ চামড়া রাস্তা থেকে বর্জ্য হিসেবে তুলে নিয়ে গেছে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা। আমার এক সহকর্মী বলেছেন তিনি তাঁর কোরবানির চামড়াটিকে বরাবরের মত বাসার দারোয়ানকে দান করেছিলেন। কিন্তু দারোয়ান কোথাও সেটার সুব্যবস্থা করতে না পেরে কোন এক পুকুরে নিক্ষেপ করে এসেছে। পত্রিকায় জানা গেল ট্যানারিগুলোতে গতবছরের কোরবানির চামড়া এখনও অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এর কারণ কী? জুতা, ব্যাগ, পোল্ট্রি ফিড ইত্যাদি বানানো ছাড়া চামড়ার কি আর কোন বিকল্প ব্যবহার নেই? এতদিন বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলেও এখন কীজন্য সেটা অর্জিত হচ্ছেনা? সেটা ভেবে দেখার বিষয়। বিদেশে পশু শিং ও চামড়ার বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। আমাদের দেশেও সেটার ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। জাপানের কুমামোতো জেলার ঐতিহ্যবাহী দামী স্যুপ জাতীয় খাবার তৈরি হয় গরুর ‘নাইজো’ অর্থাৎ ভুঁড়ির কালো খসখসে অংশটা দিয়ে ও ঢাক-ঢোল বানানো হয় চামড়া দিয়ে। আমাদের দেশেও চামড়া দিয়ে নানা বাদ্যযন্ত্র বানানো হয়। দেশের পটুয়াখালীতে বিভিন্ন এলাকায় গরুর মাথার চামড়া দিয়ে এক ধরনের রান্নার প্রচলন রয়েছে যা বিভিন্ন পদের ও স্বাদের। এছাড়া গরুর চামড়া দিয়ে এক ধরনের সুস্বাদু শুকনো আচার তৈরি করা যায় এবং সংরক্ষণ করে বছরব্যাপী খাওয়া যায়। কাঁচা চামড়া রফতানি করলে দেশের নব সম্প্রসারিত ট্যানারি প্রকল্পসহ এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প ধ্বংস হবে এবং ট্যানারি শ্রমিকেরা কর্মহীন হয়ে পড়বে।

এ বছর কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা শুরুর আগে আড়তদারদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করেননি ট্যানারি মালিকগণ। বিএইচএসএমএ-সভাপতি জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকগণ এ বছর ব্যাংকের নিকট থেকে ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েও আড়তদারদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করেননি। এজন্য একটি ট্যানারির বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও হয়েছে। ঐ ট্যানারি মালিক আদালতে টাকা প্রদানের অঙ্গীকারনামায় সই প্রদান করলেও এখন পর্যন্ত টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে। ট্যানারি মালিকদের কারণে গত দু'বছর লোকসানে পড়ে মৌসুমি সৌখিন চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার ভয়ে চামড়া কিনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে মাঠে নামেননি। ফলে ক্রেতা সংকটে চামড়ার দাম শূন্য হয়ে বিড়ম্বনা ও চরম সংকটে রূপ নিয়েছে।

গত বছর ট্যানারি মালিকেরা ঈদের সময় আড়তদারদের বকেয়া ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিলেন। এবার তারা মাত্র ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা দিয়েছেন। ফলে বাজারে নগদ অর্থ সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া আড়তদাররা ব্যাংকের নিকট থেকে কোনো অর্থ সহায়তা পাননি। এটাও আমাদের অর্থনীতির ওপর কালো থাবা। দেশের জনস্বাস্থ্যের বর্তমানে ক্রান্তিকাল চলছে। তার ওপর পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান। এমতাবস্থায় দেশের এককালের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি আয়ের উৎস চামড়া শিল্পকে সিন্ডিকেটের কালো থাবা থেকে বাঁচানো জরুরি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অসহায়, এতিম শিশু শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা এবং গরীব, দুঃস্থ, দুখী মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা জরুরি। পাহাড় সমান লাভ করার লোভ, প্রতারণার সিন্ডিকেট বানিয়ে কারসাজি করে যারা মানুষকে কষ্ট দেন, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করার কাজে লিপ্ত থাকেন তাদের ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে ও এতিম, অসহায়, অবহেলিত শিশু শিক্ষার্থীদের দুরবস্থা সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে এসে সহায়তা করতে হবে।


*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র