Alexa

ডাক্তার ফয়সালদের থামাবে কে?

ডাক্তার ফয়সালদের থামাবে কে?

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্নের সারথী মাশরাফি বিন মর্তুজা একজন সংসদ সদস্যও। বিশ্বকাপ যাত্রার আগে এলাকার মানুষের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন নড়াইল। সেখানে তিনি জেলা হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। সেটা ঠিক আকস্মিক ছিল না। জেলা হাসপাতাল নিয়ে গাদা গাদা অভিযোগ ছিল আগে থেকেই। মাশরাফি নিজেও আগে একাধিকবার চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টার ফলোআপ দেখতেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন মাশরাফি।

সেখানে গিয়ে তিনি ডাক্তারদের পাননি। ছুটি ছাড়াই অনুপস্থিত থাকা এক ডাক্তারকে রোগী সেজে ফোন করলে তিনি তাকে তিনদিন পরে আসতে বলেন। পরে নিজের পরিচয় দিয়ে সেই ডাক্তারকে ‘স্যার’ সম্বোধন করে মাশরাফি জানতে চান, তিনি তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিতে পারেন। অপর প্রান্তে ডাক্তার চুপ থাকায় এক পর্যায়ে মাশরাফি তাকে বলেন, ‘আপনি কি আমার সাথে ফাজলামি করছেন!’ ঘটনা এটুকুই।

পরে মাশরাফি ‘ফাজলামি করেন’ বলার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নড়াইল হাসপাতালের চার ডাক্তারকে প্রথমে ওএসডি, পরে সাসপেন্ড করেছিল। মাশরাফির উদ্যোগে তারা কাজে ফিরেছেন। এরপর মাশরাফি আয়ারল্যান্ড সফর ও বিশ্বকাপ খেলতে ৭৩ দিনের জন্য দেশ ছেড়েছেন। আয়ারল্যান্ডে গিয়ে দেশের হয়ে জান দিয়ে খেলছেন, দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, উইকেট নিচ্ছেন। কিন্তু ডাক্তারদের ক্ষোভ যেন মিটছেই না। তারা মাশরাফির চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করছেন। মাশরাফিরা কত অগুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন, ডাক্তাররা কত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন; তা প্রমাণে উঠে পড়ে লেগেছেন।

এটা মাশরাফিও স্বীকার করেছেন যে, ডাক্তাররাই আসল হিরো, কারণ তারা মানুষের জীবন বাঁচায়। কিন্তু মাশরাফির দুঃখপ্রকাশ, সাসপেন্ড ডাক্তারদের কাজে ফেরানো, এমনকি ডাক্তারদের হিরো বলার পরও থামছে না ডাক্তারদের রাগ। তাদের অনেকেই মাশরাফিকে ভিলেন বানাতে উঠে পড়ে লেগেছেন। তার চেয়ে বড় কথা হলো, তারা যে ভাষায় মাশরাফিকে আক্রমণ করছেন, তা উচ্চারণযোগ্য নয়। শুধু মাশরাফি নয়, যারাই ডাক্তারদের সংযত হতে বলছেন, তারা চড়াও হচ্ছেন তার ওপরও। এমনকি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান, যিনি নিজেও একজন ডাক্তার, তিনিও রেহাই পাননি ক্ষুব্ধ ডাক্তারদের আক্রমণের তীর থেকে।

এক ডাক্তার বিপদে পড়লে আরেক ডাক্তার তার পাশে দাঁড়াবে, এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা ছাড়াই ছুটি ছাড়াই অনুপস্থিত থাকা একজন ডাক্তারের পক্ষে দাঁড়িয়ে ডাক্তাররা তো নিজের পেশাকেই অবমাননা করছেন। এখন পর্যন্ত এই ইস্যুতে মাশরাফির পক্ষে কোনো ক্রিকেটারকে কথা বলতে দেখেছেন? অথচ অন্তত এই ইস্যুতে ডাক্তাররা অন্যায্য অবস্থানে।

ভালো কথা হলো, এই ইস্যুতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সুবিধার নানা দিক উঠে আসছে। প্রয়োজনের চেয়ে ডাক্তার কম থাকা, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী না থাকা, ডাক্তারদের নানা বঞ্চনার কথা উঠে আসছে। তার কিছু আমরা জানি, কিছু জানি না। সেগুলো নিয়ে আরো বেশি করে আলোচনা হওয়া উচিৎ। তবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি কিন্তু ডাক্তারদের অনুপস্থিতিতে বৈধতা দেয় না। আপনাকে আপনার কাজটা ঠিকমত করতে হবে। তারপর সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে সমস্যা সমাধানের।

ডাক্তারদের বঞ্চনার গল্প বলতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। লেটেস্ট একটা উদাহরণ দেই। ক’দিন আগে দেখলাম, ইউএনওদের (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) জন্য কোটি টাকার গাড়ি কেনা হচ্ছে। এটা বঞ্চনার একটি দগদগে উদাহরণ। ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রটি ডাক্তার হয়। আর তার চেয়ে কম মেধাবী ছাত্রটি ইউএনও হয়। এখন কম মেধাবী ছাত্র পাবে কোটি টাকার গাড়ি। আর মেধাবী ছাত্রটি সাইকেলও পাবে না। এটা অবশ্যই অন্যায়। মাশরাফি ইস্যুর পর ফেসবুকে একাধিক ছবি ভাইরাল হয়েছে।

একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ডাক্তার হাতে স্যালাইন লাগিয়ে রোগী দেখছেন। আরেকটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ডাক্তারকে ঘিড়ে আছেন অসংখ্য মানুষ। রীতিমত বাজারের মত অবস্থা। আমি জানি, এসবই সত্য ঘটনা। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে ডাক্তারদের অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে হয়। তারপরও পান থেকে চুন খসলেই মারপিট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা তো আছেই। সিলেটে এক ছাত্রলীগ নেতা এক ডাক্তরকে রেপ করার হুমকি দিয়েছে। এরকম অনিশ্চিত অনিরাপদ পরিবেশে, তীব্র বঞ্চনা আর বৈষম্যের মধ্যে কাজ করতে হয় ডাক্তারদের। তারপরও ডাক্তাররা গ্রামে থাকতে চান না, এটা তো মিথ্যা নয়।

কর্মস্থলে অনুপস্থিতির প্রবণতা ডাক্তারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। মাশরাফি তো মাত্র একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। যেকোনো সময় গ্রাম পর্যায়ের যেকোনো হাসপাতাল পরিদর্শনে গেলেই এ চিত্র পাওয়া যাবে। তাই অন্যের সমালোচনা করার আগে আয়নায় আগে নিজের চেহারাটা দেখে নিন। বৈষম্য আর বঞ্চনার কথা জেনেই তো আপনারা চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন। বঞ্চনার বিরুদ্ধে কথা বলুন। কিন্তু আগে নিজের দায়িত্বটা ঠিকমত পালন করুন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাশরাফিকে আক্রমণ করার অভিযোগে ছয় ডাক্তারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংখ্যাটা কিন্তু আরো অনেক বেশি। ডাক্তাররা প্রতিক্রিয়া জানাবেন না, তেমন দাবি আমি করছি না। তবে সে প্রতিক্রিয়া যেন হয় শালীন, তাদের পেশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এটা তো মানতেই হবে, ডাক্তারদের পেশাটা বিশেষ কিছু। সাধারণ আর দশটা পেশার মত নয়। সাধারণ মানুষের কাছে ডাক্তাররা দ্বিতীয় ঈশ্বর। কথায় কথায় তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানোটা মানানসই নয়। কথায় কথায় হুমকি দেওয়া, মাস্তানের মত আচরণ ডাক্তারদের জন্য শোভন নয়। বয়সজনিত কারণে তরুণ ডাক্তারদের ক্ষুব্ধ হওয়ার তবু কিছু ব্যাখ্যা থাকে। কিন্তু নেতারাই যদি উস্কানিমূলক আচরণ করেন, তাহলে তরুণদের দোষ দিয়ে লাভ কী?

মাশরাফির ইস্যুর সময় চার চিকিৎসককে বরখাস্ত করার পর চট্টগ্রাম বিএমএর সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘চলেন না একদিন সারাদেশের চিকিৎসকরা ওয়াকওভার ওয়াকওভার খেলি, তাহলে বুঝতো চিকিৎসক কী? তার প্রয়োজন আছে কি-না?’ তিনি একই সঙ্গে মাশরাফির খেলা অর্থাৎ ক্রিকেটকে খাটো করেছেন। আবার ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন। এর আগেও চট্টগ্রামে এক সাংবাদিকের শিশু সন্তানের ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগে অভিযুক্ত ডাক্তারকে থানায় নেওয়ার ঘটনায় তিনি পুলিশ ও সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছিলেন। এই ডাক্তার নেতার আচরণ বরাবরই মাস্তানদের মত। নেতার যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ তরুণ ডাক্তারদের কাছ থেকে কীভাবে আপনি ভালো আচরণ আশা করবেন?

ছয় ডাক্তারকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হলেও ধর্মঘটের হুমকি দিয়েও ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী কিন্তু ধরাছোয়ার বাইরে।

আমরা ডাক্তারদের সাথে আছি, পাশে আছি। তাদের সব কষ্ট, বঞ্চনা, বৈষম্য আমাদেরও ব্যথিত করে। সরকার না হলেও ডাক্তারদের আমরা মাথায় তুলে রাখি। তারা যেন সাধারণ মানুষের মত কথায় কথায় প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে, মাস্তানের মত হুমকি দিয়ে তাদের সে আসন নষ্ট না করেন। সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, প্রয়োজনীয় ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হোক; তাদের প্রাপ্য মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হোক; সারাদেশের হাসাপাতালগুলোকে আধুনিক করা হোক। কিন্তু ডাক্তাররা যেন যেখানে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেখানেই দায়িত্বটা পালন করেন। কেউ তাদের ভুলটা ধরিয়ে দিলে যেন রাগ না করেন, যেন নিজেদের শুধরে নেন।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :