Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

স্বপন যদি মধুর এমন...

স্বপন যদি মধুর এমন...
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বকাপ শুরুর আগে কোনো ফেভারিট তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল না। বিশেষজ্ঞদের তালিকায় কমন নাম ছিল তিনটি, বিশ্ব ক্রিকেটের তিন মোড়ল- ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া। চতুর্থ সেমিফাইনালিস্ট হিসেবে ঘুরেফিরে অনেকগুলো নাম আসছিল- দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ পর্যন্ত। কারো মুখে একবারের জন্যও বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা যে বাংলাদেশের নাম মুখে আনেননি, এ জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর পরও আমি লিখেছিলাম, কেউ যেন বাংলাদেশকে গোনায় না ধরে। ফেভারিট, ডার্ক হর্স ইত্যাদি ইত্যাদি তকমা দিয়ে বাংলাদেশকে যেন চাপে ফেলা না হয়। ফেভারিটরা থাকুক ফেভারিটগিরি নিয়ে, বাংলাদেশ মনের আনন্দে নির্ভার ক্রিকেট খেলুক। নির্ভার ক্রিকেট কত প্রকার ও কী কী; সোমবার টনটনে বাংলাদেশ তা দেখিয়ে দিয়েছে। কীভাবে ৩০০ প্লাস স্কোর চেজ করতে হয় ক্রিকেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তার টিউটোরিয়াল হয়ে থাকবে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচটি।

বাংলাদেশ সেমিফাইনালে যাবে কিনা জানি না, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতবে কিনা জানতে চাই না। তার চেয়ে অনেক বড় শিরোপা বাংলাদেশ জিতে নিয়েছে- মানুষের হৃদয়। ১৮ কোটির বাংলাদেশির হৃদয় তো বটেই, সোমবার বাংলাদেশ চুরি করে নিয়েছে ক্রিকেট বিশ্বের আরও বহু কোটি মানুষের হৃদয়।

প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারালেও দ্বিতীয় ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের সাথে লড়াই করে হেরেছে। এখন সেই ম্যাচের পরাজয় আফসোস আরও বাড়াচ্ছে শুধু। তৃতীয় ম্যাচ নিয়ে অবশ্য কোনো আফসোস নেই। সেদিনটি আমাদের ছিল না। তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চতুর্থ ম্যাচে আমাদের আফসোসের সাগরে ডুবিয়ে দিল বৃষ্টি। নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ দুটি জেতা থাকলে আমরা এখন অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতো।

পূর্ণশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের পঞ্চম ম্যাচটি ছিল 'ডু অর ডাই' পরিস্থিতিতে। কিন্তু বাংলাদেশ এমন 'ডু' করলো, আনন্দে আমাদের 'ডাই' হয়ে যাওয়ার দশা। টস জিতে বোলিং নিয়ে মাশরাফি আবার সমালোচনার মুখে। কিন্তু বীরেরা সমালোচনার জবাব দেয় লড়াইয়ের ময়দানে। মাশরাফিও বর্ন ফাইটার। লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিলেন সামনে থেকে, গেইলকে দেখে ভয় তো পেলেনই না, উল্টো গেইলকে বোতলবন্দী করে রাখলেন। ফলাফল ১৩ বলে শূন্য রানে বিদায় গেইল, ১০ ওভারে ৩২/১।

মাশরাফি বুঝিয়ে দিলেন সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা। মাঝের ওভারগুলোতে ক্যারিবীয় রান মেশিন এমন গতিতে ছুটলো, ভয় হচ্ছিল রান ৩৬০/৩৭০ না হয়ে যায়। কিন্তু মাশরাফি তার অস্ত্রগুলো এমনভাবে ব্যবহার করলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩২১এর বেশি করতে দিলেন না। ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট ছিল মুস্তাফিজের সেই ওভারটি। এক ওভারে দুই ভয়ঙ্কর হেটমায়ার আর রাসেলকে ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচে ফিরিয়ে আনলো বাংলাদেশকে।

আরেকটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল সোমবারের ম্যাচে- ফিল্ডিং। প্রথম তিনটি ম্যাচে ফিল্ডিং ছিল যাচ্ছে তাই, এমনকি প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জিতলেও ফিল্ডিং ভালো হয়নি। সোমবারের ফিল্ডিংয়ে ছিল অন্য বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংস চলার সময় ফেসবুকে আমি লিখেছিলাম, 'বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলছে, আজ বাংলাদেশ জিতবে।' ক্রিকেটে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানসিকতা অনেক সময় পার্থক্য গড়ে দেয়।

এত কিছুর পরও টার্গেট হিসেবে ৩২২ অনেক বড়। এবারের বিশ্বকাপে এর আগে ২৫০ প্লাস চেজ হয়নি। আর বাংলাদেশকে জিততে হলে রেকর্ড করতে হবে। ক্রিকেট লেখক উৎপল শুভ্র আগের ৬টি বিশ্বকাপ কাভার করেছেন মাঠে থেকে। এবার তিনি নির্ভেজাল দর্শক। তবুও উৎপল শুভ্রের বিশ্লেষণ যাতে কেউ মিস না করেন, তাই এটিএন নিউজ প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় 'উৎপল শুভ্রর সাথে বিশ্বকাপ' দেখার আয়োজন করেছে। সোমবার সে অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম তার সঙ্গে। দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর আগে প্রেডিকশনে তিনি বলেছিলেন, 'বাংলাদেশ জিতবে সেটা আমি বলবো না।'

তবে জিতলে সেটা আনবিলিভেবল না বিশ্বকাপের ওয়ান অব দ্যা ফাইনেস্ট ম্যাচ হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য স্মরণীয় রাত হবে। উৎপল শুভ্র পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিক, তার অত আবেগী হলে চলে না। কিন্তু আমার মতো বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্ধ অনুরাগী যারা, যারা শেষ বল পর্যন্ত আশা ছাড়ি না। ৩২২ শুনে তাদেরও বুকটা দুরু দুরু করছিল। অনেকে ভয়ে খেলা দেখেননি, একজন নাকি এক চোখে দেখেছেন। আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বুঝিয়ে দিল তারা লায়েক হয়ে গেছে, কিন্তু দর্শক হিসেবে আমরা সাহসী হতে পারিনি এখনও।

আসলে সমর্থকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। ৩২২ রান মানে ওভার প্রতি প্রায় সাড়ে ৬ রান। চেজের বিপদ হলো রান একটু স্লো হলেই আস্কিং রেট বেড়ে যায়। আর আস্কিং রেটের চাপে অনেক বড় দলের ব্যাটিং লাইনআপ তাসের ঘর হয়ে যায়। এমনিতে ৩০০ প্লাস চেজ করার নিয়ম হলো শুরুতে সাবধানী হতে হবে, আবার রানও তুলতে হবে। মাঝের ওভারগুলোতে আস্কিং রেট যাতে আয়ত্তের বাইরে চলে না যায়। আর পেটাতে হবে শেষ দিকে। কিন্তু বাংলাদেশ সব ফরম্যাট, সব নিয়মকানুন লণ্ডভণ্ড করে দিল।

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের কোনো পর্যায়েই মনে হয়নি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিততে পারে। আস্কিং রেট কখনোই কারেন্ট রেটের ওপরে উঠতে পারেনি। উৎপল শুভ্র বলেছিলেন, জিততে হলে তামিমকে জ্বলে উঠতে হবে। তামিম জ্বলে ওঠার সব রসদ নিয়েই নেমেছিলেন। যতক্ষণ ছিলেন, ভরসা হয়েই ছিলেন। অন্যকিছু হলে ৫৩ বলে ৪৮ রান করে তামিমের রান আউটটা নিয়ে অনেক আফসোস হতো।

কিন্তু সোমবার সে আফসোসের সুযোগ রাখেননি সাকিব। বিশ্বকাপের প্রথম চার ম্যাচে ৫০ প্লাস রান; দুটি ফিফটির পর দুটি সেঞ্চুরি তাকে বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তো বানিয়েছেই, বসিয়েছে অনেক রথী মহারথীর পাশে। সাথে ৫টি উইকেট নিয়ে ম্যান অব বিশ্বকাপ হওয়ার দৌড়ে সবার আগে সাকিব। বিশ্বকাপে খেলছেন বটে, তবে সত্যি বলতে সাকিব বিশ্বের নয়, অন্য গ্রহের ক্রিকেট খেলছেন। তবে সাকিবের কথা বলতে গিয়ে যেন আমরা লিটন দাসকে ভুলে না যাই। টুর্নামেন্টে দলের পঞ্চম ম্যাচে সুযোগ পেলেন। এমনিতে ওপেনার, খেলতে নামলেন ৫ নাম্বারে। খারাপ করলে বাদ পড়ার ঝুঁকি। কিন্তু বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে যা করলেন লিটন, তা আসলে রূপকথা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কম রান করেছে বলে, লিটনের সেঞ্চুরি হয়নি, কিন্তু ৬৯ বলে ৯৪ রানের যে ইনিংসের মাহাত্ম্য কি কম? পরপর তিন চলে ছক্কার যে সাহস তা গোটা দলকেই উজ্জীবিত করবে। জয়ের চেয়েও আমার ভালো লেগেছে স্টাইল।

এমন নির্ভার, ভয়ডরহীন ক্রিকেট আর কারা খেলতে পারে। চাপকে যারা অনুপ্রেরণায় বদলে দিতে পারে, তারাই আসল চ্যাম্পিয়ন।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনেক অর্জন আছে। ১৯৯৯ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই পাকিস্তানকে হারিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল বাংলাদেশ। ২০০৭ সালে ভারতের বিশ্বকাপ স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছিল। ২০১৫ সালে উঠেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে পরাজয়কে আমি বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটা মাইলস্টোন মনে করি। নির্লজ্জ আম্পায়ারিংয়ে বাংলাদেশ হারলেও পেয়েছিল নৈতিক জয়। সেই নৈতিক জয়ে ভর করেই বাংলাদেশ ছুটিয়েছিল সাফল্যের রথ। আর সোমবারের ম্যাচটি বাংলাদেশকে সত্যিকারের বড় দলের কাতারে তুলে দিল।

বাংলাদেশ অনায়াসে জিতেছে। আমাদের খুব ভালো লেগেছে। তবে উৎপল শুভ্রের প্রেডিকশন অনুযায়ী বিশ্বকাপের ফাইনেস্ট ম্যাচ হয়নি এটি। ৫১ বল বাকি থাকতে ৭ উইকেটের জয় নিরপেক্ষ দর্শকদের চোখে বিরক্তিকর ও বোরিং। তবে বিশ্বের অন্য ক্রিকেট নেশনের এই ম্যাচ থেকে শেখা উচিত। বাংলাদেশ হলো এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। বিশ্বকাপের আগে বলা হচ্ছিল, এবার ম্যাচে ম্যাচ ৩০০ হবে। কিন্তু তা হয়নি। বাংলাদেশই আগে ব্যাট করে ৩৩০ করেছে, ৩২২ কে চেজ করেছে ছেলেখেলা বানিয়ে।

সোমবার খেলা শেষেই এই লেখাটি লেখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ম্যাচ শেষে ভালো লাগার এমন একটা স্বর্গীয় আবেশ তৈরি হলো, লেখালেখির মত জাগতিক কাজে হাত দিতে মন সায় দিচ্ছিল না। সকালে ঘুম ভেঙেও দেখি ভালো লাগার আবেশটা রয়ে গেছে। সব কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে, যেন ঘোরে আছি। খালি মনে হচ্ছে স্বপ্নেই থাকি- স্বপন যদি মধুর এমন, জাগিও না আমায়, জাগিও না...।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র