Alexa

ইকরামুল্লাহর বিপদ

ইকরামুল্লাহর বিপদ

মোকাম্মেল হোসেন, ছবি: বার্তা২৪

পুরো পত্রিকা হেফজ হয়ে গেল; অথচ নাশতার কোনো খবর নেই। ইকরামুল্লাহ ভাবলেন, বোধকরি স্পেশাল কিছু তৈরি হচ্ছে; সেজন্যই দেরি। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর রান্নাঘরে উঁকি মারলেন ইকরামুল্লাহ। রান্নাঘরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শোয়ার ঘরেও কেউ নেই। বিস্মিত হয়ে ছাদে গেলেন ইকরামুল্লাহ। দেখলেন, জইতরি উদাস ভঙ্গিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। জইতরির কাঁধে হাত রেখে মোলায়েম স্বরে ইকরামুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন-
: জইতরি, কী হইছে!
: কিছু হয় নাই।
: আমি সেই কখন অফিস থেইকা ফিইরা হাতমুখ ধুইয়া বইসা রইছি!
: অজু করার পর বইসা থাকার প্রয়োজন কী? নামাজ পইড়া ফেল।
: এখন কোন ওয়াক্তের নামাজ পড়ব!
: ওয়াক্ত খুঁইজা না পাইলে নফল নামাজ পড়বা।

জইতরির এরকম নির্লিপ্ত আচরণ ও চ্যাটাং-চ্যাটাং কথাবার্তার রহস্য কী বুঝতে পারছেন না ইকরামুল্লাহ। গলার স্বর আরও নরম করে ইকরামুল্লাহ বললেন-
: জইতরি, বিগত তের বছরের দাম্পত্য জীবনে তোমার কাছ থেইকা এমন ব্যবহার কখনও পাই নাই। আমি অফিস থেইকা ফিরনের আগেই তুমি নাশতা রেডি কইরা বইসা থাকতা! আইজ হঠাৎ কী হইল তোমার; আমার সঙ্গে এইরকম আচরণ করতেছ কীজন্য?

জইতরির মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। শরীরে একটা মাছি বসলেও মানুষ তার প্রতি মনোযোগ দেয়। অথচ ইকরামুল্লাহর প্রতি জইতরি ভ্রুক্ষেপই করছে না! খুবই অপমানজনক ব্যাপার। সিনা টান করে গলায় জমে থাকা কফ পরিষ্কারের পর উঁচুগলায় ইকরামুল্লাহ বললেন-
: সারাদিন খাটাখাটনি কইরা বাসায় ফিরছি...

ইকরামুল্লাহর পরিবর্তিত অবয়ব তেরছা চোখে দেখে নিয়ে একই সুরে জইতরি বলল-
: তুমি খাটাখাটনি কইরা ফিরছো আর আমি ঠ্যাংয়ের ওপর ঠ্যাং তুইল্যা বইসা রইছি।
: সেই কথা বলি নাই।
: কী বলছো?
: নাশতার কথা বলছি।
: নাশতা নিজে বানাইয়া খাওগা।
: বুঝলাম না!
: প্রতিদিন পত্রিকার প্রতিটা লাইন মুখস্থ করো; কিছু চোখে পড়ে নাই?
: কী চোখে পড়বে?
: আমাদের একজন মন্ত্রী যে বাংলাদেশরে কানাডার সমতুল্য হওয়ার ঘোষণা দিছেন; এই খবর দেখো নাই?
জইতরির কথা শুনে এমন কষ্টের মধ্যেও ইকরামুল্লাহ খানিকক্ষণ হাসলেন। কোথায় আলি আব্বাস, আর কোথায় গাবগাছ। যতসব লাইলি-মজনুর সংলাপ- আ হো পেয়ার করো; আ হো বগল বাজাও। ইকরামুল্লাহ এই মুহূর্তে নিজেকে আলিবর্দি খাঁর নাতি নবাব সিরাজদ্দৌলা বলে ঘোষণা দিতে পারেন। কিন্তু লাভ কী তাতে? কোথায় নবাব সিরাজদ্দৌলা আর কোথায় ইকরামুল্লাহ!

ইকরামুল্লাহ ভাবলেন, প্রবৃদ্ধি সমান হলেই বাংলাদেশ কানাডা হয়ে যাবে? ব্যাপারটা কি এতই সহজ? যে দেশে মানুষের ঘাড়ের ওপর ফ্লাইওভার ভেঙ্গে পড়ে, হরতাল পালনের নামে আরোহীসহ গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়; তার সঙ্গে আফ্রিকার গোত্রশাসিত কোন জনপদের তুলনা চললেও কানাডার সঙ্গে চলে না- এ কথা জইতরিকে কে বোঝাবে? জইতরির হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, বেশ ভালোভাবেই তার ব্রেনওয়াশ সম্পন্ন হয়েছে। নিরীহ ভঙ্গিতে ইকরামুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন-
: এই মুহূর্তে তাইলে করণীয় কী!
এক মুহূর্ত দেরি না করে জইতরি বললো-
: কানাডার লাইফস্টাইল ফলো করবা।
: যেমন...
: যেমন সকালে ঘুম থেইকা উইঠা প্রথমেই ঘর ঝাড়– দিবা। তারপর থালা-বাসন মাজবা। একবেলা আমি রান্না করলে আরেক বেলা তুমি রান্না করবা। নিজের কাপড় নিজে কাচবা। গোসল কইরা বাথরুমে লুঙ্গি-গামছা রাইখা ফুরুৎ কইরা বাইর হইয়া যাও, সেইটা চলবে না। পান চিবাইতে-চিবাইতে অফিসে যাওয়া ক্যান্সেল। অফিসে যাওয়ার পথে তোমার দুই পোলারে স্কুলে রাইখা যাবা; ফেরত আনবো আমি। সব কাজ-কাম ফিফটি-ফিফটি রেটে করতে হবে।
ইকরামুল্লাহ আর্তনাদের সুরে বললেন-
: মাবুদে এলাহি, এইসব আমি কী শুনতেছি! আমারে দিয়া ঘর ঝাড়– দেওয়াবে; বাসন-কোসন মাজাবে! জুলেখা তাইলে কী করবে!
: জুলেখারে টিসি দিয়া দিছি। কানাডায় কাজের বুয়া রাখার কালচার নাই।
: আহা রে জইতরি! একজন মন্ত্রীর কথায় তুমি আমাদের এতদিনের কালচার এইভাবে এক কোপে কাইট্যা ফেলবা?
: না কাইট্যা উপায় কী? সময়টাই তো পরিবর্তনের। দিন পরিবর্তনের ঘোষণাদানকারী দলের মন্ত্রী হিসেবে তিনি যে কথা বলেছেন, তার প্রতি সবার শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। শিশু মায়ের পেট থেইকা কথা বলা শিইখা আসে না। আ-আ করতে করতেই আকাশ বলতে শিখে। খালি অর্থনীতির দিক থেইকা কানাডা হইলে চলবে? কালচারেও কানাডা হওন লাগবে।

হাতজোড় করে জইতরির উদ্দেশে ইকরামুল্লাহ বললেন-
: তুমি কানাডিয়ান হও, অস্ট্রেলিয়ান হও কিংবা আমেরিকান হও- কোনো সমস্যা নাই। শুধু রিকোয়েস্ট, আধাঘণ্টার জন্য বাঙালি হইয়া আমারে চাইরটা খাওন দেও; ক্ষিধায় জান যায়।

আবেদন না-মঞ্জুর হল। অগত্যা ইকরামুল্লাহ রান্নাঘরে প্রবেশ করলেন। আলো জ্বালতেই তেলাপোকাদের ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। গ্যাসের চুলা দু’টো ফতফত করে জ্বলছে। কানাডাবাসীর রান্নাঘরে কি তেলাপোকা থাকে; কানাডাবাসীরা কি প্রয়োজন ছাড়া গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখে- এসব প্রশ্ন জইতরিকে করতে গিয়েও নিরস্ত হলেন ইকরামুল্লাহ। খামাকা ক্যাচাল করে লাভ নেই।

ডিম ভাজার পেঁয়াজ-মরিচ ধোয়ার জন্য কলের মুখ খুলতেই নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত পানি বেরুল। ইকরামুল্লাহ মনে মনে জইতরির উদ্দেশে বললেন- মন্ত্রীর কথায় ডগমগ হইয়া যে দেশটারে তুমি কানাডার সমান মর্যাদা দিছো; রান্নাঘরে আইসা দেইখা যাও, তার বাস্তব কন্ডিশন কী!

রাতে বিছানায় শুয়ে মুচড়ামুচড়ি করছিলেন ইকরামুল্লাহ। দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পরও জইতরির মধ্যে মশারি টাঙানোর কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। অগত্যা দাম্পত্য জীবনের ইতিহাসে এই প্রথম মশারি টাঙানোর দায়িত্ব পালন করলেন ইকরামুল্লাহ। চর্চার অভাবে জ্ঞান হ্রাস পায়। ইকরামুল্লাহরও একই দশা হয়েছে। ফলে মশারির ভেতর প্রচুর মশা রয়ে গেল। মশার কামড় খেয়ে কিছুক্ষণ পরপর ইকরামুল্লাহ আঃ উঃ করছিলেন, পাশ থেকে জইতরি বলল-
: যতই উঃ আঃ করো, ঠ্যাং টিইপ্যা দেওয়ার কারবারে আমি আর নাই।
চিঁ-চিঁ সুরে ইকরামুল্লাহ বললেন-
: ঠ্যাং টিইপ্যা দিতে তোমারে কে বলছে?
: বলতে হয় না। ছাগলের ব্যা ডাকেই বোঝা যায়, সে কাঁঠালপাতা খাইতে চাইতেছে; নাকি ভোলানাথরে ডাকতেছে।

ইকরামুল্লাহ ভাবলেন, ভালো মুশকিলেই পড়া গেল! জইতরি যদি এভাবে সব ধরনের সেবাখাত বন্ধ করে দেয়, তাহলে তিনি জিন্দেগি পার করবেন কেমনে? টেনশনে ইকরামুল্লাহর ভালো ঘুম হল না।

পরদিন অফিসে যাওয়ার পথে ভাবতে ভাবতে একটা উপায় বের করলেন ইকরামুল্লাহ। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইকরামুল্লাহ অনেক রাতে বাসায় ফিরলেন। অফিসের বাথরুমে ঢুকে কয়েকবার মাতাল হওয়ার রিহের্সাল করেছেন ইকরামুল্লাহ। এবার ফাইনাল অভিনয় শুরু করলেন। জইতরির চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, সে অবিশ্বাস্য কোনো দৃশ্য দেখছে। ভয়ার্ত গলায় কোনোমতে সে বলল-
: তুমি মদ খাইছো!
: ইয়েস ডার্লিং খাইছি; কানাডা সমতুল্য প্রিয় বাংলাদেশের নামে কিঞ্চিৎ স্বাস্থ্যপান করেছি। বলো ডার্লিং, আমি কি অন্যায় করেছি?
জইতরি সবকিছু নীরবে হজম করল। পরদিন আবার নতুন এক পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হলেন ইকরামুল্লাহ। দুপুরে লাঞ্চ করার সময় মহিলা সহকর্মীকে তিনি বললেন-
: আপা, আইজ বিকালে বাসায় ফেরার সময় একটা নির্দিষ্ট স্থানে বইসা আপনে যদি আমার সঙ্গে পাঁচ টাকার বাদাম খাওয়ায় অংশগ্রহণ করেন, তাইলে আপনেরে আমি চায়নিজ খাওয়াবো।
অফিস থেকে ফেরার পর দরজা খুলে জইতরি ইকরামুল্লাহর সামনে দাঁড়াল। তারপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে অনুযোগের সুরে বললো-
: জামরুলের আব্বা, ছিঃ ছিঃ; তোমার এত অধঃপতন হইছে!
অবাক হওয়ার ভান করে ইকরামুল্লাহ জানতে চাইলেন-
: কী হইছে!
: বিকেলবেলা জামরুলরে লইয়া কোচিং সেন্টার থেইকা ফিরনের কালে দেখলাম, এক মহিলার সঙ্গে পার্কের কোনায় বইসা বাদাম খাইতে খাইতে ফুসুর-ফাসুর করতেছো!
: ওয়েস্টার্ন কালচারে গার্লফেন্ড থাকলে এবং তাদের সঙ্গে ডেটিং করলে কেউ কিছু মনে করে না।
: আরে রাখো তোমার ওয়েস্টার্ন কালচার।
মুচকি হেসে ইকরামুল্লাহ বললেন-
: কানাডার ওপর নাখোশ হইলা মনে হয়!

ইকরামুল্লাহর দিকে কটমট করে তাকিয়ে জইতরি বলল-
: হ; হইছি।
: যে মন্ত্রী এই দেশরে কানাডার সমতুল্য ঘোষণা দিছেন, বিষয়টা শুনলে তো তিনি দুঃখিত হবেন।

ইকরামুল্লাহর কথা শুনে লম্বা দম নিয়ে জইতরি বলল-
: মন্ত্রিত্ব শেষ হওয়ার পর এই দেশ কানাডা হইল, নাকি সুদান হইল- সেইটা লইয়া তার আর কোনো মাথাব্যথা থাকবে না। কিন্তু আমার সংসার তো আর পাঁচবছর মেয়াদী মন্ত্রিত্ব না; এইটা হইল সারাজীবনের ব্যাপার। কাজেই মন্ত্রী-ফন্ত্রীর কথায় নাচানাচি করলে আমার চলবে না! তুমি যাও, হাত-মুখ ধুইয়া আসো; আমি তোমার নাশতা রেডি করতেছি...

আপনার মতামত লিখুন :