বাজেট তারুণ্য বান্ধব তো?

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তা২৪

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে চতুর্থবারের (টানা তৃতীয়বার) মত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে মন্ত্রিসভায় তারুণ্যের অর্ন্তভুক্তির মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করে শেখ হাসিনা মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের বার্তা দিয়েছেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা উপভোগ বা দাপট দেখানোর জন্য নয় বরং তা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কল্যাণে ব্যয় হওয়ার বিষয়।

এবারের নির্বাচনে প্রায় ১ কোটি ২১ লাখ ৭৭ হাজার ২১৪ জন তরুণ-তরুণী জীবনে প্রথমবারের মত ভোট দিয়েছেন। তাই, বাংলাদেশের প্রতিটি গণআন্দোলনের আলোকবর্তিকা তারুণ্যের ন্যায়সঙ্গত সব চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে সজাগ থাকার এবং শিক্ষা, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরি প্রাপ্তিসহ গ্রাম-শহর কেন্দ্রিক তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির সমতাভিত্তিক সুযোগ সৃষ্টিতে অধিক গুরুত্বের সাথে সরকারকে ‘তারুণ্য বান্ধব বাজেট-২০১৯’ বিবেচনা করতে হবে। কেননা তরুণ প্রজন্ম নির্বাচনের সময় কথা রেখেছে, এখন কথা রাখার পালা সরকারের।

দুই.
৪০তম বিসিএসে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ প্রার্থী আবেদন করেছেন। এর সমাজতাত্ত্বিক কারণ আর যাই থাক, বেকারত্ব যে অন্যতম কারণ সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য, উপাত্ত ও পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন (২৩ জানুয়ারি, ২০১৮) অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের হার ভারতে অপরিবর্তিত, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় কমলেও আফগানিস্তান, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ, নেপাল এবং পাকিস্তানে বেশি। আইএলও একই প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এমন সম্ভাবনাময় কর্মসংস্থানের হার কম। কিন্তু কৃষি প্রধান দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, যা দারিদ্র্য দূরীকরণে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই, বাজেটে জীবন ও জীবিকামুখী প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে সেদিকে সরকার নিশ্চয়ই লক্ষ্য রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

তিন.
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে প্রকাশ, দেশে প্রকৃত কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার। গত ১৬ নভেম্বর ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘আঞ্চলিক কর্মসংস্থান’ নিয়ে আইএলও ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলছে, দেশের নিষ্ক্রিয় ২৭.৪ শতাংশ তরুণ এবং ৪৫ শতাংশ তরুণী কোন ধরণের শিক্ষার সাথে যুক্ত নন, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন না এবং কর্মসংস্থানের উপায়ও খুঁজে বের করতে পারছেন না।

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ১২.৮ শতাংশ বেকার যাদের মধ্যে ১০.৭ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত (২০১৭ সাল) এবং যাদের অধিকাংশই নিষ্ক্রিয়। গৃহীত উচ্চশিক্ষা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নিশ্চয়তা দিতে না পারায় বেকারত্বের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ধারে কাছেও নেই আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী উচ্চশিক্ষার সংস্পর্শে আনা দরকার। পাশাপাশি গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত তরুণ প্রজন্মকে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা নির্ভর বাজেট পরিকল্পনা করতে হবে।

চার.
বাংলাদেশে বিসিএসসহ বেশ তাৎপর্যসংখ্যক সরকারি চাকরিতে আবেদন থেকে শুরু করে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রভৃতি আনুষ্ঠানিকতা প্রায় ২-৩ বছর ধরে চলমান থাকে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যেকোনো চাকরিতে তারুণ্যের মেধাকে কাজে লাগানো গেলে উভয়পক্ষের জন্যই তাতে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি। মেধাবী তরুণ প্রজন্মের বিমুখতা একটি দক্ষ এবং উন্নত প্রশাসনের জন্য প্রত্যাশিত নয়। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে আবেদনের ফি বাতিলসহ অন্যান্য সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে মেধাবীরা যাতে অধিক হারে এগিয়ে আসতে পারে তার পথও রাষ্ট্রকে সুগম করা দরকার, যার একটি সঠিক দিক নির্দেশনা বাজেটে থাকবে বলে প্রত্যাশা করেন তরুণ প্রজন্ম।

পাঁচ.
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী তারুণ্যের চাওয়া-পাওয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যতের জন্য উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে নির্বাচনী ইশতেহার, চলমান মেগা প্রকল্প ও সম্প্রতি অনুমোদিত (৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮) শত বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনার (ডেল্টা প্লান) বাস্তবায়ন; ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন; প্রধান প্রধান রেল সড়কগুলো দুই লাইনে উন্নীতকরণ এবং দূরযাত্রার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন (নন-স্টপ) দ্রুত ও আরামদায়ক ভ্রমণের ব্যবস্থা; বাংলাদেশ রেল ও বিমানকে লাভজনক খাতে রুপান্তর; ডাক ও টেলি যোগাযোগ খাতের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠন; প্রচলিত ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির অবসান; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্নিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ; অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের বিকাশ; সরকারী সম্পদের সুষ্ঠু ও পরিমিত ব্যবহার এবং সম্পত্তি দখলমুক্তকরণ; ঋণখেলাপী, ভূমিদস্যু, শেয়ার বাজার ও ব্যাংকিক খাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্রকারী, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি দেশ, যেখানে আপামর জনসাধারণ নিশ্চিত নিরাপত্তা অনুভব করবে।

আজকের তরুণ প্রজন্ম চাই, বাংলাদেশের গ্রামগুলো উন্নয়নের আলোয় শহরের মত উদ্ভাসিত হোক, তবে শহর যেন না হয় এবং বস্তির অসহায় মানুষগুলোর জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হোক। জেলখানার পরিবেশ উন্নতকরণ, সংবেদনশীল মামলা ব্যতীত বিনা বিচারে আটককৃতদের দ্রুত বিচার এবং মুক্তি দেওয়ার মানবিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, গ্রামীণ অনগ্রসর নারী, হতদরিদ্র প্রান্তিক কৃষক, কুমার, কামার, জেলে, জাত সুইপার, সমুদ্রতীরবর্তী, বিলুপ্ত ছিটমহল এবং চা বাগানে কর্মরত হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করা প্রয়োজন। উপকূলীয় অঞ্চলে পুরাতন ও নতুন জেগে ওঠা চরে ম্যানগ্রোভ বনায়নের পাশাপাশি সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ‘উপকূলীয় সবুজ বেস্টনী’ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। নদী ও খাল খননের পাশাপাশি বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠের পার্শ্ববর্তী প্রাকৃতিক জলাধারগুলোতে চাষাবাদের জন্য সব সময় প্রয়োজনীয় পানি ধরে রাখার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। দেশের সামষ্টিক উন্নয়নের অগ্রাধিকার খাতগুলোতে গুরুত্ব প্রদানে বাস্তবমুখী ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রত্যাশা করেন তরুণ প্রজন্ম। উন্নয়ন ও একটি সুন্দর আগামীর তারুণ্যবান্ধব বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :