Alexa

সব মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই

সব মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪

পরপর দুদিনের দুটি ঘটনা আমাদের ভয় পাইয়ে দিয়েছে। মুক্তচিন্তার দুজন মানুষকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একজন কবি, একজন আইনজীবী। মঙ্গলবার (১৪ মে) বরিশালের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় কবি হেনরি স্বপনকে। আর বুধবার (১৫ মে) ঢাকার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় অ্যাডভোকেট ইমতিয়াজ মাহমুদকে। আদালত জামিন আবেদন বাতিল করে দুজনকেই কারাগারে পাঠিয়েছেন। ইতোমধ্যে দুজনেরই আবার জামিন হয়েছে। তবে তাদের জামিন হওয়াটা যতটা স্বস্তির, গ্রেফতার হওয়া তারচেয়ে অনেক বেশি শঙ্কার। যম যে বাড়ি চিনে গেল সেটা বেশি ভয়ঙ্কর।

কবি হেনরি স্বপনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। আর ইমতিয়াজ মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তথ্য প্রযুক্তি আইনের বহুল বিতর্কিত ৫৭ ধারায়। কবি হেনরি স্বপনের বিরুদ্ধে অভিযোগ খ্রিস্টানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার। আর ইমতিয়াজ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সাম্প্রদায়িক উস্কানির।

এটা ঠিক এখন সময় বদলে গেছে, বদলেছে অপরাধের ধরনও। সাইবার অপরাধ এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাথাব্যথার কারণ। নতুন অপরাধ দমনে পুরনো আইনে কাজ হচ্ছিল না। তাই এসেছে নতুন নতুন আইন। কিন্তু শঙ্কাটা হলো এসব আইন অপরাধ দমনের চেয়ে মানুষের কণ্ঠ দমনেই যেন বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। সাংবাদিকরা বরাবরই আইনের এই কালো ধারা এবং এর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। নতুন আইনে বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস থাকলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা রেখেই করা হয়।

তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অনেকগুলো ধারায় ছড়িয়ে দেয়া হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই সব কালো ধারার বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন সাংবাদিকরা। কিন্তু লাভ হয়নি। তাদের প্রবল আপত্তি সত্বেও আইনটি পাশ হয়ে যায়। তখন আইনমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইন ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের একক অধিকার নয়। সমাজের সব মানুষের যৌক্তিক বিধিনিষেধ সাপেক্ষে মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর মত প্রকাশের স্বাধীনতা সমান্তরাল। একটা ছাড়া আরেকটা অর্থহীন।

সংবিধানে একই অনুচ্ছেদে বিধিনিষেধ সাপেক্ষে দুটি অধিকারই নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে...

(ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং

(খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’

কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের প্রাথমিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু স্বাধীনতা মানেই যা ইচ্ছা তাই বলা নয়। সংবিধানেও মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা দেয়া হয়নি।

স্বাধীনতার সাথে অবশ্যই দায়িত্বশীলতার ব্যাপারটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আইন প্রণয়ন করা হয় সমাজে শৃঙ্খলা আনার জন্য। কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, শৃঙ্খলা আনার চেয়ে শৃঙ্খলিত করার ব্যাপারেই আমাদের আগ্রহ বেশি।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকেও সম্প্রতি বাংলাদেশের চার ধাপ অবনমন ঘটেছে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাহীনতার ব্যাপারে সরকারের দায় যতটা, আমি মনে করি সাংবাদিকদের দায় তারচেয়ে কম নয়। সরকার তো চাইবেই গণমাধ্যম তাদের পক্ষে থাকুক। কিন্তু সরকারের এই চাওয়া পূরণে সাংবাদিকদের আগ্রহই বেশি। আড়ালে-আবডালে সরকার যতটুকু ভয় দেখায়, সাংবাদিকরা ভয় পায় তারচেয়ে বেশি।

সেলফ সেন্সরশিপের আবরণে ঢাকা পড়ে গেছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। এই সেলফ সেন্সরশিপের ব্যাপারেও সরকারের আইনের চেয়ে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক আনুগত্যের ভূমিকা বেশি।

গণমাধ্যম নিয়ে সরকার নিশ্চিন্ত হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে ততটা নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। গণমাধ্যম চুপ থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অনেক বেশি সরব। এখানে প্রতিবাদ হয় তাৎক্ষণিক, জনমত গড়ে ওঠেও তাৎক্ষণিকভাবেই। তাই সরকারের নজর এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকেই বেশি। আমিও মনে করি গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নজর রাখা দরকার। গণমাধ্যমের তবু কিছু শৃঙ্খলা আছে, নীতিমালা আছে, এথিকস আছে; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসবের কোনো বালাই নেই।

কিন্তু সরকার মনে হয় ভুল জায়গায় নজর দিচ্ছে। ইউটিউবে শত শত ওয়াজের ভিডিও পাওয়া যায়। যেগুলো বিদ্বেষ ছড়ায়, ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে ভুল বার্তা ছড়ায়। অনেকগুলো ওয়াজ আছে, যা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার মত। কিন্তু সেই ওয়াজ নিয়ন্ত্রণের কোনো চেষ্টা নেই, উদ্যোগ নেই। ফেসবুক প্রতিদিন কত লোক ঘৃণা ছড়ায়, হিংসা ছড়ায়, গাল দেয়, হুমকি দেয় তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

অথচ বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে সরকারের রাগ মুক্তচিন্তার মানুষদের ওপর। এবার ইস্টার সানডের প্রার্থনার সময় শ্রীলঙ্কার গির্জা ও ফাইভ স্টার হোটেলে বোমা হামলা চালায়। কিন্তু বোমা হামলার পরও বরিশালের গির্জায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ কবি হেনরি স্বপন ‘রোম যখন পুড়ছে বিশপ সুব্রত তখন বাঁশি বাজাচ্ছে’ শিরোনামে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বরিশালের যাজকদের সমালোচনা করেছিলেন।

এ ঘটনায় প্রথমে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। পরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে মামলা করা হয়। যে মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার স্ট্যাটাসটি আমি পড়েছি। সেখানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার মত কিছু পাইনি। কবি হেনরি স্বপন নিজেও একজন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। বরং শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলার পর গোটা বিশ্ব যখন শোকস্তব্ধ, তখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান একজন নাগরিক হিসেবে আমার অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। আগে জানলে আমি আরও কড়া ভাষায় লিখতাম।

বরিশালের যে যাজক মামলা করেছেন, তার তো শোকের সময় গান বাজনা করায় লজ্জায় নিজেকে লুকিয়ে রাখার কথা ছিল। তিনি তা না করে চোরের মায়ের বড় গলা করে মামলা করতে গেছেন। ধর্মযাজকরা সমাজের পথপ্রদর্শক। তাদের দেখে মানুষ শিখবে। মানুষ তাদের অনুসরণ করবে। এটা সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সত্যি।

তাই ধর্মীয় গুরুদের আরও বেশি সহনশীল হওয়া উচিত। তাদের অনুভূতিও আরও শক্ত হয়। এত অল্পে অনুভূতিতে আঘাত লাগলে তো মুশকিল।

কবি হেনরি স্বপনের মুক্তির দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সোচ্চার, তখনই অ্যাডভোকেট ইমতিয়াজ মাহমুদকে গ্রেফতারের খবর আসে। ২০১৭ সালে খাগড়াছড়িতে দায়ের করা একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা ছিল। পুলিশ সেটা তামিল করেছে মাত্র। একসময় ছাত্র ইউনিয়ন করা ইমতিয়াজ মাহমুদ ইদানীং ফেসবুকে খুব সরব। তিনি মানবাধিকার ইস্যু, নারী অধিকার নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।

তবে তিনি সবচেয়ে বেশি সোচ্চার পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে। সংবিধানে যাদের ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বলা হয়, আরও অনেকের মত ইমতিয়াজ মাহমুদও তাদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি মনে করেন পার্বত্য এলাকায় সমস্যার জন্য সমতল থেকে যাওয়া সেটেলাররাই দায়ী। তার বক্তব্যের সাথে আপনার দ্বিমত থাকতে পারে। আপনি তার বক্তব্যের বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি দিয়ে লিখতে পারেন। কিন্তু মতে না মিললেই মামলা-গ্রেপ্তার সংবিধানে দেয়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সমান্তরাল নয়।

আমরা স্বাধীনভাবে আমাদের মতপ্রকাশ করতে চাই। তাই চাই মতপ্রকাশের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো বাতিল করা হোক। ‘সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই ধারা ব্যবহার করা হবে না’ এইটুকু আশ্বাসে আমি আশ্বস্ত নই। আমি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন চাই, সব মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও চাই। যুগোপযোগী আইন চাই, তবে তা যেন শৃঙ্খলা আনে, শৃঙ্খলিত না করে; আমাদের মুক্ত মতকে রুদ্ধ না করে।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :