Alexa

ভোগবাদের ফাঁদ

ভোগবাদের ফাঁদ

ফজলে রাব্বী খান, ছবি: বার্তা২৪.কম

মানবসভ্যতায় কৃষি যুগের সূচনা হয়েছিল প্রায় ১২০০০ বছর আগে। এর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা যাযাবর শিকারি জীবনে অভ্যস্ত ছিল। কৃষি যুগেই মানুষের ভেতর ব্যক্তিগত সম্পদের ধারণা প্রকট হতে শুরু করে। বেশি জমি মানে বেশি ফসল, পরিবারের সদস্যদের জন্য নিশ্চিন্ত জীবন। কৃষি যুগেই স্থায়ী মানব সমাজের গোড়াপত্তন হয়।

মানবজাতি অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক জীবনের জন্য যাযাবর শিকারি জীবন থেকে কৃষির দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু এর ফলে আরামের পরিবর্তে মানব সভ্যতায় পরিশ্রমের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। যেখানে শিকারি মানবজাতি কয়েক ঘণ্টা শ্রমের মাধ্যমেই তার জীবিকা নিশ্চিত করত। সেখানে কৃষি জীবনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম দিয়ে তাকে ফসল উৎপাদন করতে হত। এর সঙ্গে ছিল বৃষ্টি-বন্যা-খরায় ফসল না হাওয়ার শঙ্কা।

অতিরিক্ত ফসল অতিরিক্ত মানব সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রবনতা বৃদ্ধি করে। ফলে প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয় বাড়তি জনসংখ্যার চাপ। ফলশ্রুতিতে মানব সম্প্রদায়ে পরিশ্রমের মাত্রা বাড়তে থাকে আরও দ্রুত বেগে। অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক জীবন মানব সমাজের আর পাওয়া হয়নি।

ভোগবাদ তত্ত্বের প্রবর্তক গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাস। তার সেই তত্ত্ব কালের আবর্তে বস্তুবাদের সঙ্গে মিশে একাকার হয়েছে। বর্তমানে বস্তুগত ভোগ-বিলাসের মাধ্যমে সুখ সাধনাই মানবজাতির চূড়ান্ত লক্ষ্য। এর সঙ্গে যুক্ত ‘রোমান্টিকতা’তত্ত্ব, যা মানব সম্প্রদায়কে শেখায় ‘মন যা চায় তাই করতে হবে’।

ভোগবাদ আমাদের শেখায়, সুখ মানেই বিলাসী সামগ্রী, ব্যয়বহুল ফ্ল্যাট, দামি ফোন, বিলাসী রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া, বিদেশি প্রসাধনী-জামাকাপড় অথবা ছুটিতে বালি-সিঙ্গাপুর বেড়াতে যাওয়া। এমনকি জীবনের সফলতা-ব্যর্থতার মাপকাঠি এখন বিলাসিতা। তাই বস্তুগত বিলাসিতা ছাড়া অন্য কিছুতে আমরা আনন্দ খুঁজে পাই না, কল্যাণকর কাজে উৎসাহ বোধ করি না। ভোগবাদ আমাদের কাছে একটি সামাজিক মিথে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই একটি স্মার্টফোন থাকা সত্ত্বেও, বাজারের সর্বশেষ মডেলের ফোনটি না কেনা পর্যন্ত আমারা সুখী হতে পারি না।

মানব সম্প্রদায় তার জীবনকে আরামদায়ক করতে গিয়ে বেছে নিয়েছে ঢাউস সাইজের টিভি, স্মার্টফোন, এসি, ওয়াশিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, দামি খাদ্যাভ্যাস, ক্রেডিট কার্ড, দেশ-বিদেশে পর্যটনসহ হাজারটা উপকরণ।

গত বছর বিশ্বজুড়ে বিলাসী পণ্যের বাজার ছিল প্রায় ৩২৩,১৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! যার বড় অংশ জুড়ে ছিল কসমেটিক্স-পারফিউম, আধুনিক ফ্যাশনের পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ঘড়ি ও জুয়েলারি। এসব বিলাসী উপকরণ নিশ্চিত করতে একজন মানুষকে আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি পরিশ্রম করতে হয়। মানুষ এখন তার সময় বাঁচানোর জন্য দ্রুত গতির প্লেন-ট্রেন কিংবা গাড়ি ব্যবহার করে। পারস্পারিক যোগাযোগের জন্য ইমেইল, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার/মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারেও মানুষ তার সময় বাঁচাতে পারেনি। বিলাসিতার ফাঁদের সব উপকরণের যোগান দিতে গিয়ে বর্তমান সময়ের একজন মানুষকে যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়, এরপর জীবনকে উপভোগ করার মত কোনো সময় তার কাছে অবশিষ্ট থাকে না। এ ধরনের প্রযুক্তি মানব সম্প্রদায়কে দ্রুততা, তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ও বস্তুগত ভোগের উপকরণ দিলেও, মানুষকে উত্তেজনা, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে পারেনি, বরং যাযাবর বা কৃষি যুগের তুলনায় বর্তমান যুগের মানুষ অনেক বেশি ক্লান্ত ও উদ্বিগ্ন।

বর্তমান সময়ের একজন আধুনিক মানুষকে সপ্তাহে প্রায় ৬০ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়। জাপানিরা ভোগবাদের এই ফাঁদে টিকে থাকার জন্য দিনে আট/নয় ঘণ্টা পরিশ্রমের সঙ্গে প্রতিদিন চার/পাঁচ ঘণ্টা ওভারটাইম করে থাকে। সপ্তাহ শেষে তাদের অনেককেই মেট্রো স্টেশনে জ্ঞানহীন হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অতিরিক্ত এই কাজের চাপে প্রতি বছর জাপানে প্রায় ১০,০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। জাপানি ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘কারোশি’ বা কাজের চাপে মৃত্যু।

পুঁজিবাদী পৃথিবীতে গরিব থাকা ‘অন্যায়’। বিলাসিতা ক্রয়ের এই প্রতিযোগিতায় আমরা প্রতিনিয়ত অনেক বহুজাতিক কোম্পানির ফাঁদে আটকা পড়ছি। আইফোনের মত বিলাসী পণ্য কেনার জন্য তাই চীনের হুয়াং এর মত অনেকেই নিজের কিডনি বিক্রি করে দেয়, ঝাং ও তেং দম্পতিদের মত অনেকেই নিজেদের সন্তানকে বিক্রি করে দেয়।

ভোগের এই স্বপ্ন পূরণের জন্য মানুষ অবিরাম ছুটে চলেছে। প্রতিনিয়ত ক্রেডিট কার্ড, ইএমআই বা ব্যাংক লোনের হাতছানি আমাদের এই অজানার পথে ছুটে চলার গতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সময়ে মানুষ বিয়েতে একদিনের ফটোগ্রাফি বিলাসিতা বা বালি দ্বীপের কয়েক দিনের ভ্রমণের জন্য বছর জুড়ে ইএমআইয়ের বোঝা টানতে এক পায়ে খাড়া। তবুও যতখানি পারা যায় অপ্রয়োজনীয় ভোগ্য পণ্য কিনতে হবে। ভোগবাদ মানুষকে দিয়েছে ক্লান্তিহীন ছুটে চলা আর অবিরাম হতাশা। এই হতাশার কারণে গড়ে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীতে একজন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, বছরে প্রায় ৪০ লাখ, যার বেশিরভাগই উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে।

উন্নত বিশ্বের সেই ভোগের সংস্কৃতিতে ক্রমান্বয়ে আক্রান্ত হচ্ছি আমরাও। আজকের দিনে প্রায় ৩০ বছর পড়াশোনার পর একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটকে ভোগবাদী বিশ্বে টিকে থাকতে প্রতিযোগিতায় নামতে হয় লাখো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে। তারপরও মাস শেষে অর্জিত অর্থের বেশিরভাগই নিজের অজান্তেই চলে যায় ভোগসামগ্রীর পেছনে।

আমাদের সমাজে ঢাউস সাইজের টিভি বা এসি কেনার জন্য সহজলভ্য ইএমআই অফার থাকলেও, চিকিৎসা বা শিক্ষার জন্য অর্থ সহায়তা পাওয়া দুষ্কর। যাদের সহজ শর্তে ঋণ দরকার তাদের জন্য কোনো অফার নেই। তাই কৃষকদের গ্রহণ করতে হয় উচ্চ সুদে ঋণ। উচ্চ সুদের কৃষি ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতি বছর ১২,০০০ কৃষক আত্মাহুতি দেয়, প্রায় সব অনুন্নত বিশ্বে একই অবস্থা।

আমেরিকানরা শুধু বিলাসী জুতা, ঘড়ি এবং অলংকারের পেছনে বছরে ব্যয় করেছে ৭১,৮১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! অপরদিকে, ক্ষুধার কারণে প্রতিবছর মারা যায় নয় মিলিয়ন মানুষ। অথচ খাদ্য নিয়ে আমাদের বিলাসিতার জন্য ৪০% উৎপাদিত খাবার নষ্ট হয়। শুধু আমারিকায় খাদ্য অপচয় হয় ২২২ মিলিয়ন টন, আর সমগ্র সাব-সাহারা আফ্রিকায় মোট উৎপাদিত খাদ্যের পরিমাণ ২৩০ মিলিয়ন টন। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, আমারা পৃথিবীর যে উপকরণটি বিলাসিতা হিসেবে গ্রহণ করছি, সেটা হয়ত অন্য কারো মৌলিক অধিকার ছিল।

মানব সম্প্রদায় আরামদায়ক প্রশান্তির জীবনের জন্য পরিকল্পনা করেছিল প্রায় ১২০০০ বছর আগে। তার সেই ছুটে চলা আজও থামেনি। ইউভ্যাল নোয়া হারারির মতে, আমরা প্রতিনিয়ত বিলাসিতার একটি কারাগার থেকে বেরিয়ে আরও বড় কোনো কারাগারে প্রবেশ করছি।

নোয়াম চমস্কির বিশ্লেষণে পুঁজিবাদের মোড়লরা আমাদের ডুবিয়ে রাখে ব্যস্ততার সাগরে-“Keep the public busy, busy, busy, with no time to think; back on the farm with the other animals.”। দুর্ভাগ্য আমাদের, অজানা গন্তব্যে এই ছুটে চলা আমাদের প্রশান্তি দিতে পারেনি, আমরা আদৌ জানি না আমারা কোথায় ছুটে চলছি? তাই এখন নতুন করে ভাবতে হবে, মরীচিকাময় ভোগের পেছনে এই অবিরাম ছুটে চলা আমাদের আদৌ প্রশান্তি দিতে পারবে কি?

ফজলে রাব্বী খান: প্রকৌশলী এবং কলামিস্ট।

আপনার মতামত লিখুন :