Alexa

মুজিবনগর সরকার, ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

মুজিবনগর সরকার, ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান ছবি: বার্তা২৪

১০ এপ্রিল, ১৯৭১ মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। চরম ক্রান্তিকালে দেশের অভ্যন্তরে সরকার গঠনের এ ঘটনা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের অধিকাংশ কর্মকাণ্ড দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হতো বলে এ সরকারকে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার বলে অভিহিত করা হতো। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে।

দুই.

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয় (২৫ জুলাই, ২০১১) । তাঁর পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী সেই সম্মাননা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি ভারত সরকারকে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি; মুক্তিযুদ্ধের সময় আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন স্থানের সীমান্ত খুলে দেয়া; প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়; কলকাতায় প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপনে সহায়তা; বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে সব ধরণের সহায়তা প্রদান; বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলা; মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদান; অস্ত্র-গোলাবারুদ জোগান এবং সর্বোপরি মুক্তিবাহিনীর সাথে যৌথ অভিযানে অংশ নিয়ে মাত্র নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনে ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর সরকার এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী যে ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই অবদানকে বাংলাদেশের জনগণ অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

তিন.

২৫ মার্চ, ১৯৭১ পাকিস্তানের সামরিক সরকার ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর মাধ্যমে ঢাকাসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জাতিসংঘের যুদ্ধনীতি তোয়াক্কা না করে ইতিহাসের নির্মমতম গণহত্যা পরিচালনা করে এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের করাচি নিয়ে যায়। তারপর অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে মিয়াওয়ালি লয়ালপুর জেলে (বর্তমানে ফায়সালাবাদ কেন্দ্রীয় কারাগার) দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস আটক করে রাখে। গ্রেফতার হওয়ার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা টেলিগ্রাফের মাধ্যমে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের কাছে পাঠাতে সক্ষম হন এবং এম এ হান্নান ২৬ মার্চ, ১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

গণহত্যার সুবিধার্থে পাক সামরিক বাহিনী বেতার ও টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় এবং ঢাকায় কারফিউ জারি করে। বাংলাদেশের এমন দু:সময়ে ২৭ মার্চ, ১৯৭১ ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বাংলাদেশের পাশে থেকে সকল সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।

চার.

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব এবং চিফ অব স্টাফ জেনারেল শ্যাম মানেকশকে সমূহ যুদ্ধের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করতে বলেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সহায়তা অব্যাহত রাখলেও বেশ কিছু কারণে ভারত সরকার একটু দেরিতে বাংলাদেশ সরকারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়।

কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল: (১) পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের জুলুম, নির্যাতন ও বঞ্চনার ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে বুঝতে সময় দেয়া; (২) বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ও তাঁর জীবনের ঝুঁকি থাকা; (৩) বাংলাদেশের নদী, হাওড়-বাওড়, জলাভূমির প্রাচুর্যতা ও বিস্তৃতি যুদ্ধের অনুকূলে না থাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাওয়া; (৪) বিশ্বের গণমাধ্যমকে পাকিস্তানের প্রকৃত অবস্থা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে সময় দেয়া; (৫) সামান্য ভুলে যাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমূহ সম্ভাবনা নষ্ট না হয়ে যায়; (৬) ৩য় বিশ্বযুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা যেন তৈরি না হয়; (৭) ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়সঙ্গত চাওয়া, ভারতের কোনো নিজস্ব স্বার্থ এখানে জড়িত নেই’- বিষয়টি বিশ্ববাসীকে বুঝতে সময় দেয়া; (৮) ‘সৃষ্ট মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা বিদ্রোহ নয়’ বিষয়টি স্পষ্ট হতে সময় নেয়া প্রভৃতি।

পাঁচ.

১০ এপ্রিল, ১৯৭১ বাংলাদেশের অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, বন্দী বঙ্গবন্ধুর নি:শর্ত মুক্তি, পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি ও বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ অনুরোধ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/17/1555491313725.jpg

পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ২ আগস্ট, ১৯৭১ দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধুর বিচারের ঘোষণা দিলে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ভারতের প্রধান প্রধান শহর যেমন, কলকাতা, দিল্লী, বোম্বেতে মিথ্যা ও প্রহসনের বিচারের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানায় এবং ইন্দিরা গান্ধী স্পষ্ট ভাষায় বিচার বন্ধের আহবান জানান ।

প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং তাঁর প্রশাসনকে বোঝাবার জন্য নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান এবং ৪ নভেম্বর, ১৯৭১ প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে ওয়াশিংটনে তাঁর বৈঠক হয়। আলোচনার সময় বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গটি উত্থাপন করা হলে নিক্সন তা উপেক্ষা করেন। নিক্সনের সাথে নৈশভোজে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর রক্তক্ষয়ী লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

অবশেষে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে।

ছয়.

শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে পরাজিত পাক বাহিনী ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। স্বদেশের পথে ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ তিনি দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে (বর্তমানে ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট) যাত্রা বিরতি করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর মন্ত্রিসভার সব সদস্য এবং পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাগণ বঙ্গবন্ধুকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনককে রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানানো হয়। বঙ্গবন্ধুর সম্মানে আয়োজিত দিল্লীর প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী বক্তব্য শেষ করলে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্য ইংরেজিতে শুরু করেন। কিন্তু, জনতার পক্ষ থেকে বাংলায় বক্তব্য প্রদানের প্রবল দাবি উঠে।

হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা ও মুখে হাসির ঝলকানি নিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার ভাই ও বোনেরা…আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার, আপনাদের সৈন্যবাহিনী, আপনাদের জনসাধারণ যে সাহায্য এবং সহানুভূতি আমার দু:খি মানুষকে দেখিয়েছেন চিরদিন বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না…’৷

২০০৯ সালে বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০৯-২০১৪) ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অকুণ্ঠ সমর্থন ও অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের মাধ্যমে নৈতিক, সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক প্রভৃতিভাবে যারা সহায়তা করেছিলেন এমন ৫৬১ জন বিশ্বনেতা, ব্যক্তি ও সংগঠনের তালিকা তৈরি করেছিল। তখন পর্যায়ক্রমে সকলকে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। বর্তমান সরকারকে তার ৪র্থ মেয়াদে (২০১৯-২০২৪) সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং সাবেক সভাপতি, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :