Alexa

নির্লজ্জ, সর্বহারা বাবা আমি

নির্লজ্জ, সর্বহারা বাবা আমি

তুষার আবদুল্লাহ/ছবি: বার্তা২৪

আমি মোটেও লজ্জিত নই। সর্বহারা বা প্রলেতারিয়েতের আবার লজ্জা কিসের? আমরা লজ্জাকে তো কবেই হজম করে নিয়েছি। হজম করেছি বলেই বেশরমের মতো ব্যাংক লুট করে যাচ্ছে কত মানুষ। জনমানুষের পকেটের টাকা, সঞ্চয়ের টাকা নানা দস্যুপনায় লুট করে ভিনদেশে পাচার করে দিচ্ছে। বিন্দু পরিমাণ শরম নেই বলেই যতটুকু ভোগের প্রয়োজন, তার চেয়ে কয়েক গুনিতক ভোগ করছে। হজম করতে কষ্ট হচ্ছে, উগরে পড়ে যাবে তাও ভোগে বিরাম নেই। ক্ষমতার অপব্যহার করে অন্যের ভোগ নিজের পাতে নিয়ে নিয়েছে। ভোগ উৎসবে নেমন্তন্ন পেয়েছে সমাজের, রাষ্ট্রের খুব কম অংশই। বাকিদের ভাগে উচ্ছিষ্টটুকুও জুটছে না।

ভোগবাদীরা এখন এতোটাই কৃপণ যে উচ্ছিষ্টটুকুও বিলাতে রাজি নয়। সমাজে, রাষ্ট্রে এক প্রকার নীরব দুর্ভিক্ষ কিন্তু চলছেই নানা রঙের আতশবাজীর আড়ালে।

এই প্রদর্শন সর্বস্ব সমাজে নিজের বাইরে দ্বিতীয় মানুষটির খোঁজ রেখে সময় অপচয় করার মানুষ আছে কয়জন? যে মানুষটি আমার পাশে বসেই প্রাণ খুলে আড্ডা দিয়ে উঠে গেলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে, তার মনের সেই উদ্বেগের কথা কি আমরা জানি? মোড়ের দোকানদার আজ বাকি দিতে রাজি না হলে, পরিবারসহ তার রাতের খাওয়া হবে না। কিংবা বাড়িওয়ালা না ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত তিনি বাড়ি ফিরতে চান না, যদি আজও ভাড়ার জন্য কর্কশ কথা শুনতে হয়। ঐ মানুষটি বাড়ি ফিরবেন কিন্তু সন্তানের সামনে পড়তে চান না। সন্তান ঘুমিয়ে পড়ুক তারপর যাবেন, কারন ওর স্কুল ব্যাগ কিংবা ক্লাসের কোনো বই বা খাতাটি কিনে দেবার মতো টাকা এখনো জোগার করা হয়নি। উসকো খুশকো চুলের সহকর্মী, বন্ধুকে দেখে হয়তো ভেবেছিলাম-মানুষটা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে হয়তো। তাই যখন কিছু টাকার জন্য হাত পাতলো দিলাম না। কিন্তু আপনি-আমি জানতেই পারেনি –তিনি কতোদিন চাকরিছাড়া। বাড়িতে খাবার নেই। সন্তানের পোশাক নেই। পড়ালেখা নেই। নবজাতকের দুধ নেই।ভেবেছিলেন হাতে যাই তুলে দেবো-তাই দিয়ে অন্তত শিশুটির জন্য দুধ যদি কিনে নেয়া যায়।

সামাজিক যোগাযোগে মাধ্যমে যে বাবার কথা আমরা জানতে পারছি। সেই বাবাতো আমার সদ্য চাকরি হারানো কোনো সহকর্মীই হতে পারতেন। আমি তার পরিচয় জানি না। কতটা নিরুপায় হয়ে তিনি শিশু সন্তানের জন্য ‘চুরি’র ঝুঁকি নিলেন। শুক্রবার বিকেলেই এক বাবাকে দেখলাম ছেলে সন্তানের ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে লাল টুকটুকে খেলনা গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আমিও হয়তো মেয়ে বা ছেলের জন্য বাড়তি কিছু বাজারই করে ফেলেছি। অথচ ঐ রাতেই আরেকজন বাবাকে ছেলের জন্য দুধ চুরি করতে যেতে হলো।

ঈদ উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। আমি আমার মেয়ের জন্য, ছেলের জন্য কতো কেনাকাটার পরিকল্পনা করছি। কিন্তু এই গণমাধ্যমেরই অন্য যে সহকর্মীরা চাকরিহারা হয়েছেন, তারা কতোটা বায়না মেটাতে পারবেন তাদের সন্তানদের?

ছেলেবেলা থেকে বৈভবে বড় হইনি। টানাপোড়ন কাকে বলে তার সকল সুর আমার জানা। আত্মীয় পরিজনেরা যখন বিত্তের সমুদ্রে, আমাদের সেই সমুদ্র স্নান দেখা ছাড়া উপায় ছিল না। এখনও নেই। গ্রাম-গঞ্জ এবং এই নগরের অযুত বাবা-মাকে আমি জানি --তারা সন্তানের স্কুলের বেতন, স্কুলের টিফিনের যোগান কেমন করে দেন। কোনো কোনো মা,বাবা সন্তানকে স্কুলের টিফিন দেয়ার বিলাসীতাটুকুও দেখাতে পারেন না। বছরে একটি নতুন পোশাক দেবেন, সেই জন্য কতো ঘাম ঝরাতে হয়। এমন কতো মা এবং বাবাকে দেখেছি দোকানে কোনো ভালো খাবার বা জিনিস দেখে পছন্দ হয়েছে। মেয়ের জন্য বা ছেলের জন্য নেবার ইচ্ছে সামর্থ নেই। কতোবার কাছে গিয়ে দেখেছেন, জিনিসটা উল্টে পাল্টে দেখছেন। কিন্তু নেবার মতো টাকা নেই। ছেড়ে চলে যাবার সময় আপ্লুত চোখ। এমন চোখের দিকে তাকিয়ে ভিজে গেছি নিজেও। দুই একজন একেবারেই মায়া ছাড়তে পারেননি। দোকানদারদের চোখের আড়ালে নিয়ে গেছেন হয়তো কোন বনরুটি , খেলনা বা পোশাক। আমি দেখেও বাধা দেইনি। একজন মা, একজন বাবা তাঁর সন্তানের হাসি দেখতে চেয়েছেন। বাধা দেইনি বলে হয়তো অপরাধী আমি। এমন অপরাধী হওয়াও সুখের- এই লজ্জাস্কর সর্বহারাদের সমাজে।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন :