Barta24

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ডাক্তার ফয়সালদের থামাবে কে?

ডাক্তার ফয়সালদের থামাবে কে?
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্নের সারথী মাশরাফি বিন মর্তুজা একজন সংসদ সদস্যও। বিশ্বকাপ যাত্রার আগে এলাকার মানুষের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন নড়াইল। সেখানে তিনি জেলা হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। সেটা ঠিক আকস্মিক ছিল না। জেলা হাসপাতাল নিয়ে গাদা গাদা অভিযোগ ছিল আগে থেকেই। মাশরাফি নিজেও আগে একাধিকবার চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টার ফলোআপ দেখতেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন মাশরাফি।

সেখানে গিয়ে তিনি ডাক্তারদের পাননি। ছুটি ছাড়াই অনুপস্থিত থাকা এক ডাক্তারকে রোগী সেজে ফোন করলে তিনি তাকে তিনদিন পরে আসতে বলেন। পরে নিজের পরিচয় দিয়ে সেই ডাক্তারকে ‘স্যার’ সম্বোধন করে মাশরাফি জানতে চান, তিনি তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিতে পারেন। অপর প্রান্তে ডাক্তার চুপ থাকায় এক পর্যায়ে মাশরাফি তাকে বলেন, ‘আপনি কি আমার সাথে ফাজলামি করছেন!’ ঘটনা এটুকুই।

পরে মাশরাফি ‘ফাজলামি করেন’ বলার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নড়াইল হাসপাতালের চার ডাক্তারকে প্রথমে ওএসডি, পরে সাসপেন্ড করেছিল। মাশরাফির উদ্যোগে তারা কাজে ফিরেছেন। এরপর মাশরাফি আয়ারল্যান্ড সফর ও বিশ্বকাপ খেলতে ৭৩ দিনের জন্য দেশ ছেড়েছেন। আয়ারল্যান্ডে গিয়ে দেশের হয়ে জান দিয়ে খেলছেন, দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, উইকেট নিচ্ছেন। কিন্তু ডাক্তারদের ক্ষোভ যেন মিটছেই না। তারা মাশরাফির চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করছেন। মাশরাফিরা কত অগুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন, ডাক্তাররা কত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন; তা প্রমাণে উঠে পড়ে লেগেছেন।

এটা মাশরাফিও স্বীকার করেছেন যে, ডাক্তাররাই আসল হিরো, কারণ তারা মানুষের জীবন বাঁচায়। কিন্তু মাশরাফির দুঃখপ্রকাশ, সাসপেন্ড ডাক্তারদের কাজে ফেরানো, এমনকি ডাক্তারদের হিরো বলার পরও থামছে না ডাক্তারদের রাগ। তাদের অনেকেই মাশরাফিকে ভিলেন বানাতে উঠে পড়ে লেগেছেন। তার চেয়ে বড় কথা হলো, তারা যে ভাষায় মাশরাফিকে আক্রমণ করছেন, তা উচ্চারণযোগ্য নয়। শুধু মাশরাফি নয়, যারাই ডাক্তারদের সংযত হতে বলছেন, তারা চড়াও হচ্ছেন তার ওপরও। এমনকি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান, যিনি নিজেও একজন ডাক্তার, তিনিও রেহাই পাননি ক্ষুব্ধ ডাক্তারদের আক্রমণের তীর থেকে।

এক ডাক্তার বিপদে পড়লে আরেক ডাক্তার তার পাশে দাঁড়াবে, এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা ছাড়াই ছুটি ছাড়াই অনুপস্থিত থাকা একজন ডাক্তারের পক্ষে দাঁড়িয়ে ডাক্তাররা তো নিজের পেশাকেই অবমাননা করছেন। এখন পর্যন্ত এই ইস্যুতে মাশরাফির পক্ষে কোনো ক্রিকেটারকে কথা বলতে দেখেছেন? অথচ অন্তত এই ইস্যুতে ডাক্তাররা অন্যায্য অবস্থানে।

ভালো কথা হলো, এই ইস্যুতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সুবিধার নানা দিক উঠে আসছে। প্রয়োজনের চেয়ে ডাক্তার কম থাকা, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী না থাকা, ডাক্তারদের নানা বঞ্চনার কথা উঠে আসছে। তার কিছু আমরা জানি, কিছু জানি না। সেগুলো নিয়ে আরো বেশি করে আলোচনা হওয়া উচিৎ। তবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি কিন্তু ডাক্তারদের অনুপস্থিতিতে বৈধতা দেয় না। আপনাকে আপনার কাজটা ঠিকমত করতে হবে। তারপর সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে সমস্যা সমাধানের।

ডাক্তারদের বঞ্চনার গল্প বলতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। লেটেস্ট একটা উদাহরণ দেই। ক’দিন আগে দেখলাম, ইউএনওদের (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) জন্য কোটি টাকার গাড়ি কেনা হচ্ছে। এটা বঞ্চনার একটি দগদগে উদাহরণ। ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রটি ডাক্তার হয়। আর তার চেয়ে কম মেধাবী ছাত্রটি ইউএনও হয়। এখন কম মেধাবী ছাত্র পাবে কোটি টাকার গাড়ি। আর মেধাবী ছাত্রটি সাইকেলও পাবে না। এটা অবশ্যই অন্যায়। মাশরাফি ইস্যুর পর ফেসবুকে একাধিক ছবি ভাইরাল হয়েছে।

একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ডাক্তার হাতে স্যালাইন লাগিয়ে রোগী দেখছেন। আরেকটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ডাক্তারকে ঘিড়ে আছেন অসংখ্য মানুষ। রীতিমত বাজারের মত অবস্থা। আমি জানি, এসবই সত্য ঘটনা। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে ডাক্তারদের অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে হয়। তারপরও পান থেকে চুন খসলেই মারপিট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা তো আছেই। সিলেটে এক ছাত্রলীগ নেতা এক ডাক্তরকে রেপ করার হুমকি দিয়েছে। এরকম অনিশ্চিত অনিরাপদ পরিবেশে, তীব্র বঞ্চনা আর বৈষম্যের মধ্যে কাজ করতে হয় ডাক্তারদের। তারপরও ডাক্তাররা গ্রামে থাকতে চান না, এটা তো মিথ্যা নয়।

কর্মস্থলে অনুপস্থিতির প্রবণতা ডাক্তারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। মাশরাফি তো মাত্র একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। যেকোনো সময় গ্রাম পর্যায়ের যেকোনো হাসপাতাল পরিদর্শনে গেলেই এ চিত্র পাওয়া যাবে। তাই অন্যের সমালোচনা করার আগে আয়নায় আগে নিজের চেহারাটা দেখে নিন। বৈষম্য আর বঞ্চনার কথা জেনেই তো আপনারা চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন। বঞ্চনার বিরুদ্ধে কথা বলুন। কিন্তু আগে নিজের দায়িত্বটা ঠিকমত পালন করুন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাশরাফিকে আক্রমণ করার অভিযোগে ছয় ডাক্তারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংখ্যাটা কিন্তু আরো অনেক বেশি। ডাক্তাররা প্রতিক্রিয়া জানাবেন না, তেমন দাবি আমি করছি না। তবে সে প্রতিক্রিয়া যেন হয় শালীন, তাদের পেশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এটা তো মানতেই হবে, ডাক্তারদের পেশাটা বিশেষ কিছু। সাধারণ আর দশটা পেশার মত নয়। সাধারণ মানুষের কাছে ডাক্তাররা দ্বিতীয় ঈশ্বর। কথায় কথায় তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানোটা মানানসই নয়। কথায় কথায় হুমকি দেওয়া, মাস্তানের মত আচরণ ডাক্তারদের জন্য শোভন নয়। বয়সজনিত কারণে তরুণ ডাক্তারদের ক্ষুব্ধ হওয়ার তবু কিছু ব্যাখ্যা থাকে। কিন্তু নেতারাই যদি উস্কানিমূলক আচরণ করেন, তাহলে তরুণদের দোষ দিয়ে লাভ কী?

মাশরাফির ইস্যুর সময় চার চিকিৎসককে বরখাস্ত করার পর চট্টগ্রাম বিএমএর সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘চলেন না একদিন সারাদেশের চিকিৎসকরা ওয়াকওভার ওয়াকওভার খেলি, তাহলে বুঝতো চিকিৎসক কী? তার প্রয়োজন আছে কি-না?’ তিনি একই সঙ্গে মাশরাফির খেলা অর্থাৎ ক্রিকেটকে খাটো করেছেন। আবার ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন। এর আগেও চট্টগ্রামে এক সাংবাদিকের শিশু সন্তানের ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগে অভিযুক্ত ডাক্তারকে থানায় নেওয়ার ঘটনায় তিনি পুলিশ ও সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছিলেন। এই ডাক্তার নেতার আচরণ বরাবরই মাস্তানদের মত। নেতার যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ তরুণ ডাক্তারদের কাছ থেকে কীভাবে আপনি ভালো আচরণ আশা করবেন?

ছয় ডাক্তারকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হলেও ধর্মঘটের হুমকি দিয়েও ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী কিন্তু ধরাছোয়ার বাইরে।

আমরা ডাক্তারদের সাথে আছি, পাশে আছি। তাদের সব কষ্ট, বঞ্চনা, বৈষম্য আমাদেরও ব্যথিত করে। সরকার না হলেও ডাক্তারদের আমরা মাথায় তুলে রাখি। তারা যেন সাধারণ মানুষের মত কথায় কথায় প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে, মাস্তানের মত হুমকি দিয়ে তাদের সে আসন নষ্ট না করেন। সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, প্রয়োজনীয় ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হোক; তাদের প্রাপ্য মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হোক; সারাদেশের হাসাপাতালগুলোকে আধুনিক করা হোক। কিন্তু ডাক্তাররা যেন যেখানে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেখানেই দায়িত্বটা পালন করেন। কেউ তাদের ভুলটা ধরিয়ে দিলে যেন রাগ না করেন, যেন নিজেদের শুধরে নেন।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :

কেন এই ছন্দপতন

কেন এই ছন্দপতন
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সমাজ স্বাভাবিক জায়গায় নেই। অস্বাভাবিক আচরণ করছে। এই আচরণ নতুন নয়। তবে এবার অস্বাভাবিকতার চূড়ান্ত মাত্রায় বুঝি পৌঁছে গেল। সমাজ যাদের নিয়ে তৈরি, সেই মানুষেরা এখন তার গুণশূন্য। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এখন আর মানবিক উপকরণ চোখে পড়ছে না। মানুষ এমন আচরণ করছে, যা পশুর মধ্যেও অনুপস্থিত। তাহলে মানুষ এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?

আপনি বাড়ি থেকে বের হলেন। পথের কোথাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে দিয়ে চলাচল করা কারো দিকে তাকাচ্ছেন। এমনিতেই তাকাচ্ছেন। কোনো শিশুকে দেখে তাকাতে পারেন। আপনার এই তাকানো দেখে এক দল হত্যাকারী আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। যারা ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাদের অনেকেই হয়তো এতোক্ষণ আপনার আশপাশেই ছিল। একজন বা দুইজন আপনার ওপর ঝাঁপ দিল তো ব্যস অন্য পথচারীদের একটি অংশ আপনাকে না বাঁচিয়ে ‘গণ’তে যোগ দিল। আপনি হয়ে গেলেন ছেলেধরা। কিংবা কোনো মেয়েকে উত্ত্যক্তকারী। আপনাকে কেউ বাঁচাতে আসবে না। দূরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে থাকবে।

পথের কথা বাদ দিন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ঘর থেকে একজন মাকে নামিয়ে এনে হত্যা করে ফেলল। প্রতিবন্ধী একজনকেও মেরে ফেলা হলো ছেলেধরা সন্দেহে। সেই হত্যাকাণ্ড সমাজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে উপভোগ করল। ঢাকাই চলচ্চিত্রের মন্দা বাজারে এই দৃশ্য বেশ উপভোগ্য এখন সমাজের কাছে।

সমাজটাকে দেখলে আপনার মনে হবে হতাশায় ডুবে আছে। ব্যক্তিগতভাবে হয়তো আপনি এবং আমিও তাই। কেন এই হতাশা? দুর্নীতির সরলীকরণ এর একটি কারণ অবশ্যই। প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে মৃদু বা ভয়াবহ দুর্নীতির সঙ্গে পেঁচিয়ে আছি। নিজে দুর্নীতি করছি অথবা সয়ে যাচ্ছি। দুর্নীতি সামাল দেওয়া, ভোগ করাও সহজ নয়। নানা দিক সামাল দিয়ে চলতে হয়। যখন নকশা মতো হচ্ছে না, তখন হাজার কোটি টাকার মালিকের মধ্যেও হতাশা দেখা দেয়। আবার আপনি নিজে দুর্নীতি করছেন না, কিন্তু দুর্নীতির শিকার। নীরবে সয়ে যেতে যেতে আপনি হতাশার ব্যাধিতে আক্রান্ত। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বাণিজ্যের ‘কড়ি’। কড়ি দিয়ে তারা সনদ কিনছে ঠিকই কিন্তু যুৎসই চাকরি পাচ্ছে না। সাধারণ কৃষক, উৎপাদক তার ফসল ও পণ্যের দাম থেকে বঞ্চিত। তারপরও সমাজের আকাশে টাকা উড়ছে। ওই টাকা ধরতে না পেরে কেউ হতাশ। আবার কেউ ধরতে পেরে সেই টাকা ভোগ করতে করতেও এক ধরনের হতাশা এসে তাদের ঘিরে ধরেছে।

বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা আছে। অপরাধের তদন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দ্রুত আদালতে পৌঁছে না। হিমঘরে জমতে থাকে। অপরাধের কারণ ও অপরাধীদের সঙ্গে রাজনীতির এখন প্রবল আত্মীয়তা। ফলে অপরাধের স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়া সচল না দেখে সাধারণের মধ্যে এক ধরনের হতাশার নিম্নচাপ তৈরি হয়। আমরা বুঝি এখন সেই নিম্নচাপের ঘূর্ণি দেখতে পাচ্ছি। এই ঘূর্ণিই নিজেকে প্রকাশের জন্য গুজবের ধুলি খুঁজে বের করছে। ফলাফল গণপিটুনি, হত্যা ও ধর্ষণ। এই ঘূর্ণি থেকে সমাজ, রাষ্ট্র পরিত্রাণ পাবে কোন উপায়ে? একবারেই যে ঘূর্ণি মোকাবেলার সাধ্য নেই আমাদের, তা নয়। আছে। যে স্বাভাবিক রাজনৈতিক অনুশীলন দেখে আমরা অভ্যস্ত, তা যদি আবার ফিরে আসে, তবেই দেখা যাবে হতাশার নিম্নচাপ কাটতে শুরু করেছে। মানুষ, সমাজ স্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেছে। অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াও তখন স্বাভাবিক ছন্দে চলতে শুরু করবে।

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র