Barta24

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

"আমি ও আমার অফিস দুর্নীতি মুক্ত!"

"আমি ও আমার অফিস দুর্নীতি মুক্ত!"
মাহমুদুল হক আনসারী, ছবি: বার্তা২৪
মাহমুদুল হক আনসারী


  • Font increase
  • Font Decrease

ইদানিং কিছু সরকারি অফিসে গেলে একটি বক্তব্য নজরে পড়ে, “আমি ও আমার অফিস দুর্নীতি মুক্ত”। প্রশাসনের কিছু সেক্টরে দুর্নীতির লাগাম কোনো অবস্থায়ই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। এর মধ্যে পাসপোর্ট বিভাগ ও ভূমি অফিস অন্যতম। এ দু’টি বিভাগে মানুষকে কী পরিমাণ ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হতে হয়, সেটা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না।

পাসপোর্ট নাগরিকের একটি আবশ্যকীয় জাতীয় প্রমাণপত্র। পাসপোর্ট ছাড়া কোনো নাগরিক নিজ দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে যেতে পারে না। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও ভ্রমণের জন্য যেকোনো নাগরিককে স্বদেশী নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতে হয়। দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের জন্য যেতে হলে পাসপোর্ট লাগে। দেশে প্রতিবছর যে হারে বেকার সংখ্যা বাড়ছে, তাতে করে দেশের বাইরে কর্মসংস্থান ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিবছর লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষ দেশের বাইরে গিয়ে রোজগার করে দেশের অর্থনীতিকে সাবলম্বী করছে, কোটি কোটি টাকার রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে।

একজন নাগরিক যখন পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য পাসপোর্ট অফিসে যান, তখন তার ভোগান্তি কত প্রকার তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। পাসপোর্ট অফিসের নির্দিষ্ট ফরম রয়েছে। ফরমে অনেকগুলো নিয়ম রাখা হয়েছে। আবেদনপত্র পূরণ করে আবেদনকারীকে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা কর্তৃক কাগজপত্র সত্যায়িত করে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, এসব কাজ পাসপোর্ট আবেদনকারী নিজে করে পাসপোর্ট অফিসে আবেদনপত্র জমা দিলে সেটা মাসের পর মাস টেবিলে টেবিলে ঘুরতে থাকে। ২০ দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সাধারণ পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার কথা থাকলেও এ হিসেবের কোনো মূল্য বাস্তবে দেখা যায় না। তাই পাসপোর্ট অফিস ও এর কর্মকর্তারা দুর্নীতিমুক্ত বলে সাইনবোর্ড দিয়ে আবেদনকারীদের আশ্বস্ত ও চিন্তামুক্ত করার বক্তব্য দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তবে, সবাই দুর্নীতিবাজ বিষয়টি সেরকম নয়।

নির্দিষ্ট এজেন্ট ও দালাল ছাড়া আবেদনপত্র জমা দিলে সেখানে হাজার রকমের সমস্যা তৈরি করা হয়। সব কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলেও আবেদনপত্রে তাদের নির্দিষ্ট সোর্স অথবা এজেন্টের চিহ্ন না থাকলে সে আবেদনপত্র পরে খুঁজে পেতেও মাসের পর মাস লেগে যায়, পাসপোর্ট পাওয়া তো দূরের কথা। ফরম জমা দেওয়ার পর ডেলিভারির যে তারিখ দেওয়া হয়, সে তারিখে পাসপোর্ট পাওয়া যাবে এমন কোনো কথা নেই। অফিস থেকে একটা কথা বলে দেওয়া হয়- আপনার মোবাইলে অফিস থেকে মেসেজ যাবে। সে মেসেজ কবে আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ডিজিটাইলাইজেশন হয়েছে, কিন্তু তারপরও জনগণ পাসপোর্ট বিভাগের দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে কিছুতেই মুক্ত হতে পারছে না। কোনো না কোনোভাবে আইনের মারপ্যাচে ফেলে অনৈতিক অর্থ আদায় করবেনই তারা। একইভাবে ভূমি অফিসের জনভোগান্তি বলেও শেষ করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কঠোর নির্দেশ দিলেও ঘুরে ফিরে জনভোগান্তি আছেই। কোনো অবস্থায়ই ভোগান্তি থেকে নিস্তার পাচ্ছে না দেশের মানুষ। যখন এর কোনো প্রতিকার দেখি না, তখন নিজেকে অসহায় মনে হয়। সব কিছু দেখেও না দেখার ভান করছি। এসব দুর্নীতি বিরুদ্ধে নেই কোনো প্রতিবাদ, প্রতিরোধ। কেন এসব গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না সেটা জনগণ জানতে চায়।

মাহমুদুল হক আনসারী: গবেষক, প্রাবন্ধিক।

আপনার মতামত লিখুন :

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

উচ্চমাধ্যমিকের ফল ও কিছু কথা

উচ্চমাধ্যমিকের ফল ও কিছু কথা
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

১৭ জুলাই প্রকাশিত হলো ২০১৯ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল। গতবারের চেয়ে এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা বেশি এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলে লক্ষণীয়।

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫০৫ জন। এর মধ্যে আটটি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এইচএসসিতে পরীক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫০ জন ও মাদরাসা থেকে আলিমের শিক্ষার্থী ছিল ৮৮ হাজার ৪৫১ জন ও কারিগরিতে ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ২৬৪ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪৯৬ জন ছাত্র ও ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৯ জন ছাত্রী। মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৯ হাজার ৮১ শিক্ষা।

এবারের এইচএসসির ফল প্রকাশিত হলো ৫৫ দিনের মধ্যে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশিত হয়েছে বলে এটিকে পজিটিভ বলা যায়। এখন পাবলিক পরীক্ষার ফল দু’মাসে দেওয়া হয়, যা আগে তিনমাসে দেওয়া হতো। এবার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের কারণে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান এবং তিনি এতে খুশিও হয়েছেন। তবে, পরীক্ষার ফল তাড়াহুড়ো করে দেওয়া মানে প্রচুর ভুল-ত্রুটি থেকে যেতে পারে।

আর একটি বিষয় তো আমরা খেয়ালই করছি না। সেটি হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীর সারাজীবনের বিচার করছেন একজন শিক্ষক। তিনি অভিজ্ঞ হোক, অনভিজ্ঞ হোক, নতুন হোক, পুরান হোক, খাতা মূল্যায়ন করতে জানুক আর না জানুক, একজন শিক্ষকের কয়েক মিনিটের বিচার এবং রায় হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর ১২ বছরের সাধনার ফল এবং ভবিষ্যতের পথচলার নির্দেশক। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

একটি উত্তরপত্র বিশেষ করে এই ধরনের পাবলিক পরীক্ষার খাতা কমপক্ষে দু’জন পরীক্ষকের পরীক্ষণ করা উচিৎ, তা না হলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না। এরপর হাজার হাজার ভুল ত্রুটি ধরা পড়বে, সেখানে বোর্ড কিছু অর্থ উপার্জন করবে কিন্তু কাজের কাজ খুব একটা কিছু হবে না কারণ খাতা তো পুনর্মূল্যায়ন হয় না। শুধু ওপরের নম্বর দ্বিতীয়বার গণনা করা হয়। আমরা একটি পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে এর ধরনের খেলা খেলতে পারি না।

এবার ৪১টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। এদের মধ্যে ৩৩টি কলেজ ও আটটি মাদরাসা রয়েছে। কিছু কিছু কলেজ দেখলাম মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল, ওই একজনই অকৃতকার্য হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে শিক্ষা প্রশাসন তথা সরকারের সিদ্ধান্ত কী? কেনইবা একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারে না আবার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়, এটিই বা কেমন প্রতিষ্ঠান?

কুমিল্লা বোর্ডে এবার এইচএসসিতে পাসের হার সবচেয়ে বেশি ৭৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ অথচ এই শিক্ষার্থীরা ২০১৭ সালে যখন এসএসসি পাস করে তখন তাদের পাসের হার ছিল সর্বনিম্ন ৪৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। হঠাৎ করে এই পরিবর্তন কীভাবে হলো? শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তারা হয়তো বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাই এরকম হয়েছে।

আমরা জানি শিক্ষাবোর্ড একমাত্র পরীক্ষা গ্রহণ করা ছাড়া কীভাবে শিক্ষকরা পড়াবেন, কীভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটানো যায় ইত্যাদি নিয়ে তাদের তৎপরতা খুব একটা কখনও দেখা যায় না। একটি বোর্ডের অধীনে কয়েকটি জেলায় কয়েক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে। সেগুলোর শিক্ষাদান, শিক্ষক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থী উন্নয়ন নিয়ে বোর্ডের কোনো তৎপরতা বা কাজ আমরা দেখি না। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বোর্ডগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। কোন বোর্ডে কত বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে; বোর্ড যেন এক ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে চায়।

আসলে আমাদের দেশে শিক্ষাবোর্ডগুলো একমাত্র শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন আর খাতা মূল্যায়ন ছাড়া তেমন কোনো কাজ করে না। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা একটি জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষায় ভালো করলে তা ওই প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের এবং একই জেলার কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো করলে শিক্ষা প্রশাসন কিছুটা কৃতিত্ব নিতে পারে। বোর্ড কেন? বোর্ড কি শিক্ষকদের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়? বোর্ড কি শিক্ষকদের ক্লাস পর্যবেক্ষণ করে? বোর্ড কি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পড়ালেখা করার জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে? এর কোনোটিই করে না। তাহলে তারা কৃতিত্ব দেখাতে চায় কেন, বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয়।

পত্রিকায় দেখলাম যশোর বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। বোর্ডের ১৮টি কলেজের পাসের হার শতভাগ। এ বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ, আর মেয়েদের পাসের হার ৭৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ছেলেদের পাসের হার ৭২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। দিনাজপুর বোর্ডেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। এ দু’টো বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কি বেশি পড়াশোনা করেছে? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে যেটি গবেষণার মাধ্যমে জানা প্রয়োজন।

ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ২০১৫ সাল থেকে পাঁচ বছর যাবত ছাত্রীরা ধারাবাহিকভাবে ছাত্রদের চেয়ে বেশি পাস করে আসছে। এ বছর ছাত্রীদের পাসের হার ৭৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ আর ছাত্রদের ৭১ দশমিক ৬৭ শতাংশ অর্থাৎ ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। এটি যদিও আনন্দের সংবাদ কিন্তু এর সঠিক কারণ জানা প্রয়োজন।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিকে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র