সবার জন্য বাজেট

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম/ ছবি: বার্তা২৪.কম

ফরিদুল আলম/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নজিরবিহীন ঘটনার মধ্য ঘোষিত হল ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের চোখের অসুস্থতাজনিত কারণে তাঁর বাজেট বক্তব্য দিতে সমস্যা অনুভূত হওয়ায় বক্তব্যের খানিকটা পাঠের পর বাকী অংশ পাঠ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবশ্য এর আগেও দেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপ্রধান দেশের একাধিক বাজেট পেশ করলেও এবারই প্রধম এই বাজেট পেশ করা হল যৌথভাবে- অর্থমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে।

স্বাধীনতার পর এটি ছিল দেশের ৪৮তম বাজেট এবং ইতোপূর্বে ১১ জন এই বাজেট উপস্থাপন করেন। এদিন দিয়ে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর জন্য প্রথমবারের মত এটি উপস্থাপনের সুযোগ থাকলেও তিনি যেমন এর একক কৃতিত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন, অপরদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মত বাজেট বক্তব্য দেয়ার একটি বিরল সুযোগ গ্রহণ করলেন।

আজকের আলোচনাটি মূলতঃ বাজেট নিয়েই হওয়া সঙ্গত। তবে প্রাসঙ্গিকভাবেই এর সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয় এসে যায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শারীরিক অসুস্থতার বাইরেও মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের ধরণ দেখে তিনি যে ব্যাপক প্রস্তুতিহীনতায় ভুগেছেন তা ছিল স্পষ্ট। সেই সাথে দীর্ঘদিন সংসদ সদস্য হিসেবে থাকলেও সংসদীয় কার্যাবলী সম্পর্কে তিনি যে এখনও বেশ আনাড়ি সেটা তিনি প্রমাণ করে দিলেন। কীভাবে বাজেট বক্তব্য উপস্থাপনের অনুমতি চাইতে হবে এবং কীভাবে একটি লিখিত বক্তব্য পঠন করতে হবে এ বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আমার ধারণা সরকারকে বিব্রত করেছে। বক্তব্যের শুরু করতে গিয়েও অযথা সময়ক্ষেপণ এবং মূল বক্তব্যে শুরু করতে গিয়ে কিছু অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা বাজেট বক্তব্যের মত একটি অতি আগ্রহের বিষয়কে ম্লান করে দিতে যাচ্ছিল। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসার মাধ্যমে পরবর্তীতে এবারের বাজেট বক্তব্য প্রাণ ফিরে আসে বলে মনে হয়েছে।

যাহোক এবারের বাজেটের আকার সঙ্গত কারণেই গত বছরের তুলনায় বেড়েছে এবং এই বৃদ্ধির পরিমাণ হচ্ছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা। এখানে একটু বলে রাখা ভাল, বর্তমান সরকারের ইতোপূর্বেকার বাজেটগুলো পর্যবেক্ষণে বলা যায় যে, প্রতিটি বাজেটের আকার নিয়ে এবং সরকারের সামর্থ্যের বাইরে মনে করে কিছু মহল থেকে এর সমালোচনা করা হলেও কার্যত আমরা দেখেছি বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এখানে বাজেটের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের যে ঘাটতি থেকে যায় তা কোনভাবেই ৫ শতাংশের অতিরিক্ত হয় না এবং এটি অর্থনীতিতে একটি স্বীকৃত তত্ত্বও বটে, যা সরকার সব সময় অনুসরণ করে যাচ্ছে।

তবে প্রতি বছর অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে বাজেট সংশোধনের প্রয়োজন পড়লে সেটাও করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে বিগত বাজেট অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ৪ লক্ষ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে কিঞ্চিত কমিয়ে ৪ লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এবারের বাজেটের মোট আকার ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। গত বাজেটের অভিজ্ঞতার আলোকে এর আকার অনেকটা বড় হলেও সরকার এর বাস্তবায়নে যে কৌশলগুলো নির্ধারণ করেছে সেগুলোর সফল প্রয়োগ ঘটলে এটি খুবই বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে করা যায়।

সরকারের এই কৌশলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নতুন করে কর না বাড়িয়ে করের আওয়া আরও বিস্তৃত করা এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনাগুলোর দিকে অধিকতর বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা।

শিক্ষা এবং মানব সম্পদ উন্নয়নে ৮৭ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৬.৭৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৩.০৪ শতাংশ। শিক্ষার সাথে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সম্পৃক্ত করে তরুণ প্রজন্মের বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধকরণের অংশ হিসেবে সরকার অধিকতর মনযোগী হয়েছে এবং সেই সাথে এভাবে বেকার তরুণদের ব্যাপকহারে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে সকলকে করজালের আওতায় আনার যে পরিকল্পনা এটি বাস্তবায়ন করতে পারাটা চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন করে ৩ কোটি কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা মোকাবিলায় মাত্র ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভরতা রাখা হয়েছে এবং এর বিপরীতে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা দেশীয় উৎসের মাধ্যমে যোগাড় করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। তবে প্রতিবছর যে প্রবণতা দেখা যায়, অর্থাৎ ব্যাংক এবং আর্থিক খাতগুলো থেকে উচ্চ সুদে অর্থ তুলে নেয়া এটি যদি অব্যাহত থাকে তবে তা অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না।

এখানে উল্লেখ করা সঙ্গত যে এই ঘাটতে মোকাবিলায় সরকারের আমদানি এবং রপ্তানি নীতি এবং আর্থিক খাতগুলো এবং অপরাপর কিছু জায়গায় কিছু প্রণোদনার সিদ্ধান্ত অভ্যন্তরীণ খাতে অধিক অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। রপ্তানিমুখী তৈরী পোষাক খাতে ১ শতাংশ নগদ প্রণোদনা এবং বিদেশ থেকে রেমিট্যান্সের উপর প্রণোদনার ব্যবস্থা কিছুটা সরকারি কোষাগারকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতকে আরও শক্তিশালী করতে এবারের বাজেটে গত বাজেটের চাইতে আরও অধিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এবার এর পরিমাণ হচ্ছে ৬৭ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে দেশের এক চতুর্থাংশ পরিবারকে এর আওতায় আনা হয়েছে এবং আগামী ৫ বছরে এই খাতে দ্বিগুণ অর্থবরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।

এটি যেমন একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ একই সাথে এই খাতে সুশাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে উপকারভোগীদের প্রতি সরকারের এই বিনিয়োগ অনেকগুণে ফেরত পাওয়া সম্ভব। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ২ হাজার টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাবনাও প্রশংসার দাবীদার।

সব মিলিয়ে এবারের বাজেটটি ‘সকলের জন্য’ বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে এমন কোন উপকরণ এবারের বাজেটে রাখা হয়নি। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় একথা বলা যেতেই পারে যে সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এটি একটি ব্যতিক্রমী বাজেট।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :