Alexa

স্বাধীনতার ৪৮ বছর ও আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন

স্বাধীনতার ৪৮ বছর ও আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন

এম. এ. মাসুম, ছবি: বার্তা২৪

রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনার সেই গৌরব ও অহংকারের দিন ২৬ মার্চ। দিনটি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪৮ বছর উদযাপন করছে। বিগত ৪৮ বছরে দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক পট পরিবর্তন হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশকে অতিক্রম করতে হয়েছে অনেক বাঁধা প্রতিবন্ধকতা।

স্বাধীনতার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ উপাধি দিয়েছিলেন। অর্থনীতিবিদ ইউস্ট ফাল্যান্ড ও জন পাকির্নসন বলেছিলেন, বাংলাদেশে যদি কিছু উন্নয়ন ঘটে তবে পৃথিবীর যেকোনো দেশে উন্নয়ন ঘটতে পারে।

গত ৪৮ বছরে বাংলাদেশের মানুষের উদ্ভাবনী চিন্তা চেতনার বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু মৃত্যুহার, মাতৃ মৃত্যুহার, দারিদ্র্য বিমোচন, আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক শ্রমবাজার, জননিরাপত্তা, সামাজিক উন্নয়ন, জীবন মানের উন্নয়ন ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭২-৭৩ অর্থ-বছরে দেশের মোট জাতীয় বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৬০০ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৫ কোটি টাকায়। এর মধ্যে রাজস্ব আয় ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। ১৯৭২ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ৮৮ শতাংশ সেখানে বর্তমানে গড়ে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। ১৯৭১ সালে মাত্র ৭ কোটি মানুষের জন্য ৪০ শতাংশ খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো আর বর্তমানে ১৬ কোটি মানুষের দেশে বলতে গেলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, বিদেশ থেকে তেমন আমদানি করতে হয় না। ১৯৭২ সালে দেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১২৯ ডলার বর্তমানে তা ১ হাজার ৭৫১ এ উন্নীত হয়েছে। ৫০১ কোটি টাকা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বর্তমানে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ১৯৭২ সালে মাত্র ২৫টি পণ্যে রফতানির পরিমাণ ছিল ৩৪ কোটি মার্কিন ডলার যা গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে রেমিট্যান্স ছিল ১৬ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার যা সাড়ে চার দশকে বেড়েছে কয়েক শ’গুণ, আর গত এক দশকে বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ। বর্তমান সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৭৩ মিলিয়ন ডলার যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। গত এক দশকে সরকারি বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। ২০১৮-১৯ অর্থ-বছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ এসেছে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বে নজির স্থাপন করেছে। বিশ্বের উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশের তালিকায় বাংলাদেশে স্থান করে নিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ২০০৯-১০ অর্থ-বছর থেকে ২০১৪-১৫ অর্থ-বছর পর্যন্ত ৬ শতাংশের ওপরে ছিল। অন্যদিকে ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে যথাক্রমে ৭ দশমিক ১১, ৭ দশমিক ২৮ এবং ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে সেসাথে মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৯০৯ ডলারে।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার গল্পটা শুধু এগিয়েই যাচ্ছে, পেছন ফিরে তাকানোর সময় নেই। দেশে এখন অনেকগুলো মেগা প্রকল্প পুরো দমে এগিয়ে চলেছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দেশ তথ্য প্রযুক্তি খাতে বলতে গেলে নিরব বিল্পব ঘটে গেছে। দেশের ১৬ কোটি মানুষের হাতে পোঁছে গেছে ১৩ কোটি মোবাইল সিম। বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেক বেশি ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর। এ খাতে লাখ লাখ তরুণ তরুণীর ক্রমাগত নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ’বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ মহাকাশে উৎক্ষেপণ হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের সব মানুষ যোগাযোগ ও সম্প্রচার সুবিধার আওতায় আসবে। দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবিচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে স্যাটেলাইটের বর্ধিত ফ্রিকোয়েন্সি ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব হবে।

দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতি দেশ। স্বাধীনতার পর গত ৪৭ বছরে দেশের জনসংখ্যা ৭ কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ১৬ কোটিতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে চরম দারিদ্রের হার ১৫ দশমিক ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বর্তমানে ২ কোটি ৪৪ লাখ মানুষ চরম দরিদ্র্য।

তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ বিপ্লব ঘটিয়েছে। ১৯৮২ সালে গার্মেন্টস কারখানা ছিল মাত্র ৪২টি, ১৯৮৫ সালে তা ৩৮৪টি তে দাঁড়ায় এবং এ খাতে কাজ করে ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক। ২০১৮ সালে কারখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫৬০টি, শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি যার মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী, সেই সাথে রফতানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬১ কোটি ৪৮ লাখ ডলারে। মোট রফতানির ৮৩ দশমিক ৫ শতাংশই তৈরি পোষাক। বর্তমানে তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে। সেই সাথে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটির বেশি মানুষ কাজ করছেন এবং তারা ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স প্রেরণ করেছেন যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

দারিদ্র্য জয়ের পাশাপশি বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও এগিয়েছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের প্রাথমিক স্বীকৃতি মিলেছে। সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাদান প্রতিষ্ঠান হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন (এইচএসবিসি) গ্লোবাল রিসার্চের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সালে বাংলাদেশ ১৬ ধাপ এগিয়ে হবে বিশ্বের ২৬তম অর্থনীতির দেশ, এখন যে অবস্থানে আছে অস্ট্রিয়া।

বর্তমানে জিডিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির ৪২তম দেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পরবর্তী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। তার পরের পাঁচ বছর গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৭ শতাংশ হারে। সব মিলিয়ে আগামী এক যুগে দেশে গড়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মতামত থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের মতো এত বেশি হারে প্রবৃদ্ধি আর কোনো দেশের হবে না।

অর্থনীতির নানা সূচকে বাংলাদেশ চোখে পড়ার মতো সাফল্য দেখালেও বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি তা নিষ্প্রভ করে দিচ্ছে। দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ বেকার। দারিদ্র, অনাহার, জীবনযাত্রার নিম্নমানের কথা আলোচনা হলে বাংলাদেশের নাম উঠে আসে। এদেশের এখনো প্রায় ৩ কোটি মানুষ হতদরিদ্র্য যারা দারিদ্রের কঠিন বৃত্ত থেকে কোনোভাবেই বেড়িয়ে আসতে পারছে না।

এদেশের অনেক অঞ্চলে এখনও দারিদ্র্য মানুষের সংখ্যা ৬০ শতাংশের বেশি। লাখ লাখ পথশিশু প্রতিদিনই খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়। দারিদ্র্যের কারণে লাখ লাখ শিশু নূন্যতম শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না এবং অনেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে। অন্যদিকে দেশে ধনী দরিদ্র্যের বৈষম্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, বর্তমানে অতি ধনীর সংখ্যার তালিকায় হত দরিদ্র্য এই বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম স্থানে অবস্থান করছে। দেশের বহু সংখ্যক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণে জর্জরিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। সেই সাথে রয়েছে দুর্নীতির ব্যপক বিস্তৃতি ও সুশাসনের অভাব।

বঙ্গবন্ধু সুখি, সমৃদ্ধশালী, দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছেন। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে অনেক অর্জন হলেও লক্ষ্য পূরণে আরো বহু পথ বাকি আছে। দেশের রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, পেশাজীবী, তরুণ, যুবক, কৃষক, শ্রমিকসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সমন্বিতভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে তাহলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

এম. এ. মাসুম: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

আপনার মতামত লিখুন :