হোক প্রতিবাদ সব অন্যায়ের

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন/ ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রভাষ আমিন/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশে কিছু একটা ঘটলেই আমরা নানা বিচার-বিশ্লেষণ করে পক্ষ নেই, প্রতিবাদেও মিশে থাকে সেই পক্ষপাতিত্বের নিক্তি। কোনো ঘটনার পক্ষ নিলে সেটা আওয়ামী লীগের পক্ষে যাবে না বিপক্ষে, সরকার মাইন্ড করবে না তো, এই ঘটনায় আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করা যাবে কি না, বিএনপি-জামাতকে সাইজ করা যাবে কি না ইত্যাদি নানান বিশ্লেষণ শেষে নিজেদের মাপে মিললেই আমরা বিপ্লবী হই। ঘটনার ন্যায্যতার বিবেচনা আসে পরে, সত্য-মিথ্যা আসে পরে।

২৭ মার্চ মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল সিরাজ-উদ-দৌলা গায়ে হাত দেয়ার ঘটনায় মামলা করে নুসরাত। স্বাভাবিক বিচারে ন্যায়বিচারের দাবিতে সবার নুসরাতের পাশে থাকার কথা। ঘটলো উল্টো ঘটনা। প্রিন্সিপালের মুক্তি চেয়ে মানববন্ধন করলো কিছু কুলাঙ্গার। নুসরাতের পাশে দাঁড়ানোর মত সাহসী লোক মেলেনি সোনাগাজীতে। মামলা করার অপরাধে গত ৬ এপ্রিল যখন দুর্বৃত্তরা নুসরাতের হাত বেধে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, আমি ভেবেছিলাম এবার নুসরাতের পক্ষে তীব্র আন্দোলন হবে।

গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব হলেও আশ্চর্যজনকভাবে নিরব ছিল মাদ্রাসাসংশ্লিষ্টরা। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, অন্যায় মানে অন্যায়। সকল বিবেকবান মানুষকে সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে আমি চাই সংখ্যাগুরুরা বেশি প্রতিবাদ করবে। তবু সংখ্যালঘুরাই প্রতিবাদ করে বেশি। স্কুল শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে তার সহকর্মীরাই সবার আগে রাস্তায় নামে। এমনকি বাসচালকের পক্ষে রাস্তা অচল করে দেয় তার সহচালকরা। নুসরাতের ঘটনায়ই ব্যতিক্রম দেখলাম। ভেবেছিলাম মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সারাদেশ অচল করে দেবে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা যে দেশ অচল করে দিতে পারে, সে প্রমাণ তো তারা আগে রেখেছেন। নুসরাত যেন মাদ্রাসা প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে মামলা করে বিশাল অন্যায় করেছে।  মাদ্রাসার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। তাই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা মুখে কুলুপ এটে বসে আছে। বরং নুসরাত মরে যাওয়ায় যেন হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন তারা। মাদ্রাসায় দিনের পর দিন তারা কী শিখলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ আর নৈতিকতায় কি এই নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ করতে মানা?

সিরাজউদ্দৌলার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম মাদ্রাসা শিক্ষকরা সবার আগে সিরাজ-উদ-দৌলার বিচারের দাবিতে মাঠে নামবেন। কারণ তারা ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা দেন। একজন ছাত্রীর গায়ে হাত দেয়া যে ভয়ঙ্কর অন্যায়, সেটা তারা জানেন। কিন্তু জেনেশুনেও তারা চুপ করে আছেন। ছাত্রীর গায়ে হাত দেয়া ধর্মীয় বিবেচনায়ও অন্যায়। আর সেই অন্যায় যারা মেনে নিয়ে চুপ করে বসে আছেন, তারাও সমান অন্যায় করছেন। মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি আছে না। তারা অনেক কিছু নিয়ে মাঠ কাঁপায়। কিন্তু আজ একজন অপরাধী প্রিন্সিপালকে বাঁচাতে গিয়ে সবাই চুপ মেরে গেছেন। ধর্মীয় বিবেচনায় এই চুপ করে থাকার শাস্তি কি? নুসরাত মরে গিয়েও কি তার সহপাঠী বা শিক্ষকদের বিবেককে জাগাতে পারবে না?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অবশ্য নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে তোলপাড়। অনেকে আবার ফেসবুক প্রতিবাদ নিয়ে ব্যঙ্গ করছেন। আহবান জানাচ্ছেন,রাজপথে নামার। অবশ্যই রাজপথে নেমেও প্রতিবাদ করতে হবে। তবে সবসসয় সবার পক্ষে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করা সম্ভব হয় না।

শিক্ষার্থীরা যত সহজে মাঠে নামতে পারেন, পেশাজীবীরা তত সহজে পারেন না। কিন্তু কোনো একটা ঘটনায় নৈতিক অবস্থানের গুরুত্বও কম নয়।  ফেসবুকে সম্মিলিত প্রতিবাদেরও একটা প্রভাব আছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেকগুলো ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেছে, ফেসবুকে তোলপাড়ের কারণেই। ফেসবুকে তোলপাড়ের ঢেউ লাগে গণমাধ্যমেও। সব মিলিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারলে ও সে চাপ বজায় রাখতে পারলেই ন্যায়বিচার সম্ভব। তাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে। কেউ রাজপথে নামবেন, কেউ ফেসবুকে প্রতিবাদ করবেন, কেউ গণমাধ্যমে লিখবেন, কেউ টক শো'তে বলবেন। সব মিলিয়ে প্রতিবাদের ঢেউ তুলতে হবে। প্রতিবাদের সময় যেন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাজনীতি, ধর্ম নয়; একমাত্র বিবেচ্য যেন হয় ঘটনার ন্যায্যতা। সব অন্যায়ের বিরুদ্ধেই যেন আমরা সবাই অভিন্ন কণ্ঠে প্রতিবাদ জানাই।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।