ব্রেক্সিট সংকটে তেরেসা মে

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪

ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হলেও আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদে এখনো পৌঁছাতে পারেনি যুক্তরাজ্য। ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ এবং বিরোধী লেবার পার্টি উভয়েই গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী এই বিচ্ছেদের পক্ষে থাকলেও, বিচ্ছেদ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ)সম্পর্ক কেমন হবে এবং যুক্তরাজ্যের স্বার্থ কতটুকু সমুন্নত রাখা সম্ভব হবে, এ নিয়ে ইইউ’র সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একাধিক দেনদরবার হলেও এর কোনো খসড়া চুক্তিই হাউজ অব কমন্সের সদস্যদের মনঃপুত না হওয়ায় সংসদে তেরেসা মে’র একের পর এক প্রস্তাব নাকচ হয়ে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে মে’র প্রতি অনাস্থা জানিয়ে তার মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। গত ২৯ মার্চ এই বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও ব্রিটিশ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা সাংসদদের অনৈক্যের কারণে তা সম্ভব হয়নি। মে কয়েকদিন আগে পার্লামেন্ট সদস্যদের উদ্দেশে তার পেশকৃত চুক্তি অনুমোদনের শর্তে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে যেতে তার আগ্রহের কথা জানালেও তার দলসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের পছন্দ হয় এমন কোনো প্রস্তাব তিনি পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

পরিস্থিতি যখন এতটাই টালমাটাল এমন সময় মে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, কথা বলেছেন লেবার দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও। উদ্দেশ্য একটাই, যেকোনোভাবে বিচ্ছেদ বিষয়ক একটি চুক্তি অনুমোদন করিয়ে বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা।

এদিকে ইউরোপীয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্কের কাছে মে’র লেখা এক চিঠিতে সম্ভাব্য মতৈক্যের স্বার্থে ব্রেক্সিট ৩০ জুন পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার অনুরোধের জবাবে ইইউ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে কাউন্সিল ব্রেক্সিটের জন্য যুক্তরাজ্যকে ১২ মাসের একটি নমনীয় সময়ের প্রস্তাব দিতে পারে, যার ফলে মে আরও একবছর এ নিয়ে ইইউ’র সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবেন এবং এই সময়ের মধ্যে মে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিকল্প চুক্তি অনুমোদন করিয়ে নেয়ার সময় পাবেন।

তবে এমনটা করতে হলে ইইউ শীর্ষ পর্যায়ের সভার মাধ্যমে বিষয়টি অনুমোদন করিয়ে নেয়ার প্রয়োজন পড়বে, নয়তো তেরেসা মে’কে বেধে দেয়া হয়েছে ১২ এপ্রিল সময়ের মধ্যে কোনো প্রকার চুক্তি ব্যতিরেকে যুক্তরাজ্যকে ইইউ ত্যাগ করতে হবে। এর মধ্যে তিনি একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছুতে না পারলে ব্রেক্সিটের সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তার ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/10/1554886523995.gif

বিষয়টি যেহেতু এখনো নিশ্চিত নয়, এমন অবস্থায় লেবার পার্টির করবিনের সাথে মে’র বৈঠকের পর জানা গেছে যে তিনি করবিনের একটি প্রস্তাবে সম্মত হতে যাচ্ছেন। এর রেশ ধরে এবার আবার মে তার নিজে দলের রোষানলে পড়েছেন। গত ৪ এপ্রিল ওয়েলস বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং ব্রেক্সিট বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী তার ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করেছেন এর প্রতিবাদ হিসেবে।

সরকার দলীয় সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে এই মর্মে অভিযুক্ত করেছেন যে প্রধানমন্ত্রী এর আগে বহুবার করবিনকে দেশ চালানোয় অযোগ্য ঘোষণার পর এবার তার প্রস্তাবে সম্মত হওয়া মানে তিনি নিজের দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। তারা এই মর্মে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে করবিনের কোনো প্রস্তাবে যদি প্রধানমন্ত্রী সম্মত হন তাহলে আরও ১৫ জন মন্ত্রী ক্যাবিনেট থেকে বের হয়ে যাবেন।

এখন কথা হচ্ছে, ব্রেক্সিটের বিষয়ে জনগণের রায় অনুযায়ী যুক্তরাজ্যের সরকারি এবং বিরোধী দল উভয়েরই সম্মতির পরও কেন বিষয়টি একটি সমাধানে যেতে পারল না। এর উত্তরে একথাই বলতে হয় যে এখানে ইইউ’র বাকি সদস্য রাষ্ট্রসমুহ তাদের সাথে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিনিময়ে ‘ডিভোর্স বিল’ হিসেবে খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার শর্ত হিসেবে কিছু চড়া মূল্য ধার্য করেছে। এক্ষেত্রে অনেক দেনদরবারের পর ইইউ এবং যুক্তরাজ্য সরকার ৫৯৯ পৃষ্ঠার এক খসড়া বিচ্ছেদ চুক্তি তৈরি করেছে। এবার দেখে নেয়া যাক কী রয়েছে এই চুক্তিতে, যা নিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদদের মধ্যে এটি অনুমোদনের প্রশ্নে এত দ্বিধা।

প্রথমত, এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ কার্যকর হতে ২১ মাসের একটি সময়ের কথা বলা হয়েছে এই চুক্তিতে। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাজ্যের জন্য ইইউ’র সকল আইনকানুন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা ইইউ’র সদস্য পদ হারাবে। খসড়া চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে যে উভয়ের সম্মতিতে এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া আরও এক থেকে দুই বছর দীর্ঘায়িত করা যেতে পারে।

বিষয়টিকে এভাবে দেখা হচ্ছে যে তারা বিচ্ছেদের চূড়ান্তকরণের প্রস্তুতি হিসেবে এই সময়টির বিষয়ে একমত হলেও এটি যে আরও দীর্ঘায়িত হবে না এর কোনো নিশ্চয়তা নেই; বরং এই সময়ের মধ্যে ইইউ’র আইনে যদি কোনো প্রকার পরিবর্তন হয় তবে সেটাও যুক্তরাজ্যকে মেনে চলতে হবে অথচ এক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রকার মতামতের মূল্যায়ন থাকবে না।

দ্বিতীয়ত, এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন পড়বে খসড়া বিলে বলা হয়েছে যে এর সম্পূর্ণ যুক্তরাজ্য সরকারকে বহন করতে হবে। যদিও বিলে কোনো নির্দিষ্ট অংকের অর্থের কথা উল্লেখ নেই তবে ধারণা করা হচ্ছে যে চুক্তি স্বাক্ষর পরবর্তী ২১ মাস সময়ে এর জন্য যুক্তরাজ্যকে ৩৯ বিলিয়ন পাউন্ড খরচ করতে হবে। এই অর্থের একটা অংশ হচ্ছে ইইউকে প্রদেয় যুক্তরাজ্যের চাঁদা, যা ২০১৮/১৯ অর্থবছরে ছিল ১০ বিলিয়ন পাউন্ড। যদি বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হয় তবে এই অর্থের পরিমাণ আরও বাড়বে।

আবার চুক্তি স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় যদি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তবে কী ব্যবস্থা গৃহীত হবে তার উল্লেখ না থাকলেও ইউরোপীয় বাজারে তাদের বাণিজ্যের সুযোগ থাকবে না সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

তৃতীয়ত, নাগরিকদের অধিকারের বিষয়ে খসড়া চুক্তিতে বলা হয়েছে বিচ্ছেদ কার্যকরের পরেও ইইউ দেশগুলোতে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিক এবং ব্রিটেনে বসবাসরত ইইউ দেশগুলোর নাগরিকরা তাদের বসবাস এবং সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। যে কোনো ব্যক্তি যদি ৫ বছরের অধিককাল ইইউ দেশে বাস করেন তবে স্থায়ী হিসেবে বাস করার আবেদন করতে পারবেন। এখানে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের দুশ্চিন্তার মূল কারণ হচ্ছে যেহেতু চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাজ্য আইনত ইইউ’র অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো কিছু বলার অধিকার রাখবে না সেক্ষেত্রে ব্রিটেনে বসবাসরত ইইউভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকরা সামাজিক সুরক্ষা পেলেও এসব দেশে বসবাসরত ব্রিটিশরাও তেমন অধিকার পেতে থাকবেন কি না সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।

চতুর্থত, যদি ২০২০ সালের মধ্যে নতুন করে কোনো বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে ঐকমত্য না হয় তবে উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের মধ্যকার সীমান্ত বিষয়ে সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে যাবে এবং ব্রেক্সিটের বিচ্ছেদ বিষয়ক সময়সীমা এক্ষেত্রে যদি বাড়ানো না হয় তবে ইইউ এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যকার একক কাস্টমস ইউনিয়ন বাঁধার মুখে পড়বে।

এখানে উল্লেখ্য যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাথে ইইউ’র কাস্টমস ইউনিয়ন সম্পর্কিত সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বিষয়টি ব্রিটেনের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য হলেও কার্যতঃ এই একক কাস্টমস ইউনিয়ন বহালের নামে ব্রিটেনের জন্য নতুন কাস্টমস শর্ত আরোপিত হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।

পঞ্চমত, খসড়া চুক্তিতে দুই পক্ষের মধ্যে নিজেদের জলসীমায় মৎস্য আহরণ বিষয়ক একটি ভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষেরই একে অন্যের জলসীমায় অবাধে মৎস্য আহরণের অধিকার থাকবে। এখানে উল্লেখ্য যে এক্ষেত্রে ইইউভুক্ত দেশগুলোই কার্যতঃ বেশি লাভবান হবে, কারণ যুক্তরাজ্যের আয়ের খুবই নগণ্য অংশ ইইউভুক্ত দেশে মৎস্য রপ্তানি থেকে আসে।

ষষ্ঠত, খসড়া চুক্তি স্বাক্ষরের পর চূড়ান্ত বিচ্ছেদপূর্ব অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যুক্তরাজ্যকে বিরোধ সম্পর্কিত বিষয়ে ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসের (ইসিজে) সিদ্ধান্ত প্রতিপালন করে যেতে হবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য এবং ইইউ’র মধ্যকার একটি যৌথ সালিশি কমিটি গঠিত হবে। এই কমিটি যদি বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে ব্যর্থ হয় তবে ইসিজে’র সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে কার্যত: ইইউভুক্ত দেশগুলোর সিদ্ধান্তই যুক্তরাজ্যের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা রয়ে গেল।

উপরোক্ত বিষয়গুলোর আলোকে মূলত মে কর্তৃক আনীত প্রস্তাব পার্লামেন্ট বারবার বর্জন করলেও ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত যে যুক্তরাজ্যের জন্য এক বিষফোড়া হয়ে আবির্ভূত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক্ষেত্রে ব্রেক্সিট চুক্তির খসড়া পার্লামেন্টে অনুমোদন করাতে ব্যর্থ হয়ে মে যদি পদত্যাগ করেন, তারপরও এমন আশাবাদের কোনো সুযোগ নেই যে এর চেয়ে ভাল কোনো সমাধান ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী দিতে পারবেন।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।