Alexa

“বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি, আজ থেকে নতুন দিন”

“বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি, আজ থেকে নতুন দিন”

মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল যে, কৃষকদের সংকট, বেকার সমস্যা ও সর্বোপরি অর্থনৈতিক দুরবস্থা মোদির দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা, অনুমান, আলোচনা ও পূর্বাভাসকে উড়িয়ে দিয়ে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিই ধর্মনিরপেক্ষ ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের ক্ষমতায় পুনরায় বসছে। ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়েছিল ১১ এপ্রিল, সাতদফা ভোটাভুটির শেষ দফা ছিল ১৯ মে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছেন, ভারতের ৯০ কোটি ভোটারের মধ্যে ৬০ কোটিই এবার ভোট দিয়েছে।

আমরা জানি, লোকসভার ৫৪৫টি আসনের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী ভোট অনুষ্ঠিত হয় ৫৪৩টিতে, বাকি দুটি আসনে মনোনয়ন দেন রাষ্ট্রপতি। এবার ভোট হয়েছে ৫৪২টিতে। ভোট হয়নি শুধুমাত্র তামিলনাড়ু রাজ্যের ভেলর আসনে। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে আসনটিতে ভোট স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। লোকসভার ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৩৪৯টিতেই বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বিজয়ী হয়েছে। কোনো দল বা জোটকে সরকার গঠন করতে হলে প্রয়োজন ২৭২টি আসন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স বা ইউপিএ পেয়েছে ৯২টি এবং অন্যান্য দল ১০১টি আসন।

হিন্দিবলয় গুজরাটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই এই ’মোদি ঝড়’। এই ঝড় বিস্তৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটকেও। পরাজয় মেনে নিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি ও এনডিএ জোটকে। একইভাবে রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কাও দেশবাসী ও নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, দেশবাসী মোদিকে পছন্দ করে ভোট দিয়েছেন। ভারতের নির্বাচনে এবার সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। আর এতে এগিয়ে ছিলেন মোদি। সব রাজনৈতিক দলই মিডিয়ার দিকে নজর রেখেছিল। সাত দফা নির্বাচনে শুধু ভোট গ্রহণের দিনগুলোকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করে নয়াদিল্লির ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি। তাতে দেখা যায় শুধু ভোটের দিনগুলোতেই মোট ১৭ লাখ ৪০ হাজার টুইট করা হয়েছে।

গত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মোদি ঝড় আটকাতে পেরেছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। সেই আত্মবিশ্বাসে এবারও তেনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে রাজ্যের ৪২টি আসনেই তৃণমূল বিজয়ী হবে। কিন্তু হিসাব পাল্টে গেছে। এ রজ্যের মোট আসনের মধ্যে ১৮টিই পেয়েছে বিজেপি, গত নির্বাচনে পেয়েছিল মাত্র দুটো। কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র দু’টি আসন, গতবার পেয়েছিল চারটি, আর মমতার তৃণমূল পেয়েছে ২২টি আসন যা গতবারের চেয়ে ১২টি কম। এতে প্রমাণিত হয় যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুছে যাওয়া বামদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।

একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে বিজেপি মোট দুটি আসন পেয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার পর ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল চার শতাধিক আসন। এবার সেই দল ৫০টি আসনের আশপাশ দিয়ে চলছে। কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী পার্টির এই পরিস্থিতির কারণে সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আসলে তার পদত্যাগের প্রয়োজন নেই। রাজনীতি এটিই। তার নিজের ভুলের কারণে বা তার ব্যক্তিগত কোনো কারণে যে নির্বাচনের এই ফল এই দাঁড়িয়েছে তা কিন্তু নয়। একজন মানুষের পক্ষে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মন জয় করা যে সব সময়ই সম্ভব হবে তা কিন্তু নয়। রাজনীতি এক ধরনের আবেগ। জনগণের সেই আবেগ কখন যে কোনদিকে যায় তা বলা কঠিন। নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে রাজনীতির এই খেলায়।

ভারতবর্ষ বিভক্তির পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ আরএসএস নামক সাম্প্রদায়িক সংগঠনটিই জনসংঘ নামে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে। কালের পরিক্রমায় সেটিই এখন বিজেপি। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার হাওয় লাগতে শুরু করে। এ সময় ভারতের রাজনীতিতে একাধিপত্য ছিল ইন্দিরা গান্ধীর। তার আধিপত্য খর্ব করতেই এক সময় বাকি সবাই এক জোট হয়েছিল যদিও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শিক পার্থক্য ছিল অনেক।

ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো তখন দল বা গ্রুপ ভারি করতে জনসংঘকেও সঙ্গে নিয়েছিল আর সেই থেকেই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি রাজনৈতিক অঙ্গন দখল করতে শুরু করে। যার চূড়ান্ত পরিণতি ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতে দ্বিতীয়বারের মতো বিজেপির ক্ষমতা দখল।

এটা ঠিক যে, মোদির মতো ব্যক্তিগত ক্যারিশমা অন্য নেতাদের মধ্যে খুঁজে পায়নি ভারত। এ ধরনের নেতা আছেন আমেরিকায়, রাশিয়ায়, হাঙ্গেরিতে, তুরস্কে। এ ধরনের নেতারা অনেক কিছুই বলেন। অন্যদিকে যে যাই বলুক তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। তারা ক্ষমতায় ঠিকই ফিরে আসেন। কেউ কি ভেবেছিল যে ট্রাম্প হবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট?

এটিতো সবাই জানেন যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো মোদি রাখতে পারেননি, তারপরেও জনগণ তাকেই ভোট দিয়েছে। গণতন্ত্রের এটি আর এক রহস্য, আর এক ধরনের ম্যাজিক। জনগণ কখন কী চান, বলা কঠিন। জনগণ বোধহয় জাতীয়তাবদী ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতেই আস্থা রেখেছেন মোদির ওপর। কিন্তু সেখানেই বা মোদি অতিরিক্ত কী করেছেন? বরং পাকিস্তানের কূটনীতির কাছে হেরে গিয়েছিলেন যখন বিমান বাহিনীর পাইলটকে হাতের মধ্যে পেয়েও সসম্মানে ভারতে পাঠিয়ে দিলেন ইমরান খান। তারপরেও মোদিকেই জনগণ ভোট দিলেন! এটিই গণতন্ত্রের মোড়!

শতাব্দীর প্রাচীনতম দল কংগ্রেস ২০১৪ সালের নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তারপর গত পাঁচ বছরে কোন কিছুতেই যেন কিছু করতে পারছিলেন না। তবে এবার লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েকমাস আগে ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হলে জাতীয় নির্বাচনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এর সাথে যুক্ত হয় প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর কংগ্রেসে যোগদান, উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পাটির ও বহুজন সমাজবাদী পার্টিসহ বিভিন্ন দলের মহাঘটবন্ধন বা মহাজোট গঠন।

রাহুল গান্ধী বলেছেন, ”কোনটা ভুল হয়েছে, আজ এ নিয়ে আলোচনার দিন নয়। জনগণ নরেন্দ্র মোদিকে স্বতঃস্ফূর্ত রায় দিয়েছে। জনতার রায়কে সম্মান জানাচ্ছি।’ এটি ম্যাচিউর রাজনীতিকের মতোই কথা। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধার কথা। আমেথিতে ঐতিহাসিক হার মেনে নিয়ে বলেছেন, ”আশা করছি ওই আসনের মানুষকে স্মৃতি ইরানি ভালোবাসা দিয়ে রাখবেন।’চমৎকার মন্তব্য। মোদিও চমৎকার করে বলেছেন, ”বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি। আজ থেকে নতুন দিন। কোটি কোটি নাগরিক এই ফকিরের ঝুলি ভর্তি করে দিয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে সফলতম জয়।’

আমরা চাই বিজেপির নেতৃত্ব ভারতে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে বসবাস করবে। সত্যিই আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতে মোদির নেতৃত্বে নতুন দিন আসবে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক; বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত।

আপনার মতামত লিখুন :