প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এগিয়ে নেবে কারা?

জাহিদ নেওয়াজ খান
জাহিদ নেওয়াজ খান, ছবি: বার্তা২৪.কম

জাহিদ নেওয়াজ খান, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রুনাই সফর থেকে ফিরে গত ২৬ এপ্রিল গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে দেশের গণমাধ্যমের একটি চিত্র ফুটে উঠে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সাংবাদিক দেশের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির চলমান ইস্যুগুলো তুলে ধরেন। এ সময় আরেক সাংবাদিক প্রিন্ট মিডিয়ার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন। পত্রিকাগুলো অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগছে বলে প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীকে জানান।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে, প্রযুক্তির পরিবর্তনে দেশের মানুষকে অনলাইন মাধ্যমে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য বলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা হচ্ছে একটা যুগের অথবা প্রযুক্তির প্রভাব। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার প্রভাবে এভাবে বিবর্তন আসতেই থাকবে।’

গণমাধ্যম সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শুধু বিবৃতিই দেননি, তিনি বিশ্বের প্রিন্ট মিডিয়ার বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির উন্নয়নে সারা বিশ্বে কিন্তু এখন অনেক নামিদামি পত্রিকা বন্ধের দ্বারপ্রান্তে। অনেকে পত্রিকা বন্ধও হয়ে গেছে। আবার কোনো কোনও পত্রিকা শুধু অনলাইনেই চলে; ছাপানোটা আর হয় না, একদমই নাই। এ রকম বহু নামকরা পত্রিকা, তারা কিন্তু সব চলে গেছে অনলাইনে। কাগজ আর ব্যবহার হয় না।’

এ সময় প্রযুক্তির সাথে সাথে সংবাদমাধ্যমের আনার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যমের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে এটার কিছু নেতিবাচক প্রভাব আছে। তবে আমরা যদি সেটা দূর করে কাজ করতে পারি সেক্ষেত্রে চিন্তার কিছু নাই।‘

প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্য একটা ইঙ্গিত হচ্ছে, সরকারের উচ্চ মহল প্রযুক্তি ও আধুনিকতার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা আগ্রহী। অন্যদিকে প্রযুক্তি বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকতা প্রদর্শনে আমাদের দেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিগুলোর এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

কেউ যদি ডিজিটাল সংবাদ প্ল্যাটফর্মের কথা বলে তাহলে সবার আগে উঠে আসে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা নিউজ পোর্টালের কথা। এটাও সত্য যে, প্রতিদিনই অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা বেড়েই চলছে। তথাকথিত প্রযুক্তির কল্যাণে অনেকেই এখন নিউজ সাইট খুলে বসছেন। এমনকি একাই চালাচ্ছেন। তবে একটা অনলাইন পোর্টালের মান নির্ভর করে এর কন্টেন্ট, সাংবাদিকতার সঠিক চর্চা এবং নৈতিক মূল্যবোধের প্রয়োগের ওপর। যদি সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য, সময়োপযোগী এবং যদি ভিন্নতা থাকে তাহলে হাজারো সাইটের মাঝে নিজের একটা অবস্থান তৈরি করে নিতে পারবে।

সাবেক একজন অনলাইন কন্টেন্ট ডেভেলপার বর্তমানে বার্লিন থেকে একটি সাইট পরিচালনা করছেন। বিশ্বের বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য কোম্পানির বিজ্ঞাপনের থেকে ভালো অর্থ আয় করছেন। সেক্ষেত্রে আপনার অনলাইন মিডিয়ার কন্টেন্টগুলো অবশ্যই গ্রাহক কেন্দ্রিক স্ট্যান্ডার্ড হতে হবে। যা পাঠক ধরে রাখার পাশাপাশি মুনাফা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, গত ১০ বছরে প্রিন্ট মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের হার প্রায় ১২ শতাংশ কমে গেছে। যা ২০০৯ সালের ২২.৪ শতাংশ থেকে ২০১৯ সালে ১০.১ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, বিশ্বের বিজ্ঞাপনের প্রায় ৩৯ শতাংশই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় চলে এসেছে। অথচ ২০০৯ সালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞাপনের হার ছিল মাত্র ১৭.২ শতাংশ। যদিও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থানে টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির খুব একটা ক্ষতি হয়নি। গত ১০ বছরে এ মাধ্যমের মাত্র ৩ শতাংশ বিজ্ঞাপনের হার কমেছে। যদিও মানুষ এখন নিজেদের স্মার্টফোনেই ইউটিউব ও নেটফ্লিক্সেরসহ বিভিন্ন অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে পছন্দের অনুষ্ঠানগুলো দেখছে।

ডিজিটাল প্লাটফর্মের আগ্রাসনে বিদেশি টিভি প্রতিষ্ঠানগুলো খুব একটা প্রভাবিত না হলেও বাংলাদেশের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির এই নিয়ে মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলগুলো দর্শকদের কাছ থেকে কোন রেভেনিউ পাচ্ছে না। অন্যদিকে, প্রধান কোম্পানিগুলোর ৩০ শতাংশ বিজ্ঞাপনই এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে।

যদি বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলগুলো প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে পারে, সেক্ষেত্রে এই ইন্ডাস্ট্রিও ভালো রেভেনিউ আয় করতে পারে। মানলাম, দিনশেষে টেলিভিশনগুলো প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেবে, কিন্তু প্রিন্ট মিডিয়াগুলোর কি হবে? তবে, এই মাধ্যমটিও এখন অনলাইনে তাদের কার্যক্রম চালানোর দিকেই নজর দিচ্ছে।

অতএব, ব্যাঙের ছাতার মতো অনলাইন নিউজ পোর্টাল গড়ে ওঠা বাস্তবিকভাবে কোন সমস্যা নয়। বাংলাদেশের এই মুহূর্তে পত্রিকার সংখ্যা কত? প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এর সংখ্যা ৭০০। তবে এই সংখ্যা যদি সাত হাজারও হয় আর আপনি যদি এর মধ্যে ৫০টিরও নাম না জানেন, তাহলে সেটা কোন সমস্যা না। কারণ সেই মিডিয়াগুলো নিজেদেরকে আপনার কাছে সেভাবে তুলে ধরতে পারেনি। দিনশেষে, পাঠকই নির্ধারণ করবে কে টিকে থাকবে আর কে থাকবে না।

কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে অনলাইন গণমাধ্যমগুলো পরিচালনার জন্য দরকার দক্ষ জনবল। তবে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের মূল দায়িত্ব হলো যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে আগামীর জন্য প্রস্তুত করা। তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সে শিক্ষা যথার্থভাবে দিচ্ছে কিনা সেটাই প্রশ্ন।

ওই সংবাদ সম্মেলনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও জানান, তিনি রাজনীতিতে বিজ্ঞ একজন যিনি গণমাধ্যমকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক দিক নির্দেশনা দেন। আর সেই প্রয়োজনের তাগিদেই আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলোকে নতুন প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে হবে।

জাহিদ নেওয়াজ খান, প্রধান বার্তা সম্পাদক চ্যানেল আই এবং সম্পাদক চ্যানেল আই অনলাইন