Alexa

বৈশাখ ও কিছু কথা

বৈশাখ ও কিছু কথা

চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪

মাদরাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা নিয়ে মধ্যবিত্ত নাগরিকদের একাংশ ভীষণ ক্ষুব্ধ! সারাদেশে চলছে শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ! অ্যাক্টিভিস্টরা এবার পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে প্রতিবাদ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এর মধ্যেও পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সমারোহ থেমে নেই। দোকানগুলোতে চলছে বিকিকিনি, নানা ধরনের বৈশাখী অফার। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে অবশ্য নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার ঘটনার তেমন কোনো আবেদন নেই! তারা বরং আপাতত বর্ষবরণ নিয়েই মাতোয়ারা! যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বলুন তো বাঙালির নববর্ষ কোন মাসে, মাসের কোন তারিখে? শহুরে শিক্ষিত বাঙালিরা এক বাক্যে বলবেন, ‘কেন! পহেলা জানুয়ারি, খ্রিস্টমাসের এক তারিখ!’

কথা ঠিক! নববর্ষ বলতে শহুরে তরুণ-তরুণীরা আসলে বুঝি পহেলা জানুয়ারিকেই। তাহলে পহেলা বৈশাখ কী? হ্যাঁ, এটাও নববর্ষ! এ যেন অনেকটা মা আর শ্বাশুড়ি উভয়কেই ‘মা’ বলে ডাকার মতো।

উৎসব-অনুষ্ঠান, সন-তারিখ নিজের মতো করেই টিকে থাকে। কিছু উৎসবের তারিখ আমরা বাংলায় খেয়াল রাখি, কিছু ইংরেজিতে। ১৬ ডিসেম্বর, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১ জানুয়ারি ইংরেজিতে। কিন্তু পহেলা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ বাংলায়। তখন ইংরেজিটা গুরুত্বহীন।

পহেলা বৈশাখ ১৪ না ১৫ এপ্রিল, তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। সন নয়, ঐতিহ্য নয়, তারিখটাই গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালি ছেলেমেয়েরা বাংলা সন-তারিখ মোটে জানে না। কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালনের ব্যাপারে আপসহীন। জঙ্গি আক্রমণের ভয়, মৌলবাদীদের হুঙ্কার, রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধও পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে সীমাবদ্ধ করতে পারছে না।

গবেষকদের মতে, মোগল আমলে হিজরি সন ধরে এদেশে পহেলা বৈশাখ নববর্ষ হিসেবে পালন শুরু হয়। প্রাচীনকালে অগ্রহায়ণ ও পরে ফাল্গুন মাস থেকে বছর শুরু হত। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে খাজনার হিসাবের সুবিধার জন্যই বঙ্গাব্দ শুরু হয়। একটা কথা পরিষ্কার বলা দরকার। ‘পহেলা বৈশাখ’ উৎসব নিতান্ত অর্বাচীন, ইংরেজ আমলেই তার উৎপত্তি।

বাঙালি গ্রামসমাজ ছিল মুখ্যত কৃষিজীবী। সেখানে চড়ক, পৌষ-পার্বণ, নবান্ন ইত্যাদি ছিল বড় উৎসব। ঔপনিবেশিক জমানায় দেখা গেল, ১ জানুয়ারি বছরের প্রথম দিনটি ছুটি। অগত্যা বাঙালি ভাবলো, সাহেবদের থাকলে আমাদেরই বা নয় কেন? তখন মহানগরে তৈরি হলো নতুন এক ‘সেক্যুলার উৎসব’। তখন থেকে শুরু হয় পহেলা বৈশাখের খোঁড়া পায়ে দৌড়, গ্রামবাংলার নবান্ন বা পৌষ-সংক্রান্তির জনপ্রিয়তা তার ছিল না। আবার ব্রিটিশ শাসকদের ‘বড়দিন’, ‘নিউ ইয়ার্স ইভ’-এর গ্ল্যামারও ছিল না। আজও বাংলার কোনও কোনও গ্রামে পয়লা বৈশাখকে ‘বাসি চড়ক’ বলে।

বাঙালির যাবতীয় উৎসবে বিশেষ খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। পহেলা বৈশাখে সেরকম কিছু আছে বলে জানা যায় না। আগে দেখতাম, সব জন্মদিনেই পায়েস রান্না হতো। বোধহয় সে কথা ভেবেই বছরের জন্মদিন নববর্ষেও পায়েস হতো। তবে সাম্প্রতিককালে ঢাকা শহরে ইলিশ আর পান্তা খাওয়ার একটা রীতি চালু হয়েছে।

এটা অবশ্য একটা হুজুগ। কোনো রকম একটা হুজুগ তুলে দিলে আমাদের আর পায় কে? বিশেষত একালের ছেলেমেয়েরা। একালের সুশীল বালক-বালিকারা গোপালের মতো। একবার হুজুগ তুলে দিতে পারলেই হলো। তবে পরিবেশনটা করতে হবে একটু ভিন্ন মোড়কে!

যা হোক, আমাদের প্রায় সব উৎসবেই একটু ধর্মের ছোঁয়া থাকে। একমাত্র ব্যতিক্রম পহেলা বৈশাখ। এই উৎসবের ক্ষেত্রে কিন্তু ভক্তিটা অত প্রকট না। বাঙালির সেক্যুলার অংশের মেজাজের সঙ্গে খাপ খাওয়া ভালো। যদিও ধর্মবাদীরা ব্যাপারটিতে বেশ নাখোশ। তাদের কথা হলো, ‘কীসের নববর্ষ!’

যে দেশে ধর্মীয় অনুশাসনের অবাধ্য আরাধনা পোশাকে-বুলিতে-রাজনীতিতে-জঙ্গিবাদে প্রকাশিত হয়ে ছেয়ে যাচ্ছে শহর-প্রান্তর, সেদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রা সহযোগে পহেলা বৈশাখ পালন, ঔদ্ধত্য বটে! আমরা অবশ্য বিচিত্র স্বভাবের। থার্টি ফাস্ট নাইটেও আছি, আবার পহেলা বৈশাখের মাতামাতিতেও আছি। তবে পহেলা বৈশাখের মাতামাতিটা একেবারে আলাদা। এর একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে।

আমাদের ভাষা ও সাহিত্য থেকে আমরা প্রচুর আনন্দ পাই। আজ বাংলা ভাষা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষাগুলোর একটা। এই চেতনা গর্ব না, সুখকর চিন্তা, আমাদের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি। যদি বঙ্কিম-নজরুল-রবীন্দ্রনাথের ভাষা ভুলে গিয়ে টেঁশু মার্কা ‘আরে ইয়ার’ জাতীয় ‘হিংরিজি’কে মাতৃভাষা বলে আমরা বরণ করি, তাহলে আমাদের সাংস্কৃতিক গতিটা সভ্যতা থেকে অর্ধসভ্যতার দিকে চলমান, ধরে নিতে হয়। নববর্ষে সবাই মিলে একত্র হওয়া, প্রিয়জনদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, উৎসব-গান-মেলায় অংশগ্রহণ-এই সব প্রথা জীবনকে সানন্দ করে, নিজের সভ্যতা-সংস্কৃতিতে বিশ্বাস মারফত যাবতীয় হীনমন্যতার পথ রোধ করে দাঁড়ায়, বিশ্বায়নের যুগে আত্মসম্মানবোধকে বাঁচিয়ে রাখে।

বাঙালি বছর, মাসগুলোর সঙ্গে ১৩ পার্বণ, তথা অসংখ্য সুখাদ্যের স্মৃতি আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি যে কত আনন্দময়, তা স্মরণ করিয়ে দেয়। পহেলা বৈশাখ সেই বছরের শুরু। নানা আনন্দের পসরা সাজিয়ে এরপর ১২ মাস আসবে। নতুন বছর শুভ, তথা সানন্দ হবে, এই আশা নিয়ে আবার ৩৬৫ দিন কাটানোর জন্য প্রস্তুত হই। একটি সুন্দর দিন, যদি কাব্য করে বলি, ‘স্বপ্নের দিন’ খুব বোধহয় অন্যায় হয় না। বহু প্রজন্মের আশা-আনন্দের রেশ ওই দিনটির সঙ্গে জড়ানো।

দিনগত-পাপ ক্ষয়ের জীব আমরা, না জানি বিজ্ঞান, না রবীন্দ্র-মনন। সুনীলের কবিতার মতো, আমাদের এই ‘যত্তসব যাচ্ছেতাই ধুত্তেরি’ জীবনে ‘অসংখ্য প্রতিশ্রুতির ওপর শ্যাওলা জমে’, মনে হয় পৃথিবীতে এত দুঃখ, ‘মানুষের দুঃখই শুধু তার জন্মকালও ছাড়িয়ে যায়।’

নতুনেরা, বছরকে বছর পুরনো হয়, তবু কোনও দিন চিরচেনা বা অচেনা কারও কাঁধে আলতো হাত ছুঁয়ে পরম মমতায় বলে ওঠা হয় না, ‘এই যে, ভালো আছেন?’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাসের শেষটার মতো, উত্তর শোনার জন্যও তো এক মুহূর্ত কেউ দাঁড়ায় না আজকাল। এক ভুল ভাঙতে না ভাঙতে নতুন নতুন ভুলের মধ্যে প্রবেশ করে মানুষ। এই শহরেই, আমার এক পরিচিতজন গাছেদের সঙ্গে থাকে। তার বসার ঘরে গাছ, ছাদে গাছেদের মেলা পাতাবাহার, ক্যাকটাস, অলকানন্দা আরও কতো নাম। গাছেদের জন্য, গাছেদের ছেড়ে সে কোথাও যেতে পারে না, যায়ও না।

ক’দিন আগের প্রথম কালবোশেখির দিন সে আমায় এসএমএস করেছিল: ‘আমার গাছগুলো ডাল, পাতা মেলে দিয়ে আনন্দে নাচছে। আমি আর ওরা আনন্দে ভিজছি।’ আমার মনে হয়েছিল, এই তো, হঠাৎ নববর্ষাতেই ওদের কী সুন্দর, নিরাকার নববর্ষ! আমি অনুভব করি তার কল্যাণকর স্পর্শ। আমার পৃথিবী নতুন হয়ে ওঠে।

এইগুলোই তো পাওয়া। হয়তো তাই উৎসবের মোড়কে পুরে না নিলে, নিত্যদিনের ধুলামলিন, স্বেদগন্ধী জীবনটাকে একটু পালিশ না করে নিলে, জীবন বাঁচে না। আমরা মানুষেরা, বঙালিরা তাই নববর্ষকে পহেলা বৈশাখকে করে নিয়েছি নিতান্তই আমাদের মতো, আমোদ-আহ্লাদে, হুজুগে-হিড়িকে থকথকে।

মহাকাল-মহাকাশের অব্যর্থ-অমোঘ নিদানকে অস্বীকার করে বিশেষ একটি দিনকে করে তুলেছি অসাধারণ। নিরঞ্জনকে মোহাঞ্জন পরিয়ে দেখতেই হয়তো আমরা অভ্যস্ত। ‘শুভ নববর্ষ’ তাই অন্য দিনের ঘড়ির কাঁটা মেনে চলা যান্ত্রিক জীবনযাপনে একটু আলসেমির, একটু প্রশ্রয়ের অন্য রকম একটা দিন। ‘পহেলা বৈশাখ’ তাই আপামর বাঙালি মনের এক অনবদ্য ‘মেন্টাল কনট্রাস্ট’, একটু বেচাল হওয়ার দিন। এই দিনকে ঘিরে বাড়াবাড়ি আরও একটু বেশি হলে, ক্ষতি কী?

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট।

আপনার মতামত লিখুন :