মধ্যপ্রাচ্যে ফের উত্তেজনা!

ড. মাহফুজ পারভেজ
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

সংঘাত আর হানাহানি মধ্যপ্রাচ্যের পিছু ছাড়ছে না। ফের সেখানে দেখা দিয়েছে উত্তেজনা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৩০ মে পবিত্র নগরী মক্কায় জরুরি এক বৈঠকে বসছে আরব লীগ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট জিসিসি’র সদস্য রাষ্ট্রগুলো।

ইরাক, বাহরাইন, সিরিয়া ও ইয়েমেনের দগ্ধ পরিস্থিতি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের অসুখি চেহারাটাই বার বার দেখাচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের বলি নারী, শিশু, উদ্বাস্তুদের আদিঅন্তহীন হাহাকার মিশে আছে অঞ্চলটির ঊষর মরুময় ভূগোলে। পুরনো সংঘাতের সাথে নতুন উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় বড় ধরনের সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য।

শনিবার (১৮ মে) সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমুদ্র সীমায় (সৌদি) বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরবের মধ্যে দুটো তেল ক্ষেত্রে হুতি সন্ত্রাসীদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই নতুন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সপ্তাহান্তে উপসাগরে দু’টি সৌদি তেলের ট্যাংকারে হামলা ও সৌদি দুটো তেলের স্থাপনায় ড্রোন হামলার পর অপরিশোধিত তেলের গুরুত্বপূর্ণ একটি পাইপলাইন বন্ধ করে দিতে হয়েছে সৌদি আরবকে।

সৌদি আরব দাবি করেছে যে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সৌদি স্বার্থে আঘাতের চেষ্টা করছে। এসব হামলা এই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা এবং বিশ্বে তেল সরবরাহের ওপর মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে।

সৌদি বার্তা সংস্থা এসপিএ সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, 'এই পরিস্থিতিতে মক্কায় জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে।' এসপিএ আরো জানিয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি যুবরাজ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহামেদ বিন সালমানের সাথে কথা বলেছেন।'

রোববার (১৯ মে) রাজধানী রিয়াদে সংবাদ সন্মেলনে সৌদি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আদিল আল জোবায়ের হুমকির সুরে বলেছেন, 'সৌদি আরব আশা করে বিপদ এড়াতে ইরানের সরকার তাদের শুভবুদ্ধি প্রয়োগ করবে এবং তাদের অনুচরদের দায়িত্বহীন হঠকারী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখবে। না হলে এই অঞ্চলের যে পরিণতি হবে তার জন্য পরে অনুশোচনা করতে হবে।'

পক্ষান্তরে ইরান একাধিকবার হুমকি দিয়েছে যে তাদের ওপর হামলা চালালে তারা তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ যারিফ শনিবার (১৮ মে) বলেন, ইরান কোনো যুদ্ধ চায় না। তবে ইরানের সাথে লড়াইয়ে কেউ জয়ী হবে না।'

শুধু সৌদি আরব বা ইরান নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোও সম্ভাব্য উত্তেজনা ও যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি নিয়ে গভীর শঙ্কায় রয়েছে। বাহরাইন তার নাগরিকদের ইরাক এবং ইরানে যাওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে এবং বলেছে, যত দ্রুত সম্ভব ঐ দুটি দেশ ত্যাগ করতে।

বাহরাইন উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ। এছাড়া বাহরাইন প্রায়ই অভিযোগ করে যে ইরান তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানা স্বার্থের সূত্রে জড়িত থাকায় ইরানবিরোধী দেশগুলোকে প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময় ইরানের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নিলেও চূড়ান্ত যুদ্ধে জড়ায়নি দেশ দু’টি।

তবে, এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বৃহৎ মার্কিন তেল কোম্পানি এক্সন-মোবিল দক্ষিণ ইরাকের একটি তেলক্ষেত্র থেকে তার সব বিদেশি কর্মচারীকে সরিয়ে নিয়েছে। আরব লীগ, জিসিসি দেশগুলো ছাড়াও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তা জ্বালানি তেল উৎপাদকদের সমিতি ওপেক-এর মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও সংঘর্ষকে 'সৌদি বনাম ইরান' ছায়াযুদ্ধ বলছেন। সিরিয়া, ইয়ামেন, বাহরাইন সহ মধ্যপ্রাচ্যের সকল সশস্ত্র সংঘাতের পেছনে সৌদি ও ইরানের হাত দেখতে পাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা।

সৌদি বনাম ইরানের ছায়াযুদ্ধ বা 'প্রক্সি ওয়ার'-এর নেপথ্যে দেশ দুটির মধ্যকার তীব্র মতাদর্শিক লড়াই ভূমিকা রাখছে বলেও মনে করা হয়। সৌদি 'সালাফি' মতবাদের পৃষ্ঠপোষক আর ইরান 'শিয়া' মতের অনুসারী। ব্যাপকার্থে ইসলামের অনুসারী হলেও সৌদি আরব ও অন্যান্য সুন্নি রাষ্ট্রগুলো এই মর্মে অভিযোগ করে আসছে যে ইরান মধ্যপ্রাচ্য তথা ইসলামি দুনিয়ায় শিয়া ক্রিসেন্ট-এর উদয় ঘটাতে চায়।

সৌদি আরব বনাম ইরান তথা সুন্নি বনাম শিয়া দ্বন্দ্বের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে চারটি প্রধান জাতির মধ্যকার স্নায়ুগত সম্পর্ক। চারটি জাতিই কোনও না কোনও সময় মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র মুসলিম জাহানের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ ও যোগ্যতর মনে করে। এরা হলো: আরব, পারশিক, কুর্দি ও তুর্কি।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে উমাইয়া ও আব্বাসিয় বংশের কর্তৃত্বে আরবগণ মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম দুনিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছে। একদা ইরানের পারশিক জাতিগোষ্ঠী সাফাভি, পাহলভি ইত্যাদি বংশের মাধ্যমে বিস্তৃতভাবে মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম এশিয়া শাসন করেছে। এক পর্যায়ে গাজি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নেতৃত্বে কুর্দি জাতি মুসলিম জাহানের হৃত গৌরব ফিরিয়ে বহু বছর নেতৃত্বে আসনে সমাসীন থাকে। সর্বশেষে তুর্কি উসমানিয়া নেতৃত্ব মধ্যপ্রাচ্য, মুসলিম বিশ্বসহ কয়েক শতাব্দীকাল পূর্ব ইউরোপের শাসন পরিচালনা করে।

মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি মতাদর্শিক লড়াইয়ের মতোই জাতিগত দ্বন্দ্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিরিয়া ও ইরাকে মতাদর্শ ও জাতিগত সঙ্কটের কারণে শিয়া, সুন্নি, কুর্দি, আরব প্রায়-সকল পক্ষই কোনও না কোনও ভাবে সংঘাতে জড়িত। তবে বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক অ্যালান জনস্টন এ অঞ্চলে বড় কোনও যুদ্ধের সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখছেন। সাবেক মার্কিন জেনারেল ডেভিড পেট্রেয়াসও বলছেন, 'কোন সর্বাত্মক যুদ্ধের সম্ভাবনা কম।'

কিন্তু থেমে থেমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যে সশস্ত্র সংঘাত চলছে, তা ধ্বংস, হত্যা, ব্যাপ্তির নিরিখে বড় বড় যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ। এমনকি, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, হানাহানি, রক্তপাত, মৃত্যু, উদ্বাস্তুকরণের সুদীর্ঘ ইতিহাস শতবর্ষ স্পর্শ করতে যাচ্ছে।

১৯৪০-এর দশকে আরব-ইসরাইল সংঘাতের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যে যে সঙ্কটের সৃষ্টি করেছিল, তা সমগ্র জনপদ ও জনগোষ্ঠীকে গ্রাস করেছে। বরং দিনে দিনে আরব-ইসরাইল তথা ইহুদি বনাম মুসলিম দ্বন্দ্বের জায়গা দখল করেছে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যকার মতাদর্শ ও জাতিগত সংঘাতের আত্মবিনাশী লেলিহান আগুন, যা মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব ও মুসলিম বিশ্বের বৃহদাংশকে পরিণত করেছে মৃত্যুর বিভীষিকাময় 'নরককুণ্ড'-এ।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আপনার মতামত লিখুন :