চীন দেশে ঈদ, ধর্ম ও জীবন দর্শন

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪.কম

ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ত্যাগের শিক্ষা নিয়ে মহিমান্বিত পবিত্র রমজান মাসের শেষে বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় ঈদুল ফিতর উদযাপন করছে। এবার দেশে এই উৎসবে শামিল হওয়া সম্ভব হয়নি। সৌদি আরবে ঈদ উদযাপিত হয়। আমি যেখানে অবস্থান করছি, অর্থাৎ চীনে ৫ জুন বাংলাদেশের মত ঈদ উদযাপিত হয়েছে, যদিও এখানে রমজান শুরু হয়েছিল একদিন আগে।

এর আগেও একবার এখানে ঈদ করেছিলাম, তবে সেটা ছিল ঈদুল আজহা। বেইজিং শহরে যে কয়টি মসজিদ রয়েছে তার মধ্যে মাদিয়ান একটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের সঙ্গে একসঙ্গে নামাজ আদায় করাটা দারুণ এক অভিজ্ঞতা। নারীদের নামাজের জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। তাছাড়া শুক্রবার জুমার নামাজেও নারীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

মুসলমানদের ব্যাপারে চীন সরকারের যে ভূমিকা বর্তমান সময়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং বিশ্ব গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে যেসব দমন-পীড়নের সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে এখানকার মুসলমানদের ঈদ অন্য মুসলিম দেশগুলোর মতো বর্ণাঢ্য হবার কথা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটিতে মুসলমানদের সংখ্যা আট কোটির কিছু বেশি, মসজিদ রয়েছে ৩০ হাজারের মতো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলিম বসবাস করে পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং প্রদেশে। সেখানে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মুসলমানের বাস। কথিত রয়েছে, বিগত বছরগুলোতে সেখানে বসবাসরত উইঘুর সম্প্রদায়ের মুসলিমদের ওপর চীন সরকারের নির্যাতন নিকট অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিনজিয়াং প্রদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে বর্তমানে ১০ লক্ষাধিক মুসলিম বন্দী অবস্থায় অমানবিক জীবনযাপন করছে। তিব্বতের মতো প্রাদেশিক স্বয়ত্তশাসন থাকলেও এই দু’টি এলাকাই চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। চীন সরকারের পক্ষ থেকে নির্যাতনের কথা অস্বীকার করা হলেও তারা জানায়, সেখানে একটি ইসলামী গ্রুপের কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে তারা। তবে মোটা দাগে এর কারণ হিসেবে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে উইঘুররা নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির শাসনামলের শুরু থেকে তাদের প্রতি কঠিন নজরদারী বাড়ায় চীন সরকার।

উইঘুর মুসলিম অধ্যুষিত শিনজিয়াং প্রদেশটি চীনের সবচেয়ে বড় প্রদেশ এবং এর অবস্থান দেশটির সর্বপশ্চিমে। এই প্রদেশের বিষয়ে সরকারের বিশেষ সচেতনতার আরেকটি কারণ হচ্ছে ঐতিহাসিক সিল্ক রুট এই অঞ্চল দিয়েই গেছে। এই প্রদেশটির সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে আফগানিস্তান, কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া এবং ভারতের। সেখানকার উইঘুররা যাতে তাদের সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার, অবাধে যাতায়াত এবং সরকারবিরোধী প্রশিক্ষণ নিতে না পারে সে ব্যাপারে তৎপরতার অংশ হিসেবে চীন সরকারের এই দমননীতি। ২০০৯ সালে শিনজিয়াং প্রদেশে এক দাঙ্গায় প্রাণ হারায় দুই শতাধিক এবং এদের বেশির ভাগই ছিল চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ হান সম্প্রদায়ের মানুষ। কথিত আছে, উইঘুর সম্প্রদায়ের মুসলমানদের আধিপত্য খর্ব করতে চীন সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক হারে সংখ্যাগরিষ্ঠ হানদের সেখানে পাঠানো হচ্ছে। সরকারের অভিযোগ, ২০১৩ সালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে গাড়িবোমা হামলায় পাঁচজন নিহত হয় এবং ২০১৪ সালে অপর এক হামলায় ৯৬ জন নিহত হয়- এই দু’টি ঘটনাই ঘটায় উইঘুররা। তবে এর সপক্ষে তারা সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।

বেইজিং এ অবস্থানের কারণে শিনজিয়াং প্রদেশে নির্যাতিত মুসলিমদের সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানার অবকাশ নেই। এমনিতেই দেশটিতে গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংকুচিত, তদুপরি শিনজিয়াং প্রদেশে কোনো সংবাদ মাধ্যমের অনুমোদন না থাকাতে এখানে বসবাসরত মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রকৃত তথ্য জানতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমই মূল ভরসা। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এখানে মুসলমানদের সম্পর্কে কেবল এটুকুই বলা যায়, তারা নিত্য প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ইসলামের আদর্শ যেভাবে ধারণ করে চলেছে তা সব মুসলমানের জন্যই অনুসরণীয়।

বিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি মুসলমানের পবিত্র ঈদ মুসলিম দেশগুলোতে যেভাবে উৎসবের আয়োজন থাকে এখানে এসে দেখলাম কেবল মুসলমানদের বাইরে অন্যান্যদের এই বিষয়ে তেমন ধারণা নেই। কিংবা বিষয়টি তাদের কাছে আদৌ তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না। যারা বিভিন্ন পেশাগত দায়িত্বে রয়েছেন, ঈদ বলে এক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যথারীতি খোলা থাকে, অথচ বিভিন্ন উপলক্ষে এখানে যথেষ্ট ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে, এর বাইরে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে রয়েছে টানা সাতদিনের সরকারি ছুটি, যা গোল্ডেন হলিডে নামে পরিচিত। সে কারণে বলছি, এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও এখানকার মুসলিমদের ধর্মীয় আচার আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

বাংলাদেশের মানুষের ঈদ প্রস্তুতি এবার এখানে বসে দেখলাম। প্রতি বছরের মতো নাড়ির টানে বাড়ির পথে মানুষের যে ভোগান্তি, এর সব কিছু এক নিমেষেই মিইয়ে যায় প্রিয়জনদের মুখ দেখলে। তবে সেই কাঙ্ক্ষিত প্রিয়মুখ দেখা হয়ে উঠে না অনেকেরই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণে। আসলে স্বভাবজাত ভাবেই আমাদের দেশের মানুষ বোধ হয় একটু বেশি আবেগপ্রিয়। ক্ষণিকের এই প্রশান্তির জন্য কত না আয়োজন! বাস, ট্রেন, লঞ্চের টিকিটের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা। এর মধ্যে যারা পেয়ে যান তাদের আনন্দ যেন লটারিতে কোটি টাকা জেতার আনন্দকেও ম্লান করে দেয়। আর যারা পান না, অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে চলেন গন্তব্যের পথে, কখনও কোলের শিশুকে, কখনও বৃদ্ধ মা-বাবাকে বাসে বা ট্রেনের ছাদে তুলে কিংবা লঞ্চের ডেকে দাঁড় করিয়ে। এটাই যেন জীবনের ধর্ম। এই একটি জায়গায় অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি ধর্ম আর জীবন কতই না কাছাকাছি। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রকৃত ধর্মীয় অনুশাসন আমাদের জীবনকে আনন্দময় করে তুলুক – এই ঈদে এটাই প্রার্থনা করছি। সবাইকে ঈদ মোবারক।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :