সম্মানিত উপাচার্য পদের জন্য অসম্মানিত পন্থা

মো. জাকির হোসেন
মো. জাকির হোসেন, ছবি: বার্তা২৪.কম

মো. জাকির হোসেন, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

খুব ভালোবাসি। প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসি প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়কে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অধ্যয়ন করিনি। চাকরিসূত্রে সখ্য শুরু হলেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কেবল রুটি-রুজির সম্পর্ক নয়।

ভালোবাসা, মুগ্ধতা আর মমতার রাখী বন্ধনের সম্পর্ক এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। মানুষ যেমন মুহূর্তেই সুন্দর মুখের প্রেমে পড়ে, তেমনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য প্রথম দর্শনেই যে কাউকে মোহিত করবে। চারদিকে সবুজের সমারোহ, ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়, পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানির ঝরনা ও ঝিরিধারা। অজগর, হরিণ, বানর, সজারু, ‘আসমতি’ ব্যাঙ, পতঙ্গভুক উদ্ভিদ, পাখ-পাখালীসহ নানা বন্য প্রাণীর বিচরণ ও উদ্ভিদের দেখা মেলে এখানে। জীব-বৈচিত্র্য ও অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পাহাড়ের বুক চিড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এ বিশ্বদ্যিালয়।

বলছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। ৫৪ বছরের এ জীবনের আধেক সময় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেটে গেছে। যৌবনের শুরুতে যে সম্পর্ক, প্রৌঢ়ত্বে এসে সে ভালোবাসায় মোটেও ভাটা পড়েনি, বরং ভালোবাসা গাঢ়তর হয়েছে। জীবনের অংশ বনে যাওয়া এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আনন্দে-প্রাপ্তিতে যেমন উছ্বসিত হয়েছি তেমনি এর দুঃখে, অবনমনে কষ্ট পেয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছি। বের হয়ে যাব এমন সময় পত্রিকার প্রথম পাতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে চোখ আটকে গেল। সংবাদটা পড়ে দুঃখিত, অপমানিত, লজ্জিত হলাম। সংবাদে প্রকাশ উপাচার্য পদে নিয়োগ পেতে প্রার্থীদের কেউ কেউ গত কয়েক মাস ধরে দৌড়-ঝাঁপ করছেন। উপাচার্য পদে আসীন হতে কোনো কোনো শিক্ষক টানা দেড় থেকে দুই মাস তদবির করে যাচ্ছেন। একজন শিক্ষক রাজনৈতিক নেতার পা ছুঁয়ে সালামও করছেন। মন্ত্রী, আমলা, সাংসদ, স্থানীয় রাজনীতিক এমনকি ছাত্র নেতৃবৃন্দের কাছেও ধরনা দিচ্ছেন। সংবাদটি কেবল উপাচার্য পদ প্রত্যাশীদের সামাজিকভাবে অবনমন করেনি, বরং পুরো শিক্ষক সমাজকে বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজকে অপমানিত করেছে, লজ্জিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অন্যান্য পেশার মতো সরকারি গাড়ি, সর্বোচ্চ বেতন, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে সম্মানজনক প্রটোকল, নামমাত্র বা প্রতীকী মূল্যে প্লট-ফ্ল্যাট, খাদ্যসামগ্রী, স্বাস্থ্যসেবা, নানা নামে ভাতা, উচ্চহারে সিটিং অ্যালাউন্সসহ অন্যান্য প্রান্তিক সুবিধাদি ভোগ করতে পারেন না। তারপরও অপেক্ষাকৃত ভালো ফলাফলধারী এক শ্রেণীর মানুষ এ পেশায় যোগদান করেন। এর অন্যতম কারণ হয়তো জ্ঞান চর্চা ও গবেষণার প্রতি আকর্ষণ, আত্ম-সম্মানবোধ ও একেবারে তলানীতে ঠেকে যাওয়া সমাজের মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধা।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুও বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সম্মানের চোখে দেখতেন। প্রসঙ্গক্রমে দু’টি ঘটনা উল্লেখ করছি। চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান প্রফেসর ইন্নাস আলী স্মৃতিচারণে লিখেছেন ‘বঙ্গবন্ধু উপাচার্যদের প্রায়ই ডাকতেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত চাইতেন। বঙ্গবন্ধু আমাকে খুব সম্মান দেখাতেন। ওনার রুমে ঢুকলেই দাঁড়িয়ে যেতেন। অনেক সময় হয়তো মিটিং চলছে, তখনও এ রকম দাঁড়িয়ে সম্মান করতেন।’ বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর অধ্যাপক আবুল ফজল ‘শেখ মুজিবকে যেমন দেখেছি’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। শিক্ষা ও শিক্ষকের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অগাধ শ্রদ্ধার কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক আবুল ফজল লিখেছেন, ‘১৯৬৯ এর নভেম্বর মাসে ইত্তেফাক পত্রিকায় -শক্ত কেন্দ্র কেন ও কার জন্য- শিরোনামে প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে বঙ্গবন্ধু অভিনন্দন জানিয়ে তাকে পত্র লিখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর চিঠির জবাবে অধ্যাপক আবুল ফজল যে চিঠি লিখেছিলেন তার উত্তরে বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন, ‘আপনার মতো জ্ঞানী, গুণী ও দেশপ্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে পারলে খুবই আনন্দিত হতাম। আবার যখন চট্টগ্রামে যাব, সাহিত্য নিকেতনে যেয়ে নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে দেখা করব।’ অধ্যাপক আবুল ফজলকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফোন করে বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক আবুল ফজলের অনুমতি নিয়েছিলেন বলে আবুল ফজল তার লেখায় উল্লেখ করেছেন। বিগত কয়েক দশকে উপাচার্য পদের মান-মর্যাদা অনেকখানিই লুপ্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে পদ-প্রত্যাশীদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে যেভাবে এ পদের অবনমন ঘটানো হচ্ছে তা বোধ করি নজিরবিহীন। একজন সাবেক উপাচার্য আমাকে ফোন করে তার কষ্টের কথা শেয়ার করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি যে উপাচার্য ছিলেন এখন লজ্জায় এ তথ্য আর প্রকাশ করেন না।

বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন দেশে সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে যেসব বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল শিক্ষা। সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলায় শিক্ষার সবিশেষ গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করেন একজন শিক্ষকের হাতে। আর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে নিয়োগ দেন শিক্ষা সচিব হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে একীভূত বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. কুদরত-এ খোদাকে প্রধান করে যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিশন গঠন করা হয়েছিল, তাতে যুক্ত করা হয়েছিল সেরা শিক্ষক ও শিক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের। বঙ্গবন্ধুর গভীর মনোযোগ ছিল উচ্চশিক্ষার প্রতি। তিনি জানতেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই দক্ষ ও চৌকস মানবসম্পদ সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য গঠন করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি করেন। এর একটিই উদ্দেশ্য ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এবং তাতে মুখ্য ভূমিকা থাকবে শিক্ষকদের। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় উপচার্য নিয়োগের দু’টি পদ্ধতি রয়েছে। ১৯৭৩ সালে প্রণীত বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্টের আওতায় পরিচালিত ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটদের ভোটে নির্বাচিত তিন জনের একটি প্যানেল থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক একজনকে উপাচার্য নিয়োগের বিধান রয়েছে। এর বাইরে অন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপচার্য নিয়োগে সরকারের একচ্ছত্র অধিকার। সিনেট থেকে প্যানেল না পাঠালেও ১৯৭৩ এর বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্টের ১১(২) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিজস্ব ক্ষমতাবলে নিয়োগ দিতে পারেন। এ ধারায় বলা হয়েছে, ছুটি, অসুস্থতা, পদত্যাগ বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি অস্থায়ীভাবে কাউকে এ পদে নিয়োগ দিতে পারবেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মূল আইনে এ বিধানটি ছিল না। ১৯৭৫ সনে বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন অধ্যাদেশ (৬২ নম্বর অধ্যাদেশ) জারি করে এই বিধান যুক্ত করা হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন লংঘন করে বৃটিশ সরকারের কালা কানুন ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনানুগভাবে নিয়োগকৃত ১১ জন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারারকে অপসারণ করে নিজেদের পছন্দমতো উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগ দেয়। এরপর থেকে একই ধারায় সরকার কর্তৃক উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ১৯৭৩ এর বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট অনুযায়ী অন্যসব নির্বাচন হলেও উপাচার্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে উপাচার্য প্যানেল তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সিনেটের মাধ্যমে প্যানেল নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তা ব্যক্তিদের অনাগ্রহ, মামলা ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতার কারণে ৯১ এর পর থেকে ’৭৩ এর অ্যাক্টের অধীনে পরিচালিত প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার কর্তৃক উপাচার্য নিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। এমন নিয়োগ ‘৭৩ এর অ্যাক্টের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা অ্যাক্টের ১১(২) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিজস্ব ক্ষমতাবলে ছুটি, অসুস্থতা, পদত্যাগ বা অন্য কোনো কারণে কেবল অস্থায়ীভাবে কাউকে এ পদে নিয়োগ দিতে পারবেন। এ আইনের আওতায় পূর্ণ মেয়াদের জন্য কাউকে উপাচার্য নিয়োগের সুযোগ নেই।

নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে গুজবের ডাল-পালা এখন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কেই ঘিরে ফেলেছে। ক্ষণে ক্ষণে খবর আসছে অমুকের ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দফতরে। কেবল প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট স্বাক্ষরখানিই বাকি। অমুক মন্ত্রী-এমপি-নেতার বাসায় অমুক উপাচার্য প্রার্থীকে দেখা গেছে ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন পদ-পদবির জন্য তদবির করা আমি খুবই অসম্মানজনক মনে করি, হোক সেটা উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য পদ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একজন তদবিরবাজ, লবিংবাজ শিক্ষক ভিতর থেকে নৈতিকভাবে মরে যায়। সে আর তখন জাতির বিবেক, মানুষ গড়ার কারিগর থাকে না। তদুপরি ইসলামে পদ-পদবির জন্য তদবির করা কেবল নিষিদ্ধই নয়, বরং তদবির করে পদ পাওয়ার বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আর ইসলামে পদ প্রত্যাশীদের পদ দিতে নিষেধ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ ইহকাল কামনা করে, আমি সেসব লোককে যা ইচ্ছা সত্বর দিয়ে দেই। অতঃপর তাদের জন্যে জাহান্নাম নির্ধারণ করি। যেখানে সে প্রবেশ করবে একান্ত নিন্দিত ও ধিকৃত অবস্থায়।’ (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ১৮)। আবূ সাঈদ আব্দুর রহমান ইবনে সামুরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত: রসুল (সা.) আমাকে বললেন, ‘হে আব্দুর রহমান বিন সামুরাহ! তুমি সরকারি পদ চেয়ো না। কারণ তুমি যদি তা না চেয়ে পাও, তাহলে তাতে তোমাকে সাহায্য করা হবে। আর যদি তুমি তা চাওয়ার কারণে পাও, তাহলে তা তোমাকে সঁপে দেওয়া হবে। (এবং তাতে আল্লাহর সাহায্য পাবে না।’ (বুখারী ৬৭২২, ৭১৪৬, মুসলিম ৪৩৭০)।

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অতি সত্বর নেতৃত্বের লোভ করবে। (কিন্তু স্মরণ রাখ) এটি কিয়ামতের দিন অনুতাপের কারণ হবে। সুতরাং তা (ইহলোকে) কত উৎকৃষ্ট ও (পরলোকে) নিকৃষ্ট বিষয়!(বুখারী ৭১৪৮, নাসাঈ)।

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসুল (সা.) বলেন, ‘১০ ব্যক্তির আমিরকেও (নেতা) কিয়ামতের দিন বেড়ি পরানো অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। পরিশেষে হয় তাকে তার (কৃত) ন্যায়পরায়ণতা বেড়ি মুক্ত করবে, নচেৎ তার (কৃত) অত্যাচারিতা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।’ (আহমাদ ৯৫৭৩, বাইহাকী ২০০০২, সহীহুল জামে ৫৬৯৫)।

যে ব্যক্তি নেতা, বিচারক অথবা অন্যান্য সরকারি পদ চাইবে অথবা পাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করবে অথবা তার জন্য ইঙ্গিত করবে ইসলামে তাকে পদ দিতে নিষেধ করা হয়েছে। আবু মুসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত: আমি এবং আমার চাচাতো দু’ভাই নবী (সা.) এর কাছে গেলাম। তাদের দু’জনের মধ্যে একজন বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! মহান আল্লাহ আপনাকে যেসব শাসন-ক্ষমতা দান করেছেন, তার মধ্যে কিছু (এলাকার) শাসনভার আমাকে প্রদান করুন।’ দ্বিতীয়জনও একই কথা বলল। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! যে সরকারি পদ চেয়ে নেয় অথবা তার প্রতি লোভ রাখে, তাকে অবশ্যই আমরা এ কাজ দিই না।’ (বুখারী ৭১৪৯, মুসলিম ৪৮২১)

আল্লামা আব্দুর রহমান সা’দী বলেছেন, কর্তৃত্বমূলক যে কোনো পদ মানুষের চেয়ে নেওয়া উচিত নয় এবং সেজন্য নিজেকে যোগ্য বলে উপস্থাপন করাও কাম্য নয়; বরং এজন্য আল্লাহর নিকট দায়িত্ব মুক্ত ও নির্ঝঞ্ঝাট জীবন প্রার্থনা করা উচিত। কেননা সে তো জানে না যে, শাসন ক্ষমতা তার জন্য কল্যাণকর হবে, না অকল্যাণকর। সে এও জানে না যে, এই দায়িত্ব সে পালন করতে পারবে কি না। তারপরও যখন সে দায়িত্বের জন্য আবেদন-নিবেদন করে, তখন তা পেলে তার নিজের দিকেই তা সোপর্দ করে দেওয়া হয়। আর যখন বান্দার দিকে দায়িত্ব সোপর্দ করে দেওয়া হয়, তখন সেজন্য সে আল্লাহর সহায়তা পায় না। তার সব কাজ সুচারুরূপে করতে পারে না এবং সাহায্য-সহযোগিতাও পায় না। আল্লামা ইবনু রজব বলেছেন, ‘জেনে রাখ, মান-মর্যাদার লোভ মহা ক্ষতি ডেকে আনে। মর্যাদা লাভের আগে তা অর্জনের পথ-পদ্ধতি বা কলাকৌশল অবলম্বনের চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষ অনেক হীন ও অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে। আবার মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে অন্যের ওপর নিপীড়ন, ক্ষমতা প্রদর্শন, দাম্ভিকতা দেখানো ইত্যাদি ক্ষতিকর জিনিসের উদগ্র নেশায় পেয়ে বসে। (ছহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, পৃষ্ঠা ৩২)।

সরকার যাকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেবে, আমরা সবাই তার আনুগত্য করতে বাধ্য। আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর অনুগত হও, রাসুলের অনুগত হও ও তোমাদের নেতৃবর্গের।’ (সূরা নিসা, আয়াত ৫৯) বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদে নিয়োগ পেতে আসুন আমরা সচেতন থাকি, যাতে কোনোভাবেই এ পদের অমর্যাদা, অবনমন না হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক সমাজের সম্মান, মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সবাই আরও দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করি। নতুন স্বপ্নে, নতুন অঙ্গীকারে যুথবদ্ধ হই প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্মানের সঙ্গে সমৃদ্ধির পানে এগিয়ে নিতে।

মো. জাকির হোসেন: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :