Alexa

রাহুল, এরপর কী

রাহুল, এরপর কী

এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪

কংগ্রেস আরো একটি শোচনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি হলো। পরাজয়টা তারা নিশ্চিত জেনেই গিয়েছিল। দলের ভেতরে ও বাইরে তাদের পরাজয় নিয়ে তেমন কোনো সন্দেহ ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু পরাজয়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো রাহুল গান্ধী এখন কী করবেন? তিনি যে যুদ্ধে নেমেছেন সেই যুদ্ধে আপাতত তিনি পরাজিত একথা সত্য। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, তার হাতে অনেক ব্রহ্মাস্ত্র থাকার পরেও তিনি কুরুক্ষেত্রে তা ব্যবহার করতে পারেননি। নির্বাচনে পরাজয় এক জিনিস।

নির্বাচনে পরাজয় হতেই পারে। কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহারই করতে জানেন না-এটাতো তার চেয়েও বড় পরাজয়, আসল পরাজয়। রাফাল কেলেঙ্কারি, উর্ধ্বমূখী বেকারত্ব থেকে শুরু করে সর্ববিস্তৃত কৃষক অসন্তোষ-কোনোটিই রাহুল নির্বাচনের মাঠে কাজে লাগাতে পারেননি। নির্বাচনের চেয়েও এটিকে বড় পরাজয় হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

এদিকে মোদি এক ঝানু রাজনীতিক, পাকা খেলোয়াড়। নির্বাচনে মোদির ধারাবাহিক বিজয় তার রাজনৈতিক পেশাদারিত্বেরই এক নমুনা। ক্লাসিক্যাল রাজনীতি বলতে যা বোঝায় ভারতবর্ষে বুঝি তার দিন শেষ। শুধু ভারত কেন, বাংলাদেশেও সেই রাজনীতির দিন শেষ। এখন কন্টেম্পোরারি রাজনীতির দিন চলছে। পৃথিবীর দেশে দেশে এখন এই কন্টেম্পোরারি রাজনীতির জয় জয়কার।

ক্লাসিক্যাল রাজনীতির উত্তরসূরি হিসেবে রাহুল হয়তো তার পূর্বপুরুষের রাজনীতির ধারাটিই আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তিনি যে রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করছেন সে রাজনীতির জনক গত হয়েছেন অন্তত আরও চার পুরুষ আগে। নেহেরু-ইন্দিরা-রাজীব (মাঝে সোনিয়া গান্ধী)- ভারতবাসী এই তিন পুরুষ আগের রাজনৈতিক ব্যাকরণ মানবে কেন? কিন্তু মূল প্রশ্নটি রাজনীতির পারিবারিক তত্ত্ব নিয়ে না। আসলে সময় বদলেছে, ভারতও বদলেছে। ফলে রাজনীতির মেরুকরণ শুধু ভারতেই নয়, সমগ্র বিশ্বেই এক নতুন দিকে ধাবিত হচ্ছে। রাহুল এই রাজনীতি বুঝতে পারলেও হয়তো এতো তাড়াতাড়ি সেই জুতা পড়তে চাননি। পুরনো জুতা পায়ে দিয়েই হয়তো তিনি নতুন পথে হাটতে চেয়েছেন। কিন্তু রাহুল জী-এ পথ যে বড়ই কঠিন, বড়ই গরম। এই পথে হাটাতো পরের কথা- পুরান জুতা পুরে ছাড়খাড় হয়ে যাবে। মোদি বিষয়টা বুঝতে পেরে আগেই নিজস্ব ঢঙের জুতা পরেন। পরেন পাঞ্জাবি, ধুতি। শুধু তাই নয়, রয়েছে তার নিজস্ব রংও- গেরুয়া।

নরেন্দ্র মোদি গেরুয়ার মর্তবা বুঝতে পেরেছেন। ভারতবর্ষ এখন ধর্ম ও বর্ণে বিশ্বাসী। শুধু ভারত কেন? এটাই বৈশ্বিক বাস্তবতা। নেহেরুর কথিত অসাম্প্রদায়িক ভারতবর্ষের রং তাই এখন গেরুয়া। ভারতবাসী জেনে গেছে যে খালি হাতের আশীর্বাদে চিড়া ভিজবে না। যজ্ঞ সাধনায় দেবতার চরণেও যে কিছু দিতে হয়। আর কিছু না হোক, একটা পদ্ম ফুল-তাই বা কম কিসে? ভারতমাতার প্রিয় রং তাই গেরুয়া, প্রিয় ফুল পদ্ম।

রাহুলকে বুঝতে হবে আসলে রাজনীতি শুধু কাজের না, কথারও। আর শুধু কথায় যে চিড়ে ভিজে না, সেটাওতো মনে রাখা চাই। রাহুল মোদির দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’। আসলে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, মোদি চৌকিদার হয়ে নিজেই চুরি করছেন, দেশের বারোটা বাজাচ্ছেন। কিন্তু মোদি রাজনীতি জানেন, জানেন কথার মারপ্যাঁচ। রাহুলের সে কথার জবাবে মোদি পাল্টা রাজনীতি করলেন। তিনি দেশের প্রায় ২৫ লাখ চৌকিদারের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করলেন।

মোদি তাঁদের বলেন, ‘কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থে দেশের সব চৌকিদারকে চোর বলে গালি দিচ্ছে, অপমান করছে। দেশের সব চৌকিদারদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমি আপনাদের কাছে বিচার দিলাম”। ব্যাস, ২৫ লাখ চৌকিদার-ভোটার হাতের কব্জির বদলে পদ্মফুল বনে গেলেন। এটাই হলো রাজনীতি। এটাকেই বলে ওস্তাদের মাইর শেষ রাতে।

এই যুদ্ধ শুধু কংগ্রেস বা বিজেপির ছিল না, ছিল না এনডিএ আর ইউপিএ’র মাঝে। এটা প্রকাশ্য যে, এ লড়াইটি ছিল এর বাইরেও রাহুল ও মোদির লড়াই। এ লড়াইয়ে দু’জনেই রামের দাবিদার। কিন্তু দিল্লি জয়ের রাজনীতিতে একে অপরকে রাবণ বলে গালি দিচ্ছেন। তা দিক। কিন্তু এর মাঝে ভারতবাসীকে মনে রাখতে হবে যে আসল ক্ষমতাটি যেন দুর্যোধনের হাতে না যায়। কারণ ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা মনে করতেন, দুর্যোধনই কুরু বংশের ধ্বংসের কারণ।

কুরুক্ষেত্রে আপাত দৃষ্টিতে মোদি জয়ী। কিন্তু পরাজিত শুধু রাহুল একাই নন। এ লড়াইয়ে তিনি বোন প্রিয়ঙ্কা গান্ধীকে নিয়ে পরাজিত হয়েছেন। বলা হতো, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী জনগণের সাথে সম্পৃক্ত নেত্রী। ভোটের মাঠে তার ব্যাপক চাহিদা। কিন্তু ভোটের মাঠে ভাই-বোন মিলেও ভোটের হাওয়া নিজেদের দিকে ফেরাতে পারেননি। সোনিয়া গান্ধীতো আগেই গিয়েছেন। তাহলে কংগ্রেসের শেষ ভরসা কোথায়?

আসলে ৭০-৮০ দশকের ভারত আর ২০১৯ সালের ভারত এক নয়। তবে কি ভারতীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণ হচ্ছে? একদলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বলয় কি সেখানে আরও শক্তিশালী হচ্ছে? উদারপন্থী রাজনীতির জায়গায় কি স্থায়ীভাবে স্থান করে নিচ্ছে অন্য কিছু? এ প্রশ্নটি শুধু ভারতের জন্যই প্রাসঙ্গিক নয়। বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই এটি আজ এক বড় প্রশ্ন। কাজেই এ পরাজয়কে রাহুলের একার পরাজয় হিসেবে দেখা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মেনে নেওয়া যায়।

মোদি দিল্লি জয় করেছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, রাবণ লঙ্কা জয় করে বিভীষণকে দিয়েছিলেন। এর পরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। ভারতবর্ষে সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে না এটাই কাম্য। এ লড়াইয়ে ভারতবাসীর জয় হয়েছে। জনগণের জয়ই বড় জয়। ভারতীয় রাজনীতিতে এ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা- ‘জনগণমন’। তারাই ভারতের ভাগ্যবিধাতা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আপনার মতামত লিখুন :