Barta24

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

‘আর করব না ধান চাষ, দেখব তোরা কী খাস?’

‘আর করব না ধান চাষ, দেখব তোরা কী খাস?’
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তা২৪
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান


  • Font increase
  • Font Decrease

একজন শ্রমিকের একদিনের মজুরি দুই মণ ধান! আবার টাকা দিলেও মিলছে না ধান কাটার জন্য উপযুক্ত শ্রমিক। টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের বানকিনা গ্রামের আব্দুল মালেক সিকদার কিছুদিন আগে ধানের মূল্য কম ও দিনমজুর না পেয়ে নিজের ৫৬ শতাংশ ধানের ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দেন। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, ধান পোড়ানোর ঘটনা পরিকল্পিত। তার মত একজন দীর্ঘদিনের ধান ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদের মুখে একথা শুনতে কৃষক, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষেরই খারাপ লেগেছে।

যেখানে বীজ কেনা থেকে শুরু করে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত একজন কৃষককে গুনতে হয় ৭০০-৮০০ টাকা, সেখানে ধানের মূল্য মণ প্রতি ৫০০-৬০০ টাকা (বিবিসি, ১৪ মে ২০১৯) হওয়ায় কৃষকের মাথায় হাত। ঘূর্নিঝড় ফণী কৃষকদের তেমন কোনো ক্ষতি না করলেও ধানের এমন অপ্রত্যাশিত নিম্নগামী মূল্য ঝড়ের চেয়ে কম ক্ষতি করেনি। খাদ্যমন্ত্রীর উচিৎ, এর পেছনে কারো কোনো কারসাজি আছে কি-না, তা খুঁজে বের করে কৃষকের ধানের নায্য মূল্য নির্ধারণ করা।

একটি কৃষি প্রধান দেশে কৃষক হচ্ছেন অর্থনীতির মূল নিয়ামক শক্তি। কৃষক বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। সরকারের উচিৎ ভর্তুকি দিয়ে হলেও কৃষকের মুখের হাসি ধরে রাখা। আপাদমস্তক পরিশ্রমী এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো শ্রমের সাথে বঞ্চনা করেন না, খুব বেশি লাভের প্রত্যাশা করেন না। তাই, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষকের মুখের হাসির মূল্য দিতে হবে।

এখানে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা যেতে পারে। যেমন: (১) প্রতিবছর সরকার ধানের বাজার মূল্য নির্ধারণ করতে দেরি করে; (২) যে কারণে সেই সুযোগটি গ্রহণ করে বাজারের ফড়িয়া, আড়তদাররা ইচ্ছামত ধানের দাম নির্ধারণ করে; (৩) প্রতিবছর সরকার যে পরিমাণ ধান ক্রয় করে, তা খুবই সীমিত; (৪) সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ধান ক্রয় না করে চাতাল মালিক, ফড়িয়া, আড়তদার, মৌসুমি ধান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ক্রয় করে। যে কারণে ধানের বাজার ঐ সব ব্যবসায়ীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে; (৫) বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে, এমন পরিমাণে সরকার ধান ক্রয় করে না; (৬) সরকারের ক্রয়সীমার তুলনায় বহুগুণে চাতাল মালিক, ফড়িয়া, আড়তদার, মৌসুমি ধান ব্যবসায়ীরা (বছরে ৩ কোটি টন) ধান-চাল ক্রয় করে বলে এই বাজারের সাথে সরকার তাল মেলাতে অনেকটা ব্যর্থ; (৭) এই সুযোগে চাতাল মালিক, ফড়িয়া, আড়তদার, মৌসুমি ধান ব্যবসায়ীরা কৃষকের সাথে কারসাজি করার সুযোগ পায়; (৮) যে কারণে ভরা মৌসুমের সময় ধানের মূল্য কমিয়ে দিলে এবং অন্য সময় চালের মূল্য বাড়িয়ে দিলে সরকার ও কৃষককে অসহায়ত্ব বরণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না; (৯) পরবর্তিতে যে কৃষকের কাছ থেকে কম মূল্যে ধান ক্রয় করে, তাদের কাছেই পরে বেশি মূল্যে চাল বিক্রয় করে; (১০) সরকারের ক্রয়সীমা ও মজুদসীমার কারণেই অন্য পক্ষ কৃষককে ঠকানোর যাবতীয় সুযোগ গ্রহণ করে; (১১) আউশ ও আমনের ফলন অনেক ভালো হওয়ার পাশাপাশি বোরো ধানের বাম্পার ফলন (এক কোটি ৯০ লাখ টনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে -বিবিসি ১৪ মে ২০১৯।) হওয়ায় কৃষককে ঠকানোর যাবতীয় উপায় খুঁজে পেয়েছে এক শ্রেণির অসাধু বাজার নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবসায়ী; (১২) ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এ বছর ১২ লাখ টন চাল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অথচ দেশে চালের বাজারে বাৎসরিক চাহিদা রয়েছে সাড়ে তিন কোটি টন। কাজেই এই বাজারে ধান-চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না। যে কারণে কৃষক প্রত্যক্ষভাবে উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়; (১৩) ধান-চালের বাজারে সরকারের সন্তোষজনক নজরদারি আছে বলে মনে হয় না; (১৪) চাতালের স্থানে অটো রাইস মিলের উত্থান; (১৫) কৃষকের ফলন ধরে রাখার নিজেদের ব্যবস্থা নেই। ফলে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি কৃষককে ধান কেটেই বিক্রি করতে হয় বলে তারা ধানের মূল্য তুলনামূলক কম পান (বিবিসি ১৪ মে ২০১৯)।

দেশের ব্যাংকিং খাত ও শেয়ার বাজার নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। ঋণ খেলাপিরা অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্রমাগত সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দেশের ঋণের টাকার অপব্যবহার ও দুর্নীতি কাকে বলে তা জনগণকে দেখিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হবে সরকারকে। ধানের এমন দুর্মূল্যের বাজারে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হবে দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। বরং চাল রপ্তানি করে কীভাবে কৃষককে ধানের নায্য মূল্য প্রদানের ব্যবস্থা করা যায়, সেটি ভাবতে হবে। ধানের মূল্য বাজারে কম, অথচ চালের মূল্য পরিবর্তনে তেমন কোনো গতি নেই। কাজেই সরকারকে প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হবে।

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সরকারের তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এই দুই পরিকল্পনার পাশাপাশি মৌসুম শুরুর সাথে সাথে ফসল ও বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী ‘কৃষক ও ভোক্তাবান্ধব নীতি’ নির্ধারণ করতে হবে। ভালো ফলনের সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়, এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।

সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে সরকারকে কৃষকের মনের কথা শুনতে হবে। তাহলে সমস্যা পুঞ্জিভূত হওয়ার আগেই সমাধান হতে পারে। প্রতি বিঘা জমিতে হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনে পরবর্তিতে কৃষক আর ধান চাষে আগ্রহী হবেন না। তার কাছে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার অন্য কোনো উপায় বা খাত নেই। প্রয়োজনে সরকার ভর্তুকি বাড়িয়ে কৃষকের এই দুর্দিনে মাথার উপর আকাশসম ছায়া হয়ে দাঁড়াবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। অন্যথায় বর্তমানে উচ্চারিত স্লোগান “আর করব না ধান চাষ, দেখব তোরা কী খাস” ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন হলে দেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভেবেছেন কি?

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি. গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

সবার জামিন হয়ে যায়। এই সবাই কারা? শুনে মনে হয় অনেক মানুষ। একটি মহল্লায়, একটি গ্রামে, একটি শহরে কতো মানুষই তো থাকে। তাহলে সবাই বলতে কি মহল্লার সব মানুষের কথা বলা হচ্ছে? গ্রাম-শহরের মানুষও নিশ্চয়ই এই গোনার মধ্যে আছে। সবাই মানে তো অসংখ্য। তাহলে জামিন হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের।

আচ্ছা জামিন মানে কী? অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া, নাকি অপরাধ প্রমাণের আগ পর্যন্ত মুক্ত বাতাসে চলাচল করার স্বাধীনতা? এমনও তো হতে পারে জামিন মানে কাউকে পরোয়া না করার দাম্ভিকতা। মহল্লা, গ্রাম, শহরের সবাই কি অপরাধী? কারণ শুরুতেই যে বলা হয়েছে, সবাই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। কে দিল এই খবর? টিনে বারি দিয়ে মহল্লা, গ্রাম, শহরে খবর ছড়াচ্ছে কে, সবার যে জামিন হচ্ছে? মানুষ। হুম, মানুষ তার দুঃখের কথা জানাচ্ছে। মানুষ তার অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছে। তাহলে এই যে বলা হলো সবাই, সেখানে কি মানুষ নেই?

সবাই বলতে তো অগণিত, অসংখ্য বোঝায়, সেখানে মানুষ থাকবে না কেন? মানুষেরা নির্বাসনে গেছে? এমন সংবাদই পাওয়া যাচ্ছে। যাবে না কেন? মহল্লার দু’পায়ের যে প্রাণী পাশের বাড়ির শিশুকে জমির লোভে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল, সে এখন শীষ বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দু’পায়ের দল গ্রামের কিশোরীকে ধর্ষণ করার পরেও হুঙ্কার থামায়নি। নতুন কিশোরী তাদের নজরে। চাকায় মানুষ পিষে ফেলে ছিল যে, তাকে এখনও দেখা যায় রঙিন কাঁচের আড়ালে শীতাতাপ মোটর যানে। আগুনে পুড়ে গেল কতো প্রিয় মুখ। পুড়িয়ে মারলো যে সংঘ, তারা আষাঢ়ে ক্ষমতার রোদ পোহায়।

মানুষ নামে আছে যে বিলুপ্ত প্রায় সম্প্রদায়, তারা ক্রমশ গুহাবাসী হয়ে পড়ছে। কোনোভাবে মুখ বের করে দেখছে- কোথাও কোনো অপরাধ নেই। যেহেতু অপরাধ নেই, তাই সবাই শরতের রোদ্দুর দেখছে। আগাম হৈমন্তী হাওয়া শরীরে মাখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মহল্লায় তাদের সালিশে ডাকবে কে, গ্রামে সালিশ বসানোর মুরোদ কার, আর শহর? রঙিলা শহরের নকশাকার তো ওই ওরাই। যাদের জামিন হয়ে যায়। সংখ্যায় ওরা লঘিষ্ঠই ছিল। ক্রমশ ওরা নদর্মার কালো জলের মতো বুদঁ বুঁদ ছড়াতে থাকে। সেই ছোট একটি বুঁদ বুঁদের উৎস থেকে তৈরি হয়েছে কালো জলের জলাশয়। সেই জলও নাকি কালো নয়। সেই জলের দুর্গন্ধেরও নাকি সুবাস আছে। মহল্লা, গ্রাম, শহরে সেই গল্পের বয়ান চলছে। কাগজের জাদুর পরশে কালো সাদা হয়ে যাচ্ছে। অপরাধী সুবোধ হয়ে যাচ্ছে। সুবোধকে দেওয়া হচ্ছে অপরাধীর বেশ।

ওদের জামিন হয়ে যাচ্ছে বলে রাতের বাঁদুরও ভয়ে আছে। নেকড়েরা মহল্লা, গ্রাম, শহর ছেড়েছে। কিন্তু গুটিকয় সেই মানুষেরা? ওরা নির্বসানে যাবে কোথায়, গোলকে এমন কোনো ভূখণ্ড আছে, ব-দ্বীপে এমন আছে কোনো শুদ্ধ জমিন? যেখানে মানুষ মিশে যেতে পারবে দোঁ-আশের সঙ্গে? মানুষ এক আশ্চর্য প্রাণ। কি মহাকাশ, মহাকাল সমান ধৈর্য্য তার। আবার তার গরিষ্ঠ হবার সাধ।

জামিন যাদের হচ্ছে হোক না। কতোদূর যাবে ওরা, পোড়াবে, নষ্ট করবে কতোটা? মানুষ জানে সেই দু’পায়ের প্রাণীদের মুরোদ। ওদের আত্মমৃত্যুর উৎসব সন্নিকটে। মহাকার লাখ প্রাণীর মতোই, মহাদানব এই দু’পায়ের অপরাধীরা বিলুপ্ত হবেই। সবাই, অসংখ্য বলতে আসলে মানুষই সত্য। ক্ষুদ্র শুধু জামিন পেয়ে যাওয়ার দল। ওদের আসলে জামিনের সুযোগ নেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র