Barta24

বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ধানের মূল্য বৃদ্ধি পাইবার আগেই কৃষক নিঃস্ব হইয়া গেল

ধানের মূল্য বৃদ্ধি পাইবার আগেই কৃষক নিঃস্ব হইয়া গেল
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪.কম
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

চাঁদ দেখা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকলেও ঈদের আনন্দে তা ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। আমরা সবাই বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় ঈদ উদযাপন করেছি। ঢাকাকে ফাঁকা করে অনেকেই শিকড়ের টানে গ্রামের বাড়ি ঘুরে এসেছেন।

লম্বা ছুটি শেষে সবাই আবার কাজে ফিরছেন। ঈদ উৎসব শেষ হতে না হতেই আমরা মজে গেছি ক্রিকেট উৎসবে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলছে। এবার আমাদের স্বপ্ন সেমিফাইনাল খেলার। তাই ক্রিকেট নিয়ে মাতামাতির অন্ত নেই। এর মধ্যেই জাতি ঢুকে পড়েছে বাজেট উৎসবে। সব মিলিয়ে চারদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু আমরা কি কেউ খবর রেখেছি, যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন, সেই কৃষকরা কেমন আছেন? ক্রিকেট বা বাজেট নিয়ে মাথা ঘামানোর মত সময় হয়তো তাদের নেই। কিন্তু আর সবার মত ঈদ আসে তাদের জীবনেও। বছরে অন্তত একবার ঈদে সন্তানের জন্য নতুন পোশাক, ঈদে একটু ভালো খাবারের আকাঙ্ক্ষা থাকে কৃষক পিতারও। কিন্তু যতটুকু খবর পেয়েছি, তাদের ঘরে ঈদ এলেও, আনন্দ আসেনি। পত্রিকায় খবর দেখেছি, এবার গ্রামের হাট-বাজারে ঈদের কেনাকাটা জমেনি। জমবে কীভাবে? কৃষকের হাতে তো টাকা নেই। সারা বছরে তাদের আয়ের সবচেয়ে বড় যে উৎস, সেই বোরোতে এবার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেয়েছেন। এখন তাদের চিন্তা সারা বছরের খোরাকির, উৎসব করার কথা ভাবারও অবকাশ নেই।

এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু ধানের দাম। অনলাইনে, অফলাইনে, গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ধানের দাম নিয়ে তুমুল আলোচনা। ইদানীং আর কেউ কো্নো দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে নামেন না। প্রতিবাদহীন, নির্বিকার এই সময়ে তবু কেউ কেউ ধানের দাম কমে যাওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। কিন্তু লাভ হয়নি কোনো। ধানের দাম বাড়েনি। অন্তত কৃষকের উৎপাদন খরচের ধারে কাছেও যায়নি। ধানের দাম বাড়াতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বটে। কিন্তু সেগুলো সময়ের অনেক পরে। বোরো ধানের মৌসুমে প্রতিবারই দাম নিয়ে এই হাহাকারটা হয়। কোনো বছর হঠাৎ বৃষ্টি, অকাল বন্যায় বোরো ভেসে যায়। এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। আর দামের পতনও হয়েছে বাম্পার। সরকারের যারা নীতি নির্ধারক; যারা কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় চালান; তাদের তো আগেই এই হিসাবটা থাকার কথা। কখন বোরো মৌসুম শুরু হবে, এবার ফলন কেমন হবে, ফলন ভালো হলে দাম কমতে পারে; এই বিষয়গুলো তো তাদের আগেই জানা থাকার কথা। কারণ তাদের কাজই তো এটা। সে অনুযায়ী তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু ধানের দাম বাড়াতে সরকার কিছু ব্যবস্থা নিল বটে, তবে বড্ড অসময়ে। চালের আমদানি শুল্ক বাড়ানো হলো মে মাসের শেষ দিকে। অথচ এপ্রিলের শুরুতেই সরকার চাইলে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারত। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার একটি বড় উপায় হলো সরকারের ধান কেনা। কিন্তু সমস্যা হলো সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতো না। তবে এবার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুরুতে দেড় লাখ টন ধান কেনার কথা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে চার লাখ টন করা হয়েছে। তবে এই পরিমাণ খুবই কম। বোরোর উৎপাদন হবে প্রায় দুই কোটি টন। সেখানে সরকার কিনবে মাত্র চার লাখ টন। সমস্যা হলো আরো বেশি ধান কিনে রাখার মত জায়গা নেই সরকারের। ক্ষুদ্র-প্রান্তিক কৃষকের তো নেই-ই। আর ধান রাখার মত জায়গা খাকলেও দাম বাড়ার জন্য অপেক্ষা করার সামর্থ্য থাকে না। তাই লাভটা হয় শেষ পর্যন্ত চালকল মালিকদেরই।

সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বটে। তবে সরকারের মন্ত্রীদের যথেষ্ট সংবেদনশীল মনে হয়নি। তাদের কথাবার্তায় কৃষকদের প্রতি মমতার ঘাটতি ছিল। কদিন আগে সরকারের এক নীতিনির্ধারক আমলা, মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে বললেন, সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে। এটাই নিয়ম। এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে। আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তিনি আরো ব্যাখ্যা করলেন, এখানে পক্ষ তিনটি উৎপাদনকারী কৃষক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা। সরকার এখানে কোনো পক্ষ নয়, সরকার রেফারি মাত্র। রেফারির কোনো পক্ষ নেওয়া ঠিক হবে না। আমার বিস্ময় আরো বাড়লো, সরকারের নীতিনির্ধারকদের একজন যদি এভাবে ভাবেন, তাহলে সেই কৃষক যাবেন কোথায়? সেই মূর্খ কৃষক তো পক্ষ বোঝে না, খেলা বোঝে না, রেফারি বোঝে না, মুক্তবাজার অর্থনীতি বোঝে না। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শস্য ফলায় বলেই আমরা খেয়ে পড়ে বেঁচে আছি। কিন্তু তারা প্রতিবছর ক্ষতির মুখে পড়ে- কোনো বছর ফসল কম ফলে বলে, কোনো বছর বেশি ফলে বলে। প্রতিবছর তারা প্রান্ত থেকে আরো প্রান্তে চলে যায়।

তবে আশার কথা হলো বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) সংসদে উপস্থাপিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত উল্লেখ করে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে। কৃষকদের কৃষি উপকরণ ও ভর্তুকি সহায়তা অব্যাহত রাখাসহ বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি যন্ত্রাংশ আমদানিতে শূন্য শুল্কহার অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সারের দাম অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে। কৃষকদের ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে চাল আমদানির ওপর বিদ্যমান সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ও সম্প্রতি আরোপিত ২৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে মোট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ২৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব সরকার। তাদের অব্যাহত নীতি সহায়তার কারণেই কৃষিতে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির লাভটা কৃষকের পকেটে পৌঁছে দিতে হবে। সময়ের কাজটা সময়ে করতে হবে। কথায় বলে না, সময়ের এক ফোঁড়, অময়ের ১০ ফোঁড়। যতই মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দেওয়া হোক না কেন, কৃষকদের বাঁচাতে সরকারকেই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। রেফারির নিরপেক্ষতা নিয়ে নিস্পৃহ থাকার সুযোগ নেই। ন্যায্যতা নিয়ে দুর্বল কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমদানি শুল্ক বাড়ানো, সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে মৌসুমের শুরুতেই। নইলে সরকারের সিদ্ধান্তের সুফল পৌঁছানোর আগেই কৃষক নিঃস্ব হয়ে যাবে। ছেলেবেলায় একটা অনুবাদ করতাম- ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মারা গেল। ভবিষ্যতে হয়তো নতুন অনুবাদ করতে হবে- ধানের মূল্য বৃদ্ধি পাইবার আগেই কৃষক নিঃস্ব হইয়া গেল।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান
মুত্তাকিন হাসান/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সাধারণ অর্থে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে ব্যক্তির গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞান লাভের প্রক্রিয়াকে শিক্ষা বলে। বাংলায় শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‘শাস’ ধাতু থেকে যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দেওয়া। শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ education; যা এসেছে ল্যাটিন শব্দ educare বা educatum যার অর্থ হলো to lead out অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাহিরে বের করে আনা বা বিকশিত করা।

শিক্ষা মানুষের মনকে আলোকিত করে, উম্মোচিত করে নতুন নতুন জানালা। আর তাই শিক্ষার কোনো শেষ নেই। শিক্ষা শুরুর পথটা শিশুশিক্ষা দিয়েই, আর তাই বলা হয় আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষৎকে শুরু থেকেই সঠিকভাবে লালন-পালন না করলে কোনো কিছুই প্রত্যাশা করা যায় না।

শিশুশিক্ষার হাতেখড়ি পারিবারিকভাবে পিতামাতার মাধ্যমে হলেও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের যে পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়া হয়, তা শিশুদের বেলায় বাঞ্ছনীয় নয়। শিশুদের জন্য দরকার শিশুবান্ধব মানসম্মত শিক্ষা।

মানসম্মত শিশুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন শিশুর মনোজগত বোঝা। একটি বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, আমাদের দেশের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের শিশুমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে কোনো ধারণা বা জ্ঞান নেই। শিশুর মন না বুঝে ভয়ভীতি দিয়ে শিক্ষাদান করা শুধু তোতা পাখি বানানো ছাড়া আর কিছু নয়। শিশুশিক্ষা বা প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকদের অবশ্যই শিক্ষকদের মনোজগত সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের বর্তমান বেশিরভাগ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিক না হয়ে, নিজেরা শিক্ষা বাণিজ্যে মত্ত থাকেন। ক্ষণে ক্ষণে শিক্ষার্থীর বাবা-মার সাথে শিক্ষকদের পরম আলাপচারিতা মানেই মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নয়। শিশুশিক্ষায় শিশুদের মনের বিকাশে মনোবিজ্ঞানের ক্ষীণ প্রভাবের কারণেই শিশুরা জীবনের শুরুতেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

বিদ্যমান শিক্ষার পরিবেশ তাদের মেধা বিকাশের অন্তরায়। শিক্ষক আর অভিভাবকের কড়া নিয়মশাসনে ভালো পড়তে বা লিখতে পারছে ঠিকই তবে চিন্তাশীল বা উদ্ভাবনী হয়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে। আসলে তাদের এ শিক্ষা মানব বিকাশে সহায়ক নয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো- পরিপূর্ণ মানবিক গুণে মানুষ হয়ে উঠা। পিতামাতা তার সন্তানকে দিয়ে ভালো রেজাল্ট করাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষিত হয়ে উঠছে না। শিশুর সৃজনশীলতা বিকাশের যথোপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় তারা বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এতে করে টালমাটাল হচ্ছে পুরো সমাজ।

বিখ্যাত কবি মিল্টন বলেছেন- Education is the harmonious development of body, mind and soul…শিক্ষকরা যেহেতু প্রকৃত অভিভাবক এবং শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান প্রদান করে থাকেন, তাই শিক্ষকদের হতে হবে প্রকৃত মানুষ। শিক্ষদের নিজেদের মধ্যেই যদি মানবিক গুণাবলীর ঘাটতি থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে কখনোই মানবিক গুণাবলী জাগ্রত হবে না।

শিক্ষাদানের জন্য বিদ্যালয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও যত উপকরণই ব্যবহার করা হোক না কেন শিক্ষকরা নিজেরাই সবচেয়ে বড় উপকরণ। শিক্ষাকে পেশার পাশাপাশি সেবা হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে উঠবে নিবিড়, সৌহার্দ ও স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক। কোমলমতি শিশুদের বকাঝকা না করে সকল শিক্ষকদের উচিত সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করা। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থীই প্রথম স্থান অর্জন করবে। শিশুদের পাশাপাশি যেন পিতামাতারাও এমন প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান বিকাশের প্রথম স্তর মাত্র। তাদের জন্য আরও বহু পথ বাকি।

শিক্ষক আর পিতামাতার চাপে শিশুরা যেন দিশেহারা। ভোরবেলায় চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে উঠা, বিদ্যালয় থেকে ফিরে যতটুকু সময় তাতে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় শ্রেণীতে দেওয়া পড়ালেখা নিয়ে। শিশুরা তাদের চিন্তা চেতনা প্রকাশ করার কোন সুযোগই পাচ্ছে না। গ্রামের শিশুদের চেয়ে শহরের শিশুদের বেলায় এ অবস্থা বেশি পরিলক্ষিত হয়। কারণ শহরের বিদ্যালয়ে নেই খেলার উন্মুক্ত মাঠ। অথচ খোলামেলা মাঠ শিশুদের মনোবিকাশের অন্যতম উপাদান। শিশুরা দুরন্ত হরিণের মতো খেলাধুলা করবে এটাই স্বাভাবিক।

বিখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল বলেছেন ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতির প্রাণশক্তি তৈরির কারখানা আর রাষ্ট্র ও সমাজ সব চাহিদার সরবরাহ কেন্দ্র। এখানে ত্রুটি ঘটলে দুর্বল আর পঙ্গু না করে ছাড়বে না।’ যে স্থানেই হোক না কেন আমাদের উচিত শিক্ষার সঠিক সংজ্ঞার প্রতি খেয়াল রাখা। নচেৎ পুরো সমাজকে ভোগান্তিতে পড়তে হবে এবং যার প্রভাব সুদূরপ্রসারি। শিশুশিক্ষার বর্তমান ধারা সংশোধন করে মনোবিজ্ঞান ভিত্তিক পড়ালেখা অত্যন্ত জরুরি।

প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য শিশু-মনোবিজ্ঞান বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষকদের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু ভালো পড়ালেখার আশায় পিতামাতারা তাদের শিশু সন্তানদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে ইচ্ছুক বেশি, তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে শিক্ষকদের বড় একটি অংশ উচ্চ-মাধ্যমিকের বেশি পড়ালেখা করেননি এবং তাদের বেশিরভাগের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। যাদের প্রশিক্ষণ আছে তা আবার স্বল্পকালীন। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে শিক্ষকদের মনেও নেই কোনো আনন্দ, তারা যেন কোনোমতে নিজেদেরকে ঠেলা দিয়ে চালাচ্ছে। শিক্ষকরা নিজেরাই নিজেদের মনোবিকাশে ব্যর্থ। শিশু শিক্ষার্থীর মনোবিকাশ এখানে বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী

রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, পুরনো ছবি

৮৯ বছরের এক বিশাল কর্মজীবন পেছনে ফেলে সব আলোচনা-সমালোচনার ওপারে চলে গেছেন এরশাদ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদ একাই একটি অধ্যায়। এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা) হয়তো আরও বহুদিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়েই থাকবে, তবে এরশাদবিহীন জাপা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাবে বলেই মনে হয়।

তার দীর্ঘ পেশাগত ও রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য তিনি দলকেও ছাড়িয়ে গেছেন বহুমাত্রায়। তার অনুপস্থিতিতে জাপা হয়তো এখন সেটিই অনুভব করবে। ক্ষমতার সিঁড়ির কাছাকাছি যেতে এরশাদের বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিপরীতে একটি শক্ত প্রতিরক্ষা ঢাল হিসেবেও তার জুড়ি নেই। তাই জাপার মতো একটি সমর্থক শক্তি রাজনীতিতে প্রয়োজন ছিল বৈকি। অপর দলের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এরশাদবিহীন জাপা আগামীতে কতটা শক্তি জোগাতে পারে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তবে পার্টির গুরুত্ব থাকা না থাকা নির্ভর করে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ওপর। দলের ভেতরে সামরিক বেসামরিক ক্যারিয়ারিস্ট নির্বিশেষে এরশাদের মতো হাই-প্রোফাইল রাজনীতিক আর নেই। এক সময় জাপা করেছেন দেশের অনেক হাই প্রোফাইল রাজনীতিক। মিজানুর রহমান চৌধুরী, কাজী জাফর, শাহ মোয়াজ্জেম, মওদুদ আহমেদসহ দেশের প্রথিতযশা অনেক রাজনীতিকরা এরশাদের জাপাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা বামপন্থী রাজনীতি থেকে এসেছেন। ডিগবাজীর এই রাজনীতি শুরু হয় জিয়ার আমলে। সামরিক, বেসামরিক আমলা ও পেশাজীবীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন জিয়া।

এরশাদও একই কায়দায় সামরিক-বেসামরিক আমলা, পেশাজীবীদের দলে ভেড়ান। কিন্তু ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার পর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তাদের বেশির ভাগই আজ আর জাপায় নেই। যেমন নেই বিএনপিতে। সময় বুঝে আজ জিয়ার উপদেষ্টা, কাল এরশাদের উপদেষ্টা বা মন্ত্রী হয়েছেন অনেকে। নগদ ইনামের আশায় এরকম রাজপন্ডিতের (উপদেষ্টা) নজির আজও বিরল নয়। ক্ষমতার লোভে যারা ডিগবাজী দিয়ে জাপায় এসেছিলেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে তারাই সবার আগে উল্টো ডিগবাজী দিয়েছেন। কেউ বা মৃত্যৃ বরণ করেছেন, অবসর নিয়েছেন। ফলে জাপায় আজ ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান যাকে বলে সে রকম কেউ নেই বললেই চলে। ক্যারিশম্যার কথা বাদই দিলাম। ফলে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বই জাপার জন্য আজ বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতার রাজনীতিতে একইভাবে দলের গুরুত্ব বহাল রাখা।

Ershad
১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

এরশাদকে নিয়ে আলোচনা আছে, আছে সমালোচনা। কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়। তিনি একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেছেন। বিদ্যমান দলগুলোর অদূরদর্শীতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে নিজেই ৯ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছেন। সব সামরিক শাসক যা করেন এরশাদও তাই করেছেন। জিয়াউর রহমান বিএনপি করেছেন, এরশাদ করেছেন জাতীয় পার্টি। নয় বছর ক্ষমতায় থেকে বিদায় নিয়েছেন সত্য, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে এরশাদের গুরুত্ব কমেনি মোটেও। বরং ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজের পাল্লা ভারি করতে এরশাদের বিকল্প শুধুই এরশাদ। আগামী দিনের ক্ষমতার রাজনীতিতে জাপা একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ থাকতে পারবে কিনা জাপা’র জন্য আপাতত এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য অন্তত আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে ‘ক্ষমতা’, ‘রাজনীতি’ ও ‘কৌশলের’ সঙ্গে ভোটের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে। এ সম্পর্ক যেভাবে শিথীলতার দিকে যাচ্ছে তাতে তৃতীয় কোনো সহায়ক শক্তির রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতাও হয়তো ফুরিয়ে যাবে। তবে সে রাজনীতি আমাদের হিসাবের বাইরে। আমরা শুধু এটুকুই বলতে পারি, এরশাদ জাপায় যেমন অপরিহার্য ছিলেন, ক্ষমতার রাজনীতিতেও ছিলেন একই রকম অপরিহার্য।

Ershad
একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য। এই উপমহাদেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলই বেশি বিকাশ লাভ করেছে। ভারতে যেমন কংগ্রেস, পাকিস্তানে মুসলিম লীগ, পিপলস পার্টি, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা। ভারতের বিজেপি অথবা বাংলাদেশের জামায়াত একটি ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা করে। কাজেই প্রচলিত রাজনীতি থেকে তাদের রাজনীতি ভিন্ন, নেতৃত্বের বিষয়টিও ব্যক্তি বা পরিবার নির্ভর নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যদিও ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বিকাশ লাভ করেছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলের প্রয়োজনেই বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতেই দলের দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়। সেই থেকে প্রায় চার দশক আওয়ামী লীগও ব্যক্তি কেন্দ্রিক দলীয় রাজনীতির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

দলের ভবিষ্যৎ পারিবারিক সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর বিএনপি ও জাপার শুরুই হয়েছে একজন ব্যক্তি বিশেষের রাজনৈতিক খায়েস মেটানোর জন্য। জিয়া ও এরশাদ যদি ধরেও নিই যে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ক্ষমতা দখল করেছেন (ডকট্রিন অব নেসিসিটি), না হলে দেশ গোল্লায় যেতো ইত্যাদি, ইত্যাদি... তারপরও বাস্তবতা হলো তারা কেউ দেশের সেই কথিত ক্রান্তিলগ্ন পার হওয়ার পর ব্যারাকে ফিরে যাননি। গদি আঁকড়ে ধরে থেকেছেন। জিয়া নিহত হওয়ার পর বিচারপতি সাত্তার ও পরে খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন। সেই থেকে আজও ব্যক্তি ও পারিবারিক দখলমুক্ত হতে পারেনি বিএনপি।

একই কায়দায় এরশাদ নয় বছর ক্ষমতায় থাকার পরও জাপা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তি এরশাদ থেকে জাতীয় পার্টি মুক্ত হতে পারেনি চার দশকেও। পতিত সামরিক ও স্বৈরশাসকরা ‘মরিবার পূর্বে মরিতে চান না’। তাই নিরাপদ ও স্বাভাবিক মৃত্যু নিশ্চিত করতেই তারা দলের সভাপতি বা উপদেষ্টার পদ আজীবন আঁকড়ে থাকেন। এরশাদের হয়তো এক্সিটওয়ে ছিল, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে তার প্রয়োজন ছিল এবং তিনিও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা উপভোগ করে গেছেন। ক্ষমতার প্রতিটি কোনায়ই তিনি বিচরণ করেছেন।

সেনাপ্রধান, সিএমএলএ, রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিরোধী দলের নেতা সব ক্ষেত্রেই তার সরব উপস্থিতি আমরা দেখি। সবকিছু যে তার প্রয়োজন ও ইচ্ছায় হয়েছে হয়তো সেরকমটি নয়। অনেকটা রাজনীতি ও ‘ক্ষমতা’র প্রয়োজনেই তার এই এদিক ওদিক, কখনো নিজের কখনো অপরের প্রয়োজনে। এখানেই এরশাদের অপরিহার্যতা। আর এজন্যই আমরা তাকে বলি ‘রাজনীতির দুষ্টু বালক’।

Ershad

সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংসদ টিভি 

 

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের তিনটি বড় দলের মধ্যে জাপা আপাত একজন ব্যক্তির নেতৃত্ব থেকে মুক্ত হলো বটে। কিন্তু ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা থেকে বের হয়ে নতুন করে পরিবারভূক্ত হলো বলেই মনে হচ্ছে। এতে আপতত হয়তো জাপা প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পার্টির নিয়তি নির্ধারণে তা কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে তা সময়ই বলবে।

এরশাদের সমালোচনা আছে অনেক। কিন্তু নির্মোহ দৃষ্টিতে বললে এ সমালোচনা থেকে সবাই-ই কি মুক্ত? রাজনীতিতে এরশাদ একটি সিনড্রোম। এ সিনড্রোমে সব রাজনৈতিক দলই আক্রান্ত। এমনকি নাগরিক হিসেবে আমরাও কি সুবিধাবাদী নই? এরশাদ আমাদের সুযোগসন্ধানী, সুবিধাবাদী, ভোগবিলাসী ও ডিগবাজীর রাজনীতির আইকন। কিন্তু এরশাদ সিনড্রোম কি আমাদের মাঝেও নেই? এরশাদকে গালি দেওয়া সহজ, কারণ তিনি ক্ষমতাহীন এক ‘দুষ্টু বালক’। এরশাদের বিদায়ের পর রাজনীতিতে হয়তো সহসা সমালোচনা করার মতো লোকটি বিদায় নিলেন। কিন্তু তাতে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে কি? এরশাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ভাড়ামি হয়তো কিছুটা কমবে, কিন্তু রাজনৈতিক দুষ্টামি বন্ধ হবে কি?

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র