Barta24

রোববার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

English

“বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি, আজ থেকে নতুন দিন”

“বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি, আজ থেকে নতুন দিন”
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪
মাছুম বিল্লাহ


  • Font increase
  • Font Decrease

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল যে, কৃষকদের সংকট, বেকার সমস্যা ও সর্বোপরি অর্থনৈতিক দুরবস্থা মোদির দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা, অনুমান, আলোচনা ও পূর্বাভাসকে উড়িয়ে দিয়ে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিই ধর্মনিরপেক্ষ ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের ক্ষমতায় পুনরায় বসছে। ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়েছিল ১১ এপ্রিল, সাতদফা ভোটাভুটির শেষ দফা ছিল ১৯ মে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছেন, ভারতের ৯০ কোটি ভোটারের মধ্যে ৬০ কোটিই এবার ভোট দিয়েছে।

আমরা জানি, লোকসভার ৫৪৫টি আসনের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী ভোট অনুষ্ঠিত হয় ৫৪৩টিতে, বাকি দুটি আসনে মনোনয়ন দেন রাষ্ট্রপতি। এবার ভোট হয়েছে ৫৪২টিতে। ভোট হয়নি শুধুমাত্র তামিলনাড়ু রাজ্যের ভেলর আসনে। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে আসনটিতে ভোট স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। লোকসভার ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৩৪৯টিতেই বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বিজয়ী হয়েছে। কোনো দল বা জোটকে সরকার গঠন করতে হলে প্রয়োজন ২৭২টি আসন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স বা ইউপিএ পেয়েছে ৯২টি এবং অন্যান্য দল ১০১টি আসন।

হিন্দিবলয় গুজরাটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই এই ’মোদি ঝড়’। এই ঝড় বিস্তৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটকেও। পরাজয় মেনে নিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি ও এনডিএ জোটকে। একইভাবে রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কাও দেশবাসী ও নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, দেশবাসী মোদিকে পছন্দ করে ভোট দিয়েছেন। ভারতের নির্বাচনে এবার সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। আর এতে এগিয়ে ছিলেন মোদি। সব রাজনৈতিক দলই মিডিয়ার দিকে নজর রেখেছিল। সাত দফা নির্বাচনে শুধু ভোট গ্রহণের দিনগুলোকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করে নয়াদিল্লির ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি। তাতে দেখা যায় শুধু ভোটের দিনগুলোতেই মোট ১৭ লাখ ৪০ হাজার টুইট করা হয়েছে।

গত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মোদি ঝড় আটকাতে পেরেছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। সেই আত্মবিশ্বাসে এবারও তেনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে রাজ্যের ৪২টি আসনেই তৃণমূল বিজয়ী হবে। কিন্তু হিসাব পাল্টে গেছে। এ রজ্যের মোট আসনের মধ্যে ১৮টিই পেয়েছে বিজেপি, গত নির্বাচনে পেয়েছিল মাত্র দুটো। কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র দু’টি আসন, গতবার পেয়েছিল চারটি, আর মমতার তৃণমূল পেয়েছে ২২টি আসন যা গতবারের চেয়ে ১২টি কম। এতে প্রমাণিত হয় যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুছে যাওয়া বামদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।

একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে বিজেপি মোট দুটি আসন পেয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার পর ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল চার শতাধিক আসন। এবার সেই দল ৫০টি আসনের আশপাশ দিয়ে চলছে। কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী পার্টির এই পরিস্থিতির কারণে সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আসলে তার পদত্যাগের প্রয়োজন নেই। রাজনীতি এটিই। তার নিজের ভুলের কারণে বা তার ব্যক্তিগত কোনো কারণে যে নির্বাচনের এই ফল এই দাঁড়িয়েছে তা কিন্তু নয়। একজন মানুষের পক্ষে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মন জয় করা যে সব সময়ই সম্ভব হবে তা কিন্তু নয়। রাজনীতি এক ধরনের আবেগ। জনগণের সেই আবেগ কখন যে কোনদিকে যায় তা বলা কঠিন। নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে রাজনীতির এই খেলায়।

ভারতবর্ষ বিভক্তির পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ আরএসএস নামক সাম্প্রদায়িক সংগঠনটিই জনসংঘ নামে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে। কালের পরিক্রমায় সেটিই এখন বিজেপি। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার হাওয় লাগতে শুরু করে। এ সময় ভারতের রাজনীতিতে একাধিপত্য ছিল ইন্দিরা গান্ধীর। তার আধিপত্য খর্ব করতেই এক সময় বাকি সবাই এক জোট হয়েছিল যদিও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শিক পার্থক্য ছিল অনেক।

ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো তখন দল বা গ্রুপ ভারি করতে জনসংঘকেও সঙ্গে নিয়েছিল আর সেই থেকেই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি রাজনৈতিক অঙ্গন দখল করতে শুরু করে। যার চূড়ান্ত পরিণতি ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতে দ্বিতীয়বারের মতো বিজেপির ক্ষমতা দখল।

এটা ঠিক যে, মোদির মতো ব্যক্তিগত ক্যারিশমা অন্য নেতাদের মধ্যে খুঁজে পায়নি ভারত। এ ধরনের নেতা আছেন আমেরিকায়, রাশিয়ায়, হাঙ্গেরিতে, তুরস্কে। এ ধরনের নেতারা অনেক কিছুই বলেন। অন্যদিকে যে যাই বলুক তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। তারা ক্ষমতায় ঠিকই ফিরে আসেন। কেউ কি ভেবেছিল যে ট্রাম্প হবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট?

এটিতো সবাই জানেন যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো মোদি রাখতে পারেননি, তারপরেও জনগণ তাকেই ভোট দিয়েছে। গণতন্ত্রের এটি আর এক রহস্য, আর এক ধরনের ম্যাজিক। জনগণ কখন কী চান, বলা কঠিন। জনগণ বোধহয় জাতীয়তাবদী ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতেই আস্থা রেখেছেন মোদির ওপর। কিন্তু সেখানেই বা মোদি অতিরিক্ত কী করেছেন? বরং পাকিস্তানের কূটনীতির কাছে হেরে গিয়েছিলেন যখন বিমান বাহিনীর পাইলটকে হাতের মধ্যে পেয়েও সসম্মানে ভারতে পাঠিয়ে দিলেন ইমরান খান। তারপরেও মোদিকেই জনগণ ভোট দিলেন! এটিই গণতন্ত্রের মোড়!

শতাব্দীর প্রাচীনতম দল কংগ্রেস ২০১৪ সালের নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তারপর গত পাঁচ বছরে কোন কিছুতেই যেন কিছু করতে পারছিলেন না। তবে এবার লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েকমাস আগে ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হলে জাতীয় নির্বাচনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এর সাথে যুক্ত হয় প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর কংগ্রেসে যোগদান, উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পাটির ও বহুজন সমাজবাদী পার্টিসহ বিভিন্ন দলের মহাঘটবন্ধন বা মহাজোট গঠন।

রাহুল গান্ধী বলেছেন, ”কোনটা ভুল হয়েছে, আজ এ নিয়ে আলোচনার দিন নয়। জনগণ নরেন্দ্র মোদিকে স্বতঃস্ফূর্ত রায় দিয়েছে। জনতার রায়কে সম্মান জানাচ্ছি।’ এটি ম্যাচিউর রাজনীতিকের মতোই কথা। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধার কথা। আমেথিতে ঐতিহাসিক হার মেনে নিয়ে বলেছেন, ”আশা করছি ওই আসনের মানুষকে স্মৃতি ইরানি ভালোবাসা দিয়ে রাখবেন।’চমৎকার মন্তব্য। মোদিও চমৎকার করে বলেছেন, ”বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি। আজ থেকে নতুন দিন। কোটি কোটি নাগরিক এই ফকিরের ঝুলি ভর্তি করে দিয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে সফলতম জয়।’

আমরা চাই বিজেপির নেতৃত্ব ভারতে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে বসবাস করবে। সত্যিই আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতে মোদির নেতৃত্বে নতুন দিন আসবে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক; বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত।

আপনার মতামত লিখুন :

আবদুল মোনেম: এক মহান কর্মবীরের প্রতিকৃতি

আবদুল মোনেম: এক মহান কর্মবীরের প্রতিকৃতি
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

#ও বন্ধু আমার 🌷 জনাব আবদুল মোনেম। দেশের প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব। সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট অবকাঠামো, যা আজকের বাংলাদেশে আমরা দেখি, এসবের সিংহভাগেরই নির্মাতা আবদুল মোনেম লিমিটেড তথা জনাব মোনেম। যৌবনের স্বর্ণালী সময়সহ তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটাই তিনি অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন প্রিয় মাতৃভূমির বৃহৎ সব নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে। দেশি বিদেশি সব কন্ট্রাক্টররা যে প্রকল্প তাদের পক্ষে করা অসম্ভব বলেছে, আবদুল মোনেম সাহেব সে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন হাসি মুখে। প্রাণান্ত চেষ্টা আর অধ্যাবসায় দিয়ে অসম্ভব সেসব প্রকল্পকে দেখিয়েছেন সাফল্যের মুখ। সমাজ সংসার আত্মীয় পরিজন সব ছেড়ে ছুঁড়ে প্রকল্প এলাকায় কাটিয়েছেন মাসের পর মাস। গলা পর্যন্ত কাদা পানিতে নেমে শ্রমিকদের দেখিয়েছেন কাজের দিশা! তাঁর কোম্পানির প্রকৌশলীরা অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন কিভাবে একজন কর্মবীর আবদুল মোনেম বাস্তবায়ন করে চলেছেন উন্নয়নের পথরেখা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566051707738.gif
গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে আবদুল মোনেমের (ডানে) সঙ্গে লেখক/ সংগৃহীত


ব্যবসায়ের লাভ লোকসানকে কখনোই গুরুত্ব দেননি জনাব মোনেম। দেশমাতৃকার উন্নতি সবসময় তাঁর কাছে মুখ্য হয়ে থেকেছে। যে কারণে মুনাফাখোর ব্যবসাদাররা যেখানে মানুষের অশ্রদ্ধার পাত্র হন, জনাব মোনেম সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের আসনে। দিন গেছে, ব্যবসা ডাইভার্সিফাই হয়েছে। বিশ্বখ্যাত কোমল পানীয় কোকাকোলা বা ইগলু’র মতো দুনিয়া জোড়া সুনামের আইসক্রিম ব্র্যান্ড সমৃদ্ধ আবদুল মোনেম লি. এখন পরিণত হয়েছে আবদুল মোনেম গ্রুপে। কয়েক কোটি টাকার টার্নওভারের সেদিনের কোম্পানি এখন হাজার কোটি টাকার কনগ্লোমারেট! কোক ইগলু ছাড়াও বিশ্বের বেশকিছু নামকরা ব্র্যান্ড এখন মোনেম গ্রুপের সঙ্গে পার্টনার। তাই বলে মোনেম ভাই পরিবর্তিত হননি এতটুকু। সেই শুরুতে যেমন নিরহংকারী, দানশীল ও ডাউন টু আর্থ ছিলেন, আজও তেমনই আছেন!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566051780819.gif

দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে জনাব মোনেমের সঙ্গে আমার ও আমার পরিবারের সম্পর্ক। দেশ বিদেশের অনেক স্টেশন আমরা একসঙ্গে সফর করেছি, একত্রে থেকেছি। সুযোগ হয়েছে পরস্পরকে জানার ও কাছে আসার। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছেছেন জনাব আবদুল মোনেম। আমাদের স্বার্থহীন মানবিক সম্পর্ক আজও দ্যুতিময় প্রথম দিনের ঔজ্জ্বল্যেই! এতটা পথ আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি, কিন্তু স্বার্থের কোনো সংঘাত না থাকায় আমাদের পারিবারিক সম্পর্কে মালিন্য সামান্য মরিচা ধরাতে পারেনি, আলহামদুলিল্লাহ!
পবিত্র ঈদ আল-আদহা’র সালাত আদায়ে গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে আমাদের এই হিরণ্ময় সাক্ষাৎ। আল্লাহ সুবহানআহু ওয়াতা’আলা উন্নয়ন ব্যক্তিত্ব আমার প্রিয়-শ্রদ্ধেয় মোনেম ভাইকে সুস্থ ও নেক আমলময় হায়াতে তাইয়েবা দান করুন, আমীন...

লেখক: জাতীয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?
শেখ আদনান ফাহাদ/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

১৯৪৭ সালেই বর্তমান বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙালিদের নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহান প্রয়াস চালিয়েছিলেন তৎকালীন কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের কয়েকজন প্রগতিশীল নেতা। কিন্তু দুই দলের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে পেরে উঠেননি তাঁরা। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, সরদার বল্লভভাই প্যাটেল ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রমুখের ধূর্ত রাজনীতির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন বাঙালির রাষ্ট্রকামী রাজনীতিবিদগণ। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ৭৩ এবং ৭৪ নং পৃষ্ঠায় সে সময়ের ঘটনাবলীর বর্ণনা দেওয়া আছে। পূর্ববাংলার সম্পদ লুটে গড়া উঠা কলকাতা হারিয়ে বাঙালি দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে ১৯৭১ এর গণহত্যা সংঘটিত করার সুযোগই পেত না পাকিস্তানি হায়েনারা।

বাঙালি আজ দুইভাগে বিভক্ত- ভারতীয় বাঙালি আর বাংলাদেশি বাঙালি! বাঙালির একান্ত রাষ্ট্র একমাত্র বাংলাদেশ। হিন্দি আর ইংরেজির আগ্রাসনে ভারতে বাংলা আজ ধুঁকে ধুঁকে মরলেও বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা হিসেবে বাংলা এখানে টিকে আছে স্বমহিমায়। ইতিহাসের নানা খেলায় বাঙালি বিভক্ত হয়ে তার অতীত গৌরবের অনেকখানি হারিয়েছে। ভারতের পুরো ক্রিকেট টিমে আজ একজন বাঙালি খেলোয়াড় নেই; অদূর ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট টিমে কোনো বাঙালি সন্তান খেলতে পারবে- এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমে ১১ জন বাঙালি বিশ্ব ক্রিকেট আলোকিত করছে। বাঙালি অনেক হারিয়েও বুঝতে পারে না, কী তার ছিল আর কী তার আছে?

৪৭ এ বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও পরবর্তী ২৪ বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার মানুষকে প্রস্তুত করেছেন স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আর এ যাত্রায় সাথে নিয়েছেন তৎকালীন সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন আর প্রতিবেশী ভারতকে। ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ভারত সরাসরি যুদ্ধে জড়ালেও সীমান্ত খোলা রেখেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক চালানো গণহত্যার শুরু থেকেই। বাঙালি অধ্যুষিত আগরতলা আর কলকাতার মানুষ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। বাংলাদেশের পাশে ছিল পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও প্রতিবেশী ভারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল স্বাধীনতা আর ভারত পেয়েছিল এই অঞ্চলে তার একমাত্র নিরাপদ এবং বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে তৎকালীন সামরিক বাহিনীর কিছু বখাটে কর্মকর্তার হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতি বঙ্গবন্ধুকে না হারালে, বাংলাদেশই হত বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলে। জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন মাঝিবিহীন নৌকায় পরিণত হয়। রাষ্ট্র চলে যায় সামরিক আর বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দখলে। বাংলাদেশ মূলত উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমল থেকে।

তবে পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ফলে বাংলাদেশ মূলত ভারত আর চীনের নানা পণ্যের বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। সিপিডির এক রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। বাংলাদেশে চাকুরি ও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ হয় হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকের। এক তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধলক্ষ ভারতীয় চাকুরি করে। অথচ ভারতে বাংলাদেশের নাগরিকদের কাজের অনুমতি দেয়া হয় না। হাজার হাজার বাংলাদেশি ভারতের বিভিন্ন স্থানে পর্যটক হিসেবে ঘুরতে যায়; তাছাড়া মেডিক্যাল সেবা পেতে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি লাভজনক রাষ্ট্র। এমন একটি লাভজনক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ভারতের নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে বাঙালিদের সম্পর্ক দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে!

ফেসবুক ও ইউটিউবের দুনিয়ায় দুই পারের বাঙালিদের মধ্যে ভয়ানক কথাযুদ্ধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন সব বাজে শব্দ বলা হচ্ছে যা মুখে আনা যায় না। বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে কিছু বলা হলেই ওপার থেকে শুরু হয় পুরো বাংলাদেশকে অপমান করে নানাবিধ অশ্রাব্য বাক্যবান। অনেক ফেইক আইডি থেকেও বিতর্ক উসকে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাস না জেনেই, অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে না বুঝেই পুরো দেশকে নিয়ে অনেককে আপত্তিকর কথা বলতে দেখা যায়। ফেসবুকে আনন্দবাজার কিংবা প্রথম আলোর পেইজে ঢুকলেই দুই বাংলার মানুষের মধ্যকার কথাযুদ্ধের নমুনা পাওয়া যায়। কাশ্মীর সমস্যা হোক, কিংবা ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলা হোক কিংবা হোক সাকিব আল হাসানের উপর হওয়া কোনো নিউজ, ফেসবুকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু হয় বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে।

ইন্টারনেট পুরো বিশ্বকে এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার আওতায় এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কোনো বিষয়ে নিজের মত, অমত, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ মিথস্ক্রিয়ার দুনিয়াকে করেছে ব্যস্ত। মানুষ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে যোগাযোগপ্রবণ এবং একইসাথে প্রতিক্রিয়া-প্রবণও। অনলাইন নিউজপেপার এবং প্রিন্ট নিউজপেপারগুলোর অনলাইন ভার্সন এবং ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশ এবং ভারতের বাঙালিদের আনাগোনা অহরহ। ইন্টারনেট এবং ভাষার শক্তিকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগাতে পারত ভারত ও বাংলাদেশের বাঙালিরা। কিন্তু কাজের চেয়ে যে অকাজই বেশী হচ্ছে।

ভারত-বিদ্বেষী বাংলাদেশি আর বাংলাদেশ-বিদ্বেষী ভারতীয়রা দুই রাষ্ট্রের নাম বিকৃত করেছেন। যে গালি মুখে আনা যায় না, সেসব কথা লেখা থাকে কমেন্ট আকারে। বাংলাদেশের কেউ ভারতের কারও কথার প্রতিবাদ করলেই শুরু হয় ১৯৭১ সালের রেফারেন্স দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। ৭১ কে ভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি, মুক্তিবাহিনীর বীরত্ব ইত্যাদি বিষয়কে খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা ভারতীয় বাঙালিদের মধ্যে দেখা যায়। কোনো বাংলাদেশি ভারতের দিক থেকে করা কোনো কাজের সমালোচনা করলেই ৭১ এর কথা বলে খোটা দেয়ার চেষ্টা হয়। ভারতীয়রা একাত্তরকে দেখে থাকে তাঁদের নিজস্ব প্রেক্ষিত থেকে। বাংলাদেশ যে ভারতের কত উপকারে আসে কিংবা আসছে, সেটি ফেসবুকের জগতে খুব কম ভারতীয়ই স্বীকার করেন।

বাংলাদেশিদের একটা ছোট অংশ ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আনন্দবাজারসহ নানা পত্রিকার ফেসবুক পেইজের নিউজে কমেন্ট করে। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয়রা ক্ষিপ্ত হয়। ক্ষিপ্ত হওয়ার অধিকার তাঁদের আছে, কিন্তু গুটি কয়েক বাংলাদেশির ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এই ভারতীয়রা পুরো বাংলাদেশ নিয়ে অত্যন্ত অপমানজনক মন্তব্য করে। এই মন্তব্য কোনো সচেতন বাংলাদেশির পক্ষে হজম করা মুশকিল। ভারতীয়দের বড় একটা অংশ বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেই না। তারা শুধু জানে, ১৯৭১ এ ভারত পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে?

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বিশালত্ব, জাতি সংগঠনে আওয়ামী লীগ এর অবদান, স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি, বিশ্ব রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব, বাঙালি আর্মি, নেভি ও বিমান সেনা, মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী কিংবা ক্র্যাক প্লাটুন এর বীরত্ব ইত্যাদি কিছুই না জেনে ৭১ কে শুধু ভারতীয় প্রেক্ষিত থেকে দেখতে অভ্যস্ত এসব ভারতীয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের সহযোগিতা আদায় করেছেন। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের যে কোনো বিশ্লেষণে প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শাহাদাত বরণ করা বীর বাঙালিরা। ৭১ প্রশ্নে ভারতীয়দের উচিত হবে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। মূলত বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর বীরত্বেই ৭১ সালে পাকিস্তানকে পরাজিত করার গৌরবের ভাগীদার হতে পেরেছিল ভারত।

বাংলাদেশকে ‘কাঙ্গালের’ দেশ বলে মন্তব্য করে কিছু ভারতীয়। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে কোথায় চলে গেছে এবং যাচ্ছে সেটি এসব ভারতীয় বন্ধুরা জানেন না। সামাজিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলেছে বহু আগেই। মাথাপিছু আয়ের হিসেবেও আর কয়েক বছর পরে পেছনে পড়বে ভারত। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে বহু বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। গুগলে সার্চ করলেই সব লিংক পাওয়া যাবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ নানা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ঢুকলেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির দলিল মিলবে। ভারতীয়দের উচিত হবে সিনেমার জগতে শুধু না থেকে বাস্তবতাকে জানার চেষ্টা করা।

সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, ভারতের চলচ্চিত্র জগতে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি, সংবাদ মাধ্যমগুলোতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ইত্যাদি কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারত-প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় একই সভ্যতা ও সংস্কৃতির দুটো প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এমন বাস্তবতা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র