Alexa

খাদ্য নিরাপত্তা: নামীদামি কোম্পানিও আস্থাহীন!  

খাদ্য নিরাপত্তা: নামীদামি কোম্পানিও আস্থাহীন!   

ছবি: বার্তা২৪.কম

হাইকোর্ট নির্দেশনা না দিলে কেউ টেরই পেতো না, প্রাণ, এসিআই, ওয়েল ফুড ইত্যাদি নামীদামি কোম্পানির পণ্য সামগ্রীর অবস্থা কত শোচনীয়! বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার করুণ চিত্রটিই এবার দেখা গেল।

কে জানতো, চটকদার বিজ্ঞাপন আর নামীদামি কোম্পানির মুখোশ চাপিয়ে এদেশে নিকৃষ্ট খাদ্য সামগ্রী বিক্রি করা হয়? এদেশে উপরে ফিটফাট আর ভেতরে সদরঘাটের মতো জালিয়াতি করা হয় খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসায়। দেশের তথাকথিত শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির এমন ফেরেববাজি অকল্পনীয়।

পবিত্র রমজান মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোজা ও রোজাদারদের প্রতি সম্মান ও সহযোগিতার নিদর্শন হিসেবে জিনিসপত্রের সরবরাহ বাড়ানো হয়, কমানো হয় দাম। অথচ বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে উল্টো মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। সৃষ্টি করা হয়, কৃত্রিম সংকট। ভেজাল ও মানহীন খাদ্যে বাজার সয়লাব করা হয়!

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নস্যাৎ করতে শুধু অনামা কোম্পানি নয়, নামীদামিরাও পিছিয়ে নেই। খোদ হাইকোর্টের নির্দেশনায় তেমনি চিত্র পাওয়া গেছে। বার্তা২৪.কমের খবরে সেই মারাত্মক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

প্রাণ-এসিআইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২ ভেজাল পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ

খবরে বলা হয়, বিভিন্ন নামীদামি প্রতিষ্ঠানের ৫২ ভেজাল পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। শুধু তাই নয়, ১০ দিনের মধ্যে এসব পণ্য প্রত্যাহার করতেও বলা হয়েছে। আদালত বলছেন, এসব পণ্য নষ্ট করে ফেলতে হবে, যাতে তৃতীয় কারও হাতে না যায়।

একই সঙ্গে এসব খাদ্যপণ্য বিক্রি ও সরবরাহে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের প্রতি এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রোববার (১১ মে) হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সম্প্রতি ২৭ ধরনের ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২টি নিম্নমানের ও ভেজাল পণ্য রয়েছে। এর আগে ২ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিএসটিআই।

তালিকায় এমন অনেক কোম্পানি আছে, যেগুলোকে মানুষ বড় ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান মনে করে। কিন্তু এরাও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। মানুষকে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের গ্যারান্টি দিতে পারেনি।

অথচ এসব তথাকথিত বিখ্যাত ও বড় কোম্পানি বিজ্ঞাপনের বাহারে সবার চোখে ধুলা দিয়ে চলেছে দিনের পর দিন। মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে এবং ভুল তথ্য দিয়েছে বিজ্ঞাপনের আড়ালে। ফলে এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তীব্র সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। এদের পণ্য বর্জন করে সামাজিকভাবে এসব জালিয়াত কোম্পানিকে 'না' বলা দরকার।

সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি মিডিয়াকেও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। পয়সা দিলেই সত্যাসত্য বিবেচনা না করে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারেও সংযমী হতে হবে মিডিয়াকে। তাদেরও জনস্বার্থে শক্তিশালী নীতি ও নৈতিকতা ধারণ করতে হবে। 

খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকে বাংলাদেশ সম্ভবত সবচেয়ে ভঙ্গুর অবস্থার একটি দেশ। যে দেশে ফলমূল, মাছ, সবজি, মিষ্টি মুখে দেওয়ার আগে ১০ বার ভাবতে হয়, ফরমালিন, কার্বাইড মেশানো খাদ্য সামগ্রী দিব্যি খোলা বাজারে কেনাবেচা করা যায়, কেমিক্যাল পলিসি বা রাসায়নিক নীতি না থাকায় যে কেউ যে কোনও রাসায়নিক দ্রব্য কিনে খাবারে মেশাতে পারে, বিপজ্জনক রং ও কেমিক্যাল দিয়ে খাবারের নামে বিষ খাওয়ানো সে দেশেই সম্ভব।

পচা খেজুর, ডাল, চিনি, আটা, ময়দা কম দামে পশু খাদ্য হিসেবে কিনে এনে এদেশে চটকদার প্যাকেটে ভরে মানুষকে খাওয়ানো চলে। ড্রাকুলার মতো রক্ত পিপাসী দানবীয় সিন্ডিকেট এদেশের খাদ্য ব্যবস্থাকে কব্জা করে রেখেছে। মানুষের জীবনের ঝুঁকির বিনিময়ে এদেশে খাদ্যের নামে বিষ ও অখাদ্য খাইয়ে মুনাফা লুণ্ঠন করা হচ্ছে। চুনোপুঁটি অসাধু ব্যবসায়ীদের মাথার ওপর উপবিষ্ট চরম অনৈতিক নামীদামি কোম্পানিগুলোও এহেন ঘৃণ্য কাজ করে চলেছে।

বাংলাদেশের চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি দেখে স্থির থাকা কোনও মানবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সবার কর্তব্য হলো, এই অসাধু চক্রকে প্রতিহত করা। বাংলাদেশের বিপুল জনতাকে বাঁচানোর স্বার্থে খাদ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় লিপ্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের জরুরি কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :