Alexa

শুষ্ক তিস্তা ও আবার কারো মমত্বের অপেক্ষা

শুষ্ক তিস্তা ও আবার কারো মমত্বের অপেক্ষা

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম/বার্তা২৪.কম

স্বাভাবিক পানি প্রবাহের অভাবে এ মৌসুমে শুকিয়ে গেছে তিস্তা নদী। প্রতি বছরের মতো এবারও শীতকাল শেষে খরা শুরু হয়েছে। শুকিয়ে সরু নালায় সরু নালার রূপ ধারণ করেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী।

বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশে বন্ধু সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়েছে। তবু হয়নি তিস্তা সমস্যার সমাধান। গত বছর খরার সময় তিস্তা সমস্যার সমাধান নিয়ে যখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে একটি ইতিবাচক বাণী শোনা গিয়েছিল, কিন্তু ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সুরে ভিন্নতা বাংলাদেশের মানুষকে হতাশ করেছে।

তিস্তায় তো পানি নেই-চুক্তি হবে কীভাবে? পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ধরনের কথা শুনিয়েছিলেন। কে তিস্তার পানি সিকিমে আটকালো বা কে মহানন্দা দিয়ে সরিয়ে নিলো? কোথায় গেলো? কোথায় যাচ্ছে? কোথায় কে ব্যবহার করছে? মমতার মুখে তিস্তায় পানি নেই-উক্তিটি শোনার পর এ প্রশ্নগুলো নিয়ে মুখে ও মিডিয়ায় এখন হৈ হৈ ব্যাপার চলছে। তিনি পানি নেই বলছেন। অথচ এপ্রিলে উপরের বরফ গলা পানি তিস্তা দিয়ে নেমে আসে।

মমতার মনোভাব আন্তর্জাতিক নদী আইন তথা তিস্তা চুক্তির অন্তরায়। প্রায় বাইশ বছর হলো; তিস্তা নিয়ে ভাবছি, পড়ছি, গবেষণা করছি, লিখছি। উভয় দেশের আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত জয়-জয় অবস্থা (Bilateral benefiting agenda & win-win situation) নিয়ে একটি গবেষণায় পুরস্কারও পেয়েছিলাম। অনেক আর্টিকেল লিখেছি। ভারতের রিজিওনাল সাইন্স জার্নালসহ বিদেশি জার্নালেও বেশ কয়েকটি প্রকাশনা ও স্প্রিংগার থেকে ‘Water use and poverty reduction’ শীর্ষক একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। আমার কেনো যেন মনে হয়, একাডেমিক পড়াশুনা ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান ব্যবহারের চেয়ে উপমহাদেশের নেতা-আমলারা অবৈজ্ঞানিক কথাবার্তা আমলে নিয়ে রাজনৈতিক কারণে সমস্যাকে জিইয়ে রাখতে বেশি পছন্দ করেন! তবে আমি এ তিস্তাপাড়ের একজন ভুক্তভুগি মানুষ হিসেবে এবার আশা করেছিলাম ভাল কিছু একটা হবে। এ সমস্যা সমাধানে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীই আন্তরিক। কিন্তু মমতা মমত্বহীন কথা বলে আন্তর্জাতিক নদী আইনের নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিস্তায় পানি নেই বলে চুক্তির কথা উড়িয়ে দিলেন। তাই এবারও চুক্তি হলো না বলে ... হায় হায় করলে হবে না। মাওলানা ভাসানীর লং মার্চের কথা অনেকে আজ ভুলে বসে আছেন। কেউ কেউ বলেন, আন্তর্জাতিক নদী আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা করা প্রয়োজন। সমুদ্র আইনের মামলায় আমরা এই সেদিনইতো জিতেছি! তবে আমার ধারণা হলো- আধুনিক সভ্য সমাজে সবকিছুতে উদারীকরণ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সেটা হলে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়, শান্তি আসে।

তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার এজেন্ডা নিয়ে মোট কতবার বৈঠক হয়েছে মনে আছে কি? বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সভা করার হিসেব অনুযায়ী ৯৬ বার এ নিয়ে বসা হয়েছিল। সেই ১৯৯৮ সালে ডালিয়ার অবসর, ঢাকার সচিবালয়, নানা জায়গায় বহুবার অতীতের বহু প্রেসিডেন্ট-মন্ত্রী-সচিব কমিটি, টেকনিক্যাল কমিটি, সংসদীয় কমিটির প্রচেষ্টা ভন্ডুল করে ২০১৭ সালে দিল্লি রাজপ্রাসাদের ঝলমলে আলোয় বন্ধুত্বের উষ্ণতার মধ্যে আলোচনায় অনেক আশার সঞ্চার হয়েছিল। আমাদের আশার ওপর যেন বাড়া ভাতে ছাই দেওয়ার কাজটি করলেন মমতা ব্যানার্জী। এবার ৩৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলেও তিস্তাকে সুকৌশলে বাদ রাখা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিস্তা সমস্যা সমাধানের জন্য দেখিয়ে দিয়েছেন মমতাকে। আর মমতা বলেছেন ভিন্ন কথা-তিস্তায় পানি নেই। এতে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়াই হচ্ছে।

মমতার এখন নতুন কথা- তিস্তা নয়, তোরসা, জলঢাকা, মানসাই, ধানসাই ইত্যাদি নদীতে পানি আছে। সেগুলো থেকে বাংলাদেশের জন্য পানি দেওয়া যাবে। তিনি বলেছেন-বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তি নয়, দরকার তো জলের! এসব ক্ষীণ জলধারাকে বর্ষাকালে নদী মনে হলেও এগুলো সারা বছর প্রবাহমান কোনো নদী নয়। এসব নদীর কোনো অস্তিত্ব বা প্রবাহ কি বাংলাদেশে আছে? তিনি তিস্তা পানি বন্টনের কথা অন্যখাতে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? তিস্তা সমস্যার সমাধান তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি দিয়েই করতে হবে। আমাদের তিস্তা ব্যারেজ (ডলিয়া) শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ বছর ব্যবধানে ৬৬ কিলোমিটার উজানে গজলডোবায় একই তিস্তা নদীতে বাঁধ দিয়ে আপনারা পানি সরিয়ে নিয়ে কি আন্তর্জতিক নদী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাননি? এটা কি আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও মানবাধিকারের সুস্পস্ট লঙ্ঘন নয়?

আপনার মতামত লিখুন :