Alexa

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

মিয়ানমারের অনীহা ও বিশ্ব মোড়লদের উদাসীনতা

মিয়ানমারের অনীহা ও বিশ্ব মোড়লদের উদাসীনতা

এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় না। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাইলে তাদের মেরে দেশ থেকে বিতাড়ন করতো না। দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা থাকলে পুরো একটি জনগোষ্ঠীর ওপর এভাবে কেউ নির্যাতন নিপীড়ন চালায় না।

সম্প্রতি তিন দেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী আর রাখঢাক না রেখেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের অনীহার কথাটি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আমাদের সব চেষ্টাই কি শেষ হয়ে গেছে? আর কি কোনো উপায়ই নেই?

একথা সত্য, আপাত দৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ কম চেষ্টা করেনি। তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে হয়তো আরও কিছু করার ছিল। বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখলে হয়তো একটা সমাধানের পথ বের হতো। কিন্তু আমরা নিজের ব্যর্থতাই হোক অথবা বিশ্ব মোড়লদের সঙ্গে রাগ-গোস্বা করেই হোক, অব্যাহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থেকে পিছু হটেছি। এটি মিয়ানমারকে সুবিধা দিয়েছে। মিয়ানমার তলে তলে তার কাজটি ঠিকই করে গেছে।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের জন্য যে বদ্ধ পরিকর ছিল এটি পরিষ্কার। এটা তাদের দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন মাত্র। ফলে বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কোনো বিকল্প ছিল না। এর একটি বড় প্রমাণ হলো, অব্যাহত চাপের ফলেই মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এটি আগেই বোঝা গিয়েছে যে মিয়ানমার ওই চুক্তিটি করেছে মূলত তাদের ওপর চাপ প্রশমনের একটি কৌশল হিসেবেই। সে কৌশলে মিয়ানমার জয়ী হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ চুক্তি বাস্তবায়ন তথা আন্তর্জাতিক পরিসরে মিয়ানমারের ওপর কার্যত চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে পারেনি। সেটি করতে পারলে হয়তো মিয়ানমার পিছু হটতো। কিন্তু আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল, আমরা ‘বিশ্ব মোড়ল’ বা ‘বড় ভাই’দের কাউকেউ সঙ্গে পাইনি।

সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার বাংলাদেশ থেকে দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শরণার্থীরা আসা শুরু করেছে প্রায় দুই বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখনও উল্লেখ করার মতো কোনো রোহিঙ্গা নিজে দেশে ফেরত যায়নি। এর মূল কারণ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মিয়ানমারের অনীহা ও বিশ্ববাসীর উদাসীনতা।

আমাদের সবচেয়ে পরীক্ষিত বন্ধু বলে খ্যাত ভারতও রোহিঙ্গা প্রশ্নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়নি চীন ও জাপান। ট্রাম্পতো আগেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন আর পুতিনও সে পথেই গিয়েছেন। ফলে রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশে বিশ্ব একা। কেউ কেউ কিছু তাৎক্ষণিক খয়রাতি সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু বিশ্ববাসীর বুঝতে হবে, ১১ লাখ মানুষের ভরনপোষণ দুই টন গম, এক টন খেজুর আর দুই বান্ডেল ঢেউ টিনের কাজ না।

বিশ্ব মোড়ল এমনকি মুসলিম দেশগুলোর এমন উদাসীনতা দেখে প্রধানমন্ত্রী তার সেই হতাশাই ব্যক্ত করেছেন মাত্র। মুসলিম দেশগুলোও রোহিঙ্গাদের মতো একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য এগিয়ে আসেনি। মুসলিম বিশ্ব একসঙ্গে মিয়ানমারকে একটি ধমকও দিতে পারেনি। পারবে কীভাবে তাদের নিজেদের মধ্যেই ঐক্য নেই। প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই মুসলিম দেশগুলোকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে আহবান জানিয়েছিলেন, কিন্তু কিছুতেউ কেউ রা করেনি। না বিশ্ব মোড়ল না মুসলিম উম্মাহ। তাই গত ১ জুন প্রধানমন্ত্রী এক রকম বাধ্য হয়েই ওআইসি সম্মেলনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের প্রসঙ্গ টেনেছেন। এ ব্যাপারে তিনি মুসলিম দেশগুলোর কাছ থেকে অন্তত কারিগরি সহায়তা যেন পান, সেই আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা নিয়ে মিয়ানমার মিথ্যাচার করছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মিয়ানমার চাপ প্রশমনের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। চাপ শেষ, চুক্তিও খতম। অং সান সু চি বহুদিন ঘাপটি মেরে বসেছিলেন। হঠাৎ করে তিনি সম্প্রতি চেক প্রজাতন্ত্র ও হাঙ্গেরি সফর করেছেন। সেখান সু চি ও চেক নেতা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, তাদের দুই দেশ তথা দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ‘অভিবাসন’। শুধু তাই নয়, তারা আরও বলেছেন, দুই অঞ্চলেই মুসলিম জনগোষ্ঠীর অব্যাহত সংখ্যা বৃদ্ধি’ এক বড় চ্যালেঞ্জ। এর মানে তারা দক্ষিণ এশিয়া মুসলিম অভিবাসীদের একটি সমস্যা হিসেবে দেখছেন। ‘মুসলিম জনগোষ্ঠী’ বলতে তারা মূলত এখানকার রোহিঙ্গাদের বোঝাচ্ছেন। একেই বলে চোরের মায়ের বড় গলা। যে সমস্যার সৃষ্টি করলো সুচি, অথচ সে সমস্যার জন্যই তিনি দুষছেন রোহিঙ্গা তথা এ অঞ্চলের মুসলিমদের।

পৃথিবীর নিকৃষ্টতম জাতিগত সংঘাত ও বিদ্বেষের জননী ‍সু চি। শুধু জাতিগত নিপীড়নই নয়, একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার সব রকম চেষ্টাই করেছেন তিনি। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম নজির সু চির আগে শুধু হিটলারই সৃষ্টি করতে পেরেছেন। মৃত হিটলার আজও ঘৃণীত। অথচ সু চি আজও শান্তির দূত! নোবেল পদকপ্রাপ্ত। যে সমস্যার সৃষ্টি করেছেন ‍সুচি, আগুন লাগিয়েছেন সু চি, অথচ হাঙ্গেরি গিয়ে তিনি দুষছেন দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের। এটাই পরিহাস!

হিটলারের প্রচারমন্ত্রী ছিলেন গোয়েবলস। মিথ্যাকে গোয়েবল শৈল্পিক কায়দায় প্রচার করতেন। মিথ্যার রাজনীতিতে গোয়েবলরা আজও অপরিহার্য। কিন্তু সুচির গোয়েবলসও লাগে না। তিনি নিজেই সে কাজটি করে চলেছেন। মিয়ানমার যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিচ্ছে না এটা জলবৎ তরলং। কিন্তু তিনি শরণার্থী প্রত্যাবাসন না হওয়ার দোষ চাপাচ্ছেন বাংলাদেশের ওপর। শুধু তাই নয়, অন্যান্য দেশের নেতারা তার কথা বিশ্বাসও করছেন। এক চেক মন্ত্রী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশর উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন।

অস্বীকার করা যাবে না, বর্তমান বিশ্ব কূটনীতিতে মিডিয়া একটি বড় নিয়ামক। ন্যায়-অন্যায় যাই হোক, নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হয়। যার অন্যায় যতো বড় তার প্রচারণাও ততো বেশি। সুচিও তাই করেছেন। দেশে বিদেশে একের পর মিথ্যা বয়ান করে যাচ্ছেন। এসব মিথ্যাচারের জন্য সুচিকে আমরা নিন্দা করতে পারি। কিন্তু স্বীকার করতে হবে, এটাই ছিল তাদের কূটনৈতিক কৌশল এবং এতে তারা জয়ী হয়েছে। কিন্তু আমরা বিশ্ব মোড়লদের সঙ্গে গোস্বা করে হারের আগেই হার মেনে বসে আছি। পৃথিবীর বুকে নিকৃষ্টতম মানবাধিকার হরণের তথ্যচিত্র আমরা বিশ্ববাসীর নজরে আনতে পারিনি, প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারিনি। কোনো ‘বড় ভাই’দের পাশে পাইনি।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য তাদের মেরেকেটে ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হলে তারা ফিরতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। মিয়ানমার চুক্তি অনুযায়ী সে ব্যবস্থা করার কথা। কিন্তু তারা তা করছে না। রোহিঙ্গারাও ফিরছে না। ফলে, আমরা বলতেই পারি, মিয়ানমারের সঙ্গে এ চুক্তিটি আমাদের পক্ষে যায়নি। এটি মিয়ানমারের কূটনৈতিক কৌশলের অংশমাত্র।

মিয়ানমার তার দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা মাঠে নাই। ফলে, আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে। মিয়ানমারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। চীন, ভারত, রাশিয়া, ফ্রান্স, জাপানসহ অপরাপর দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গেও গভীর যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :