স্বপন যদি মধুর এমন...

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বকাপ শুরুর আগে কোনো ফেভারিট তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল না। বিশেষজ্ঞদের তালিকায় কমন নাম ছিল তিনটি, বিশ্ব ক্রিকেটের তিন মোড়ল- ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া। চতুর্থ সেমিফাইনালিস্ট হিসেবে ঘুরেফিরে অনেকগুলো নাম আসছিল- দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ পর্যন্ত। কারো মুখে একবারের জন্যও বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা যে বাংলাদেশের নাম মুখে আনেননি, এ জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর পরও আমি লিখেছিলাম, কেউ যেন বাংলাদেশকে গোনায় না ধরে। ফেভারিট, ডার্ক হর্স ইত্যাদি ইত্যাদি তকমা দিয়ে বাংলাদেশকে যেন চাপে ফেলা না হয়। ফেভারিটরা থাকুক ফেভারিটগিরি নিয়ে, বাংলাদেশ মনের আনন্দে নির্ভার ক্রিকেট খেলুক। নির্ভার ক্রিকেট কত প্রকার ও কী কী; সোমবার টনটনে বাংলাদেশ তা দেখিয়ে দিয়েছে। কীভাবে ৩০০ প্লাস স্কোর চেজ করতে হয় ক্রিকেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তার টিউটোরিয়াল হয়ে থাকবে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচটি।

বাংলাদেশ সেমিফাইনালে যাবে কিনা জানি না, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতবে কিনা জানতে চাই না। তার চেয়ে অনেক বড় শিরোপা বাংলাদেশ জিতে নিয়েছে- মানুষের হৃদয়। ১৮ কোটির বাংলাদেশির হৃদয় তো বটেই, সোমবার বাংলাদেশ চুরি করে নিয়েছে ক্রিকেট বিশ্বের আরও বহু কোটি মানুষের হৃদয়।

প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারালেও দ্বিতীয় ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের সাথে লড়াই করে হেরেছে। এখন সেই ম্যাচের পরাজয় আফসোস আরও বাড়াচ্ছে শুধু। তৃতীয় ম্যাচ নিয়ে অবশ্য কোনো আফসোস নেই। সেদিনটি আমাদের ছিল না। তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চতুর্থ ম্যাচে আমাদের আফসোসের সাগরে ডুবিয়ে দিল বৃষ্টি। নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ দুটি জেতা থাকলে আমরা এখন অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতো।

পূর্ণশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের পঞ্চম ম্যাচটি ছিল 'ডু অর ডাই' পরিস্থিতিতে। কিন্তু বাংলাদেশ এমন 'ডু' করলো, আনন্দে আমাদের 'ডাই' হয়ে যাওয়ার দশা। টস জিতে বোলিং নিয়ে মাশরাফি আবার সমালোচনার মুখে। কিন্তু বীরেরা সমালোচনার জবাব দেয় লড়াইয়ের ময়দানে। মাশরাফিও বর্ন ফাইটার। লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিলেন সামনে থেকে, গেইলকে দেখে ভয় তো পেলেনই না, উল্টো গেইলকে বোতলবন্দী করে রাখলেন। ফলাফল ১৩ বলে শূন্য রানে বিদায় গেইল, ১০ ওভারে ৩২/১।

মাশরাফি বুঝিয়ে দিলেন সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা। মাঝের ওভারগুলোতে ক্যারিবীয় রান মেশিন এমন গতিতে ছুটলো, ভয় হচ্ছিল রান ৩৬০/৩৭০ না হয়ে যায়। কিন্তু মাশরাফি তার অস্ত্রগুলো এমনভাবে ব্যবহার করলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩২১এর বেশি করতে দিলেন না। ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট ছিল মুস্তাফিজের সেই ওভারটি। এক ওভারে দুই ভয়ঙ্কর হেটমায়ার আর রাসেলকে ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচে ফিরিয়ে আনলো বাংলাদেশকে।

আরেকটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল সোমবারের ম্যাচে- ফিল্ডিং। প্রথম তিনটি ম্যাচে ফিল্ডিং ছিল যাচ্ছে তাই, এমনকি প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জিতলেও ফিল্ডিং ভালো হয়নি। সোমবারের ফিল্ডিংয়ে ছিল অন্য বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংস চলার সময় ফেসবুকে আমি লিখেছিলাম, 'বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলছে, আজ বাংলাদেশ জিতবে।' ক্রিকেটে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানসিকতা অনেক সময় পার্থক্য গড়ে দেয়।

এত কিছুর পরও টার্গেট হিসেবে ৩২২ অনেক বড়। এবারের বিশ্বকাপে এর আগে ২৫০ প্লাস চেজ হয়নি। আর বাংলাদেশকে জিততে হলে রেকর্ড করতে হবে। ক্রিকেট লেখক উৎপল শুভ্র আগের ৬টি বিশ্বকাপ কাভার করেছেন মাঠে থেকে। এবার তিনি নির্ভেজাল দর্শক। তবুও উৎপল শুভ্রের বিশ্লেষণ যাতে কেউ মিস না করেন, তাই এটিএন নিউজ প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় 'উৎপল শুভ্রর সাথে বিশ্বকাপ' দেখার আয়োজন করেছে। সোমবার সে অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম তার সঙ্গে। দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর আগে প্রেডিকশনে তিনি বলেছিলেন, 'বাংলাদেশ জিতবে সেটা আমি বলবো না।'

তবে জিতলে সেটা আনবিলিভেবল না বিশ্বকাপের ওয়ান অব দ্যা ফাইনেস্ট ম্যাচ হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য স্মরণীয় রাত হবে। উৎপল শুভ্র পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিক, তার অত আবেগী হলে চলে না। কিন্তু আমার মতো বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্ধ অনুরাগী যারা, যারা শেষ বল পর্যন্ত আশা ছাড়ি না। ৩২২ শুনে তাদেরও বুকটা দুরু দুরু করছিল। অনেকে ভয়ে খেলা দেখেননি, একজন নাকি এক চোখে দেখেছেন। আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বুঝিয়ে দিল তারা লায়েক হয়ে গেছে, কিন্তু দর্শক হিসেবে আমরা সাহসী হতে পারিনি এখনও।

আসলে সমর্থকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। ৩২২ রান মানে ওভার প্রতি প্রায় সাড়ে ৬ রান। চেজের বিপদ হলো রান একটু স্লো হলেই আস্কিং রেট বেড়ে যায়। আর আস্কিং রেটের চাপে অনেক বড় দলের ব্যাটিং লাইনআপ তাসের ঘর হয়ে যায়। এমনিতে ৩০০ প্লাস চেজ করার নিয়ম হলো শুরুতে সাবধানী হতে হবে, আবার রানও তুলতে হবে। মাঝের ওভারগুলোতে আস্কিং রেট যাতে আয়ত্তের বাইরে চলে না যায়। আর পেটাতে হবে শেষ দিকে। কিন্তু বাংলাদেশ সব ফরম্যাট, সব নিয়মকানুন লণ্ডভণ্ড করে দিল।

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের কোনো পর্যায়েই মনে হয়নি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিততে পারে। আস্কিং রেট কখনোই কারেন্ট রেটের ওপরে উঠতে পারেনি। উৎপল শুভ্র বলেছিলেন, জিততে হলে তামিমকে জ্বলে উঠতে হবে। তামিম জ্বলে ওঠার সব রসদ নিয়েই নেমেছিলেন। যতক্ষণ ছিলেন, ভরসা হয়েই ছিলেন। অন্যকিছু হলে ৫৩ বলে ৪৮ রান করে তামিমের রান আউটটা নিয়ে অনেক আফসোস হতো।

কিন্তু সোমবার সে আফসোসের সুযোগ রাখেননি সাকিব। বিশ্বকাপের প্রথম চার ম্যাচে ৫০ প্লাস রান; দুটি ফিফটির পর দুটি সেঞ্চুরি তাকে বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তো বানিয়েছেই, বসিয়েছে অনেক রথী মহারথীর পাশে। সাথে ৫টি উইকেট নিয়ে ম্যান অব বিশ্বকাপ হওয়ার দৌড়ে সবার আগে সাকিব। বিশ্বকাপে খেলছেন বটে, তবে সত্যি বলতে সাকিব বিশ্বের নয়, অন্য গ্রহের ক্রিকেট খেলছেন। তবে সাকিবের কথা বলতে গিয়ে যেন আমরা লিটন দাসকে ভুলে না যাই। টুর্নামেন্টে দলের পঞ্চম ম্যাচে সুযোগ পেলেন। এমনিতে ওপেনার, খেলতে নামলেন ৫ নাম্বারে। খারাপ করলে বাদ পড়ার ঝুঁকি। কিন্তু বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে যা করলেন লিটন, তা আসলে রূপকথা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কম রান করেছে বলে, লিটনের সেঞ্চুরি হয়নি, কিন্তু ৬৯ বলে ৯৪ রানের যে ইনিংসের মাহাত্ম্য কি কম? পরপর তিন চলে ছক্কার যে সাহস তা গোটা দলকেই উজ্জীবিত করবে। জয়ের চেয়েও আমার ভালো লেগেছে স্টাইল।

এমন নির্ভার, ভয়ডরহীন ক্রিকেট আর কারা খেলতে পারে। চাপকে যারা অনুপ্রেরণায় বদলে দিতে পারে, তারাই আসল চ্যাম্পিয়ন।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনেক অর্জন আছে। ১৯৯৯ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই পাকিস্তানকে হারিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল বাংলাদেশ। ২০০৭ সালে ভারতের বিশ্বকাপ স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছিল। ২০১৫ সালে উঠেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে পরাজয়কে আমি বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটা মাইলস্টোন মনে করি। নির্লজ্জ আম্পায়ারিংয়ে বাংলাদেশ হারলেও পেয়েছিল নৈতিক জয়। সেই নৈতিক জয়ে ভর করেই বাংলাদেশ ছুটিয়েছিল সাফল্যের রথ। আর সোমবারের ম্যাচটি বাংলাদেশকে সত্যিকারের বড় দলের কাতারে তুলে দিল।

বাংলাদেশ অনায়াসে জিতেছে। আমাদের খুব ভালো লেগেছে। তবে উৎপল শুভ্রের প্রেডিকশন অনুযায়ী বিশ্বকাপের ফাইনেস্ট ম্যাচ হয়নি এটি। ৫১ বল বাকি থাকতে ৭ উইকেটের জয় নিরপেক্ষ দর্শকদের চোখে বিরক্তিকর ও বোরিং। তবে বিশ্বের অন্য ক্রিকেট নেশনের এই ম্যাচ থেকে শেখা উচিত। বাংলাদেশ হলো এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। বিশ্বকাপের আগে বলা হচ্ছিল, এবার ম্যাচে ম্যাচ ৩০০ হবে। কিন্তু তা হয়নি। বাংলাদেশই আগে ব্যাট করে ৩৩০ করেছে, ৩২২ কে চেজ করেছে ছেলেখেলা বানিয়ে।

সোমবার খেলা শেষেই এই লেখাটি লেখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ম্যাচ শেষে ভালো লাগার এমন একটা স্বর্গীয় আবেশ তৈরি হলো, লেখালেখির মত জাগতিক কাজে হাত দিতে মন সায় দিচ্ছিল না। সকালে ঘুম ভেঙেও দেখি ভালো লাগার আবেশটা রয়ে গেছে। সব কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে, যেন ঘোরে আছি। খালি মনে হচ্ছে স্বপ্নেই থাকি- স্বপন যদি মধুর এমন, জাগিও না আমায়, জাগিও না...।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :