Barta24

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

সাগরে মরণযাত্রা

সাগরে মরণযাত্রা
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪
ফরিদুল আলম


  • Font increase
  • Font Decrease

ভাগ্যান্বেষণে দেশ ছাড়লেন তারা। ইউরোপে ঢুকতে পারলেই লাখ লাখ টাকার হাতছানি– এমন স্বপ্নে বিভোর হয়ে যাত্রা পথের কণ্টককে তুচ্ছ জ্ঞান করে ছুটলেন। কেউ একা, কেউ বা পরিবার সমেত। এর মধ্যে সিলেট অঞ্চলের একই পরিবারের চারজন রয়েছেন, যারা তাদের এই মরণ যাত্রার টিকিট কেটেছিলেন প্রতিজনের জন্য আট লাখ টাকা করে, অর্থাৎ মোট ৩২ লাখ টাকায়। ১১ মের মর্মান্তিক নৌকাডুবির ঘটনায় সাগরে সলিল সমাধি ঘটেছে ৬৫ জনের, যার মধ্যে কমপক্ষে ৩৭ জন বাংলাদেশি। লিবিয়া থেকে ইতালির উদ্দেশে যাওয়া ট্রলারটি তিউনিসিয়ার উপকূলে দুর্ঘটনায় পড়ে। যদিও ১৬ জন বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে যারা বাঁচলেন, তারা কি সত্যিই বাঁচলেন? সব কিছু হারিয়ে এই বেঁচে থাকা নাকি মৃত্যু, কোনটা শ্রেয়? এই প্রশ্ন কি তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে না?

আসলে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে এ ধরনের দুর্ঘটনা। আর এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এমনটা ধরে নিয়েই যারা যাওয়ার তারা যাচ্ছেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগর পারি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছুতে গিয়ে প্রতি তিনজনের একজন হয় ধরা পড়েন, নয় ডুবে মরেন। জীবন আর মৃত্যুকে এভাবে দুই হাতের মধ্যে নিয়ে যারা লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেন, আপাতদৃষ্টিতে তারা মৃত্যুকে ফাঁকি দিলেও জীবনধারণ এবং টিকে থাকার প্রতি মুহূর্তের প্রবল প্রতিবন্ধকতা আর অনিশ্চয়তা তাদের কাছে মৃত্যুর বিভীষিকা হয়ে ধরা দেয় নিয়তই।

এ ঘটনা কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। এর আগে ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল ভূমধ্যসাগরে এক ট্রলারডুবিতে নয় শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় ইউরোপজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়। রাজনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনার জন্য লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানসহ বিভিন্নস্থানে যুদ্ধের ফলে মানবিক বিপর্যয়কে দায়ী করেন। তখন এই ব্যবস্থা রোধকল্পে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ১০ দফা কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় যৌথ টহলদারী ব্যবস্থা পরিচালনা করা; বিশেষত লিবিয়াসহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সব পাচারকারী জলযানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া। এর জন্য বিশেষ বাজেটও বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।

তবে যে দু’টি বিষয়কে সেসময়, এমনকি এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে তা হচ্ছে- প্রথমত, মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন এসব মানুষের দুর্দশার পেছনে তাদের করণীয়। দ্বিতীয়ত, অবৈধপন্থায় যেসব অভিবাসী রয়েছেন তারা তো কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের দেশগুলোতে বসবাস করছেন। সেক্ষেত্রে বৈধ প্রক্রিয়ায় দক্ষ জনশক্তি আনয়নের ব্যাপারে জনঅধ্যুষিত দেশগুলোর সাথে বোঝাপড়ার ব্যবস্থা এ ধরনের ব্যবস্থা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হয়।

একইভাবে, যে দেশগুলো থেকে ব্যাপক হারে ইউরোপমুখী অভিবাসনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাদের অভ্যন্তরীণ নীতির শিথিলতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের সীমাবদ্ধতা এই ক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অভিবাসনের ক্ষেত্রে পুশ এবং পুল – এই দু’টি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে কেবল বাংলাদেশকে একটি কেস হিসেবে বিবেচনা করে আলোচনা করতে গেলে আমরা দেখব যে দেশে চরম বেকারত্ব, বিশেষতঃ শিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে তাদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ণ না হওয়া, সরকারি চাকরিখাত ক্রমাগতভাবে বাণিজ্যমুখী হয়ে যাওয়া, রাজনৈতিক বিবেচনা ইত্যকার বিষয়গুলো একশ্রেণির শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ফলে দেশে বেসরকারি খাতের বিকাশের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণির মানুষের চাকরির সুযোগ যতটুকু বেড়েছে, শিক্ষিত তরুণদের জন্য সেই সুযোগ তার চেয়েও বেশি সংকুচিত হয়ে গেছে। উপায়ান্তর না দেখে এদের অনেকেই জানা অজানা অনেক শংকা মাথায় নিয়ে ইউরোপের পথে পা বাড়ান। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা মানুষের কাছে ইউরোপ যেন এক চোখ ধাঁধানো স্বপ্নের নাম। অনেকের কাছে শুনে, কিছুটা যাচাই করে, আবার অনেকটাই যাচাই না করেই সেই স্বপ্নের আকর্ষণে দুর্নিবার ছুটে চলা এই মানুষগুলোকে যেমন কক্ষচ্যুত করে, যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে সীমাবদ্ধতা এ ধরনের প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

১১ মে ভূমধ্যসাগরে এক নৌকা ডুবিতে নিহত প্রায় ৬০ জন অভিবাসীর অধিকাংশই ছিল বাংলাদেশি

বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় যদি আমরা আমাদের অভিভাসী মানুষের হিসেব করি, তবে দেখব যে সংখ্যাটি নিতান্ত কম নয়। এক কোটিরও বেশি প্রবাসী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করে তাদের কষ্টার্জিত আয় এদেশের স্বজনদের পাঠাচ্ছেন, যা আমাদের রেমিট্যান্সের অন্যতম খাত। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এদের একটি বড় অংশই কিন্তু বৈধ পথে নয়, অবৈধ পথে এবং বিভন্ন ফাঁক ফোঁকর খুঁজে, জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে তাদের আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় যে, প্রতিবছর আমাদের শ্রমশক্তি রপ্তানি কমছে, আর এই সম্ভাবনাময় খাত থেকে বিশাল আয়ের সুযোগটি আমাদের কাছ থেকে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে ১০ লাখ শ্রমিক বিদেশে গেলেও সংখ্যাটি ২০১৮ সালে কমে দাঁড়ায় ৭ লাখে এবং এ বছর তা আরও কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে- বাংলাদেশের এই জনশক্তি প্রেরণ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মধ্যেই থমকে আছে। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও গত ছয় বছর ধরে তা বন্ধ রয়েছে। যেখানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সেখানে আমাদের শিক্ষিত তরুণদের সর্বস্ব খোয়ানোর পরিবর্তে এই অর্থের একটি অংশ দিয়ে যদি দক্ষতা বৃদ্ধির যথাযথ প্রশিক্ষণ দেশে নিশ্চিত করা যেত, তবে আমাদের সম্ভাবনাগুলোর এমন অপমৃত্যু কিছুটা হলেও ঠেকানো যেত।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :

কেন এই ছন্দপতন

কেন এই ছন্দপতন
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সমাজ স্বাভাবিক জায়গায় নেই। অস্বাভাবিক আচরণ করছে। এই আচরণ নতুন নয়। তবে এবার অস্বাভাবিকতার চূড়ান্ত মাত্রায় বুঝি পৌঁছে গেল। সমাজ যাদের নিয়ে তৈরি, সেই মানুষেরা এখন তার গুণশূন্য। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এখন আর মানবিক উপকরণ চোখে পড়ছে না। মানুষ এমন আচরণ করছে, যা পশুর মধ্যেও অনুপস্থিত। তাহলে মানুষ এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?

আপনি বাড়ি থেকে বের হলেন। পথের কোথাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে দিয়ে চলাচল করা কারো দিকে তাকাচ্ছেন। এমনিতেই তাকাচ্ছেন। কোনো শিশুকে দেখে তাকাতে পারেন। আপনার এই তাকানো দেখে এক দল হত্যাকারী আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। যারা ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাদের অনেকেই হয়তো এতোক্ষণ আপনার আশপাশেই ছিল। একজন বা দুইজন আপনার ওপর ঝাঁপ দিল তো ব্যস অন্য পথচারীদের একটি অংশ আপনাকে না বাঁচিয়ে ‘গণ’তে যোগ দিল। আপনি হয়ে গেলেন ছেলেধরা। কিংবা কোনো মেয়েকে উত্ত্যক্তকারী। আপনাকে কেউ বাঁচাতে আসবে না। দূরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে থাকবে।

পথের কথা বাদ দিন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ঘর থেকে একজন মাকে নামিয়ে এনে হত্যা করে ফেলল। প্রতিবন্ধী একজনকেও মেরে ফেলা হলো ছেলেধরা সন্দেহে। সেই হত্যাকাণ্ড সমাজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে উপভোগ করল। ঢাকাই চলচ্চিত্রের মন্দা বাজারে এই দৃশ্য বেশ উপভোগ্য এখন সমাজের কাছে।

সমাজটাকে দেখলে আপনার মনে হবে হতাশায় ডুবে আছে। ব্যক্তিগতভাবে হয়তো আপনি এবং আমিও তাই। কেন এই হতাশা? দুর্নীতির সরলীকরণ এর একটি কারণ অবশ্যই। প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে মৃদু বা ভয়াবহ দুর্নীতির সঙ্গে পেঁচিয়ে আছি। নিজে দুর্নীতি করছি অথবা সয়ে যাচ্ছি। দুর্নীতি সামাল দেওয়া, ভোগ করাও সহজ নয়। নানা দিক সামাল দিয়ে চলতে হয়। যখন নকশা মতো হচ্ছে না, তখন হাজার কোটি টাকার মালিকের মধ্যেও হতাশা দেখা দেয়। আবার আপনি নিজে দুর্নীতি করছেন না, কিন্তু দুর্নীতির শিকার। নীরবে সয়ে যেতে যেতে আপনি হতাশার ব্যাধিতে আক্রান্ত। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বাণিজ্যের ‘কড়ি’। কড়ি দিয়ে তারা সনদ কিনছে ঠিকই কিন্তু যুৎসই চাকরি পাচ্ছে না। সাধারণ কৃষক, উৎপাদক তার ফসল ও পণ্যের দাম থেকে বঞ্চিত। তারপরও সমাজের আকাশে টাকা উড়ছে। ওই টাকা ধরতে না পেরে কেউ হতাশ। আবার কেউ ধরতে পেরে সেই টাকা ভোগ করতে করতেও এক ধরনের হতাশা এসে তাদের ঘিরে ধরেছে।

বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা আছে। অপরাধের তদন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দ্রুত আদালতে পৌঁছে না। হিমঘরে জমতে থাকে। অপরাধের কারণ ও অপরাধীদের সঙ্গে রাজনীতির এখন প্রবল আত্মীয়তা। ফলে অপরাধের স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়া সচল না দেখে সাধারণের মধ্যে এক ধরনের হতাশার নিম্নচাপ তৈরি হয়। আমরা বুঝি এখন সেই নিম্নচাপের ঘূর্ণি দেখতে পাচ্ছি। এই ঘূর্ণিই নিজেকে প্রকাশের জন্য গুজবের ধুলি খুঁজে বের করছে। ফলাফল গণপিটুনি, হত্যা ও ধর্ষণ। এই ঘূর্ণি থেকে সমাজ, রাষ্ট্র পরিত্রাণ পাবে কোন উপায়ে? একবারেই যে ঘূর্ণি মোকাবেলার সাধ্য নেই আমাদের, তা নয়। আছে। যে স্বাভাবিক রাজনৈতিক অনুশীলন দেখে আমরা অভ্যস্ত, তা যদি আবার ফিরে আসে, তবেই দেখা যাবে হতাশার নিম্নচাপ কাটতে শুরু করেছে। মানুষ, সমাজ স্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেছে। অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াও তখন স্বাভাবিক ছন্দে চলতে শুরু করবে।

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র