খেতে চাইলাম দুধ, হয়ে গেল ছানা

এরশাদুল আলম প্রিন্স, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪.কম

এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মানুষ যে কত কিছু খেতে চায়, তার হিসেব নেই। আমরা বাঁচার জন্য খাই একথা সত্য। বেঁচে থাকার জন্যই আমাদের আজীবন এই বাঁচা-মরার লড়াই। আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন একটি পেট ও দুইটি হাত দিয়ে। সাথে দুইটি পাও দিয়েছেন। কিন্তু সব কিছুর ঊর্ধ্বে যা দিয়েছেন তা হচ্ছে আমাদের কপাল। নয়নের জলে কপোল ভিজিয়া যাইতে পারে, কিন্তু তাতে আমাদের কপালের উনিশ-বিশ হইবে না।

তাই বলে, কপালের আশায় বসে থাকা মানুষের কাজ না। তাই চার-হাত পায়ের লড়াই ওই এক পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য। যার পেট যতো বড় বা বেশি (খাওয়ার লোক বেশি) তার লড়াইও বেশি। এনিয়ে কথার শেষ নেই। কিন্তু শেষ কথা হচ্ছে, মানুষ সব সময় যা খেতে চায় তা-ই কি সব সময় খেতে পারে? না, পারে না।

একেক বয়সে মানুষের একেক ধরনের খাবার। শিশু বয়সে মাতৃদুগ্ধ। এর একটু পরে সুজি, নরম ভাত, জাউ ভাত ইত্যাদি। ধীরে ধীরে একটু একটু শক্ত খাবার, মানে-রেগুলার খাবার। এরপর ধীরে ধীরে একজন শিশু প্রবেশ করে জগতের অসীম খাদ্য জগতে। গরুর পায়া, খাসির মাথা, মুড়িঘন্ট, পায়েস, সেমাই-সবই সে পরিণত বয়সে খাওয়া শুরু করে। এরপর আবার সেই শৈশবের দিকেই তার প্রত্যাবর্তন। জীবনে ফিরে আসে সেই শৈশবের নরম খাবার---নরম ভাত, জাউ ভাত, সুজি, নরম ফল ইত্যাদি। এটাই মানুষের জীবনচক্র। এটাই আমাদের জীবনের খাদ্য শৃঙ্খল।

আমরা এ জগত-সংসারে যতো পাই ততো চাই। আমাদের চাওয়ারও শেষ নেই, পাওয়ারও শেষ নেই, তাই খাওয়ারও শেষ নেই। প্রজা চায় পাইক হতে, পাইক চায় পেয়াদা হতে, পেয়াদা চায় সেনাপতি হতে, সেনাপতি চায় জমিদার হতে, জমিদার চায় নবাব হতে, নবাব চায় রাজা হতে, রাজা মহারাজ হতে, মহারাজ চায় সম্রাট হতে। তাতেও শেষ নেই। নরপতি ও সম্রাট ফেরাউন তাতেও সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাই শেষমেশ সে নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করে বসলো। এতে তার কিছু অনুসারীও মিলল যারা তাকে খোদা বলে মানতে শুরু করলো। আল্লাহ সব ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু তার অংশীদার তিনি মানতে পারেন না। এখানে তিনি আল-ক্বাহার-কঠোর। তাই ওই যে প্রজা, পাইক, পেয়াদা, সেনাপতি, জমিদার, নবাব, রাজা, সম্রাট বা রাজ্যের চাষাভুষা, শুদ্র, কামার, কুমার-সবাইকে যিনি সৃষ্টি করলেন, তিনি তাতে রাগান্বিত হলেন। ফেরাউন ধ্বংস হল।

তাই বেশি কিছু চাইতে নাই। বেশি কিছু পেতেও নেই। বেশি চাইলে নিরাশ হওয়ার ভয় থাকে, আর বেশি পেলে হারানোর ভয় থাকে। যার কম আছে তার হারানোর ভয় নেই, যে কম চায় তার প্রাপ্তিও বেশি।

সম্পদ ও ক্ষমতার জন্য মানুষ আজীবন লড়াই করে যায়। কিন্তু সবাই সবকিছু পায় না। মানুষ শুধু চেষ্টা করতে পারে। সবকিছু এক হওয়ার পরেও সবাই একই জায়গায় পৌঁছায় না। সম্রাট বাবরের চার ছেলে ছিল- হুমায়ূন, কামরান, হিন্দাল ও আসকরি। সবাই সম্রাট হতে পারেননি। হুমায়ুন হয়েছেন। একইভাবে হুমায়ূনেরও চার পুত্র ছিল-আকবর, হাকিম, কলিম, ফররুখ। সবাই সম্রাট আকবর হননি। এটাই জগতের নিয়ম ও সৌন্দর্য। এটাই সৃষ্টির বিধান। কবি বলেছেন, বিষ্ণু-বুকে চরণ-চিহ্ন, ললাট-লেখা কে খণ্ডায়।

মানুষের খাই-খাই স্বভাব চিরদিনের। দুনিয়া থেকে শোকর গোজার উঠে যাচ্ছে। সব সময় আমরা অসন্তুষ্ট-বসের ওপর, পরশির ওপর, দোকানদারের ওপর, দারোয়ানের ওপর, সৃষ্টিকর্তার ওপর। মানুষ তার উপর-নীচ-সমান্তরাল---সবার ওপরই মহা খ্যাপা। মানুষ শোকরিয়া আদায় করতে ভুলে গেছে। অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা পাওয়ার পরে মানুষ সহসাই তার অতীত ভুলে যায়। মন্ত্রী ভুলে যায় যে সে এমপি হবে কিনা এটাই নিয়েই সন্দেহ ছিল। এমপি ভুলে যায় যে সে এমপি হওয়ার জন্য কিনা করেছে। ভুলে যায় সে একদিন এমপি-মন্ত্রী কিছুই ছিল না। অতীতকে মনে রেখে পথ চললে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। আমরা অতীত ভুলে যাই-তাই বারবার হোঁচট খাই।

এক সময়ের দাপুটে এমপি-মন্ত্রী আজ অসহায় জীবন যাপন করছেন-এমন লোক আমাদের দেশে অনেক আছেন। দেশের মিডিয়া ও মানুষ তাদের ভুলে গেছে। ক্ষমতা কারো চিরদিন থাকে না। থাকে না, যৌবন। অর্থ থাকলেও সে অর্থ ভোগ করার মতো সামর্থ্যও অনেকের থাকে না।

মন্ত্রী ভাবেন কেয়ামত পর্যন্ত তিনি মন্ত্রী থাকবেন। এমপি ভাবেন, আমাকে মন্ত্রী হতেই হবে। চেষ্টায় দোষ নেই। কিন্তু কিছু না পেলেই, বা কিছু হারালেই এখানে সবাই বেজার। তাই মন্ত্রী তার মন্ত্রিত্ব গেলে নাখোশ। হাফ মন্ত্রী ফুল মন্ত্রী না হলে বেজার। ফুল মন্ত্রীর দু’একটি বিভাগ কমে গেল বেজার। গতবারের মন্ত্রী এবারও পদ না পেলে আরও বেজার।

আমরা ভুলে যাই গদির গরম চিরদিনের না। গদি কারো চিরদিনের জন্য থাকে না। পরিবারে এক সময় দাদা খবরদারি করে, একসময় বাবা, তারপর সন্তান। পরিবারে যেখানে দাদা বাবা গদি হারায় সেখানে রাষ্ট্রের পদ-পদবীতো কারো বাপ-দাদার সম্পত্তি না।

কবিতায় আছে, চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়/ আজিকে যে রাজাধিরাজ কা'ল সে ভিক্ষা চায়।/ অবতার শ্রীরামচন্দ্র যে জানকীর পতি/ তারও হলো বনবাস রাবণ করে দুর্গতি।

তাই বাবুদের বলছি-বেশি লোভ করা ভালো নয়। কারণ, এক বাবুর চারটা বাচ্চা ছিল। একদিন কাগজে বাবু দেখল যে সরকার ঘোষণা করেছে, যার পাঁচটা বা তার বেশি বাচ্চা আছে, তাকে প্রতি মাসে সরকার ২০,০০০.০০ টাকা করে দেবে। বাবুতো খুশীতে গদগদ হয়ে তার বউকে খবরটা দেখাল। বলল, তুমি যদি কিছু মনে না করো তো একটা কথা বলবো? বৌ সম্মতি দেয়ায় বাবু বলল দেখো, আমার প্রেমিকার কাছে আমার একটা বাচ্চা আছে। তুমি বললে আমি নিয়ে আসবো আর তখন আমাদের পাঁচটা বাচ্চা হয়ে যাবে এবং আমরা মাসে মাসে ২০,০০০.০০ টাকা করে পাবো। বউ বলল যাও। বাবু বাচ্চা নিয়ে ফিরে এসে দেখল তার ঘরের দুটো বাচ্চা গায়েব। বাবু বৌকে জিজ্ঞাসা করলো ব্যাপার কি? বৌ বলল যার বাচ্চা সে নিয়ে গেছে, খবরের কাগজ কি তুমি একাই পড়েছ?

তাই সব সময় দুধ খেতে নেই, মাঝে মাঝে ছানাও খেতে হয়। অনেকে ছানাও পায় না।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আপনার মতামত লিখুন :