Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মানিব্যাগ থেকে বাজেট: ইতিহাসের পরিক্রমা

মানিব্যাগ থেকে বাজেট: ইতিহাসের পরিক্রমা
ছবি: বার্তা২৪
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

'মানিব্যাগ' বা 'টাকার থলে' নামক শব্দটি থেকে যে বাজেটের উৎপত্তি, আধুনিক রাষ্ট্র সে বাজেট ছাড়া অচল। সরকারের আয় এবং ব্যয়ের খাতগুলো নির্ধারিত হয় বাজেটের মাধ্যমে। সম্পদের আহরণ ও বণ্টনের দিক-নির্দেশনাও দেওয়া হয় বাজেটের মাধ্যমেই।

পৃথিবীর ইতিহাসে ঠিক তিনশত বছর ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থার অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ হিসেবে বাজেট প্রণয়ন ও পেশ করার ধারা চলছে। আগামী বছরই বাজেট পেশের ইতিহাস ৩০০ বছর পেরিয়ে ৩০১ বছরে পা রাখবে।

বাজেট যে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা বলে শেষ করা সম্ভব নয়। বাজেটের পরিমাণ দেখে একটি রাষ্ট্রের আর্থিক সামর্থ্য এবং রাজনৈতিক চরিত্র অনুধাবন করা যায়। রাষ্ট্রটির অর্থনৈতিক শক্তি এবং সে অর্থনীতিকে ব্যবহারের রাজনৈতিক অভিলাষের প্রতিফলন ঘটে বাৎসরিক বাজেটে।

ফলে একটি শোষণমূলক রাষ্ট্র আর একটি জনকল্যাণকর রাষ্ট্রের বাজেট এক ধরনের হয় না। পাকিস্তান আমলে বাজেটের সিংহভাগ চলে যেতো পশ্চিমাংশে। শোষকরাষ্ট্র যেসব খাতে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করে, কল্যাণকামী রাষ্ট্র তা করে না। তাই বাজেটে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র ও নীতির অর্থনৈতিক বহিঃপ্রকাশও ঘটে থাকে।

ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, বাজেট শব্দটির উৎপত্তি হয়েছিল 'বোগেটি' শব্দ থেকে, যার আরেক অর্থ 'মানিব্যাগ', যেখানে টাকা রাখা যায়। ব্যক্তির ক্ষেত্রে যা মানিব্যাগ, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা হলো বাজেট।

প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে কবে, কখন এবং পৃথিবীর কোথায় সর্বপ্রথম বাজেট দেওয়া শুরু হয়েছিল? উত্তরটি খুব কঠিন নয় এ কারণে যে, বাজেট একটি আধুনিক কার্যক্রম। আদিম বা মধ্যযুগে বাজেটের বালাই ছিল না। রাষ্ট্র তখন এতো নিয়মকানুন মেনেও চলতো না।

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর পর বাজেটের প্রচলন ঘটে, যাতে রাষ্ট্রের আর্থিক আয় ও ব্যয়ের স্পষ্ট চিত্র দেখা যায়। নাগরিকগণ জানতে পারেন যে তার রাষ্ট্রটি কোন কোন খাত থেকে আয় করছে এবং তা কোথায় কোথায় ব্যয় করছে। অর্থাৎ জনগণ এটা অবগত হয় যে, রাষ্ট্র জনতার কাছ থেকে কীভাবে অর্থ আহরণ করছে এবং কীভাবে তা ব্যয় করছে।

প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রে বা সোজা কথায় সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক যখন নিবিড়ভাবে গড়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকার দায়িত্ব হিসেবে বাজেট প্রণয়ন করে এবং তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক সরকার, এমনকি অগণতান্ত্রিক সরকারকেও বর্তমানে বাজেট প্রণয়ন ও পেশ করতেই হচ্ছে। রাষ্ট্রটির চরিত্র যাই হোক, বাজেট দিয়ে তাকে আর্থিক পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা জানাতেই হচ্ছে।

তবে বাজেটের উৎপত্তি ও বিকাশের সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অগ্রগতির ইতিহাসও জড়িত। গণতন্ত্রে সরকারি অর্থ আয় ও ব্যয়ের যে পরিসীমা রয়েছে, বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটে। তদুপরি অর্থনীতি, পাবলিক ফিন্যান্স ও পলিটিকাল ইকোনমি নামক বিদ্যা শাখার অগ্রগতির হাত ধরে বাজেট আরও বিকশিত হয়েছে।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যাবে বাজেটের উৎপত্তি হয়েছে ঠিক ৩’শ বছর আগে। ১৭২০ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে প্রথম জাতীয় বাজেট ও রাজস্ব নীতি উত্থাপন করেন (স্যার) রবার্ট ওয়ালপোল। ইতিহাসের পাতায় এটি হলো প্রথম বাজেট প্রণয়ন ও পেশের ঘটনা।

পৃথিবীর প্রথম বাজেট প্রণয়নের কৃতিত্বের জন্য (স্যার) রবার্ট ওয়ালপোল ইতিহাসে আজও অম্লান। তিনি ১৭১১ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ জয়েন্ট স্টক কোম্পানি সাউথ সি বাবলির তহবিলের উপাচার্য ছিলেন। সরকারি এই কোম্পানিটির শেয়ারে ধস নামলে জনগণের মনোবল ও বিশ্বাস ফিরে পেতে তিনি প্রথম বাজেট তৈরি করেন। এটাই হলো বাজেটের উদ্ভবের পেছনের ঐতিহাসিক কারণ।

(স্যার) রবার্ট ওয়ালপোলের মতো আরেক জন মানুষ ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। তিনি হলেন লর্ড ক্যানিং (১৮১২-১৮৬২)। ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসিত ভারতের শেষ শাসক এবং ব্রিটিশরাজ শাসিত ভারতের প্রথম শাসক। কোম্পানি আমলে তার পদবি ছিল গভর্নর জেনারেল আর ব্রিটিশরাজের আমলে ভাইসরয়।

১৮৬১ সালে মূল ভূখণ্ডের রেওয়াজ অনুযায়ী শেষ গভর্নর জেনারেল ও প্রথম ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম বাজেট পেশ করেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসন ক্ষমতা খোদ ব্রিটিশ সরকারের হাতে বর্তায়। তখন থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বদলে উপনিবেশ ভারতের শাসন শুরু হয় বিলেতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার আলোকে।

লর্ড ক্যানিং প্রথম বারের মতো ভারতে যে বাজেট পেশ করেন, তা শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, পুরো এশিয়ার মধ্যে প্রথম বাজেট। এমনকি, ব্রিটেনের বাইরে সম্ভবত সবচেয়ে পুরনো বাজেট।

কারণ, উনিশ শতকের বিশ্বপরিক্রমায় দেখা যায়, অধিকাংশ দেশই তখন রাজতন্ত্রী বা কলোনি ছিল। ফলে সেখানে নিয়মতান্ত্রিকতা মেনে এবং সরকারি অর্থসম্পদ খাত অনুযায়ী খরচের বিধান মেনে রাষ্ট্র পরিচালিত হতো না। সরকারের আয় ও ব্যয় অর্থবিজ্ঞানের নীতি অনুযায়ী পরিচলিত করার বিদ্যাও তখন বহু দেশের করায়ত্ত ছিল না।

লর্ড ক্যানিং আরও কিছু কাজের জন্য ঐতিহাসিকভাবে স্মরণীয়। তার শাসনামলে ভারতের প্রথম স্বাধীনতার সংগ্রাম নামে খ্যাত ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিল এবং তিনি তা দমন করে ভারতকে ব্রিটেনের অধীনস্থ রাখতে সক্ষম হন। বিদ্রোহের পরের বছর (১৮৫৮) ব্রিটেনের পার্লামেন্টে আইন পাস হয়ে ভারতের শাসনভার কোম্পানির কাছ থেকে রানির শাসনাধীনে আসে।

চরম রাজনৈতিক সঙ্কুল ও পালাবদলের সময়ে লর্ড ক্যানিং কোম্পানি শাসিত ভারতকে ব্রিটিশ শাসনের আইন ও শৃঙ্খলার মধ্যে আনেন। বিদ্রোহের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট অরাজকতা, হানাহানি, লুটপাট থামাতেও তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। তিনি ইঙ্গ-ভারতীয় সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠিত করেন। আয়কর প্রবর্তন, শতকরা দশভাগ হারে সমশুল্ক আরোপ ও বিনিমেয় কাগজের মুদ্রার প্রচলন দ্বারা আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করেন।

উপনিবেশ ভারতকে অর্থনৈতিক দিকের পাশাপাশি আইন ও গণতান্ত্রিক বিধির আওতায় আনার ক্ষেত্রে লর্ড ক্যানিং গুরুত্বপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করেন। ১৭৯৩ সালে কুখ্যাত লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-এর মাধ্যমে অত্যাচারী জমিদার সৃষ্টি করে বাংলার চাষীদের যে দুর্দশা তৈরি হয়, তার প্রকোপ কিছুটা দূর করে প্রজাদের অধিক নিরাপত্তা প্রদানের উদ্দেশ্যে ১৮৫৯ সালে বাংলায় খাজনা আইন পাস করেন তিনি। নীলের একচেটিয়া চাষাবাদ কমিয়ে চা ও কফি চাষ শুরু করে তিনি কৃষিক্ষেত্রকে বিকশিত ও নীলকরদের মনোপলি ও নিপীড়নের কবল থেকে কৃষকদের কিছুটা স্বস্তি দেন।

চার্লস উড শিক্ষা বিষয়ে ১৮৫৪ সালে যে সুপরিশমালা পেশ করেন, তা কার্যকর করেন লর্ড ক্যানিং এবং ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিা করেন। ফলে উপমহাদেশে উচ্চশিক্ষার পথিকৃৎ বলা হয় তাকে।

ইউরোপীয় নীলকরদের বিরুদ্ধে বাংলা ও বিহারের চাষীদের যে অভিযোগের কারণ ছিল তা তদন্ত করতে লর্ড ক্যানিং একটি কমিশন গঠন করেন। কমিশনের সুপারিশমালার ভিত্তিতে তিনি যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তা নীলকরদের স্বেচ্ছাচারিতাকে বহুলাংশে লাঘব করে। লর্ড মেটকাফ কর্তৃক প্রণীত ভারতীয় দন্ডবিধি প্রবর্তন ও কার্যকর করেন তিনি এবং ১৮৬১ সালে ফৌজদারি কার্য-পরিচালনা বিধি (criminal procedure code) প্রকাশ ও চালু করেন। পরবর্তী বছরে পুরাতন সুপ্রিম কোর্টসমূহ ও কোম্পানির ‘আদালত’-এর পরিবর্তে তিনটি প্রেসিডেন্সি শহরে হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা করে উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী অবদান রাখেন তিনি।

লর্ড ক্যানিংয়ের প্রশাসনের শেষদিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ১৮৬১ সালে ভারতীয় কাউন্সিল আইন পাস, যার দ্বারা বেসরকারি ভারতীয় সদস্যগণ ভাইসরয়ের আইনসভায় মনোনীত হতে পারতেন। ভারতীয় নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রথম সুযোগটি এভাবেই উন্মোচিত করেন তিনি।

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময়কার গুরুভার ও কঠিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্লান্ত ক্যানিং অবসর গ্রহণ করে ১৮৬২ সালের ১৮ মার্চ ভগ্নস্বাস্থ্যে ভারত ত্যাগ করেন। অবসর গ্রহণ করার পূর্বে ভারতে তার কর্তব্যপালনের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮৫৯ সালে তাকে ‘আর্ল’ (Earl) মর্যাদায় উন্নীত করা হয়। ইংল্যান্ডে অল্প কয়েকমাস পর ১৮৬২ সালের ১৭ জুন তিনি পরলোকগমন করেন এবং ওয়েস্ট মিনিস্টারস অ্যাবিতে তাকে সমাহিত করা হয়।

বাজেটের হাত ধরে ক্রমে ক্রমে শাসনতান্ত্রিক, বিচারিক ও উচ্চশিক্ষা বিষয়ক অবদানের মাধ্যমে লর্ড ক্যানিং উমহাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিটি গড়ে তুলেছিলেন। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোকেও তিনি বিভাজিত ও বিকশিত করেন। পরবর্তীতে উপনিবেশিক রাষ্ট্র যত গণমুখী হয়েছে, বাজেটেও ততই গণমানুষের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে। ইতিহাসের পাতায় গণতান্ত্রিক অগ্রগতি আর বাজেটের গণমুখী ধারাকে হাত ধরাধরি করে সমান্তরালে চলতে দেখা গেছে।

উপমহাদেশের মানুষ লর্ড ক্যানিংকে মনে রেখেছে। কলকাতার দক্ষিণে ক্যানিং নামে একটি বিরাট এলাকার নামকরণ করা হয়েছে। মহানগরী কলকাতার বুকে সেন্ট্রাল বা মধ্যাঞ্চলে রয়েছে ক্যানিং স্ট্রিট। বড়বাজারের চীৎপুর রোড আর মহাত্মা গান্ধি রোডের পয়েন্ট থেকে ঐতিহাসিক রয়েল ইন্ডিয়া হোটেলের সামনে দিকে এগিয়ে গেলে জমজমাট ক্যানিং স্ট্রিটের দেখা পাওয়া যায়।

কিংবা খেলাফত আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত মোহাম্মদ আলী পার্কের সামনে দিয়ে জাকারিয়া স্ট্রিট ধরে ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদ হয়ে যাওয়া যায় ক্যানিং স্ট্রিটে। ঢাকায় যেমন পাটুয়াটুলী কলকাতায় তেমনি ক্যানিং স্ট্রিট হলো চশমার বিরাট পাইকারি বাজার। আধ ঘণ্টার মধ্যে কাঁচে যে কোনও পাওয়ার দিয়ে চশমার সরবরাহ পেতে ক্যানিং স্ট্রিট একমাত্র ভরসা।

একদা ক্যানিং স্ট্রিটে আস্ত একটি বিকাল কাটিয়ে চশমা ঠিক করতে করতে দেখছিলান বড়বাজার, চীৎপুর, স্ট্যান্ড রোড, বর্ধণ স্ট্রিট, জাকারিয়া স্ট্রিট, কলুটোলা, হাওড়া ব্রিজ থেকে ধেয়ে আসা ভিড় ও জনারণ্য। আর ভাবছিলাম ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল ও প্রথম ভাইসরয়ের কর্ম ও কীর্তিময় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, বিচারিক, উচ্চশিক্ষামূলক অবদানের কথা, যার মধ্যে ছিল উপমহাদেশে প্রথম বাজেট প্রণয়ন ও পেশের কৃতিত্বও।

আপনার মতামত লিখুন :

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

উচ্চমাধ্যমিকের ফল ও কিছু কথা

উচ্চমাধ্যমিকের ফল ও কিছু কথা
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

১৭ জুলাই প্রকাশিত হলো ২০১৯ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল। গতবারের চেয়ে এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা বেশি এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলে লক্ষণীয়।

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫০৫ জন। এর মধ্যে আটটি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এইচএসসিতে পরীক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫০ জন ও মাদরাসা থেকে আলিমের শিক্ষার্থী ছিল ৮৮ হাজার ৪৫১ জন ও কারিগরিতে ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ২৬৪ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪৯৬ জন ছাত্র ও ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৯ জন ছাত্রী। মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৯ হাজার ৮১ শিক্ষা।

এবারের এইচএসসির ফল প্রকাশিত হলো ৫৫ দিনের মধ্যে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশিত হয়েছে বলে এটিকে পজিটিভ বলা যায়। এখন পাবলিক পরীক্ষার ফল দু’মাসে দেওয়া হয়, যা আগে তিনমাসে দেওয়া হতো। এবার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের কারণে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান এবং তিনি এতে খুশিও হয়েছেন। তবে, পরীক্ষার ফল তাড়াহুড়ো করে দেওয়া মানে প্রচুর ভুল-ত্রুটি থেকে যেতে পারে।

আর একটি বিষয় তো আমরা খেয়ালই করছি না। সেটি হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীর সারাজীবনের বিচার করছেন একজন শিক্ষক। তিনি অভিজ্ঞ হোক, অনভিজ্ঞ হোক, নতুন হোক, পুরান হোক, খাতা মূল্যায়ন করতে জানুক আর না জানুক, একজন শিক্ষকের কয়েক মিনিটের বিচার এবং রায় হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর ১২ বছরের সাধনার ফল এবং ভবিষ্যতের পথচলার নির্দেশক। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

একটি উত্তরপত্র বিশেষ করে এই ধরনের পাবলিক পরীক্ষার খাতা কমপক্ষে দু’জন পরীক্ষকের পরীক্ষণ করা উচিৎ, তা না হলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না। এরপর হাজার হাজার ভুল ত্রুটি ধরা পড়বে, সেখানে বোর্ড কিছু অর্থ উপার্জন করবে কিন্তু কাজের কাজ খুব একটা কিছু হবে না কারণ খাতা তো পুনর্মূল্যায়ন হয় না। শুধু ওপরের নম্বর দ্বিতীয়বার গণনা করা হয়। আমরা একটি পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে এর ধরনের খেলা খেলতে পারি না।

এবার ৪১টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। এদের মধ্যে ৩৩টি কলেজ ও আটটি মাদরাসা রয়েছে। কিছু কিছু কলেজ দেখলাম মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল, ওই একজনই অকৃতকার্য হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে শিক্ষা প্রশাসন তথা সরকারের সিদ্ধান্ত কী? কেনইবা একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারে না আবার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়, এটিই বা কেমন প্রতিষ্ঠান?

কুমিল্লা বোর্ডে এবার এইচএসসিতে পাসের হার সবচেয়ে বেশি ৭৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ অথচ এই শিক্ষার্থীরা ২০১৭ সালে যখন এসএসসি পাস করে তখন তাদের পাসের হার ছিল সর্বনিম্ন ৪৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। হঠাৎ করে এই পরিবর্তন কীভাবে হলো? শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তারা হয়তো বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাই এরকম হয়েছে।

আমরা জানি শিক্ষাবোর্ড একমাত্র পরীক্ষা গ্রহণ করা ছাড়া কীভাবে শিক্ষকরা পড়াবেন, কীভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটানো যায় ইত্যাদি নিয়ে তাদের তৎপরতা খুব একটা কখনও দেখা যায় না। একটি বোর্ডের অধীনে কয়েকটি জেলায় কয়েক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে। সেগুলোর শিক্ষাদান, শিক্ষক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থী উন্নয়ন নিয়ে বোর্ডের কোনো তৎপরতা বা কাজ আমরা দেখি না। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বোর্ডগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। কোন বোর্ডে কত বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে; বোর্ড যেন এক ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে চায়।

আসলে আমাদের দেশে শিক্ষাবোর্ডগুলো একমাত্র শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন আর খাতা মূল্যায়ন ছাড়া তেমন কোনো কাজ করে না। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা একটি জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষায় ভালো করলে তা ওই প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের এবং একই জেলার কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো করলে শিক্ষা প্রশাসন কিছুটা কৃতিত্ব নিতে পারে। বোর্ড কেন? বোর্ড কি শিক্ষকদের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়? বোর্ড কি শিক্ষকদের ক্লাস পর্যবেক্ষণ করে? বোর্ড কি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পড়ালেখা করার জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে? এর কোনোটিই করে না। তাহলে তারা কৃতিত্ব দেখাতে চায় কেন, বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয়।

পত্রিকায় দেখলাম যশোর বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। বোর্ডের ১৮টি কলেজের পাসের হার শতভাগ। এ বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ, আর মেয়েদের পাসের হার ৭৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ছেলেদের পাসের হার ৭২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। দিনাজপুর বোর্ডেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। এ দু’টো বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কি বেশি পড়াশোনা করেছে? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে যেটি গবেষণার মাধ্যমে জানা প্রয়োজন।

ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ২০১৫ সাল থেকে পাঁচ বছর যাবত ছাত্রীরা ধারাবাহিকভাবে ছাত্রদের চেয়ে বেশি পাস করে আসছে। এ বছর ছাত্রীদের পাসের হার ৭৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ আর ছাত্রদের ৭১ দশমিক ৬৭ শতাংশ অর্থাৎ ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। এটি যদিও আনন্দের সংবাদ কিন্তু এর সঠিক কারণ জানা প্রয়োজন।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিকে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র