শ্রীলঙ্কায় ধর্মভিত্তিক সমীকরণ আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা

মাছুম বিল্লাহ
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র ও সার্কের অন্যতম সদস্য দেশ শ্রীলঙ্কায় ২১ এপ্রিল সকালটি শুরু হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশে। দিনটি ছিল ‘ইস্টার সানডে’- খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য আনন্দের দিন, তাৎপর্যপূর্ণ দিন। তারা পবিত্র মনে গির্জায় প্রার্থনা সভায় একত্রিত হয় আর তার মধ্যে ঘটে যায় সহিংস ও অমানবিক ঘটনা। রক্তাক্ত হলো গির্জা, হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র। গোটা শ্রীলঙ্কায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়ে আটটি সিরিজ বোমা হামলা সংঘটিত হয়।

আড়াই দশকেরও বেশি সময় চলছিল তামিল টাইগারদের ভয়াবহ কর্মকাণ্ড। ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। কিন্তু পুরোপুরি কি তাদের সহিংসতা বন্ধ হয়েছিল?তামিলদের প্রতি সিংহলীদের যে দমননীতি তা কি তামিলরা চিরতরে ভুলে গিয়েছিল? তারা তাদের ওপর চালানো সব রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন হজম করে ফেলেছিল ইত্যাদি প্রশ্ন মনের কোনো উদয় হচ্ছে এই ঘটনার পর।

নিউজিল্যান্ডের মসজিদের হামলার ৩৫দিনের মাথায় প্রার্থনারত মানুষদের ওপর হামলা হলো। তামিল বিরোধী দীর্ঘ যুদ্ধাবস্থার কারণে শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তায় গোয়েন্দা কাঠামো অতীতের চেয়ে এখন বেশ কঠোর ও সুগঠিত বলা যায় । তার মধ্যেও এত বড় ঘটনা কিভাবে ঘটে গেল তা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে। কারা এর পেছনে? নিশ্চয়ই কোনো শক্তিশালী এবং দক্ষ গ্রুপ এর পেছনে রয়েছে। হিসেব মেলানো যাচ্ছে না কারণ দেশটির ৬-৭ শতাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো জনগোষ্ঠী নয়।

তবে,১৯৯৫ সালে একবার গৃহযুদ্ধ চলাকালে আরেক বোমা হামলায় ১৪৭ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করা হয়েছিল। সেই ঘটনার সাথে বর্তমান ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, ভেবে দেখার বিষয়। তামিল বিদ্রোহীদের সাথে শ্রীলঙ্কান সরকারের গৃহযুদ্ধ অবসানের পর এ ধরনের বড় কোন হামলার ঘটনা এই প্রথম। দেশটির ২ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে বৌদ্ধরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুসলিম, হিন্দু আর খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সব মিলে মোট জন সংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ। শুধু খ্রিষ্টান ৬-৭ শতাংশ। তাদের ওপরই হামলা হলো, কি কারণ থাকতে পারে এর পেছনে?

সিরিজ বোমা হামলায় ৩৬জন বিদেশি নাগরিকসহ মৃতের সংখ্যা ৩১০ এ দাঁড়িয়েছে। চার শতাধিক আহত হয়েছে যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই ভয়াবহ। হতাহত মানুষের সংখ্যার বিচারেই নয় ঘটনার ব্যাপকতার বিচারেও এই হামলাকে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহতম বড় সন্ত্রাসী হামলা বলা যেতে পারে। হামলার ধরন, ব্যাপকতা ও স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে বলা যায় এটি হঠাৎ করে হয়নি। এর পেছনে পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত কৌশলী, সময়সাপেক্ষ ও সুপরিকল্পিত। প্রশ্ন হচ্ছে শ্রীলঙ্কান গোয়েন্দারা কেন তা আঁচ করতে পারলো না।

শোন যায়, ১১ এপ্রিল দেশটির পুলিশ প্রধান দেশের সর্বত্র পাঠানো একটি ’গোয়েন্দা বার্তায়’ বলেছিলেন যে, দেশের উল্লেখযোগ্য গির্জাগুলোয় আত্মঘাতী বোম হামলা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন কিন্তু কেন তারা কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি সেটিও একটি বিরাট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রহস্যের জট এখানেও পাকিয়ে আছে। পুলিশ প্রধানের সতর্কবাণীতে নাকি বলা হয়েছিল একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ’ন্যাশনাল তৌহিদি জামাত’ নামে একটি সংগঠন এই ধরনের কাজ করতে পারে।

তবে, তাদের সাংগঠনিক কোন সক্ষমতার কথা তাদের জানা ছিল না। ঘটনার পর সংগঠনটিও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে এবং হামলাকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তির দাবি করেছে। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। তবে, যে কোন বড় হামলা করতে হলে স্থানীয় লোকজনের সংশ্লিষ্টতা থাকাটা অপরাধ বিজ্ঞানের একটি বড় অংশ। স্থানীয় কারা জড়িত ছিল, কি এর পেছনের কারণ তা জানার জন্য আমাদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

যে কোন হামলার পেছনে একটি বার্তা থাকে। শ্রীলঙ্কান হামলার পেছনের কোন বার্তা এখনও আমরা বুঝতে বা জানতে পারিনি। তাহলে কোন বার্তাই কি নেই? নেই নিজেই কি একটি বার্তা নয়? কোন বার্তা না থাকার মানে হচ্ছে হামলার দায় যে কারও ওপরে চাপিয়ে দেয়া যায় বা যাবে। খ্রিষ্টানদের মাঝে তামিল ও সিংহলি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে। তামিলরা যদিও সংখ্যায় বেশি, তামিল প্রধান উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে এবং কলম্বোতেই বেশি খ্রিষ্টান বসবাস করে। হামলা হয়েছে কলম্বো ও পূর্বাঞ্চলের বাত্তিকালোয়াতে। এই হামলার পেছনে হিন্দু তামিল ও বৌদ্ধ সিংহলিদের সংশ্লিষ্টতার বড় কোন ঐতিহাসিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তামিলদের সঙ্গে সিংহলিদের যে রাষ্ট্রনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে তাতে খ্রিষ্টান কেন্দ্রিক কোন উপাদান নেই।

আবার হিন্দু তামিল ও খ্রিষ্টান তামিলদের মাঝেও বড় ধরনের কোন সংঘাত নেই। অতীতে মুসলমান তামিলদের সঙ্গে এলটিটিইর সাথে সম্পর্ক খারাপ থাকলেও এলটিটিইর মূল নেতৃত্ব কাঠামোতে ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু, খ্রিষ্টান নয়। সম্প্রতি মুসলমানদের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কা জুড়ে যেসব আক্রমণ হয়েছে সেটাও হয়েছে বৌদ্ধ সিংহলি কিছু সংগঠন দ্বারা। খ্রিষ্টান সিংহলিদের তাতে উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা ছিল না। আবার বৌদ্ধধর্মীয় কিছু সংগঠন চার্চগুলোতে মাঝেমধ্যে প্রার্থনা সভায় হামলা করে থাকে। সামগ্রিকভাবে মনে হচ্ছে এটি এমন কোন তৃতীয় শক্তি এই ঘটনা ঘটিয়েছে যা একটি পরিপূর্ণ সন্ত্রাসী হামলা। এই হামলার প্রভাব যে শুধু শ্রীলংকায়ই থাকবেনা সেটি আমাদের বুঝতে হবে। এর ফলও সুদূরপ্রসারী।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে হামলার ক্ষত এখনো শুকায়নি, এরই মধ্যে নরপিশাচদের বোমায় আবারও আক্রান্ত হলো বিশ্ব মানবতা। রক্তাক্ত হলো কলম্বোর মাটি। বিশ্বজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশ্বব্যাপী যে এই নিষ্ঠুরতার প্রতিযোগিতা চলছে এর শেষ কোথায়? সরল ও সাধারণ বিশ্বাসে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রার্থনা করতে গিয়ে যদি মানুষকে এই পরিণতি বরণ করতে হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বিশ্বকে যারা অগ্নিকুণ্ডলীতে পরিণত করছে তারা কারা।কারা তাদেরকে মদদ দিচ্ছে, সহায়তা করছে , চিন্তা করতে হবে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।

বিশ্বনেতাদের গোটা বিশ্বের পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে হবে। কারা কেন কিভাবে বঞ্চিত হচ্ছে, কে বা কারা কোন বিষয় ভুল বুঝে বসে আছে, সে ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটানো প্রয়োজন। প্রয়োজন গোটা বিশ্বের শান্তির জন্য কাজ করা। মানুষের নৈতিক উন্নয়ন ঘটানোর জন্য কাজ করা। সামরিক খাতে ব্যয় কমানো। প্রতিটি দেশই -ধনী হোক গরীব হোক, সবাই যেন ব্যস্ত সামরিক খাতে খরচ বাড়াতে অথচ সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা নেই, কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিরাপদে নেই, কোন জনগোষ্ঠী নিরাপদে নেই তাহলে বিশ্বব্যাপী অস্ত্রের মজুত বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রীয় অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখে শুধু সামরিক ব্যয়ের চিন্তা মানুষের কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনা। অস্ত্রের দ্বারাই সব সমাধান করা সম্ভব নয়। বিশ্বনেতৃবৃন্দের বিষয়টি এখন বুঝতে হবে।

আটটির মধ্যে অধিকাংশ হামলাই ছিল আত্মঘাতী। কাজেই হঠাৎ করে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। স্মরণাতীত কাল থেকে সামাজিকভাবে মুসলিমরা কোণঠাসা। এ মুহূর্তে যে কোনো ঘৃণাবাচক প্রচারণা তাদের নিরাপত্তার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। মুসলিম রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে বিক্রমসিংহকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তামিল সংগঠনগুলোও একই সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া দেশটিতে সম্প্রতি মুসলমানদের সঙ্গে আর কারও সংঘাতপূর্ণ কোনো সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়নি। চার্চের সাথে মসজিদ বা প্যাগোডার সহিংস কোনো বিষয় শ্রীলঙ্কায় সেভাবে দেখা যায় না। পুরো বিষয়টি একটি ধোঁয়াশার মধ্যে পড়ে আছে। এই অবস্থা শ্রীলংকার রাজনীতিতে বিশাল এক অবিশ্বাসের জন্ম দেবে এবং ধর্মভিত্তিক সমীকরণ আরও জটিল করে তুলবে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক।