রোল নম্বর ১৪৯৬১৪

তুষার আবদুল্লাহ
তুষার আবদুল্লাহ/ছবি: বার্তা২৪

তুষার আবদুল্লাহ/ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

রোল নম্বর ১৪৯৬১৪ বড় বোকা ছিল! শরীরে পশুর স্পর্শ সয়ে নিয়ে পরীক্ষার প্রশ্ন জেনে নেয়নি! চায়নি উত্তরপত্রের নম্বর এমনিতেই বেড়ে যাক। কোনো দলের হয়ে স্লোগান দেওয়া শিখে নেয়নি। আলোচনায় আসতে আসেনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লাইভে। তথাকথিত নারী স্বাধীনতার কোনো প্রচারপত্রের লেখক ছিল না ও। মাদরাসায় পড়ুয়া এই রোল নম্বর ঠিকই জেনে গেছিল-নিজের প্রতিবাদ নিজেরই করতে হয়, করতে হবে। রোল নম্বর ১৪৯৬১৪ তাই করেছিল।

যখন তাঁকে নিয়ে লিখছি, তাঁর শরীরে তখন ময়নাতদন্তের কাঁচি। আমি নিশ্চিত কাঁচিও কেঁপে উঠেছে। নতজানু হয়েছে তাঁর কাছে। আমরা অন্ধকার চোখে দেখছি প্রতিবাদ করায় রোল নম্বর ১৪৯৬১৪-কে ঝলসে যেতে হয়েছে। ঝলসানো শরীর এক ফোঁটা পানির জন্য কতো তৃষ্ণার্ত ছিল। বাবার কাছে আকুতি ছিল চুরি করে হলেও এক ফোঁটা পানির। বাবা শেষ মূর্হুতেও চাইছিলেন কন্যা বেঁচে থাকুক। তাই পবিত্র চুরিটিও তিনি করেন নি। রোল নম্বর ১৪৯৬১৪ বিদায় নেয়। কোনো অভিমানে নয়। কোনো পরাজয় মেনে নিয়েও নয়। তাঁর চলে যাওয়া বীরের। সকলে আমরা যখন আপোষ করছি, সন্তানকেও বলছি আপোষ করলেই ফায়দা হবে, সেই মন্দ সময়ে প্রতি নি:শ্বাসে নি:শ্বাসে প্রতিবাদ করে গেছে রোল নম্বর ১৪৯৬১৪।

আমরা হেরে গেছি তাঁর কাছে। তিনি চলে গেলেন বীরের বেশে। এই পরাজিত সমাজে আমরা কেবলই বৃত্তবন্দি হয়ে পড়ছি। নিজ উঠানের বাইরে বেরোতে পারছে না আমাদের চোখ। ফলে আমরা যে ব্যক্তিকে জানি নারীবাদী পরিচয়ে, মানবাধিকার কর্মী বলে যার খ্যাতি, যে সংগঠনগুলো হাউমাউ করে মায়াকান্নায় নোনাজলের সমুদ্র রচনা করে বিশেষ কারো কারো জন্যে, তারা নিশ্চুপ থাকে রোল নম্বর ১৪৯৬১৪-এর মতো আপোষহীনদের বেলায়। কারণ ঐ ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো প্রথমে দেখে নেয় নিজ গোত্রের মধ্যে ঘটনাটি ঘটলো কিনা? যদি গোত্রের বাইরে ঘটে, তবে চোখ বুজে কুম্ভকর্ণের নিদ্রা। অবশ্য সেই নিদ্রার মাঝেও কখনও কখনও পিটপিট করে খেয়াল রাখে – হুজুগের দিন। হুজুগ কোন দিকে যাচ্ছে। স্রোত বুঝে ভাসিয়ে দেয় নিজেকে। এখনও তেমন ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে চৈত্রের ক্লান্ত দুপুরের ঘুমে দেখতে পাচ্ছি।

তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মূলধারার গণমাধ্যম যেভাবে রোল নম্বর ১৪৯৬১৪-র প্রতিবাদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছে, তাঁর চলে যাওয়ার প্রতিবাদ করছে, তাতে ঘুমন্ত মানুষ ও সংগঠনগুলো যেকোনো সময় জেগে উঠতেই পারে। এই জেগে ওঠা আমাকে আশ্বস্ত করে না। কারণ আমি জানি নতুন কোনো বিষয় বা হুজুগ এসে তাদের গন্তব্য বদলে দেবে। যেমনটা তনু ও খাদিজার বেলাতেও ঘটেছিল। তনুর মতোই এবারও মূলধারার গণমাধ্যম একটু অঙ্ক কষেই রোল নম্বর ১৪৯৬১৪-এর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কারণ রোল নম্বরটি একজন মাদরাসা শিক্ষার্থীর। অভিযোগ মাদরাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

গণমাধ্যম, সমাজ, রাষ্ট্র এই অঙ্ক কষায় যতোটা সৃজনশীল হবে, ততোই রোল নম্বর ১৪৯৬১৪-দের বিপন্ন হবার ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে সেই ঝুঁকিকে বুক পেতে প্রতিরোধ করা যায়, জীবন দিয়ে সেই উদাহরণ দেখিয়ে গেলেন রোল নম্বর ১৪৯৬১৪। তিনি হয়তো জীবন দিলেন, যেতে পারে আরো কোনো জীবন। কিন্তু তারপর? রোল নম্বর ১৪৯৬১৪দের নেতৃত্বে আমরা জয়ী হবোই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন