গ্রামের ঈদ ও ভালো-মন্দের তফাৎ ভোলার অনুভূতি

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গ্রামের ছেলেদের হৈ-হুল্লোড় করে সবার সঙ্গে ঈদ করাটা পছন্দনীয় ব্যাপার। আমার বেলাতেও তাই। এবার সব জেলার মানুষ চাঁদ দেখেনি, আমরা দেখেছি। আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির যুগেও চাঁদ দেখার বিলম্বিত তথ্য নিয়ে রাত বারোটায় বিড়ম্বনার চাঁদ দেখার ঘোষণা না দিলেও হয়তো আমরা পরদিন ঈদ করতাম। ঢাকাসহ প্রায় সব জেলায় বৃষ্টি হলেও আমরা সূর্যের আলোয় আনন্দ করে উন্মুক্ত ঈদগাহ মাঠে নামায আদায় করতে পেরেছি। চারদিকে মানুষের উৎসাহ, মসজিদ থেকে বারংবার ঈদের জামাতের সময়সূচি ঘোষণা, মাইক বাজিয়ে ঘটা করে বৃহৎ ষাঁড়ের মাংস বিক্রি ইত্যাদি জানান দিচ্ছিল যে গ্রামের ঈদে ভিন্ন আমেজ এসেছে। তাই ঈদের ছুটিতে গ্রামে এসে বেশ খুশিমতোই সময়টা পার হয়েছে।

ঈদের ছুটি শেষ। ক’ দিন গ্রামে থেকে মনটা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠলেও কিছু নেতিবাচক পরিবর্তন দাগ কেটেছে। এর অনেক কারণ হয়তো আমাদের অজানা। আবার অনেক কারণ জেনেও গুরুত্ব দেয়া হয় না। সব অজানা কারণ উদঘাটন করার সময় এসেছে।

গ্রামের রাস্তায় প্রচুর অটোরিকশা ও মোটর সাইকেল। একরাতে একজন বেকার যুবকের ঘরে দেখলাম তিনটি মোটর সাইকেল। ভাবলাম সে কোন ব্যবসাপাতি করে বেশ অবস্থাসম্পন্ন হয়েছে। পরে জেনেছি ওগুলো তার নিজের নয়। সে ‘মুলি’ (উচ্চহারে সুদ)-র ব্যবসা করে। অর্থাৎ, এক সপ্তাহের জন্য কোন অভাবী লোককে টাকা ‘মুলি’ দেয়। সপ্তাহান্তে কোন কারণে সে টাকা শোধ দিতে অপারগ হলে সেটার সুদ তিন থেকে পাঁচগুণ বেড়ে যায়। এরপর সেই টাকা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শোধ দিতে না পারলে অভাবী লোকটির অটোরিকশা বা ব্যবহৃত মোটর বাইকটি জব্দ করা হয়। এভাবে একদিন সেগুলো মুলিদাতার নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে যায়। সামন্তবাদী উচ্চ সুদের এই পদ্ধতিটি গ্রামে-গঞ্জে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠে অভাবী মানুষকে শোষণ ও নি:স্ব করে চলেছে তা দেখে ব্যথিত হলাম। কোন কোন গ্রামে ভিক্ষাবৃত্তির প্রাপ্ত অর্থকে মুলি ব্যবসায় খাটানো হচ্ছে বলে জানা গেল।

এছাড়া দিনের বেলা বটতলা, বাঁশঝাড়, পুকুরঘাট ইত্যাদিতে মানুষের জটলা চোখে পড়লো। মাদুর, চটের বস্তা অথবা খড় বিছিয়ে গোল হয়ে বসে অনেকে দীর্ঘসময় কাটাচ্ছে। সেখানে কোন জটলাতে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন হুজুরের ওয়াজ বেজে চলেছে। অথচ তাদের হাতে বিড়ি-সিগারেট ও তাস। সামনে জুয়ার বেটের টাকা ছড়ানো! অর্থাৎ সেখানে মোবাইলে ধর্মীয় ওয়াজ বাজিয়ে জুয়া খেলা চলছে! ওদের পাশে কিছু মুরুব্বী গোছের মানুষ বসে আছেন, শিশুরাও ঘোরাঘুরি করছে সেখানে। কৌতূহল বশত আমরা ওদের খেলা দেখতে গেলে হাতের তাস ও সামনের ছড়ানো টাকাগুলো দ্রুত লুকিয়ে ফেলে কাঁচুমাচু হয়ে সবাই বলে উঠলো- আমরা এখানে বসে ওয়াজ শুনছি। চাচা আসসালামু আলাইকুম, আপনি কেমন আছেন? বাড়িতে কখন আসলেন? গ্রামের বড়দের শ্রদ্ধা জানানোর চিরন্তন ভালো মূল্যবোধগুলো তারা এখনো অনুসরণ করে চললেও নৈতিকতার নেতিবাচক চর্চার দিকগুলো ইতোমধ্যে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে এবং সেগুলো সামাজিক ভাঙন ও মানবিক ধস তৈরি করে ফেলছে তা ভেবে খুব আতঙ্কিত হলাম।

আরেক জায়গায় দেখলাম ডাব্বু, মার্বেল, ক্যারমবোর্ড খেলা চলছে। বিদ্যুৎ এর আলোয় এ খেলাগুলো নাকি রাত-দিন চলে। এগুলো শুধু বিনোদনের জন্য হলে ভালই হতো। কিন্তু ভয়ংকর বিষয় হলো- এখানে সব ধরণের খেলাতেই জুয়ার টাকার ছড়াছড়ি। এটাই হলো বর্তমান গ্রামীণ বিনোদনের নেতিবাচক পরিবর্তন।

এক সন্ধ্যায় একজন অভিভাবক এসে জানালো তার সন্তানের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, চাহিদা অনুযায়ী দালালকে পর্যাপ্ত টাকা দিতে না পারায় তার ছেলের সরকারি চাকরিটি হয়নি। এই পাশের গ্রামের একজনের ও তার পাশের গ্রামের আরেকজনের ছেলের চাকরি হয়েছে। তিনি তার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে থাকলেন। একবছর আগে তিনি এক বিঘা জমি চার লাখ টাকায় বন্ধক রেখেছিলেন ছেলের চাকরি পেতে সে টাকার কাজে লাগাবেন বলে! কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেই ছোটখাটো চাকরির দাম উঠে গেছে দশ-বারো লাখ টাকা! হায়রে কপাল। তিনি এখন ছেলেকে নিয়ে কী করবেন তা ভেবে ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। ছেলে তার বি.এ. পড়ে, জমিতে যায় না, কাজ করতে চায় না। তাকে আর পড়ানোর আর্থিক সামর্থ্য তার নেই। ছেলেটা দিনরাত মোবাইল নিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর ডাব্বু, ক্যারাম খেলে। সেজন্য বিটের টাকা তার বাবার কাছে নিয়মিত চায়। এছাড়া ঘরে তার বিবাহযোগ্যা মেয়েও আছে।

এরকম পরিস্থিতি আরও বেশকিছু নজরে পড়ল।

এ ধরণের আরও অনেক সমস্যার কথা শুনে, দেখে, বুঝে এক সময় ঈদের ছুটি শেষ হয়ে গেল। গ্রাম ছেড়ে আবার শহরের চিরচেনা কর্মস্থলে চলে এলাম। তবে বাড়ির পুকুরপাড়ে আমার মরহুম প্রিয় আব্বাজানের লাগানো গোলাপজাম গাছের নিচের সুশীতল ছায়ায় পাতানো বাঁশের টং-এ বসে যে সুখানুভূতি হয়েছিল তা মিলিয়ে যাবার পূর্বে অভিজ্ঞতাগুলোকে লিখে প্রকাশ করে ফেললাম।

কারণ, আমাদের বর্তমান সমাজে ঘুষ-জালিয়াতি, চাকরি কেনা-বেচা, অনৈতিকতার দালালী ইত্যাদি নানা ধরণের নেতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে তা যদি ক্রমান্বয়ে চলতেই থাকে তাহলে সামাজিক বিপর্যয় অনিবার্য। রক্তে মিশে যাওয়া দুর্নীতি ও অপরাধ প্রতিনিয়ত আমাদেরকে পাপ-পঙ্কিলতার অতল গহ্বরে তলিয়ে দিয়ে আত্মহননে বাধ্য করছে।

এজন্য এখনই সময়- প্রতিটি সামাজিক নিরাপত্তা সেবা খাতে উপযুক্ত সেবাদান নিশ্চিত করতে সামাজিক গবেষণা শাখাকে জোরদার করে যথার্থ তথ্যের ভিত্তিতে কর্মসূচি হাতে নিয়ে এসব নেতিবাচক ও ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেবার পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনা। অদৃশ্য ও অবৈধ আয়ের মানুষরা কর প্রদান করতে গেলে ধরা পড়তে পারে তাই সঠিক পরিমাণ কর ও যাকাত প্রদানেও বিরত থাকে। তাই এদের দ্বারা রাষ্ট্রের আর্থিক ও বৈশ্বিক কোন মর্যাদাই বাড়ে না।

গ্রাম-শহর সবজায়গায় চারদিকে অনৈতিকতার চর্চা, অদৃশ্য আয় ও কিছু স্বার্থপর মন্দ মানুষের অবৈধ অর্থ ব্যয়ের বাহারি ফুটানি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্বকে প্রকাশ করে। মানুষ যেন ভাল-মন্দের তফাৎ করা ভুলেই গেছে। তাই আজকের একান্ত কামনা- মানুষের অন্তরাত্মা সৎ ও নির্ভীক হোক এবং এ হীন অবস্থার আশু অবসান হোক।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

আপনার মতামত লিখুন :