দেশ অর্জন থেকে বিনির্মাণের সাত দশক

রেজা-উদ্-দৌলাহ প্রধান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি প্রতীকী

ছবি প্রতীকী

  • Font increase
  • Font Decrease

আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল অর্জন, সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ জাতির যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন, তার মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগ।

দেশের সকল গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল আন্দোলনের সাহসী মিছিলের নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। জনগণের ভেতর থেকে উত্থিত প্রগতিশীল সংগ্রামী রাজনৈতিক দলের নাম আওয়ামী লীগ। সমাজের অগ্রসর চিন্তা-চেতনা, আদর্শ, লক্ষ্য ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতা-কর্মীদের ইস্পাতদৃঢ় মনোবল এবং ঐক্যবদ্ধতার ফসল হচ্ছে আওয়ামী লীগ।

শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে পুরোনো, বৃহত্তম ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। হাটি হাটি পা পা করে আজ পথচলার ৭০ বছর পূরণ করেছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জননেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুল হকের নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ।

জন্মলগ্নে এই দলের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, শোষণমুক্ত সাম্যের সমাজ নির্মাণের আদর্শ এবং একটি উন্নত সমৃদ্ধ আধুনিক, প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দর্শনের ভিত্তি রচনা করে আওয়ামী লীগ। ফলশ্রুতিতে ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও আওয়ামী লীগের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। অনেকে বলে, আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস। ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়, ১৯৪৮ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সূচিত ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে গণজাগরণে পরিণত হয়। তখন অব্যাহত রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার তরুণ জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান সেই সময়ে কারান্তরালে থেকেও ভাষা আন্দোলনে পালন করেন প্রেরণাদাতার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের পটভূমিতে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের হয় শোচনীয় পরাজয়। পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ সরকার নিশ্চিত করে এক মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ। আওয়ামী লীগের উদ্যোগেই মাতৃভাষা বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হয় জাতীয় ছুটির দিন ‘শহীদ দিবস’। আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ প্রায় সম্পন্ন হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমি। মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে জনগণের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় সংগঠন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এরপর আইয়ুবের এক দশকের স্বৈরশাসন-বিরোধী আন্দোলন, ’৬২ ও ’৬৪-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয়দফা আন্দোলন, ’৬৮-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ছয়দফাভিত্তিক ’৭০-এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” খ্যাত কালজয়ী ভাষণ ও পরে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন, ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার পর ২৬ মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অবশেষে দীর্ঘ ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অভ্যুদ্বয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

আরও পড়ুন:আ’লীগের আঁতুরঘর, পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেন

স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের রূপকার আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতির স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সুমহান ঐতিহ্যের প্রতীক। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের রাজনীতির মূলস্রোতই আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে যখন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত ঠিক তখনই স্বাধীনতা বিরোধীচক্র আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে খুব দ্রুত। দেশের মত অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় দল, দিশেহারা হয়ে ওঠে নেতা-কর্মীরা। যে দলের নেতৃত্বে দেশ অর্জন হল কিন্তু দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সেই স্বপ্ন তিমিরেই রয়ে গেল।

১৯৮১ সালের ১৭ মে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে ভঙ্গুর মনোবলের দলের হাল ধরেন। এর পরই নবউদ্যামে সংগঠিত হয় আবারো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতির হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের এক নবতর সংগ্রামের পথে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথপরিক্রমায় অনেক অশ্রু, ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি ফিরে পায় ‘ভাত ও ভোটের অধিকার’। ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন শুরু করে। কিন্তু সেই স্বপ্ন যাত্রায় ছেদ পড়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে। ৮ বছর বিরতি দিয়ে এরপর আবারো দেশের শাসনক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। তারপর টানা তিনবার নির্বাচনে জয় লাভ করে এক দশকের বেশি সময়কাল হল দেশের শাসনক্ষমতায় তারাই আছে।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদের টানা শাসনকালে শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে ও সুদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্থিতিশীল অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নয়নে গতিশীলতা, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, খাদ্য নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়নের ফলে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আরও পড়ুন:গল্পে গল্পে আওয়ামী লীগের সংগ্রামী ৭০

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ এবং সাবমেরিনের মালিকানা অর্জনের মধ্য দিয়ে জল-স্থল-মহাকাশ জয় করেছে বাংলাদেশ। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯শ৯ ডলার, প্রবৃদ্ধি ৭.৯ শতাংশ। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলভুক্ত ৪৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে, যা ছিলো ১৯৭৪ সালের পর দ্রুততম বিকাশ।

সাত দশকের লড়াই-সংগ্রামের অভিযাত্রায় আওয়ামী লীগ বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। আগামি বছর ‘মুজিব বর্ষ’ তারপরের বছর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে আওয়ামী লীগ। দেশের উন্নয়নের যে গতি ও অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০৪১ সালের আগেই একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে চায় আওয়ামী লীগ। আমরাও সেই স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা।

আপনার মতামত লিখুন :