হায় চাঁদ, বিলম্বিত চাঁদ

তুষার আবদুল্লাহ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সীমিত, অতিসীমিত ওভারের ক্রিকেট ম্যাচের উত্তেজনাকে হার মানিয়ে আজ ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে। আসলে উদযাপনের বৃষ্টি বিলম্বিত চাঁদ রাতেই ভোগ করা হয়ে গেছে। যদিও কারো কারো মনে হয়েছে তৃতীয় বিচারকের কাছে চাঁদ দেখা কমিটি আকাশে মেঘ দেখা মাত্রই যেতে পারত। চাঁদরাত্রি উদযাপনের সময় কমিয়ে আনায় ক্ষোভ রয়েছে নাগরিকদের মধ্যে। আচমকা সিদ্ধান্ত বদল হওয়ায় ঈদ আনন্দ ভোগ কারো কারো বেলাতে অনুভোগে আটকে যাচ্ছে।

কেনাকাটার মাত্রায় পূর্ণতা আনা যায়নি। রান্না না হয় অনেকটাই সামলে নেওয়া গেছে। বিপণিবিতান রাত জেগে কাটালেও, অনেকের রাতে ঘরের বাইরে যাবার মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক ফিটনেস ছিল না। ১৯৯৭ সালের কথা মনে পড়ে। হাল ছেড়ে দেবার পর এবারের মতোই জরুরি ভিত্তিতে চাঁদ সরবরাহ করা হয়েছিল। সেবার যেমন করে ভেবেছিলাম কতো কিছুই চাইতে চাইতে পাই না। যাক, হাল ছেড়ে দেবার পরেও তো আকস্মিকভাবে জীবনে চাঁদ এসে ধরা দেয়। এতোদিনে আরো কতো কিছুই তো অধরা। লাটাইর সুতো ছিঁড়ে ঘুড়ি দূরে চলে যায়। চাঁদই কেবল আমাদের মন যন্ত্রণা বুঝে। শেষ মুহূর্তে হলেও এসে পাশে দাঁড়ায়। ওই যে একজন আছেন না, চাঁদের বুড়ি? ঠিক যেন আমার দিদুর মতোই। মজা দেব না দেব না বলে, শেষ পর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়ার আগে ঠিকই হাতে গুঁজে দিল ঈদ।

চাঁদ বেচারাও এবার একটু মুশকিলেই ছিল। একদিন আগেও কেমন ঝকঝকে আকাশ। কাল কেন মেঘের এমন নষ্টামি? আরে বাবা গন্ধরাজ, কদমের সঙ্গে তোমার প্রেম লীলার জন্য তো আষাঢ়ের লগ্ন এখনও বাকি। এই জ্যৈষ্ঠে কেন তোমার মেঘ রঙ ওড়না পড়ে উসকানী দিতে হবে? মেঘের ওড়না ডিঙিয়ে চাঁদ আর সামনে এসে দাঁড়াতে পারেনি। আড়ালেই থেকেছে। মেঘ ভেবেছে-থাকি না আড়ালে। দেখ না আষাঢ়ে পূর্ণিমার এক, দুই আনার স্বাদ পাও কি না? না, জ্যৈষ্ঠের মেঘরঙ ওড়না এবার মসলিনে বোনা ছিল না। বোনা হয়েছে মোটা কাপড়ে। তাই শহরের মানুষের বহুতল ইমরাতের ছাদে উঠেও চোখে তার নাগাল পাইনি।

গ্রাম-গঞ্জও আজকাল উঁচু ভবনে ঠাসা। তাদের রুচিও সুক্ষ তাঁতে বোনা। তাই সর্বত্র চাঁদ বিরাজিত হতে পারেনি। কিন্তু মোটা কাপড়ের দেশের কিছু চোখ ঠিকই চাঁদ খুঁজে পেয়েছে। স্বস্তির জায়গা এতোটুকুই যে-সবার চোখ নিয়নবাতির আলোয় ঝলসে যায়নি। সবাই যখন হাল ছেড়ে ক্লান্ত, তখন ঠিকই ঘাম ঝরিয়ে তারা চাঁদ উদ্ধার করে এনেছেন। বিলম্বিত চাঁদ এসে বসল এই দুর্ভাগা কপালে। গোলকের সবাই উদযাপন করবে। আশপাশের বাড়িঘর থেকে সেমাই পায়েসের ঘ্রাণ এসে নাকে ঝাঁপটা দেবে, আর আমরা সবুর করেই থাকব? এই আবেদনে তৃতীয় আম্পায়ার সদয় হয়েছেন। কৃতজ্ঞতা তার প্রতি।

ঈদ তো শুরু হয়ে গেল। এবার ঈদির (সালামি) অপেক্ষা। এখন তো আর সেই দিন নেই, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সালাম করে ঈদির জন্য হাত পাতব। গলির মোড়ে মহল্লার মুরব্বিদের কদমবুচি করে হাত পাতব। পেশাগত ব্যস্ততায় আধেক ঈদ তো অফিসেই ফুরোয়। তবে এবার এক অন্য স্বাদের ঈদির অপেক্ষায় আছি। এককভাবে আমি নই। সম্মিলিত ঈদির অপেক্ষায় আছি। ঈদ উদযাপনে সেই ঈদি পাওয়ার ব্যাকুলতার আতর মাখা থাকবে দিনমান। ঈদের শেষ তিথিতে সেই ঈদি এসে পৌঁছবে বলে বিশ্বাস রাখি। ঈদি আসবে বিলেত থেকে। নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে জয়। এর চেয়ে বড় ঈদি আর হতে পারে না। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, সৌম্য, মাহমুদউল্লাহ, মিথুন, সাইফুদ্দিন, মোস্তাফিজ, মোসাদ্দেক, সাব্বির এই নক্ষত্ররা আমাদের জন্য ঈদি পাঠাবে, সেই অপেক্ষায় ব্যাকুল হয়ে বিলম্বিত চাঁদকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছি।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন :