দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই

ড. মাহফুজ পারভেজ
ড. মাহফুজ পারভেজ

ড. মাহফুজ পারভেজ

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রায়ই অপরাধমূল কাজের বিচার দাবি করার সময় বলা হয় 'দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই'। পাশবিক ও বর্বরোচিত অপরাধ বা রোমহর্ষক নির্যাতনের প্রতিবিধান চাইতে গিয়ে এমন দাবি উচ্চারিত হয়।

কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বলতে কী বোঝায়? কোন কোন শাস্তি দৃষ্টান্তমূলক বলে গণ্য হয়? কেনই বা এমন শাস্তির দাবি ওঠে?

এসব প্রশ্ন মনে এলো ফেনীর পাষণ্ড শিক্ষক অধ্যক্ষ (এ পদের যোগ্য নয় মোটেও) সিরাজ-উদ-দৌলা কর্তৃক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি ও আগুনে পুড়িয়ে মারার অপচেষ্টার খবরগুলো পড়ে। যে ছাত্রী এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। জীবনের বিপন্নতম পরিস্থিতিতে মেয়েটিকে এখন ঢাকায় লাইফ সাপোর্ট থেকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার কথা হচ্ছে।

অধ্যক্ষ নামধারী পাশবিকতায় আকীর্ণ লোকটির অতীত অপকর্মের যে ফিরিস্তি বার্তা২৪.কমের রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, তাতে হেন অপর্কম করতে তার বাকি নেই। নৈতিক স্খলনের যাবতীয় উপাদানে ঠাঁসা তার পেশাজীবন। চেক জালিয়াতি, শিশু নির্যাতন, যৌন নিগ্রহের জন্য একাধিকবার জেল খেটেও লোকটি দমেননি। কুপ্রবৃত্তি নিয়ে আরও অপরাধ করেছেন। একটি মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়েছেন মৃত্যুমুখে।

 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/09/1554791032668.gif
অগ্নিদগ্ধ ছাত্রী/ছবি: সংগৃহীত

 

এমন একটি জঘন্য লোক কেমন করে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হন? তাও প্রতিষ্ঠানটি একটি পবিত্র ধর্মের নামে পরিচালিত! যেসব পরিচালকরা এমন পাষণ্ডকে বছরের পর বছর পুষেছেন, পৃষ্ঠপোষকতা ও মদদ দিয়েছেন, তারাই তো এ অপরাধীর নেপথ্য বা প্রচ্ছন্ন দোসর। আশকারা না পেলে অধ্যক্ষের সাধ্য ছিল না একের পর এক অপরাধ করার।

এই মেয়েটি প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় অধ্যক্ষের অপরাধ সামনে চলে এসেছে। নইলে কে জানতো এসব? মেয়েটি মারা গেলে হয়ত দুর্ঘটনা বা আত্মহনন বলে চালিয়ে দেওয়া হতো। অতএব সেই কুলাঙ্গার শিক্ষক ও পরিচালকদের আইনের আওতায় আনা হোক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবসা ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প চালিয়ে নিরীহ শিক্ষার্থীদের নিপীড়ন, নির্যাতন ও যৌন সম্ভোগের পাত্রে পরিণত করার ক্ষমতা ও অধিকার তাদের কে দিলো? এসবের জবাবদিহিতা সংশ্লিষ্ট সবাইকেই করতে হবে।

শুধু ফেনী নয়, সর্বত্রই জবাবদিহিতার প্রয়োজন রয়েছে। কেননা, লক্ষ্য করলেই দেখা যাচ্ছে, ব্যাঙের ছাতার মতো শহর-নগরের আনাচে-কানাচে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা তৈরি হচ্ছে। কে তাদের লাইসেন্স দিচ্ছে? কে তাদের যোগ্যতা ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল করছে? কি পড়ানো হচ্ছে? ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে? এসব প্রশ্ন খতিয়ে দেখা দরকার।

শিশু-কিশোরের অধিকার ও মনস্তত্ত্ব নিষ্কলুষ না থাকলে তার পরবর্তী জীবন ভয়াবহ হবে। অতীত ও শৈশবের ট্রমা বা ক্ষতে জর্জরিত হয়ে সে হবে মানসিক অসুস্থ কিংবা বিকৃত মানুষ। তাই সবার চোখের সামনে শিক্ষা দেওয়ার আড়ালে শিশু-কিশোরদের নিয়ে এহেন অপকর্ম চলতে দেওয়া যায় না।

আইন, জবাবদিহিতা, নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সরকারকে এসব সমস্যা ও অনাচার দূর করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/09/1554790484337.gif
অভিযুক্ত সিরাজ-উদ-দৌলা/ছবি: সংগৃহীত

 

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি মানে এমন শাস্তিই হওয়া উচিত, যে শাস্তি দেখে বা শুনে অপরাপর অপরাধীদের হৃৎকম্পন শুরু হয়। প্রচলিত আইনের আওতায় কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না থাকলে আইনের সংশোধন ও সংস্কার করে তা সংযোজন করা হোক এবং অন্ধভাবে দল-মত-পক্ষ-বিপক্ষ না দেখে সে আইন প্রয়োগ করা হোক।

বিশেষত মাদক, হত্যা, শিশু ও নারী নির্যাতন, মানব পাচার, অমানবিক শ্রম ও দাসত্বে বাধ্যকরণ, পাশবিকতা ও যৌন পীড়ন, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ইত্যাদি চরম অপরাধের জন্য চরম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য কাম্য নয়।

রাজনৈতিক বিবেচনা ও পক্ষপাতের কারণে নানা সময় আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে উপযুক্ত শাস্তির বিধান করতে পারে না। কিন্তু যা ভয়াবহ অপরাধ রূপে চিহ্নিত তার ক্ষেত্রে রাজনীতি, দলীয় সংযোগ, আঞ্চলিক ও আত্মীয়তার প্রশ্ন আসতে পারে না। মানুষ ও সমাজকে নিরাপদ ও আইনানুগ ব্যবস্থার মধ্যে রাখতে হলে অপরাধীদের সঙ্গে আপোষ করে তা হবে না। আপোষ ও শৈথিল্য অপরাধকে দিন দিন আরও বাড়াবে এবং অপরাধীরাই সবাইকে অসহায় ও জিম্মি বানিয়ে ফেলবে।

তেমন দুরবস্থা আসার আগেই নাগরিক-সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কঠোরতম পদক্ষেপ নিতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে বিভিন্ন ধরনের পাশবিক কর্মের জন্য দোষী ও অপরাধীদের নির্মূল ও অপরাধচক্র নিশ্চিহ্ন করতে হবে। চারদিকের অবনতিশীল পরিস্থিতি দেখে সবাই এ ব্যাপারে একমত যে অপরাধ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণার এখনই সময়।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম